সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-পর্যালোচনা
   আইন-আদালত
   তদন্ত
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   পাঠক-পাতা







   যোগাযোগ
    সম্পাদক, বুলেটিন
    আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
    ২৬/৩ পুরানা পল্টন লাইন
    ঢাকা-১০০০
    ইমেইল :
    ask@citechco.net
    publication@askbd.org


পিলখানাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি

সুলতানা কামাল

পিলখানার নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পরে কিছু লেখা বা বলা কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। ২৯ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধের বিচার ও সাধারণ মানুষের কল্যাণমুখী অসামপ্রদায়িক সমাজ গঠন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পক্ষে জনগণের অকুণ্ঠ রায় নিয়ে যখন সমগ্র জাতি উদ্দীপিত ছিল, ঠিক তখনই এই ঘটনায় জাতি যেমন শোকে মুহ্যমান হয়েছে তেমনই প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ক্ষতের। এই ন্যক্কারজনক হত্যাযজ্ঞের নিন্দা জানানোরও ভাষা জানা নেই আমাদের।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী বিডিআরের সাধারণ সৈনিকদের বহুদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের কারণে তারা বিদ্রোহ ঘটিয়েছে এমন ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল। ক্রমশ সেটা অপসৃত হয়ে এই বিশ্বাস দৃঢ় হয়ে আসছে যে, পিলখানায় যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে তা ছিল বহুদিনের ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে সুচতুর পরিকল্পনাপ্রসূত। তবে একথা ভুলে গেলে চলবে না যে বঞ্চনার প্রতিকার সবসময় বঞ্চিতরা না পেলেও সুযোগসন্ধানীরা সেটা সময়মতো ঠিকই তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে। আমরা নিশ্চয় করে বলতে পারি না যে এক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল। আজকে প্রত্যেকের গভীর মনোযোগের সাথে একথা অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে যে কীভাবে আমাদের সামাজে এমন ক্রুর, নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারার উপাদানগুলো বিরাজমান থাকল। এমন ভয়াবহ সন্ত্রাস কী করে এ সমাজে বাস্তব হতে পারল। আমাদের এই সমাজের কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই এ ভয়ঙ্কর হিংসা লুকিয়ে ছিল।
এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় এর মূল কারণ আমরা জাতি হিসেবে সন্ত্রাস, হত্যা, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের সংস্কৃতিকে লালন করেছি। আমরা উপরোক্ত অপরাধগুলোকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে তার আইনানুগ প্রতিকার চাওয়ার ব্যাপারে, অন্যায়ের শাস্তি বিধান করার ব্যাপারে দেখিয়েছি চরম অনীহা অথবা অবহেলা। অপরাধ করে, অন্যায় করে অপরাধী বা অন্যায়কারী আইনকে সমাজের ন্যায়-অন্যায়বোধকে, ন্যায়বিচারের অঙ্গীকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সমাজের অনুমোদন নিয়ে দাপটের সাথে জীবনযাপন করে গেছে। শুধু তাই নয় সমস্ত রকম সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সুবিধা হাসিল করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করেছে, উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটিয়েছে ব্যক্তিগত সম্পদ ও অবস্থানের। অন্যদিকে সৎ ও ভালো মানুষেরা এই দুর্নীতির পদাঘাতে ছিটকে পড়েছে উন্নয়নের সামগ্রিক প্রক্রিয়া থেকে। এত অন্যায়, অবিচার, এত অপরাধকে টিকিয়ে রাখতে, বিচারের ঊর্ধ্বে রাখতে সন্ত্রাসীরা, দুর্নীতিবাজরা এবং তাদের ক্ষমতাসীন দোসররা বহুগুণ তেজে সন্ত্রাস আর দুর্নীতিকে রক্ষা করে গেছে। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচার না করার মধ্য দিয়ে এই ধারাকে করা হয়েছে শক্তিশালী। তারই ফলশ্রুতিতে আমাদের সইতে হয়েছে ’৭৫-এর চরম আঘাত, দেখতে হয়েছে নিজেরই সেনাসহকর্মীদের হাতে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, একের পর এক রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, হত্যাযজ্ঞ। নিহত হয়েছেন আহসান উল্লাহ মাস্টার, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, ময়েজউদ্দীন, আইভী রহমানসহ পরীক্ষিত রাজনীতিকরা, নিহত হয়েছেন মানিক সাহা, বালু, হারুনুর রশীদসহ সাংবাদিকেরা, ঘটেছে সিপিবি, উদীচী, রমনার বটমূল, ঝালকাঠি, ২১ আগস্টের মতো রক্ত হিম করা সন্ত্রাসী ঘটনা। আমরা মনে করি, এরই ধারাবাহিকতায় ঘটেছে পিলখানার হত্যাকাণ্ড।
অথচ আমাদের ইতিহাস যে সাক্ষ্য দেয় তাতে দেখতে পাই বাংলাদেশের জনগণ কখনোই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে অথবা প্রতিকার চাইতে দ্বিধাবোধ করেনি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতেও ৩৮ বছর ধরেই বাংলাদেশের জনগণ সোচ্চার থেকেছে। কখনোই এই দাবি পরিত্যাগ করেনি। তার বড় প্রমাণ এই দাবিই আজ নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে দৃঢ়তরভাবে উঠে এসেছে। একথাও আজকে বিশ্লেষণের দাবি রাখে যে কোন অবস্থায় বা কোন পরিপ্রেক্ষিতে আমরা এই দাবি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আমাদের নৈতিক দায়িত্ব সেটাও দেখা যে এর পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে। আমাদের উচিত ছিল আমাদের মধ্যে সন্ত্রাস, দুর্নীতির যে গ্রহণযোগ্যতার এক সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কঠোর কিন্তু অতি প্রয়োজনীয় কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার করা। এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে আমরা যেন আর দেরি না করি। স্বাধীনতা দিবসে সব শহীদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।