নারী
বাংলাদেশের আদিবাসী
নারী
মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী
নারীকে তার প্রাপ্য দিলে দেশ ও দশের সুফল মেলে।
এই স্লোগানকে সামনে রেখে গত ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিয়াম অডিটরিয়ামে মাসলাইন মিডিয়া সেন্টার ও এডকম একটি সেমিনারের আয়োজন করে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়- নারীর জন্য বাড়তি সুবিধা নয়, তার প্রাপ্যটুকুই নিশ্চিত করার আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে সেখানে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নারীরা প্রায় সবক্ষেত্রেই বৈষম্যের শিকার হয়। নারীরা এই বৈষম্যের শিকার হয় মূলত লিঙ্গগত পার্থক্যের কারণে। কিন্তু একজন আদিবাসী নারী বৈষম্যের শিকার হয় পাঁচটি দিক থেকে: আদিবাসী হিসেবে, নারী হিসেবে, আদিবাসী নারী হিসেবে, প্রত্যন্ত এলাকার অধিবাসী ও দরিদ্র হিসেবে, অভিবাসী হিসেবে।
‘ক্ষমতায়ন’ নিশ্চিত হয় দুটি বিষয়ের ওপর-
১. উৎপাদন এবং উৎপাদিত দ্রব্যের ওপর অধিকার। ২.নিজের জীবন সম্পর্কে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার।
আদিবাসী নারী বাঙালি নারীদের তুলনায় স্বাধীনতা বেশি ভোগ করে- এটি একটি প্রচলিত ধারণা। বস্তুত স্বাধীনতা নয়,আদিবাসী নারীদের কর্মতৎপরতা বাঙালি নারীদের তুলনায় বেশি। ক্ষমতায়নের সূত্র যে দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল তার কোনোটাই আদিবাসী নারীদের নেই। হ্যাঁ, তারা উৎপাদন করছে। ইউএনডিপির এক জরিপমতে শুধু কৃষিক্ষেত্রেই তাদের অংশগ্রহণ ৯০%। কিন্তু উৎপাদিত দ্রব্যের ওপর তাদের অধিকার নেই বললেই চলে। এখানে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পুরুষের সর্বময় কর্তৃত্বই বিরাজ করে।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে খাসিয়া ও গারো এ দুটি জনগোষ্ঠী মাতৃসূত্রীয়। অন্য সব জনগোষ্ঠীতে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের প্রাধান্য প্রবলভাবে বিদ্যমান। শহরাঞ্চলে অবস্থানরত আদিবাসী পরিবারগুলোতে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ ৬০%। এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ঘটনা ঘটে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোতে।
উত্তরাধিকার হিসেবে নারীরা গণ্য হয় গারো, খাসি, মারমা ও রাখাইন সমপ্রদায়ে। অন্যান্য সমপ্রদায়ে তা বাবা বা বড় ভাইয়ের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। নারীরা অধিকার হিসেবে সম্পত্তি দাবি করতে পারে না ৪১টি সমপ্রদায়ে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪৫টি।
আদিবাসী সমাজের নারীর বিচরণ ক্ষেত্রের ব্যাপকতা মানেই স্বাধীনতা নয়। সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়মগুলোর মাঝে নারীরা এমনভাবে নিজেদের হারিয়ে ফেলেছেন যে তারা নিজস্ব গণ্ডির বাইরে কিছু ভাবতেও চান না। আদিবাসী জাতিসত্তাগুলো নিজ নিজ সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখে তাদের নিজস্ব সামাজিক প্রথার মাধ্যমে। এই প্রথাগুলোর কোনো কোনোটি নারীর অধিকার ও মানবাধিকারকে লঙ্ঘিত করে।
বিবাহের ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, এতে নারী স্বাধীনতা প্রতীয়মান হয় বলে অধিকাংশ আদিবাসী তরুণের অভিমত। এখানে উল্লেখ্য, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় আদিবাসী নারীদের অবশ্যই পালনীয় বাধানিষেধ মেনে চলতে হয়। এ ক্ষেত্রে বৈবাহিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীরা আসলে কতোটুকু স্বাধীনতা ভোগ করে তা একটি প্রশ্ন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোকে বিলীন করার জন্য যে রাজনীতিটি সবসময় গৃহীত হয়েছে তা হলো Population transfer policy. এই পলিসিকে স্থানীয় নেতৃত্ব ‘Islamization’ বলে অভিহিত করেন। এই পলিসির কারণে আদিবাসীদের ভূমি এবং নারী দুটিই চরম নিগ্রহের শিকার হয়েছে। চুক্তি-পূর্ববর্তী সময়ে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ১৪টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ৬০০০ নিহত আদিবাসীর মধ্যে নারীর সংখ্যা যথেষ্ট। ১০০০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। অপহৃতের সংখ্যা অজানা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নির্যাতিত আদিবাসীর প্রকৃত সংখ্যা কখনোই জানা যায়নি।
চুক্তি পরবর্তী সময়ে এ নির্যাতন কমে আসবে বলে যে ধারণা জনসাধারণের ছিল তা মুছে যেতে বেশি সময় লাগেনি। ১৯৯৮-০৬-এর মধ্যে সরকারি বাহিনী ও বাঙালি সেটেলার কর্তৃক ধর্ষিত হন ৩৬ জন, যৌন নিপীড়নের শিকার ১৩ জন, অপহরণের শিকার ৯ জন, শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার ২৫ জন। এসব সহিংসতার পর যে নারীরা বেঁচে যায়, তারা আর কখনোই মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে পারে না। উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ হলো- প্রায় সব ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা শাস্তি পায় না এবং অভিযোগকারী একাধিকবার হয়রানির শিকার হন। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি মৌজায় একজন করে হেডম্যান থাকে। তিন পার্বত্য জেলার ৩০০ মৌজায় নারী হেডম্যানের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। তাও যারা আছেন তাদের স্থলাভিষিক্ত করা হয়েছে স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর পদটিতে।
পার্বত্য জেলা পরিষদে (চুক্তির পূর্বে স্থানীয় সরকার পরিষদ) তিনটি পার্বত্য জেলাতে তিনটি করে মোট ৯টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত। পার্বত্য জেলা পরিষদে ১৯৮৯ সাল থেকে কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় একজন নারীও এ পদপ্রাপ্ত হননি। সামাজিক প্রথার মাধ্যমে যে বিচার হয় সার্কেল চিফের আদালতে, তা নারীদের অধিকার নিশ্চিত করলেও গ্রাম পর্যায়ে নারীরা খুব কম ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার প্রাপ্ত হন। গ্রাম্য সালিশগুলোতে নারীকে শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার হতে হয় প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।
অর্থাৎ আদিবাসী নারীরা একদিকে তাদের সমাজে নির্যাতনের শিকার এবং অন্যদিকে সামরিক বাহিনী ও সেটেলার কর্তৃক নির্যাতনের শিকার। রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা যে ক্ষমতা তাদের দিচ্ছে তাও কাগজে-কলমে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জ্বলন্ত উদাহরণ ১৯৯৬ সালের ১২ জুন কল্পনা চাকমার অপহরণ। আদিবাসী সমাজের হাতে কি আসলে কোনো ক্ষমতা আছে যা তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে? বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি এবং বাংলাদেশ সরকার কোনোভাবে কি এ সম্পর্কিত দায়ভার অস্বীকার করতে পারে?
আদিবাসী নারীদের ওপর সহিংসতার রূপ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নারীদের ওপর সহিংসতার মতোই, বরং আরো বেশি। এজন্য যা করণীয় তা হলো আদিবাসী সমাজের অভ্যন্তরে ‘জেন্ডার’ ধারণার ব্যাপ্তি ঘটানো এবং তার সাথে সাথে রাষ্ট্রের তরফ থেকে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ যা নিশ্চিত করবে ‘রাষ্ট্রের কোনো অংশ’ কর্তৃক আদিবাসী নারী নিগ্রহের শিকার হবে না। উভয় প্রকারের সমন্বিত প্রয়াসই আদিবাসী নারীদের তাদের প্রাপ্যটুকু নিশ্চিত করুক।য়
তথ্যসূত্র
১. শ্রী সুদোম। চাকমা আইনের ভাষ্য (১ম খণ্ড)। সম্পাদনায় করুণাময় চাকমা। অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
২. পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন।
৩. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটির সাথে সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দলিল।
৪. CDL প্রকাশিত জুম পাহাড়ের জীবন। পৃষ্ঠা ২৭৫-৩২৮।
৫. মঙ্গল কুমার চাকমা। লেখক ও আদিবাসী অধিকার কর্মী।