আইন-পর্যালোচনা
পিলখানার হত্যাকাণ্ডের বিচার
একটি আইনি পর্যবেক্ষণ
আবু ওবায়দুর রহমান ও তাপস বন্ধু দাস
গত ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ঢাকা
পিলখানার বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটে গেছে বর্বরোচিত, নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ। পিলখানা ট্র্যাজেডি কি নিছকই বিডিআর জওয়ানদের বিদ্রোহ, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? - ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠবার সাথে সাথে এ প্রশ্নটিই এখন সবার সামনে। এ ঘটনায় সামরিক- বেসামরিকসহ মোট ৭৩ জনকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়- যাদের মধ্যে ৬৭ জনই সেনা কর্মকর্তা। হত্যার পর তাদের লাশ গণকবরে চাপা দেয়া, ম্যানহোলে ফেলে দেয়া, পুড়িয়ে ফেলা, সেনা কর্মকর্তাদের বাসায় ঢুকে নির্যাতন, হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগের মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। নির্মমভাবে নিহত হয় তিন সাধারণ পথচারী। এদের মধ্যে রয়েছে একজন শিশু সবজি বিক্রেতা (বাবার সহকারী), বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী এবং একজন দরিদ্র রাজমিস্ত্রি। এই যে লোমহর্ষক নিষ্ঠুরতা, অনৈতিকতার এই যে চরম বহিঃপ্রকাশ তা শুধু বঞ্চিত জওয়ানদের ক্ষোভ ও অভিযোগ থেকে সংঘটিত হতে পারে না। কার্যকারণের তুলনামূলক বিচারে পিলখানা হত্যাকাণ্ড তাই যথেষ্ট অস্পষ্টতার জন্ম দিয়েছে।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনের জন্য ইতিমধ্যেই সিআইডি, সেনাবাহিনী এবং সরকারের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিশন। আর তদন্তের পরপরই আসে বিচারের প্রশ্ন। বিচারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের সামনে কী পথ খোলা আছে সে সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়ার জন্যই এখানে প্রচলিত আইনগুলো পর্যালোচনা করা হলো।
দণ্ডবিধির অধীনে বিচার
ইতিমধ্যেই বিডিআর সদর দপ্তরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০খ, ১২১, ১২১ এ, ১৪৭, ১৪৯, ২০১, ৩৩২, ৩৩৩, ৩৪৩, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩০২, ৩৮০, ৩৮২, ৪৩৬, ৪২৭, ১১৪, ১০৯, ৩৪ ধারা এবং বিস্ফোরক আইনের ৩ ও ৪ ধারার অধীনে মামলা হয়েছে।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, দণ্ডবিধির অধীনে এ ধরনের বিদ্রোহ ও হত্যার বিচার সম্পন্ন করা দুরূহ ব্যাপার। এ আইনে প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরাধীর সংশ্লিষ্টতা, আলামত, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট/ডাক্তারি সার্টিফিকেট ইত্যাদি বিষয় সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা একই লাইনে এনে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি অপরাধীকে সাজা প্রদান করা হয়। এ ধরনের বিদ্রোহের ঘটনায় ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু কে বা কারা গুলি করেছে, কয়টা গুলি করেছে, এ বিষয়গুলো প্রমাণ করা খুবই কঠিন। কারণ এ ঘটনার সাথে অসংখ্য মানুষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বাদিপক্ষ হয়তো আসামিদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেবে এবং তার ওপর ভিত্তি করে নিম্ন আদালত হয়তো শাস্তি প্রদান করবে। কিন্তু হাইকোর্টে এ শাস্তি বহাল থাকার সম্ভাবনা কম। কেননা এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ রকম বড় একটি উদাহরণ হচ্ছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা। যে ১২ জন হত্যার কথা নিজে স্বীকার করেছে, নিম্ন আদালত শুধু তাদেরই শাস্তি দিতে পেরেছে। কারণ ঘটনার ভয়াবহতা ও ব্যাপকতার কারণে সাক্ষ্য-প্রমাণ এক লাইনে আনা সম্ভব হয়নি বিধায় অন্যদের শাস্তি দেয়া যায়নি। উল্লেখ্য, ঐ ১২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল মামলা হওয়ার আগে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সময়। অর্থাৎ তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক জবানবন্দি আদায় করা হয়নি। এ কথা সত্য যে, বঙ্গবন্ধু হত্যায় শুধু ১২ বা ১৫ জন জড়িত ছিল না। আরও অনেকে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে। শুধু সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
বিডিআর আইন
বাংলাদেশ রাইফেলস্ (সংশোধনী) আইন ১৯৭৪-এর ধারা ১০(ক) অনুযায়ী বিদ্রোহ, মারপিট, বলপ্রয়োগ ইত্যাদি অপরাধের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি অপরাধের বিষয়ে এই আইনে কিছু উল্লেখ নেই। ফলশ্রুতিতে শাস্তিরও বিধান নেই।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস্) অ্যাক্ট ১৯৭৩
বিভিন্ন মহল থেকে বিডিআরের ঘটনার বিচার এই আইনে করা সম্ভব বলে মতামত আসছে। এই আইনের ৩(২) ধারা অনুযায়ী যুদ্ধের নামে বা সময়ে সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক বেসামরিক নাগরিক, কিংবা কোনো জাতি, ধর্ম, রাজনৈতিক বিবেচনায় হত্যা বা ক্ষতিসাধন করা হলে এই আইনে বিচার করা যাবে। বিডিআরের ঘটনা এ ধরনের কোনো বিষয় নয় বিধায় এই আইনে তাদের বিচার করার সুযোগ নেই।
আর্মি অ্যাক্ট ১৯৫২
বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যাচ্ছে যে, বিডিআর বাহিনী সেনাবাহিনীর অফিসার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তাই তাদের বিচার আর্মি অ্যাক্ট ১৯৫২-এর অধীনে হতে পারে। কিন্তু সেনা কর্মকর্তাগণ বিডিআরে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। ফলে শুধু কর্মকর্তারাই আর্মি অ্যাক্ট ১৯৫২-এর অধীনস্থ। বিডিআরের সাধারণ সৈন্য বা অন্য কর্মচারীরা নয়।
আর্মি অ্যাক্ট ১৯৫২-এর ৫(১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকার এই আইনের বিধিবিধান অন্য যে কোনো বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারবে। সেদিক থেকে বলা যায়, বিডিআরের ঘটনা এ আইনের অধীনে বিচার করা সম্ভব। কিন্তু জটিলতা হচ্ছে, বিডিআর তার নিজস্ব আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিডিআর আইনে কোথাও উল্লেখ নেই যে, বিডিআর আইন প্রয়োগে কোনো সমস্যা দেখা দিলে অন্য আইনের বিধান প্রয়োগ করা যাবে। বিডিআর পরিচালিত হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আর সেনাবাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এর বিপরীতে আবার যুক্তি আছে- যেহেতু আর্মি অ্যাক্টের ৫(১) ধারায় বিধান রয়েছে যে, সরকার সৃষ্ট ও পরিচালিত যে কোনো বাহিনীর ক্ষেত্রে এ আইনের বিধানগুলো প্রয়োগ করা যাবে এবং যেহেতু বিডিআর আইনটি আর্মি অ্যাক্ট-এর পরে প্রণীত হওয়া সত্ত্বেও এতে বিপরীত কোনো বিধান অর্থাৎ আর্মি অ্যাক্টের উক্ত বিধানকে অগ্রাহ্য বা অতিক্রম করে কোনো বিধান রাখা হয়নি, তাই আর্মি অ্যাক্টের বিধান এক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে।
আইনের এই কৌশলগত দিকগুলো বিবেচনা করা সত্ত্বেও আর্মি অ্যাক্টে বিচার করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় উদ্বেগের কারণ রয়েছে। তা হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। সেনা আদালতে বিচারের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে শাস্তি নিশ্চিত করা হলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বিডিআর ট্র্যাজেডির বিচার নতুন কোনো বিশেষ আইনের মাধ্যমে কিংবা বিডিআর আইনের সংশোধনের মাধ্যমে করা হলে তার সাংবিধানিক বা আইনগত ভিত্তি কী হবে?
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পিলখানা ট্র্যাজেডির যথার্থ বিচারে প্রচলিত আইন পর্যাপ্ত নয়। সেক্ষেত্রে নতুন আইনের মাধ্যমে বা বিদ্যমান বিডিআর আইনের সংশোধনের মাধ্যমে বিচার করার বিষয়টি বিবেচনায় আনা যেতে পারে। বিডিআর আইনে বিদ্রোহ, মারপিট ইত্যাদি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলেও হত্যার মতো গুরুতর অপরাধ এর আওতার বাইরে। বিডিআর আইন সংশোধন করে হত্যা, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি সংঘটিত অপরাধগুলো এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হলে এবং সে অনুযায়ী শাস্তি ঠিক করে দিলে বিডিআরের নিজস্ব/বিভাগীয় বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে অভিযুক্তদের বিচার করা যেতে পারে বলে অভিমত রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় যেহেতু এই অপরাধগুলো বা তার শাস্তি বিডিআর আইনে ছিল না, তাই এগুলোকে শুধু অন্তর্ভুক্ত করলেই চলবে না ভূতাপেক্ষ /পূর্বাপর কার্যকারিতাও দিতে হবে এবং তা অবধারিতভাবে এর বৈধতা সম্পর্কে আইনগত ও সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দেবে। দ্বিতীয়ত, বিডিআর এর গঠন ও নিয়ন্ত্রণ এখন এক ধরনের অস্পষ্টতার মধ্যে রয়েছে। যদি সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ রেখেই বিচার করা হয় তা হলে আর্মি অ্যাক্ট-এ বিচার করার ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতার যে আশঙ্কা করা হয়েছে তা এক্ষেত্রেও থাকবে।
অপরদিকে যদি একটি নতুন আইন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হয়, তাহলে-
১. সম্পূর্ণ নতুন একটি কাঠামো ও প্রক্রিয়ায় বিচার করা যাবে;
২. বিচারিক প্রক্রিয়া সহজতর হবে এবং অপরাধ প্রমাণ করাও সহজ হবে;
৩. বিডিআরের বাইরের কেউ এ ঘটনার সাথে যুক্ত থাকলে তাকেও এর আওতায় আনা যাবে।
বাংলাদেশে এধরনের আইনের নজির আছে, যেমন-কোলেবোরেটরস্ অ্যাক্ট ১৯৭২, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস্) অ্যাক্ট ১৯৭৩।
* * *
