সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-পর্যালোচনা
   আইন-আদালত
   তদন্ত
   নারী
   আন্তর্জাতিক
   পাঠক-পাতা







   যোগাযোগ
    সম্পাদক, বুলেটিন
    আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
    ২৬/৩ পুরানা পল্টন লাইন
    ঢাকা-১০০০
    ইমেইল :
    ask@citechco.net
    publication@askbd.org


আন্তর্জাতিক
গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসন
নিজ বাসভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের উৎখাত প্রক্রিয়ার অংশ
শাহ আফ্রোদিতি পান্না

বেইত হানুনে নিজেদের বাড়িতে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়েছিল ১০ বছরের ইসমাইল হামদান ও তার বোন। কিন্তু মায়ের কাছ পর্যন্ত তারা পৌঁছাতে পারেনি। এক গোলার আঘাতে তাদের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়’ (প্রথম আলো, ৭ জানুয়ারি ২০০৯)। এটি ফিলিস্তিনে ইসরাইলের সর্বশেষ যে হামলাটি হয়েছে তার একটি ক্ষুদ্র চিত্র। গাজায় ইসরাইলি হামলা চলাকালীন খবরের কাগজ, টেলিভিশন খুললেই দেখা গেছে অনেক শিশুর এরকম ক্ষত-বিক্ষত দেহ, বাবা-মায়ের কোলে কাগজের পুটলির মতো মোড়ানো সন্তানের মৃত শরীর।
‘শুধু ধ্বংসযজ্ঞ বা গণহত্যার শব্দ দিয়ে ইসরাইলের এ হামলাকে বর্ণনা করা যাবে না। এই যে আমি এখন আপনার সঙ্গে কথা বলছি, আমি শঙ্কায় আছি, এখনই হয়তো একটি রকেট এসে আমাকে কিংবা আমার বাড়িতে আমার প্রিয় কাউকে হত্যা করবে। অবিরাম হামলার কারণে রাতে ঘুমাতে পারি না। প্রার্থনা করি, যারা এ হামলা চালাচ্ছে তাদের এবং তাদের আরব মিত্রদের জন্যও যেন এমন একটি রক্তাক্ত দিন আসে’ (প্রথম আলো, ৭ জানুয়ারি ২০০৯)। এ কথাগুলো হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ানো এক ফিলিস্তিনি নাগরিকের।
ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে ঠেকানোর দোহাই তুলে ইসরাইল গত ২৭ ডিসেম্বরে ফিলিস্তিনের গাজায় হামলা চালায়। গাজার বড় বড় ভবন দখল করে সেখান থেকে ইসরাইলি সৈন্যরা গোলাবর্ষণ করেছে। গাজায় প্রতি ৫ মিনিট অন্তর শোনা গেছে ইসরাইলি বোমার বিকট শব্দ। শরণার্থী আশ্রয় শিবিরগুলোও এ হামলা থেকে রেহাই পায়নি। হামাসের সৈন্যরা আবাসিক এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে- এ অভিযোগে সেখানে ইসরাইলি বাহিনী স্থল, বিমান ও নৌপথে নির্বিচারে বোমা হামলা চালায়। ইসরাইলি সৈন্যরা গাজার একটি ভবনে ১১০ জন ফিলিস্তিনিকে জড়ো করে ওপর থেকে বোমা ফেলে। জাতিসংঘ পরিচালিত তিনটি বিদ্যালয়ে, যেখানে হামলা থেকে বাঁচতে বেসামরিক নিরীহ লোকজন আশ্রয় নিয়েছিল, সেখানে ট্যাঙ্ক ও বিমান থেকে হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় বারবার যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানালেও ইসরাইল এ হামলা অব্যাহত রাখে।

ইসরাইল ও পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমের মিথ্যাচার
ইসরাইলের দাবি, হামাসের রকেট হামলা ঠেকাতেই গাজায় ইসরাইল হামলা চালিয়েছে। পশ্চিমা প্রচারমাধ্যম বরাবরের মতো এবারও এই দাবিকে প্রচার করে ইসরাইলের হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরছে। কিন্তু এ প্রচার সম্পূর্ণ মিথ্যাচার (সারী মাকদিসি, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘর্ষবিশারদ, জানু. ০৯)। এ হামলার আগে শান্তিচুক্তি ভঙ্গ করে ইসরাইল ১৮ মাস যাবৎ গাজাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং দরিদ্রতম এলাকার একটি হচ্ছে গাজা। গাজার ১৫ লাখ অধিবাসীর অর্ধেকেরও বেশি শিশু। ইসরাইলের নিষেধাজ্ঞার কারণে ১৮ মাস ধরে গাজার চারদিকের সীমান্ত বন্ধ। ফলে ২৭ ডিসেম্বর ইসরাইলি হামলার আগেই দিনের পর দিন খাদ্য, জ্বালানি, চিকিৎসার অভাবে গাজার নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, অপুষ্টিতে ভুগছিল ৫০ হাজার শিশু। এরকম নানা আগ্রাসন পরিকল্পনার মাধ্যমে ইসরাইল দিনের পর দিন জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জর্াতিক মানবাধিকার চুক্তির লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনে ধ্বংসযজ্ঞ ও নীরব গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসরাইলি ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস
ইসরাইল পরিচালিত এসব পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ফিলিস্তিনিদের জাতিগতভাবে নিধন করে ফিলিস্তিন দখল প্রক্রিয়ারই অংশ। ইহুদিদের স্বাধীন আবাসভূমি নির্মাণের রাজনৈতিক আন্দোলনকারী (জাইয়ানিস্ট) হিসেবে পরিচিত একদল ইউরোপীয় আঠারো শতকের শেষদিকে ইহুদি পুণ্যভূমি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনে আসে। ইহুদিদের অভিবাসন শুরুর দিকে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে কোনো সমস্যা তৈরি না করলেও, অভিবাসী ইহুদিদের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে তাদের অনেকের মধ্যে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মনোবাসনা প্রকাশিত হলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করে। ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে ফিলিস্তিনে ক্রমান্বয়ে সংঘাত ও সংঘর্ষ বৃদ্ধি পায়।
১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ড বিভক্ত করার ব্যাপারে সে সময় (নভেম্বর ১৯৪৭) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসী/জোরজবরদস্তি-কারীর ভূমিকায় আবির্ভূত হয়। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ আমেরিকান রাষ্ট্রগুলোকে তার অনুসারী হিসেবে প্রভাবিত করার জন্য সময় নিতে সাধারণ পরিষদের ভোট গ্রহণ পেছায়। বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক সন্ত্রাসের’ অভিযোগ করে। নাম প্রকাশ না করে একজন সম্পাদকীয় লেখক লিখেছিলেন, “যেসব দেশের সরকারগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকার জবাব দেয়ার সামর্থ্য নেই, সেসব দেশের ওপর ‘ভয়ানক চাপ’ প্রয়োগবিহীন জাতিসংঘে ‘ফিলিস্তিন ভাগ করার প্রস্তাব’ পাস হওয়া সম্ভব হতো না” (জন কোয়েজলি, ‘প্যালেস্টাইন এন্ড ইসরাইল: ঐ চ্যালেঞ্জ টু জাস্টিস’)। ‘অধিবাসীরা নিজেই নিজের রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে’- এই নীতিকে না মেনে অন্যের ভূখণ্ড বাইরের শক্তি দ্বারা ভাগ করে দেয়ার নীতি অবলম্বন করে জাতিসংঘ। ইহুদি এবং আমেরিকার চাপে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ৫৫ ভাগ ভূমি তাদের (ইহুদি) ভাগ করে দেয়ার জন্য সুপারিশ করে, যেখানে কিনা তখন ফিলিস্তিনে অভিবাসিত ইহুদির সংখ্যা ছিল ফিলিস্তিনের মোট অধিবাসীর ৩০ ভাগ এবং তাদের বৈধ জমির পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ ভাগ।
জাতিসংঘ দ্বারা ফিলিস্তিন বিভক্ত হওয়ার পর ১৯৪৮ সালে ইহুদিরা ইসরাইল রাষ্ট্র ঘোষণা করে। ১৯৪৭-১৯৪৮ সালের মধ্যে ইসরাইলি সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনে সর্বমোট ৩৩টি নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। তার মধ্যে দেইর ইয়াসিরে ১০০ নারী, পুরুষ ও শিশুর ওপর ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। ইসরাইলের তৎকালীন ভাবী প্রধানমন্ত্রী, ইহুদি সন্ত্রাসী দলের প্রধান মেনাকেম বেগিন এ হত্যাকাণ্ডকে ‘চমৎকার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সে সময় বলেছিল, দেইর ইয়াসিরের মতো, এরকম সব জায়গায়, আমরা শত্রুকে আক্রমণ ও আঘাত করবো। ঈশ্বর আমাদের বিজয়ের জন্য নির্বাচন করেছেন। ১৯৪৮ সালে এসে ইসরাইলের ফিলিস্তিনের ৭৮ ভাগ দখল করে এবং ১০ লাখ ফিলিস্তিনি নিজের ভিটামাটি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়।

ইসরাইলের আগ্রাসনে মার্কিনি সমর্থন
গাজায় যখন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি অমান্য করে, মানবাধিকারের লঙ্ঘন করে ইসরাইলি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র অসহায় মানুষের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালাচ্ছে, তখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার ঘোষণা, ‘ইসরাইল কেন এটা করছে আমাদের তা বুঝতে হবে .... নিজের নিরাপত্তা বজায় রাখার অধিকার ইসরাইলের রয়েছে ....।’ ‘দিনবদলের’ প্রতিভূ হিসেবে নবনির্বাচিত মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় এই ঘোষণা তার পূর্বসূরি মার্কিন রাষ্ট্রপতিদের থেকে একচুলও ভিন্ন নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রথমবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি পাসের উদ্যোগ নিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রতিহত করেছে। বিশ্লেষকদের দাবি, মার্কিন সমর্থনই ফিলিস্তিনে ইসরাইলি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে উদ্দীপনা ও শক্তি যুগিয়েছে।

আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের অসহযোগিতা
মিসর সরকার স্থানীয় ও বিদেশি চিকিৎসকদের গাজায় যাওয়ার অনুমতি না দেয়ায় গাজায় আহতদের চিকিৎসা দিতে আসা চিকিৎসকরা গাজায় ঢুকতে পারেননি। হামাসের সদস্যরা গাজার নিয়ন্ত্রণ নিলে ২০০৭ সালের জুনে মিসর তার গাজা সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, মিসর ইসরাইলকে উৎসাহ দিতে গাজা সীমান্ত বন্ধ রেখেছে। বেশকিছু আরব রাষ্ট্রগুলোর রাজা-বাদশাদের মার্কিন সমপ্রীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্নে মিসরসহ প্রতিবেশী আরব রাষ্ট্রগুলোর নীরব ভূমিকা বছরের পর বছর ফিলিস্তিনে ইসরাইলি দখলদারি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যেতে সাহায্য করছে।য়

তথ্যসূত্র
১. দ্য অরিজিন অব দ্য প্যালেস্টাইন-ইসরাইল কনফ্লিক্ট, www.ifamericansknew.org.
২. স্কালার সে অ্যাটাক অন গাজা এবিউস অব হিউম্যান রাইটস, www.international.ucla.edu.
৩. হোয়াই ইসরাইল ওয়েন্ট টু ওয়ার ইন গাজা, www.guardian.co.uk.
৪. প্রথম আলো, ৬, ৭ জানুয়ারি ২০০৯।