আইন-আদালত
আইনের সালতামামি ২০০৮
এ টি এম মোরশেদ আলম
২০০৮ সালের প্রায় পুরোটা জুড়েই জরুরি অবস্থা জারি ছিল। এই সময়ে কোনো রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় ছিল না, স্বাভাবিকভাবেই ছিল না কোনো আইন সভা। কিন্তু তাই বলে আইন প্রণয়নের কাজ থেমে থাকেনি। সংবিধানের ৯৩ (৩) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করে ২০০৮ সালে প্রণয়ন করেন মোট ৭২টি আইন। তবে এর বেশিরভাগই ছিল প্রচলিত বিভিন্ন আইনের সংশোধনী। বর্তমান আলোচনায় শুধু ২০০৮ সালে প্রণীত আইনগুলোর দিকেই আলোকপাত করা হয়েছে।
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর গঠিত হয় আইন সভা। সংবিধানের ৯৩ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ গঠিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পূর্বে জারিকৃত অধ্যাদেশগুলো সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে, নতুবা এসব অধ্যাদেশ আপনা-আপনি বাতিল হয়ে যাবে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২০০৬ সালে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর গত প্রায় আড়াই বছরে জারি করা হয় মোট ১১৪টি অধ্যাদেশ। এর মধ্যে ২০০৬ সালে ৩টি, ২০০৭ সালে ৪২টি এবং ২০০৮ সালে ৭২টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এসব অধ্যাদেশ অনুমোদনের জন্য নতুন গঠিত জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু সংসদ এসব অধ্যাদেশের মধ্য থেকে ৫৪টি অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ কারণে আলোচনাকে দুই ভাগে ভাগ করে প্রথমে অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে এমন কয়েকটি জনগুরুত্বপূর্ণ আইন এবং এরপর যেসব অধ্যাদেশ অনুমোদন না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে তার মধ্য থেকে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি আইনের আলোচনা করা হয়েছে। ৫৪টির মধ্যে মাত্র কয়েকটি আইন এখানে আলোচনা করার অন্যতম কারণ হলো, এসব আইনের বেশিরভাগই বিভিন্ন প্রচলিত আইনের সংশোধনী, তাছাড়া সব আইন জনগুরুত্বপূর্ণও নয়।
আলোচনার শুরুতে জানিয়ে রাখা ভালো যে, বিগত আড়াই বছরে যদিও প্রায় সোয়াশ’ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে কিন্তু নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি এমন অনেক আইনই প্রণীত হয়নি, যেমন পারিবারিক নির্যাতনবিরোধী আইন অথবা পুলিশের সংস্কার বিষয়ক আইন।
সংসদ কর্তৃক অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হওয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন
সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ ২০০৮
১১ জুন ২০০৮ তারিখে জারি হওয়া এই অধ্যাদেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তার মধ্যে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য, অখণ্ডতা বা নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয় বা জনমনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে বা দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এমন যে কোনো কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত হয়েছে [ধারা ২]। সন্ত্রাসী কাজের মধ্যে রয়েছে খুন, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ, সম্পদের ক্ষতিসাধন এবং বিস্ফোরক ও দাহ্য পদার্থ, আগ্নেয়াস্ত্র বা কোনো ধরনের রাসায়নিক পদার্থ দখলে রাখা বা ব্যবহার করা [ধারা ৬]। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা দেয়াকেও এই আইনে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে [ধারা ৭]। কোনো জঙ্গিকে আশ্রয়দান, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের তথ্য সংবলিত প্রকাশনা বহন করা বা এর পক্ষে প্রচার চালানোকেও দণ্ডনীয় করা হয়েছে। আতঙ্ক সৃষ্টি বা দেশের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড বা তাতে অর্থায়নের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করা হয়েছে এই আইনে [ধারা ১২]।
উদ্বেগের বিষয় হলো, জনমত গ্রহণের কোনো উদ্যোগ ছাড়াই মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোর শাস্তির বিধান সংবলিত এবং সরকারকে গ্রেফতার ও আটকের ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে এই অধ্যাদেশ জারি হয়েছে। পূর্বের অভিজ্ঞতা এই আশঙ্কার জন্ম দেয় যে, অধ্যাদেশটি যত না সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হবে, তার চেয়ে বেশি প্রয়োগ হতে পারে বিরোধীপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য।
তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ ২০০৮
জনগণের ক্ষমতায়ন এবং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে অধ্যাদেশটি জারি হয় ২০ অক্টোবর ২০০৮। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী যে কোনো নাগরিক সরকার বা জনগণের অর্থে পরিচালিত যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য চাইতে পারে এবং আবেদনের ২০ দিনের মধ্যে তাকে তা সরবরাহ করতে হবে। আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে এতে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তথ্য কমিশন গঠনের বিধান রয়েছে। কোনো ব্যক্তি তথ্য না পেলে বা ভুল তথ্য পেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এবং পরে তথ্য কমিশনে প্রতিকার চেয়ে আবেদন করতে পারবে। প্রার্থিত তথ্য প্রদানে ব্যর্থ হলে বা ভুল তথ্য প্রদান করা হলে এর জন্য ২৫,০০০ টাকা জরিমানা এবং বিভাগীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
সরকারের খসড়া প্রস্তুতি কমিটি প্রথমে ‘জনস্বার্থ’ ও ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’র প্রশ্নে তথ্যের অবমুক্তি বারিত করার বিধান রেখেছিল। পরবর্তীকালে নাগরিকদের সমালোচনার মুখে এগুলো বাদ দেয়া হয়। যদিও চূড়ান্ত পর্যায়ে বেশ কিছু ক্ষেত্রকে তথ্য অধিকার আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়। আটটি প্রধান গোয়েন্দা সংস্থাসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানকে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
জনপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০০৮
সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতার জন্য নতুন কিছু অযোগ্যতা নির্ধারণ করে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের জন্য কিছু শর্ত নির্ধারণ করে এই অধ্যাদেশটি জারি হয় ১৯ আগস্ট ২০০৮। নতুন করে আরোপিত বিধিনিষেধ অনুযায়ী সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী, জনপ্রশাসন, সামরিক বাহিনী বা সরকারি কর্র্তৃপক্ষ বা সামরিক প্রশাসনের কোনো সাবেক সদস্য, অথবা বেসরকারি সংস্থার সাবেক প্রধান জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এ বিধিনিষেধ ঋণখেলাপি ও বিভিন্ন পরিসেবার বিলখেলাপিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য [ধারা ১২ (ক)]। অবশ্য নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধের জন্য সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে এ বিধিনিষেধের আওতায় আনার পরিকল্পনা থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত তা আর রাখা হয়নি। এছাড়া দলগুলোর গঠনতন্ত্রে কেন্দ্রীয় কমিটিসহ সব কমিটিতে ৩৩ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা ও ২০২০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করার শর্ত আরোপ করা হয়েছে। সর্বোপরি দলগুলোকে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা ছাত্রদের নিয়ে অথবা কোনো আর্থিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার চাকরিজীবী বা শ্রমিক অথবা অন্য কোনো পেশাজীবীদের নিয়ে কোনো অঙ্গ সংগঠন বা সহযোগী সংগঠন গঠনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।
অধ্যাদেশে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য কিছু অযোগ্যতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের লক্ষ্য সংবিধান পরিপন্থী হয় কিংবা এতে যদি ধর্ম, জাতি, বর্ণ, ভাষা বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক কিছু থাকে তাহলে ঐ রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। কোনো রাজনৈতিক দল যদি পরপর দু’বার সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে অথবা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় তাহলে সেই দলের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে [ধারা ৯০ (ছ)]।
এই প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে ‘না ভোট’ দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। যদি কোনো নির্বাচনী আসনে শতকরা ৫০ শতাংশের বেশি ‘না ভোট’ পড়ে তাহলে ঐ আসনের নির্বাচন বাতিল হবে এবং উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নাগরিকত্ব (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০০৮
এই অধ্যাদেশ নাগরিকত্ব আইন ১৯৫১-এর ধারা ৪ ও ৫-এ সংশোধন এনেছে। ফলে বাংলাদেশি কোনো নারীর স্বামী নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন এবং জন্মসূত্রে মা ও বাবা উভয়ের কাছ থেকেই সন্তানরা নাগরিকত্ব পাবে। আগের বৈষম্যমূলক বিধান অনুযায়ী একজন নারীর সূত্রে তার স্বামী বা সন্তান নাগরিকত্ব পেত না। এর মাধ্যমে তার অবসান হলো।
বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০০৮
অধ্যাদেশটি জারি হয় ৮ মে ২০০৮। এর মাধ্যমে বন্দরে ট্রেড ইউনিয়ন পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। অধ্যাদেশটি ডক ওয়ার্কার্স ম্যানেজমেন্ট বোর্ডকে অবলুপ্ত করেছে আর বোর্ডের কর্মীদের বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়ে এসেছে। বন্দরের ২০০ মিটারের মধ্যে কোনো ট্রেড ইউনিয়নের কার্যালয় স্থাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে [ধারা ২] এবং বন্দর কল্যাণ তহবিলে যে কোনো দানের ৫০ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে জমা দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। শ্রম আইন লঙ্ঘনের শাস্তি বাড়িয়ে তিন মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫,০০০ টাকা অর্থদণ্ড করা হয়েছে (আগে এর পরিমাণ ১০,০০০ টাকা ছিল)।
মানি লন্ডারিংবিরোধী অধ্যাদেশ ২০০৮
এই অধ্যাদেশ জারি হয় ১৫ এপ্রিল ২০০৮। অধ্যাদেশটি তদন্ত ও সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের জন্য অন্য দেশের সরকার বা কোনো সংস্থার সাথে সমঝোতা স্মারক, চুক্তি বা সনদের মাধ্যমে অন্যান্য দেশ বা সংস্থার সাহায্য নেয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংককে দিয়েছে [ধারা ২৬]। মানি লন্ডারিংয়ের সাথে যুক্ত অপরাধ তদন্তে এবং এধরনের অর্থ জব্দ করতে সরকারকে যে কোনো দেশের সরকারের সাহায্য চাওয়ার এবং যে কোনো তদন্তকারী সংস্থাকে সহযোগিতা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। অধ্যাদেশ বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে কোনো কুরিয়ার সার্ভিস, ক্ষুদ্র ঋণ সংস্থা, এনজিও এবং শেয়ার ও সিকিউরিটি ব্রোকারদের জরিমানা করার ক্ষমতা দিয়েছে, যদি এরা অধ্যাদেশের বিধিমালায় বর্ণিত ১৭ ধরনের অপরাধের কোনো একটি করে [ধারা ২৩]। এ অপরাধগুলোর মধ্যে আছে দুর্নীতি ও ঘুষ, মুদ্রা বা কাগজপত্র জাল করা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, খুন, যৌন হয়রানি, স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচার এবং মানুষ পাচার।
স্থানীয় সরকার (উপজেলা পরিষদ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০০৮
যারা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হবেন তারা উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না [ধারা ৩] এরকম বিধান করে অধ্যাদেশটি জারি হয় ২৫ নভেম্বর ২০০৮। এর আগে জুন মাসে এই আইনের আরেকটি সংশোধনীর মাধ্যমে উপজেলা নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর একাধিক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিষিদ্ধ করেছে। নতুন সংশোধনী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে।
অনুমোদনের সিদ্ধান্ত হয়নি এমন কয়েকটি আইন
আদালত অবমাননা অধ্যাদেশ ২০০৮
এই অধ্যাদেশ জারি করা হয় ২৫ মে ২০০৮। ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননা আইনের স্থলে অধ্যাদেশটি প্রতিস্থাপিত হয়। কোনো ইচ্ছাকৃত কাজ, উক্তি বা বক্তব্য যদি কোনো আদালতের দেয়া রায়, ডিক্রি, আদেশ, রিট বা পরোয়ানাকে লঙ্ঘন করে এবং এতে যদি বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয় তাহলে তা অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারে বাধা সৃষ্টিও অবমাননা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে [ধারা ২]। তবে কোনো আদালতের স্বাভাবিক বিচার বা কার্যক্রমের ওপর সংবাদমাধ্যমে সদবিশ্বাসে ও পরিমিত ভাষায় মন্তব্য করা যাবে এবং কোনো বিচারকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও আবেদন করা যাবে। কোনো বিচারকের দুর্নীতি বা অদক্ষতার বিষয়ে এবং বিচারিক এখতিয়ারের বাইরে তাদের বিচার-বহির্ভূত কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রতিবেদন প্রকাশ করা যাবে এবং কোনো রায়ের গঠনমূলক সমালোচনা করা যাবে [ধারা ৩]।
জনস্বার্থে একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট অধ্যাদেশটি অবৈধ ঘোষণা করে এবং অধ্যাদেশটি সংবিধানের চেতনা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে খাটো করেছে বলে মত প্রকাশ করে। সংবিধানের ৫৮ (ঘ) অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে হাইকোর্ট রায় দেয় ২০০৮, বিদ্যমান একটি আইনকে বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করা একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং যেহেতু নির্বাচনের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই তাই এটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইনগত কর্তৃত্ব-বহির্ভূত। আদালত আরও বলে যে, অধ্যাদেশটি ১০(১) ধারায় সরকারি চাকরিজীবীদের আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে সশরীরে আদালতে হাজির হওয়া থেকে অব্যাহতি দিয়েছে যা ‘আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান’- এই নীতির লঙ্ঘন।
সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন অধ্যাদেশ ২০০৮
অধ্যাদেশটি জারি হয় ১৬ জুন ২০০৮। এই অধ্যাদেশ সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে সুপারিশ করার জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে নয় সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা করে। কমিশনে অন্য সদস্যরা হলেন- আইনমন্ত্রী, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দু’জন বিচারপতি, হাইকোর্ট বিভাগের জ্যেষ্ঠতম দু’জন বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি [ধারা ৩]।
প্রাথমিকভাবে আইন মন্ত্রণালয় প্রতিটি শূন্য পদের জন্য পাঁচজনের নাম প্রস্তাব করবে এবং কমিশন প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে সর্বোচ্চ দুটি করে নাম সুপারিশ করবে। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত নামগুলোর বাইরে অন্যদের নামও কমিশন বিবেচনায় আনতে পারে [ধারা ৬] এবং তারপর এ বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে; আর তা না হলে সংখ্যাধিক্যের ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে [ধারা ৪(৭)]।
রাষ্ট্রপতি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দেবেন এবং চাইলে তিনি কোনো সুপারিশ পুনর্বিবেচনার জন্য কমিশনে ফেরত পাঠাতে পারেন। এক্ষেত্রে কমিশন সুপারিশ পুনর্বিবেচনা করতে পারে অথবা আগের সুপারিশই আবার পাঠিয়ে দিতে পারে। যদি রাষ্ট্রপতি কোনো সুপারিশের ভিত্তিতে কাজ না করেন, তাহলে তাঁকে অবশ্যই এর যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে হবে [ধারা ৯]।
অধ্যাদেশটির সংবাদমাধ্যম এবং আইনজ্ঞদের দ্বারা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। কারণ এখানে নির্বাহী বিভাগকে বিচার বিভাগের ওপর প্রাধান্য দিয়ে, বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়কে প্রাথমিক সুপারিশ তৈরির ক্ষমতা দিয়ে অধ্যাদেশটি এর মূল চেতনাকেই খর্ব করেছে। কোনো কোনো সমালোচক এমনও আশঙ্কা করেছেন যে, আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ আপিল বিভাগে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বিচারপতি নিয়োগের প্রথাকেও ভঙ্গ করতে পারে [ধারা ৬ (১) ও (২)]।
নতুন এই বিধানগুলো বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো মানদণ্ড নির্ধারণ করেনি। তাছাড়া সরকার ইচ্ছা করলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশনের সুপারিশ পাশও কাটাতে পারে। বছরের শেষ দিকে হাইকোর্ট বিভাগে কয়েকজন নতুন বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি (যিনি সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশনেরও সদস্য) এই নিয়োগ কমিশনের সুপারিশ অনুসারে হয়নি বলে মত দেন এবং এরূপ নিয়োগে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
অ্যাটর্নি সার্ভিস অধ্যাদেশ ২০০৮
এটি জারি হয় ১৮ মে ২০০৮। রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য একটি অ্যাটর্নি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করে এই অধ্যাদেশ [ধারা ৩]। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে এই অধিদপ্তর সুপ্রিম কোর্টের জন্য ১৯৭ জন আইন কর্মকর্র্তা (অ্যাটর্নি) এবং নিম্ন আদালতের জন্য আরও ১,৭৯৯ জনকে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তাব করে। হাইকোর্ট বিভাগ ২৯ জুলাই এই অধ্যাদেশ এবং এর অধীনে যে কোনো নিয়োগের ওপর স্থগিতাদেশ দেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আব্দুল মান্নান খান, চঞ্চল কুমার দত্ত ও খন্দকার আঞ্জুমান আরা শেলীর জনস্বার্থে দায়ের করা রিট মামলায় আদালত কেন এই অধ্যাদেশকে আইন-বহির্ভূত এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না এই মর্মে সরকারকে চার সপ্তাহের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলে।
উপদেষ্টা পরিষদ ২০ নভেম্বর এই অধ্যাদেশটির সংশোধন অনুমোদন করে যাতে এটি শুধু নিম্ন আদালতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। জেলা পর্যায়ে জেলা অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠা হবে জেলা অ্যাটর্নি, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি, যুগ্ম অ্যাটর্নি এবং সহকারী অ্যাটর্নি সমন্বয়ে। অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তরের আইনজীবীরা পূর্ববর্তী প্রথা অনুযায়ী নিযুক্ত হবেন এবং এই অধ্যাদেশের অধীনে আসবেন না।য়
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ
অধ্যাদেশ ২০০৮
মিলন চন্দ্র পাল
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধ ও তৎসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে ২০০৮ সালের ২০ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০০৮ জারি করে। এ পর্যায়ে দেখা যাক, অধ্যাদেশটিতে ভোক্তার অধিকারগুলো রক্ষার জন্য কি কি বিধান রাখা হয়েছে।
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা
অধ্যাদেশের ১৮ ধারা অনুযায়ী জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এ অধিদপ্তরের একজন মহাপরিচালক থাকবেন এবং এর কার্যালয় অবস্থিত হবে ঢাকায়। মহাপরিচালক ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ, ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধ এবং ভোক্তা-অধিকার লঙ্ঘনজনিত অভিযোগ নিষ্পত্তি করার লক্ষ্যে সমীচীন ও প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত সব ব্যবস্থা নিতে পারবেন (ধারা ২১)। অর্থাৎ এ ধারার মাধ্যমে মহাপরিচালককে বিস্তর ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ ও সংরক্ষণ কমিটি গঠন
এ অধ্যাদেশের ধারা ৫ অনুযায়ী ‘জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামে একটি পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। এ পরিষদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ২৩ জন সদস্য (চেয়ারম্যান ও মহাপরিচালকসহ) থাকবে। পরিষদের কার্যাবলি হলো- ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন, সরকার কর্তৃক প্রেরিত বিষয়ে মতামত প্রদান, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে আইন ও নির্দেশনা প্রণয়নে সরকারকে পরামর্শ প্রদানসহ অন্যান্য কার্যাবলি (ধারা ৮)। ধারা ১০ অনুযায়ী প্রত্যেক জেলায় ‘জেলা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ কমিটি’ গঠন করা হবে যার সদস্য সংখ্যা হবে ১০ জন (সভাপতিসহ)। এ কমিটির কার্যাবলি হলো- জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের প্রদত্ত নির্দেশনা মেনে চলা ও পরিষদকে সহযোগিতা করা, সচেতনমূলক প্রচার-অনুষ্ঠানের আয়োজন করাসহ অন্যান্য কার্যাবলি। ধারা ১৩ অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে (প্রয়োজনবোধে) উপজেলা ও ইউনিয়ন ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এসব কমিটির সদস্য সংখ্যা, মনোনয়ন, যোগ্যতা, অপসারণ ও পদত্যাগ এবং দায়িত্ব ও কার্যাবলি পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত হবে।
এ অধ্যাদেশের অধীন কতিপয় অপরাধ ও তার শাস্তি (ধারা ৩৭-৫৬)
কোনো ব্যক্তি-
১. পণ্যের মোড়কের গায়ে বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের ও মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ ইত্যাদি না লিখলে এক বছর কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
২. আইন বা বিধি দ্বারা নির্ধারিত মূল্য অপেক্ষা অধিক মূল্যে কোনো পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রয় বা বিক্রয়ের প্রস্তাব করলে এক বছর কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।য়
৩. ভেজাল মিশ্রিত পণ্য বা ওষুধ জেনেও তা বিক্রয় বা বিক্রয় করতে প্রস্তাব করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৪. কোনো খাদ্য, পণ্যে বিষাক্ত কোনো দ্রব্য (যা মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিকারক) মিশ্রিত করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৫. আইন বা বিধি অমান্য করে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এমন কোনো উপায়ে কোনো পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াকরণ করলে অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৬. কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে মিথ্যা বিজ্ঞাপন দ্বারা ক্রেতাসাধারণকে প্রতারিত করলে অনূর্ধ্ব এক বছর কারাদণ্ড, বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৭. ওজনে কারচুপি করলে অর্থাৎ প্রতিশ্রুত ওজন অপেক্ষা কম ওজনে কোনো পণ্য বিক্রয় বা সরবরাহ না করিলে এক বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৮. কোনো পণ্যের নকল প্রস্তুত বা উৎপাদন করলে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
৯. মেয়াদ শেষ হওয়া কোনো পণ্য বা ওষুধ বিক্রয় বা বিক্রয় করতে প্রস্তাব করলে এক বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
বিচার পদ্ধতি ও আপিলের সুযোগ
প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট অথবা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট অধ্যাদেশের অধীন অপরাধগুলো বিচার করবেন এবং অপরাধগুলো জামিনযোগ্য, আমলযোগ্য ও আপোসযোগ্য হবে। ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘন হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে মহাপরিচালক বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার কাছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অভিযোগ করবে। অভিযোগ দায়ের হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে মামলা দায়েরের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উক্ত মহাপরিচালক বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্র দাখিল করবে। ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োজনবোধে অভিযোগকারীর কাছে থেকে ত্রুটিপূর্ণ পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারে পাঠাতে পারবেন। ম্যাজিস্ট্রেটের রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি রায় প্রদানের ৬০ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সেশন জজের আদালতে আপিল দায়ের করতে পারবেন।
বিকল্প পথ দেওয়ানি প্রতিকার
ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কার্যের জন্য কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হলেও, উপযুক্ত ক্ষেত্রে, ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ভোক্তা উক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ক্ষতিপুরণ দাবি করে দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়ের করতে পারবেন (ধারা ৬৯)। ভোক্তার ক্ষতি আর্থিক মূল্যে নিরূপণযোগ্য হলে উক্ত নিরূপিত অর্থের পাঁচগুণ পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করে দেওয়ানি আদালতে মামলা করা যাবে। দেওয়ানি আদালতের রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল দায়ের করা যাবে।
উপরের বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ঘটনাস্থলেই অপরাধগুলো তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নিয়ে বিচার করা যাবে। এক্ষেত্রে মহাপরিচালক বা তার কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার ক্ষমতা থাকবে। মোবাইল কোর্ট অধ্যাদেশ, ২০০৭-এ অধ্যাদেশের তফসিলভুক্ত করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশের অধীন কোনো বিধানের লঙ্ঘনজনিত কোনো কাজের সাথে কোনো বিক্রেতা জ্ঞাতসারে জড়িত না থাকলে তাকে কোনো অপরাধের জন্য দায়ী করে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না। জীবিকা অর্জনের জন্য কোনো ব্যক্তি কোনো পণ্য ক্রয় করে হকার বা ফেরিওয়ালা হিসেবে বিক্রি করলে এবং অনুরূপ বিক্রীত পণ্যে যদি নকল, ভেজাল বা অন্য কোনো ত্রুটি থাকে এবং এর দ্বারা কোনো ভোক্তার স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে অনুরূপ কারণে ঐ ব্যক্তিকে এ অধ্যাদেশের অধীন দায়ী করা যাবে না। আরেকটি ব্যাপার জানা থাকা দরকার, তা হলো- ওষুধে ভেজাল মিশ্রণ ও নকল ওষুধ প্রস্তুত করার জন্য বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪- এর ধারা ২৫(গ) এর অধীন মামলা দায়ের করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যে অধ্যাদেশগুলো পাস হয়েছে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার সেগুলোর মধ্যে ৫৪টিকে সংসদে পাস করে আইনে পরিণত করার জন্য বাছাই করেছে। আশার কথা হচ্ছে, বাছাইকৃত ৫৪টি অধ্যাদেশের মধ্যে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধ্যাদেশ ২০০৮ রয়েছে। অতীতে ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরাসরি কোনো আইন ছিল না। এজন্য ভোক্তার অধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকারও ছিল না। অনেক সময় দেখা যায় আইন থাকা সত্ত্বেও আইনের সঠিক প্রয়োগ না হলে অধিকার সংরক্ষিত হয় না। এ অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে আমরা এ অধ্যাদেশের সুফল পেতে পারি।য়
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিধিমালা ২০০৮
ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
এ টি এম মোরশেদ আলম
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২-এর
১৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশন প্রণয়ন করে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা ২০০৮। ২৬ আগস্ট ২০০৮ গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই বিধিমালা প্রকাশ করা হয়। বিধিমালা অনুসারে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধন পেতে হলে যেসব শর্ত পূরণ করতে হবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
* বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দরখাস্ত দাখিলের তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যে কোনো একটিতে দলীয় নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে কমপক্ষে একটি আসনে জয়লাভ করতে হবে; অথবা
* বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দরখাস্ত দাখিলের তারিখ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের যে কোনো একটিতে দরখাস্তকারী দল কর্তৃক নির্বাচনে অংশগ্রহণকৃত নির্বাচনী এলাকায় প্রদত্ত মোট ভোটার সংখ্যার শতকরা পাঁচ ভাগ ভোট লাভ করতে হবে।
* দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় দপ্তর; কমপক্ষে দশটি জেলায় জেলা কমিটিসহ কার্যকর জেলা দপ্তর এবং কমপক্ষে পঞ্চাশটি উপজেলা বা ক্ষেত্রমতে মেট্রোপলিটন থানায় কার্যকর দপ্তর থাকতে হবে।
বিধিমালায় রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য কিছু অযোগ্যতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের লক্ষ্য সংবিধান পরিপন্থী হয় কিংবা এতে যদি ধর্ম, জাতিসত্তা, বর্ণ, ভাষা বা লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক কিছু থাকে, তাহলে ঐ রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। কোনো রাজনৈতিক দল যদি পরপর দু’বার সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে অথবা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় তাহলে সেই দলের নিবন্ধন বাতিল হতে পারে।
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য মোট ১০৭টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করে, যার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি দল নিবন্ধনের শর্ত পূরণ না করায় নিবন্ধন পেতে ব্যর্থ হয়। তবে ব্যাপকভাবে অভিযোগ ওঠে যে, নিবন্ধনের শর্ত সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমানভাবে পালন করা হয়নি। অনেক রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের শর্ত পূরণ না করেও নিবন্ধিত হয়েছে। এসব দলের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছিল। অভিযোগগুলো দ্রুততার সাথে শুনানি করা হয়। উদাহরণ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। ২৩ অক্টোবর ২০০৮ নির্বাচন কমিশন একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধনের বিষয়ে কারো আপত্তি থাকলে তা ২৬ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর নির্দেশ দেয়। কিন্তু হতাশাজনক তো বটেই, সেই সাথে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, যদিও ২৩ অক্টোবর বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয় কিন্তু এটা প্রচার করা হয় ২৬ অক্টোবর, অর্থাৎ আপত্তি দাখিলের শেষ দিনে। এখানেই শেষ নয়, প্রচারিত বিজ্ঞপ্তিটি ছাপা হয় শুধু একটি জাতীয় দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকায়। এর ফলে অনেকে বিষয়টি জানতেই পারেননি, আবার যারা জেনেছেন তাদের ইচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে আপত্তি দাখিল করতে পারেননি। তবে আশার কথা হলো, নির্বাচন কমিশনের এহেন লুকোচুরি খেলা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামীকে নিবন্ধন না দেয়ার আপত্তি জানিয়ে সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ বেশ কিছু সংগঠন তাদের যুক্তি ও দলিলপত্র নির্বাচন কমিশনে দাখিল করে। কিন্তু তারপরও জামায়াতকে নিবন্ধন দেয়া হয়, তারা নির্বাচনে অংশ নেয় এবং জনগণের রায়ে চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হয় [দেখুন ‘জামায়াত স্কিপ ইসি’স ওয়ার ক্রাইম হেয়ারিং: ইলেভেন অরগানাইজেশনস সাবমিট প্রুফ, আস্ক নট টু রেজিস্টার জামায়াত অ্যাজ পার্টি’, দি ডেইলি স্টার, ২ নভেম্বর ২০০৮]। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের শর্তের বেড়াজালে নিবন্ধন জটিলতায় পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। দল দুটি নিবন্ধনের জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন পেতে নির্বাচন কমিশন যেসব বাধ্যতামূলক শর্ত দিয়েছে তা পূরণ না করায় নিবন্ধিত হতে পারেনি। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য হলো- রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধনের জন্য দশটি জেলা এবং পঞ্চাশটি উপজেলায় কার্যালয় ও কমিটি থাকার যে বিধান আছে সেটা এই অঞ্চলের দলগুলোর ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা। কারণ এখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম শুধু পার্বত্য তিন জেলাতেই সীমাবদ্ধ। ঢাকা এবং চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কর্মসূচি পালিত হয় বটে কিন্তু রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের জন্য তা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কেন্দ্রীয় নেতা উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা বলেন, ‘আমরা পূরণযোগ্য সকল শর্ত পালন করেই আবেদন করেছি, কিন্তু আমাদের নিবন্ধন না দিয়ে নির্বাচন কমিশন একটা মহাভুল করছে’ [দেখুন ‘নিবন্ধন জটিলতায় পাহাড়ের দুই আঞ্চলিক দল’, ইত্তেফাক, ২৯ অক্টোবর ২০০৮]।
এদিকে তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব রেজাউল হক, জাকের পার্টির মহাসচিব মুন্সী আব্দুল লতিফ এ বং আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-এর সভাপতিসহ ২৫ জনের দায়ের করা একটি জনস্বার্থ রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট জামায়াতের নিবন্ধনের বিরুদ্ধে ২৭ জানুয়ারি ২০০৯ একটি রুল জারি করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন কেন বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তার কারণ জানতে চেয়ে নির্বাচন কমিশন এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতি এই রুলটি জারি করা হয়।
রিট আবেদনের বক্তব্য ছিল, জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন দেয়া সংবিধান এবং গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের ৯০খ ও ৯০গ ধারার লঙ্ঘন। ৯০খ ধারা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিটি জেলা ও উপজেলা কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্যের বিধান থাকলেও জামায়াত তা মানছে না। তাছাড়া কোনো নারী দলটির আমিরও হতে পারবে না। আবার ৯০গ ধারা অনুসারে, কোনো রাজনৈতিক দলের বিদেশি কোনো শাখা থাকলেও সেই রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের যোগ্য হবে না। অথচ জামায়াত নিজেই স্বীকার করেছে বিদেশে তাদের দপ্তর আছে।
রিট আবেদনে আরো বলা হয়, জামায়াতের গঠনতন্ত্র সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের লঙ্ঘন। কারণ, জামায়াত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিশ্বাস করে না। নির্বাচন কমিশন দলটিকে নিবন্ধন দিয়ে বেআইনি কাজ করেছে। রিট আবেদনে দলটির নিবন্ধন বাতিল করার আদেশ প্রার্থনা করা হয়।
আলোচনার শেষে নির্বাচন কমিশনের দ্বিমুখী নীতির কথাটা উল্লেখ করা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশন একদিকে যুদ্ধাপরাধীরা যাতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে সে রকম বিধান করে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ সংশোধন করছে, আবার অন্যদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতকে নিবন্ধন দিয়ে এবং পাবর্ত্য এলাকার আদিবাসী দলগুলোকে নিবন্ধন না দিয়ে নিজেরাই যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ সুগম করছে। নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এরূপ দ্বিমুখী নীতি কখনো কাম্য হতে পারে না।য়
ট্রুথ কমিশন
দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞতা
মাবরুক মোহাম্মদ
৪ আগস্ট, ২০০৮ থেকে শুরু হওয়া ট্রুথ
কমিশনের কার্যক্রম শেষ হলো গত ৪ জানুয়ারি। ২০০৮ সালের ৮ জুন এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশ জারি করেন রাষ্ট্রপতি। অধ্যাদেশ অনুযায়ী এর মেয়াদ ছিল পাঁচ মাস। তবে কেবল এই পাঁচ মাসই নয়, এ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ জারির অনেক আগে থেকেই এই কমিশন ছিল পাদপ্রদীপের আলোয়। ট্রুথ কমিশন নিয়ে হয়েছে দীর্ঘ আলোচনা, সমালোচনা আর পর্যালোচনা। জারির পর অধ্যাদেশটির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট অধ্যাদেশটিকে কেন বেআইনি বলে ঘোষণা করা হবে না তার জবাব চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত একে অবৈধ এবং অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করে। পরবর্তীকালে এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিলের প্রেক্ষিতে বর্তমানে মামলাটি আপিল বিভাগে বিচারাধীন আছে। আপিল বিভাগের রায়ের ওপর নির্ভর করছে এর সব কার্যক্রমের বৈধতা, ভবিষ্যৎ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ ধরনের অধ্যাদেশ জারির এখতিয়ার, এর আশ্রয় নেয়া ব্যক্তিদের ভবিষ্যত, এর মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমাকৃত টাকার ভবিষ্যৎ, আমাদের আইনি কাঠামোতে এর আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল কিনা তার উত্তর, প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সাথে এটি কতটুকু সাংঘর্ষিক, সংবিধানের সাথে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা এবং জারির সময় বিদ্যমান অবস্থার বিচারে এর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু- এগুলোসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর। যা আদালতের দেয়া রায় থেকে আমরা নিশ্চয় পেয়ে যাবো। তাই এ সমস্ত বিষয় বাদ দিয়ে আমরা দেখার চেষ্টা করব ট্রুথ কমিশন আসলে কি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এটি কীভাবে কাজ করেছে এবং বাংলাদেশের ট্রুথ কমিশন তার উদ্দেশ্য কতটা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
ট্রুথ কমিশন কি
ট্রুথ কমিশন বা সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন বলতে অতীত সরকারের মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘটিত অপরাধ, অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধান ও প্রকাশের দায়িত্বে নিয়োজিত কোনো কমিশনকে বোঝায়, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে অতীতে সংঘটিত কোনো বিরোধের মীমাংসা করা। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ বা একনায়কতন্ত্রের অবসানের পর বিভিন্ন দেশ ভিন্ন ভিন্ন নামে এ ধরনের কমিশন গঠন করে থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য শাসনের অবসানের পর প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সে দেশের সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশনকে সারা বিশ্বেই একটি মডেল ধরা হয়।
ট্রুথ কমিশন দেশে দেশে
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে এ পর্যন্ত মোট ১৮টি দেশে ট্রুথ কমিশন গঠিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দেশ হলো আর্জেন্টিনা, দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, পূর্ব তিমুর ও যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা ও আর্জেন্টিনার ট্রুথ কমিশন সারা বিশ্বেই বহুল আলোচিত।
১৯৯০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ ২৭ বছরের জেল জীবনের অবসান ঘটে। এরপর শুরু হয় তৎকালীন ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল পার্টি এবং ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের মধ্যে আলোচনা। এই আলোচনায় নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সাথে উঠে আসে অতীত সরকারের বর্ণবৈষম্যকালীন সময়ের অপরাধগুলো। আলোচনায় ন্যাশনাল পার্টি সবাইকে সাধারণ ক্ষমা করার পক্ষে মত দেয়। অপরপক্ষে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস অতীতের সব অপরাধের জন্য জবাবদিহিতার পক্ষে অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত দুই দলই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংঘটিত বর্ণবৈষম্যের অপরাধের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছায়। ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস ৬১% ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়। একই বছরের নভেম্বরে সংসদে একটি বিল উত্থাপন করা হয়। পূর্ববর্তী সমঝোতা অনুযায়ী এতে রাজনৈতিক অপরাধের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। তবে শর্ত রাখা হয় যে, অপরাধীদের কেবল তখনই ক্ষমা করা হবে যদি তারা তাদের অপরাধের তথ্য প্রদান করে এবং প্রমাণ করতে পারে যে, তারা কেবল রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এই অপরাধ করেছে। অপরাধের তথ্য প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় ট্রুথ কমিশন। আর্চ বিশপ ডেসমন্ড টুটুকে কমিশনের প্রধান করা হয়। এর কার্যক্রম চলে প্রায় ৩ বছর ধরে। এতে প্রায় ২০,০০০ ভিকটিম অপরাধের সাক্ষ্য প্রদান করে এবং ৭,০৬০ ব্যক্তি তাদের অপরাধ স্বীকার করে। তবে অনুমান করা হয়, অপরাধীর প্রকৃত সংখ্যা কমিশনে আশ্রয় নেয়ার সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
আর্জেন্টিনায় ১৯৭৬ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে। এরপর ৩ বছরব্যাপী নাশকতাকারী বিনাশের নামে প্রায় ৩০,০০০ লোককে হত্যা করা হয়। অনেকে নিরুদ্দেশ হয়, যাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত নিরুদ্দেশ ব্যক্তিদের তথ্য দেয়ার জন্য সামরিক শাসকদের ওপর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফকল্যান্ড যুদ্ধে পরাজয়ের পর তারা দেশে সাধারণ নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। ১৯৮৩ সালের এই নির্বাচনে রাউল আলফনসিন সে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সরকার গঠনের ১০ দিনের মধ্যে তিনি নিরুদ্দেশ ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য উদ্ধারে একটি কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনের একমাত্র দায়িত্ব ছিল নিরুদ্দেশ ব্যক্তিদের ভাগ্য এবং অবস্থান সম্পর্কে অনুসন্ধান করা। কমিশন প্রায় ৯,০০০ নিরুদ্দেশ ব্যক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। তবে তাদের অবস্থান সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি।
সশস্ত্র বাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করা ছিল আর্জেন্টাইন ট্রুথ কমিশনের এক অনন্য দিক। সামরিক জান্তার ৯ শীর্ষ কর্মকর্তাকে এর মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা হয়। ৫ জনের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এই বিচার কার্যক্রম মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। এর ফলে সামরিক শাসনামলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ব্যাপারে ব্যাপক জনমত ও জনসচেতনতা গড়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ট্রুথ কমিশন
যে কোনো দেশে ট্রুথ কমিশন গঠনের সময় পাঁচটি দিক বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো- ১. সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রকৃতি; ২. রাজনৈতিক পালাবদলের প্রকৃতি;
৩. রাজনৈতিক পালাবদলের পর অপরাধীদের
দাপট ও ক্ষমতার দৌরাত্ম;
৪. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিতকরণ এবং
৫. ট্রুথ কমিশনের প্রতি জনসমর্থন।
বাংলাদেশের ট্রুথ কমিশন গঠিত হয় একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে শত শত রাজনীতিবিদ দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে আটক হন। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় প্রায় হাজারখানেক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বল্পমেয়াদে এত বিপুলসংখ্যক মামলা অতি দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব ছিল না। এছাড়াও আশঙ্কা ছিল যে, নির্বাচিত সরকার হয়তো মামলাগুলো চালিয়ে নিয়ে যাবে না। তাই মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গঠন করা হয় ‘সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন’ বা ট্রুথ কমিশন। ট্রুথ কমিশনের এই উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে অধ্যাদেশটির ভূমিকায় বলা হয়েছে- ‘রাষ্ট্রকে উক্তরূপ দুর্নীতির বিচার ও অপরাধ প্রমাণের ভার লাঘব এবং উক্ত অপরাধের বিচারের বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে উহা দ্রুততার সহিত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান করিবার উদ্দেশ্যে প্রণীত।’
যদিও আইনটির কোথাও সরাসরি বলা নেই যে, রাজনীতিবিদদের জন্য এটি গঠন করা হচ্ছে, তবুও আইনটি তৈরির সময়ে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সে সময়কার আইন প্রণেতাদের চিন্তা-চেতনা, এবং আইনটির ভূমিকায় অপ্রত্যক্ষভাবে উল্লিখিত রাজনীতিবিদদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয় থেকে বোঝা যায়, এটি গঠিত হয়েছিল দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে। এছাড়াও অন্য যে কোনো পেশার লোকজনের এর আশ্রয় নেয়ার সুযোগ ছিল।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে ট্রুথ কমিশন গঠিত হয়েছিল তা কতটুকু অর্জিত হয়েছে, সে সম্পর্কে প্রশ্ন করাই যায়। কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী মোট ৪৫২ ব্যক্তি এর অনুকম্পা নিয়েছে। যার মধ্যে রাজনীতিবিদ মাত্র ১২ জন। অধিকাংশই আমলা এবং সরকারি চাকরিজীবী, বাদবাকি ব্যবসায়ী। এই তালিকায় উঁচু স্তরের দুর্নীতিবাজ বলে পরিচিত কারো নাম নেই। রাজনীতিবিদরা কেন এর আশ্রয় নিল না তা খুব সহজেই অনুমেয়। অধ্যাদেশটির ২৬নং ধারায় কমিশনের আদেশের পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, কমিশনের আশ্রয় গ্রহণকারী কোনো ব্যক্তি পরবর্তী ৫ বছরের জন্য সাংবিধানিক আইনের দ্বারা বা অধীনে নির্বাচিত কোনো পদ গ্রহণ করতে পারবে না, কোনো ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, পাবলিক কোম্পানির চেয়ারম্যান, সদস্য বা পরিচালক হতে পারবে না। উপরোক্ত বাধানিষেধের কারণেই হয়তো তারা কমিশনের দ্বারস্থ হন নাই। কেননা রাজনীতিবিদদের অনেকেই বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য বা সংস্থার সাথে জড়িত। তাছাড়া দেশের সাধারণ আইনে অনেক ফাঁক-ফোকর থাকায় বিশেষ পরিস্থিতিতে উচ্চ আদালত থেকে জামিন বা স্থগিতাদেশ নিয়ে অনেক কিছু করা সম্ভব। এ অবস্থায় ট্রুথ কমিশনে স্বেচ্ছায় দুর্নীতির কথা স্বীকার করে কেউ নিজ চরিত্রে কালিমা লেপন করতে চাননি। কারণ সাধারণ আইনে যেটি প্রমাণ সাপেক্ষ, ট্রুথ কমিশনে তা স্বীকার করে স্বেচ্ছায় শাস্তি মাথা পেতে নেয়ার সামিল। এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনো সরকারি এজেন্সি যে তাকে ধরবে না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এছাড়াও এই আইনের দ্বারা একই ধরনের অপরাধের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিকে বিভিন্ন ধরনের সাজা বা বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন কিন্তু চার্জ গঠন করা হয়নি তারা ট্রুথ কমিশনে আসতে পারে। আর যাদের মামলা আগে শুরু হয়েছে তারা সাধারণ আইনের অধীনে সাজা খাটবে। কেবল সরকারি সংস্থার তদন্ত, মামলা দায়ের এবং চার্জ গঠনে বিলম্বের কারণে এক ব্যক্তি অন্যায় স্বীকার করে পার পেয়ে যাবে আর অন্য জন জেল খাটবে- এটি ন্যায়নীতির পরিপন্থী।
ট্রুথ কমিশনের প্রতি জনসমর্থন নিরঙ্কুশ ছিল না। এর কার্যকারিতা নিয়েও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল, ছিল স্বচ্ছ ধারণার অভাব। বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে এর অবস্থান কী হবে তা নির্ভর করছে আপিল বিভাগের রায়ের ওপর। তবে আপাতত এটুকু বলা যায়, যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ট্রুথ কমিশন গঠিত হয়েছিল তা অর্জন করতে এটি স্পষ্টতই ব্যর্থ হয়েছে।য়
সূত্র: ইন্টারনেট
‘না’ ভোটের বিধান বাতিল হতে যাচ্ছে
মাবরুক মোহাম্মদ
বাতিল হতে যাচ্ছে ‘না’ ভোটের বিধান। সেই সাথে বাতিল হচ্ছে একটি নাগরিক অধিকার। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে জারি করা গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (সংশোধিত) ২০০৯ জাতীয় সংসদে উত্থাপনের সময় ‘না’ ভোটের বিধানটি বাদ দিয়ে উত্থাপন করা হয়। বিগত দিনগুলোতে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা চালুর জন্য সোচ্চার সুশীল সমাজ ও অন্যান্য নাগরিক আন্দোলন গোষ্ঠীর এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সম্ভবত ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহের কারণে বিষয়টি সবার দৃষ্টির অন্তরালে চলে যায়।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের ব্যালট পেপারে ‘না’ ভোট প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি ছিল বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পছন্দনীয় প্রার্থীকে ভোট প্রদান করা একজন নাগরিকের অধিকার কিন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী কোনো প্রার্থীকেই ভোটারের পছন্দ নাও হতে পারে। পূর্ববর্তী ব্যবস্থায় কেবল পছন্দনীয় প্রার্থীকেই ভোটদানের সুযোগ ছিল। কিন্তু কোনো প্রার্থীকেই পছন্দ না হলে বা যোগ্য মনে না করলে তা জানানোর কোনো আনুষ্ঠানিক পন্থা ছিল না। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেয়া যেমন অধিকার তেমনি কাউকেই পছন্দ না হলে তা জানানোও একজন নাগরিকের অধিকার। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে ‘না’ ভোটের বিধান সংযোজনের মাধ্যমে একজন নাগরিকের এই অধিকারকেই স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল।
গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে সংযোজিত এই বিধানটির ব্যাপারে রাজনীতিবিদরা শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছিলেন। বড় দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নানা বিষয়ে মত পার্থক্য থাকলেও এই বিষয়ে উভয়পক্ষই ছিল এক মত। ‘না’ ভোটের বিরোধিতা করে রাজনীতিবিদদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে কোনো ভোটার যদি কোনো প্রার্থীকেই যোগ্য মনে না করে তবে তিনি ভোটদানে বিরত থাকতে পারেন। কিন্তু ভোট কেন্দ্রে অনুপস্থিতি একজন ভোটারের প্রার্থীদের ওপর অনাস্থাকে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে না। কারণ আমাদের দেশে নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে ভোটদানে বাধা দেয়ার নজির আছে। এছাড়াও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণেও কোনো ভোটার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভোটদানে ব্যর্থ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে কোনোভাবেই বলা যাবে না তিনি প্রার্থীদের ওপর অনাস্থা প্রকাশ করেছেন। তাই এই ধরনের পরিস্থিতি এবং ভোটারদের অনাস্থা জ্ঞাপনকে আলাদা করার জন্যই প্রয়োজন ‘না’ ভোটের বিধান।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে প্রতিটি নাগরিককেই চিন্তা, বিবেক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এটি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার এবং তা কোনোভাবেই বিঘ্নিত করা যাবে না। ‘না’ ভোটের বিধান বাতিলের মাধ্যমে প্রার্থীদের ব্যাপারে ভোটারদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সঙ্কুচিত করে ফেলা হয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রতিটি ভোটারের মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে এবং তাদের ভাবনা ও অনুভূতিকে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে। কিন্তু ‘না’ ভোটের বিধান বাতিলের মাধ্যমে ভোটারদের এই অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
এদিকে ভারতে ২০০৪ সালে ‘পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবারটিস’ নামক একটি এনজিও সে দেশের ব্যালট পেপার ও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ‘না’ ভোট প্রদানের ব্যবস্থা চালু করার জন্য জনস্বার্থে একটি মামলা দায়ের করে। ভারতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচিত হচ্ছে। জনগুরুত্ব বিচারে মামলাটি শুনানির জন্য সমপ্রতি সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেয়। এই বেঞ্চে গত ২৯ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে মামলার শুনানিতে অংশগ্রহণ করে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ‘না’ ভোটের বিধানের বিরোধিতা করেন। এখানে উল্লেখ্য, কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধিতা করলেও ভারতের নির্বাচন কমিশন ‘না’ ভোট সংযোজনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
বাংলাদেশও ভারত সরকারের এই বিষয়ক কার্যক্রম ও বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বলা যায়। দেশভেদে রাজনীতিবিদদের চিন্তা, যুক্তি ও শঙ্কার জায়গা একই। কোনো দেশের শাসকরাই তাদের নাগরিকদের ‘না’ ভোট নামক আপাত নিরীহ অধিকারটি চর্চার সুযোগ দিতে চায় না। এর অন্যতম কারণ হয়তো না ভোটের মাধ্যমে রাজনীতিকরা তাদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার ব্যাপারে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, যা তাদের কাম্য নয়। তাছাড়া এই অধিকার চর্চার মাধ্যমে নাগরিকরা যে কোনো সময় রাজনৈতিকভাবে পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারে সঙ্কেত পাঠাতে পারেন- এ ব্যাপারেও হয়তো শঙ্কা রয়েছে। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হতে পারে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে পার্বত্য তিন জেলার ভোটারদের বিপুলভাবে এই বিধানের চর্চা। সেখানে দুটি আঞ্চলিক দল চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন জটিলতায় নিবন্ধিত হতে পারেনি। ফলে এই তিন পার্বত্য জেলায় বিপুলসংখ্যক ‘না’ ভোট পড়ে। অর্থাৎ পার্বত্য জনগোষ্ঠী প্রচলিত ধারার রাজনীতিকদের ওপর ব্যাপক অনাস্থা প্রকাশ ও নিজেদের মধ্য থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেয়। ‘না’ ভোটের বিধান ছাড়া তাদের এই আকাঙ্ক্ষা ও মনোভাব ব্যক্ত করার আর কী উপায় আছে প্রচলিত ব্যবস্থায়? কিংবা ‘না’ ভোটের বিধান যদি না থাকত তবে কি তারা তাদের এই মত প্রকাশের সুযোগ পেত? বা আমরাও কি তা জানতে পারতাম?
‘না’ ভোটের বিধান নিয়ে ব্যাপক প্রচার ও সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়োজন রয়েছে, তাই এটি এই মুহূর্তে ততটা কার্যকরী নাও হতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় সৎ, স্বচ্ছ, যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সন্দেহ নেই। য়
বাদপড়া ১০ বিচারপতির স্থায়ী নিয়োগের আদেশ আপীল বিভাগে বহাল
আতিয়া নাজনীন
২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত
জোট সরকারের আমলে স্থায়ী না করা ১০ বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগ দিতে হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশ বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে কর্মরত ২৯ বিচারপতির দায়ের করা লিভ টু আপিলের ওপর ৫ দফা নির্দেশনা দিয়ে আবেদনটি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। ২ মার্চ ২০০৯ প্রধান বিচারপতি এম. এম. রুহুল আমীনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই নির্দেশ দেয়। নির্দেশনাগুলো হচ্ছে-
১. প্রধান বিচারপতির পরামর্শের ভিত্তিতে বিচারপতি নিয়োগ সাংবিধানিক রেওয়াজ। আর তাই প্রধান বিচারপতির পরামর্শ নেয়া বাধ্যতামূলক।
২. এই পরামর্শ সংবিধানের আওতায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নীতির মধ্যে গ্রথিত ও আইনের শাসনের অংশ।
৩. বিচারপতি মনোনয়নের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিচারিক দক্ষতা ও যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ প্রাধান্য পাবে। তবে তাদের পূর্ব বৃত্তান্ত সম্পর্কে নির্বাহী বিভাগের মতামতও নেয়া হবে। এ দুই পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ পরামর্শ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারপতি হিসেবে সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তিবর্গকে খুঁজে বের করাই বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের দায়িত্ব।
৪. সংবিধানের ৯৫ ও ৯৮ অনুচ্ছেদে যথাক্রমে স্থায়ী ও অতিরিক্ত বিচারকের শপথ সম্পর্কিত বিধান আছে। উভয় ক্ষেত্রে শপথ নেয়ার দিন থেকেই সংশ্লিষ্ট বিচারক দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন বলে বিবেচিত হবেন, তার আগে থেকে নয়।
৫. পঞ্চম নির্দেশনা অনুযায়ী, উপরের নির্দেশনাগুলোর আলোকে ১০ জন বিচারপতি - বিচারপতি আব্দুস সালাম, মমতাজউদ্দীন আহমেদ, শামসুল হুদা, ফারুক আহমেদ, হাসান ফয়েজ সিদ্দীকি, মোহাম্মদ আব্দুল হাই, মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক, মোহাম্মদ মারযি উল হক, মোহাম্মদ নিজামুল হক এবং এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরীর বিষয়টি বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের অস্থায়ী বিচারপতি হিসেবে ১১ জন বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এই বিচারপতিদের ২০০৩ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট স্থায়ী না করে বরং বাদ দেয়। এ সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইদ্রিসুর রহমান সর্বপ্রথম জনস্বার্থে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিবাদি করে। এ রিট পিটিশনে বাদপড়া বিচারপতি আব্দুস সালাম ও মমতাজউদ্দীন আহমেদ পক্ষভুক্ত হন। রিট পিটিশনে মূলত অভিযোগ করা হয় যে, প্রধান বিচারপতির সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের পরামর্শে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি তাদের স্থায়ী না করে বাদ দেন। এরপর বিচারপতি ফারুক আহমেদ, হাসান ফয়েজ সিদ্দীকি, মোহাম্মদ আব্দুল হাই আরেকটি রিট আবেদন করেন। ওই বছরেরই ৪ মে আদালত সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করে। পরবর্তীকালে বিচারপতি মোহাম্মদ মারযি উল হক, মোহাম্মদ নিজামুল হক এবং এএইচএম শামসুদ্দীন চৌধুরী এই রিটের পক্ষভুক্ত হন। এ রিট পিটিশনে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত থাকায় তা নিষ্পত্তিকল্পে প্রধান বিচারপতি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুর রশিদ, বিচারপতি এস কে সিনহা ও নাজমুন আরা সুলতানাকে নিয়ে একটি স্পেশাল বেঞ্চ গঠন করেন। গত বছরের ১৭ জুলাই বেঞ্চ ১ মাসের মধ্যে বাদপড়া ১০ জন অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী নিয়োগ দেয়ার নির্দেশ দেয়। রায়ে ২০০৩ সালে বাদ পড়ার তারিখ থেকে তাদের স্থায়ী বিচারপতি না হওয়ার সময় পর্যন্ত বিনা বেতনে বিশেষ ছুটি হিসেবে গণ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়। তাছাড়া ২০০৩ সাল থেকেই তাঁদের জ্যেষ্ঠতা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে কর্মরত ২৯ বিচারপতি লিভ পিটিশন দায়ের করেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে লিভ টু আপিলের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ রায় প্রদানের তারিখ ঘোষণা করে।
২৯ জন বিচারপতির পক্ষে ছিলেন টি এইচ খান, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট আফজাল এইচ খান, অ্যাডভোকেট ফয়সাল এইচ খান, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আহসান, অ্যাডভোকেট রোজিনা চৌধুরী প্রমুখ আইনজীবী।
আর ১০ বিচারপতির পক্ষে ছিলেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অ্যাডভোকেট আবুল বাসেত মজুমদার, ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর প্রমুখ আইনজীবী। সরকারের পক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম. এনায়েতুর রহিম।
এবার আসা যাক, রায় পর্যালোচনার ক্ষেত্রটিতে- আর এ পর্যায়টি বিশ্লেষণের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হচ্ছে রায়ের বিপরীতে রিট আবেদনকারী ও হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলকারী উভয়পক্ষগুলোর মতামত। রায় ঘোষণার পর বাদপড়া বিচারপতিদের পক্ষের আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেন, প্রধান বিচারপতির পরামর্শক্রমে বিচারপতি নিয়োগ সাংবিধানিক, এই অধিকারটি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের স্বীকৃতি পেল। এই রায়ের ফলে বিচার বিভাগের স্তম্ভ রক্ষা পেয়েছে।
অন্যদিকে ২৯ জন বিচারপতির পক্ষের আইনজীবী টি এইচ খান বলেন, আদালতের রায়ে আমরা খুশি। রায়ে বলা হয়েছে, বিচারপতিরা যখন নিয়োগ পাবেন তখন শপথ নেবেন। শপথের সময় থেকে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ হবে- আমরা এটাই চেয়েছিলাম।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ১০ বিচারপতিকে নতুন করে শপথ নিতে হবে। স্থায়ী নিয়োগের পরেই এই শপথ নিতে হবে। বিচারপতির নিয়োগে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ নেয়া এখন বাধ্যতামূলক।
মামলার রায় পর্যালোচনার পর আরও একটি ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেয় রায়টি আংশিক বহাল রেখেছে। কারণ স্থায়ী বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা দেয়া হবে না বরং জ্যেষ্ঠতার ব্যাপারটি স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে তাদের শপথের সময় থেকে হিসাব করা হবে।
সবশেষে বলা যায়, বিচার বিভাগীয় কার্যক্রমে অনভিপ্রেত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ওপর সুপ্রিম কোর্টের এই যুগান্তকারী রায়টি একটি সমুচিত জবাব এবং একইসাথে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা অর্জনের পথে আরো একটি ইতিবাচক ইংগিত।
কোড়াইল বস্তি উচ্ছেদ নোটিশ প্রদান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না
সরকারের প্রতি আদালতের রুল জারি
সারোয়ার হোসাইন
বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যতিরেকেই গত ১৬ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে সরকারের গণপূর্ত বিভাগ লিখিত নোটিশ জারির মাধ্যমে কোড়াইল বস্তির বাসিন্দাদের অনতিবিলম্বে নিজ দায়িত্বে সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেয়। বস্তিবাসীদের বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা সম্পন্ন না করে এরূপ উচ্ছেদ করার কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করে বস্তিবাসীদের পক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর (কাপ) ও দু’জন বস্তিবাসীর দায়ের করা রিট মামলায় গত ১৮ ডিসেম্বর ০৮ তারিখে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ওই বস্তির স্থাপনা অপসারণের নোটিশ প্রদান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর জন্য সরকারের প্রতি রুলনিশি জারি করে।
মামলার বিষয়বস্তু
বস্তিবাসী পুর্নবাসন কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী গুলশান থানাধীন প্রায় ৯০ একর সরকারি জায়গায় এক লক্ষ বিশ হাজার ভূমিহীন লোক জীবন-জীবিকার তাগিদে ৩০-৩৫ বছর যাবৎ বসবাস করছে। গত ১৬ নভেম্বর ২০০৮ তারিখে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরিত চিঠির মাধ্যমে বস্তিবাসীদের অনতিবিলম্বে অভ্যন্তরস্থ সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ প্রদান করা হয়। অন্যথায় আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ওই স্থাপনাগুলো অপসারণ করা হবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
মামলার সমর্থনে যুক্তি
ক্স সরকার যেখানে ইতোমধ্যেই বস্তিবাসীসহ শহুরে বাস্তুহারাদের বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এমতাবস্থায় বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা না করেই নতুন করে বস্তি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সরকার গৃহীত পরিকল্পনারই পরিপন্থী, যা সরকারের পুনর্বাসন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে।
ক্স উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে প্রায় বিশ হাজার পরিবার সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় পড়বে। এতে করে প্রায় এক লক্ষাধিক মানুষ (শিশু, মহিলা, বৃদ্ধসহ) তাদের জীবনধারণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।
আদালতের নির্দেশ
শুনানি অন্তে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ ওই বস্তিউচ্ছেদ নোটিশ প্রদান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর জন্য সরকারের প্রতি রুলনিশি জারি করে। একই সাথে আদালত ৫ জানুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত বস্তি উচ্ছেদ না করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেয়। গত ৬ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে আদালত পুনরায় বস্তি উচ্ছেদ বিষয়ে তিন মাসের স্থগিতাদেশ প্রদান করে। আবেদনকারীদের পক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সিনিয়র আইনজীবী জনাব নিজামুল হক নাসিম। তাকে সহযোগিতা করেন অ্যাডভোকেট আবু ওবায়দুর রহমান, অ্যাডভোকেট অবন্তি নুরুল ও সারোয়ার হোসেইন।য়
ডাণ্ডাবেড়ির ব্যবহার ও প্রচলিত আইনের সাংবিধানিক অবস্থান
সারোয়ার হোসাইন
আমাদের দেশে কারাব্যবস্থার অস্তিত থাকলেও অধিকাংশ সময়ই তা থাকে আমাদের চিন্তা জগতের বাইরে। যখনই কারাগারে কোনো অনিয়ম, দাঙ্গা কিংবা কোনো কয়েদির অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে কারাগার তখন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। কারা আইনের অধীনে কারাগারের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে বন্দিদের জন্য রয়েছে নানা রকম শাস্তির ব্যবস্থা। ডাণ্ডাবেড়ি হলো সেগুলোর মধ্যে নিষ্ঠুরতম ও অমানবিক। ডাণ্ডবেড়ি লাগানোর ফলে ওই বন্দি স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারে না, ঘুমাতে হয় চিত বা উপুড় হয়ে। অমানবিক এই শাস্তির ভয়ে করাবন্দিদের মাঝে সর্বদা আতঙ্ক লেগে থাকে। 
কারাগারে কাউকে ডাণ্ডাবেড়ি লাগানো হয় জেলকোডের ভিত্তিতে (প্রিজন অ্যাক্ট ১৮৯৪, প্রিজনার্স অ্যাক্ট ১৮৭১, ও ১৮১৮ সালের তিন নম্বর রেগুলেশনের সমন্বয়)। কারাভ্যন্তরে কোনো বন্দি কারা নিয়ম ভঙ্গ করলে তার নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে জেলকোডের ১৯ নং অধ্যায়ে। এই অধ্যায়ের বিধান মোতাবেক কারাধ্যক্ষ বা জেল সুপার ১১ প্রকারের লঘু ও ১১ প্রকারের গুরুতর শাস্তি বিধানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। গুরুতর শাস্তির মধ্যে ৩০ দিনের জন্য ডাণ্ডাবেড়ি পরানোর বিধানও রয়েছে বিধি ৭০৮ অনুযায়ী। গুরুতর শাস্তিগুলো ইতোমধ্যে আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের ক্ষেত্রে অতি বিরল পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করার বিধান রয়েছে। আদালতে বিচারাধীন কোনো বন্দিদের এধরনের শাস্তি প্রদানের বিধান নেই। বিচারাধীন বন্দিদের ক্ষেত্রে গুরুতর শাস্তি প্রদান করতে হলে জেলকোড- অধ্যায় ২৭-এর ৯২৭ নং বিধান মোতাবেক অবশ্যই জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নিতে হবে ও কৃত অপরাধ এবং প্রযোজ্য শাস্তি সম্পর্কে আইজি প্রিজনকে বিস্তারিত জানাতে হবে।
আদালত কর্তৃক সাজাপ্রাপ্ত বন্দিদেরও আইনানুগভাবে কতটুকু সাজা দেয়া যাবে সে প্রশ্নে জেলকোড অনুযায়ী ডাণ্ডাবেড়ি কেবল তাদেরই লাগানো যাবে যারা বন্দিদের জন্য বিশেষ বিপজ্জনক ও যাদের পালিয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে বা সে কোনো বিশেষ প্রকৃতির গুরুতর অপরাধ করেছে। তবে এক্ষেত্রেও এরূপ শাস্তি ২৪০ ঘণ্টার বেশি প্রয়োগ করা যাবে না।
বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫ (৩) ও ৩৫ (৫) বন্দিদের নির্মম ও অমানবিক কোনো শাস্তি দিতে বাধা দান করেছে। যেহেতু সংবিধানই বন্দিদের নির্যাতন করতে বারণ করে দিয়েছে, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই কতিপয় ক্ষেত্রে কারাভ্যন্তরে বন্দিদের হাতকড়া বা ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা সংবিধান-বিরুদ্ধ। সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও জেলকোডে অনুরূপ শাস্তির ব্যবস্থা বিদ্যমান। কারা কর্তৃপক্ষ হাতকড়া ও ডাণ্ডাবেড়ির ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনের বিধানও যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। কর্তৃপক্ষ যথেচ্ছভাবে হাতকড়া ও ডাণ্ডাবেড়ি ব্যবহার করছে। এরূপ ব্যবহার বিদ্যমান আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। তাছাড়া সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যে কোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার। উক্ত অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে যে, আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। উপরোক্ত অনুচ্ছেদগুলোর দ্বারা এটি পরিষ্কার, কারাগারে বন্দি যে কোনো ব্যক্তির অধিকারগুলো সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে। তারপরও ডাণ্ডাবেড়ির মাধ্যমে কয়েদিদের অমানবিক শাস্তি প্রদান সংবিধান কর্তৃক নিশ্চিতকৃত মৌলিক অধিকারেরই লঙ্ঘন।
অতিসমপ্রতি পার্বত্য বান্দরবানের কারা বন্দি আদিবাসী নেতা রাংলাই ম্রো চট্টগ্রাম কারাগারে হৃদরোগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরবর্তীকালে তাঁকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে ভর্তি করা হয়। এরূপ অমানবিক আচরণের খবর পরের দিন দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), এএলআরডি, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিশন ও আইনজীবী সারা হোসেন রাংলাইকে ডাণ্ডাবেড়ি মু্ক্ত করতে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। বিগত ২০০৭ সালে দায়ের করা একটি অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রাংলাই ম্রোকে আটক করা হয়। অসুস্থ রাংলাইকে কেন ডাণ্ডাবেড়ি লাগানো হলো- এ প্রশ্ন আইজি প্রিজনকে করা হলে তিনি সাংবাদিকদের জানান যে, বন্দি কারাগারের বাইরে এলে ডাণ্ডাবেড়ি লাগানোর নিয়ম রয়েছে। আইজি প্রিজনের এই উত্তরের প্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠতে পারে, গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পুলিশ প্রহরা থেকে পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? আরও একটি প্রশ্ন, এই নিয়ম কি কেবল সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য? যদি তা না হয় তবে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গ্রেফতারকৃত অধিকাংশ ভিআইপি কারা বন্দিরা অসুস্থতার অজুহাতে দিনের পর দিন হাসপাতালে ছিলেন। তাদের কাউকেই হাসপাতালের বেডে ডাণ্ডাবেড়ি বা হাতকড়া পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়নি।
রাংলাই ম্রোর অনুরূপ ঘটনা ঘটে ঝিনাইদহের ফজলুর রহমান হ্যাপীর বেলায়। ১৯৯০ সালে গ্রেফতার হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাকে একাধারে ৩৩ মাস ধরে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জেলকোডের বিধি ৭১৯ অনুযায়ী ডাণ্ডাবেড়ি অবিরামভাবে প্রয়োগের সর্বোচ্চ মেয়াদ তিন মাস এবং বিধি ৭২০ অনুযায়ী যে কোনো ধরনের বেড়ি আরোপের শাস্তি প্রদানের পর পুনরায় আরোপ করতে হলে ১০ দিনের বিরতি প্রদান করতে হবে। ফজলুর প্রতি এরূপ অমানবিক নির্যাতনের বিষয়কে এবং ডাণ্ডাবেড়ির আইনগত বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) পুনরায় একটি রিট মামলা দায়ের করে (রিট নং ২৮৫২/১৯৯৭)। ওই রিটে ডাণ্ডাবেড়িকে নিষিদ্ধ ও অবৈধ ঘোষণা করার আবেদন করা হয়। মামলায় আদালতের নির্দেশে ফজলুর ডাণ্ডাবেড়ি খুলে দেয়া হলেও ডাণ্ডাবেড়িকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়নি এবং এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে জেলকোডের বিধানাবলি মেনে চলার জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
রাংলাই, রাজু ও ফজলু মিডিয়ার কল্যাণে জনসমক্ষে আসাতে বিলম্বে হলেও ডাণ্ডাবেড়ির শৃঙ্খলমুক্ত হতে পেরেছে। কিন্তু এরূপ আরও কত রাংলাই, রাজু ও ফজলু ডাণ্ডাবেড়ির ভয়ঙ্কর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে কারাজীবন যাপন করছে তা আমাদের জানা নেই। আশা করছি, অচিরেই ঔপনিবেশিক আমলের এই ভয়ঙ্কর শাস্তি আমাদের কারা ব্যবস্থা থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত হবে এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পথকে নিশ্চিত করবে আরো এক ধাপ।য়
পরিবেশ রক্ষায় দিল্লি হাইকোর্টের পদক্ষেপ
আতিয়া নাজনীন
“জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষকে (ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট অ্যাপিলেট অথরিটি) একটি কার্যকর সংস্থা হিসেবে গঠন করার জন্য ভারত সরকারকে অনতিবিলম্বে সমস্ত পদক্ষেপ নিতে হবে”- ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, কতিপয় পরিবেশবাদী সমাজকর্মীর রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে বিমল ভাই এবং অন্যান্য বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া এবং অন্যান্য মামলায় দিল্লি হাইকোর্ট এ রায় দেয়।
মামলার নেপথ্য প্রেক্ষাপট
৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৫ উত্তরাঞ্চল জেলার উত্তরকাশী গ্রামে ‘লোহারীনাগ-পালা জলবিদ্যুৎ শক্তি প্রকল্প’ স্থাপনের অনুমতিপত্র প্রদান করে ভারত সরকার। এ সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে কয়েকজন পরিবেশবাদী সমাজকর্মী জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে ১ এপ্রিল ২০০৫ আপিলের আবেদন করেন। ‘কিন্তু নির্দিষ্ট সময়সীমা ৩০ দিনের মধ্যে আপীল করা হয়নি’- এই দোহাই দিয়ে কর্তৃপক্ষ ২০ মে ২০০৫ আবেদনটি বাতিল করে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে দিল্লি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০০৫ হাইকোর্ট তার আদেশে বলে, যে কারণের প্রেক্ষিতে জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ আবেদনটি বাতিল করেছে, তা নিতান্তই অযৌক্তিক এবং মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করে। কোর্ট আরও লক্ষ্য করে যে, জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষের নিজেরই রয়েছে গঠনগত সমস্যা এবং ৪৫ দিন সময়সীমার মধ্যে ‘জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৭’-এর অধীনে কর্তৃপক্ষের পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয়। তারপরও যখন ভারত সরকার এবং জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নির্দেশটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছিল না তখন পুনরায় সমাজকর্মীদের পক্ষ থেকে দিল্লি হাইকোর্টে আরেকটি আবেদন করা হয়।
জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ
গঠনের পটভূমি
৯ এপ্রিল ১৯৯৭, জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় ‘জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৭’-এর অধীনে। যেসব উদ্দেশ্যগুকে মাথায় রেখে এরকম একটি বিশেষায়িত কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়, সেগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১৯৭২ সালের জুন মাসে বিশ্বব্যাপী মানব পরিবেশ রক্ষার ব্রত নিয়ে সুইডেনের স্টকহোমে একটি পরিবেশবাদী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভারত ছিল একটি অংশগ্রহণকারী দেশ। সম্মেলনে গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি হচ্ছে পরিবেশসংক্রান্ত মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য পৃথক পরিবেশ আদালত গঠন। এর সাথে সঙ্গতি রেখেই ভারত ‘পরিবেশ (রক্ষা) আইন ১৯৮৬’ প্রণয়ন করে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার, এ আইনের কোনো বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছিল না। পরবর্তীকালে, এম. সি. মেথা বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া, ১৯৮৬ (২) মামলায় আদালত মন্তব্য করে যে, শুধু পরিবেশ সংক্রান্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তির জন্য পৃথক কোনো আদালত না থাকায় এ মামলাগুলো জনস্বার্থমূলক মামলা হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের সামনে আসছে এবং তা কোর্টগুলোর ওপর মামলার চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে অনেকখানি।
বৃহদায়তন প্রকল্পগুলো যা প্রাকৃতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করে, সেই প্রকল্পগুলোকে ছাড়পত্র প্রদানের ক্ষমতা ছিল কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য কোনো কর্তৃপক্ষ ছিল না। যার ফলে পরিবেশসংক্রান্ত ব্যাপারে বিচার পাওয়ার অধিকার থেকে মানুষ অহরহ বঞ্চিত হচ্ছিল।
সরকারের উদাসীনতা- অকার্যকর জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ
প্রথমেই ‘জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ আইন ১৯৯৭’-এর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধানের দিকে লক্ষ্য করা যাক: আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী একজন সভাপতি, একজন সহ-সভাপতি এবং আরও তিনজন সদস্য সমন্বয়ে আপিল কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অথবা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন এমন কারো মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচন করা হবে। আর সহ-সভাপতি হবেন এমন কেউ যিনি অন্যূন ২ বছর ভারত সরকার, কেন্দ্রীয় বা প্রাদেশিক সরকারের অধীনে সেক্রেটারি পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং প্রশাসনিক, আইনি, ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশসংক্রান্ত কৌশলগত দিক সম্পর্কে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ। ধারা ৫(৩) অনুযায়ী, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ, আইন, পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে পর্যাপ্ত পেশাগত জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে এমন কারো মধ্য থেকে সাধারণ সদস্য নির্বাচন করা হবে। ধারা ১১(১) অনুযায়ী পরিবেশসংক্রান্ত কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবে। ধারা ১২ অনুযায়ী জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষকে দেওয়ানি আদালতের মর্যাদা দেয়া হয় এবং পরিবেশসংক্রান্ত ব্যাপারে আপিলের ক্ষেত্রে ধারা ১৫ এই কর্তৃপক্ষকে একচ্ছত্র এখতিয়ার প্রদান করে।
সুতরাং ‘বৃহদায়তন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে কিনা?’- এই ব্যাপারে কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের দেয় রায়ের পুনর্বিবেচনার জন্য একটি কার্যকর, স্বাধীন, নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ গঠন করাই ছিল আইনটির উদ্দেশ্য। অর্থাৎ তাত্ত্বিক দিক থেকে আইনটি যথেষ্ট ইতিবাচক।
কিন্তু প্রায়োগিক বিচারে আইনটির সফলতা কতটুকু ছিল? বাস্তবিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় -
এক. জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ গঠন সংক্রান্ত ব্যাপারে অনবগতির কারণে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে নিষ্পত্তির জন্য আবেদন আসছিল খুবই কম। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীর সংখ্যা অনেক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর সামনে আসা মামলাগুলোর মধ্যে একমাত্র উল্লেখ করার মতো মামলা হচ্ছে-এ.পি.পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড বনাম প্রফেসর এম. বনাম নাইডু (১৯৯৯) ২ সুপ্রিম কোর্ট ৭১৮.
দুই. ২ জুলাই ২০০০ থেকে সভাপতির পদ এবং ১ আগস্ট ২০০৫ থেকে সহ-সভাপতির পদ শূন্য থাকার ব্যাপারে অবগত থাকার পরও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। এরূপ অবস্থায়, ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৫, দিল্লি হাইকোর্ট ৪৫ দিনের মধ্যে হলফনামার মাধ্যমে সরকারকে কারণ দর্শানোর এবং একইসাথে আপিল কর্তৃপক্ষের পুনর্গঠনের আদেশ দেয়। কিন্তু তারপরও সরকারের কোনো ভাবান্তর হয়নি বরং সরকারের পক্ষ থেকে কোর্টকে জানানো হয়, জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষের পরিবর্তে প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক পরিবেশ ট্রাইব্যুনাল গঠন করার জন্য একটি বিল বাজেট অধিবেশনে পেশ করা হয়েছে। এবং আরো বলা হয় যে, জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আসা আপিলগুলো সংখ্যার বিচারে কম হওয়ায় সভাপতি, সহ-সভাপতির পদ শূন্য থাকলেও কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, আপিল কর্তৃপক্ষের এরূপ সুসংগঠনের অভাবে এমন একটি বিশেষায়িত কর্তৃপক্ষ থাকার পরও পরিবেশসংক্রান্ত মামলাগুলো জনস্বার্থমূলক মামলা হিসেবে ব্যাপকভাবে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের সামনে আসছিল।
তিন. এখানে আরেকটা ব্যাপার উল্লেখ করা প্রয়োজন, জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ বিধি (১৯৯৮)’র ১০ বিধি অনুযায়ী শুধু আপিল কর্তৃপক্ষের প্রথম সভাপতির বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য শর্তাবলী হবে সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে নিযুক্ত একজন বিচারকের সমান এবং ধারা ৪ অনুসারে, পরবর্তীকালে নিযুক্ত সকল সভাপতি ভারত সরকারের অধীনে চাকরিরত একজন সেক্রেটারির সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। সুতরাং এটা মোটেই কোনো আশ্চর্যের বিষয় না যে, অবসরপ্রাপ্ত সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অথবা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এই বেতন স্কেলে সভাপতি এবং সহ-সভাপতির পদ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। আর তাই, প্রথম সভাপতি বিচারপতি শ্রী এন. ভেনকাটাচালা এবং সহ-সভাপতির পদত্যাগের পর যথাক্রমে ৮ বছর এবং ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও আর কেউ এই পদ দুটির প্রতি আকৃষ্ট হননি।
এসব অবস্থাবলির বিচারে খুব স্পষ্টভাবেই বলা যায়, প্রায়োগিক বিচারে জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ পরিণত হয়েছে একটি অকার্যকর কর্তৃপক্ষে আর এর পেছনে রয়েছে সরকারের উদাসীন মনোভাব। এ প্রেক্ষিতেই, দিল্লি হাইকোর্ট এই মামলায় ভারত সরকারকে কয়েকটি বাধ্যতামূলক আদেশ প্রদান করে বলে, যে, আদেশ প্রদানের ১২ সপ্তাহের মধ্যে সরকার সভাপতি ও সহ-সভাপতির নিয়োগ প্রদান করবে এবং তাদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলোর ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য আনার উদ্দেশ্যে জাতীয় পরিবেশ আপিল কর্তৃপক্ষ বিধির (১৯৯৮) ৪ ও ১০- এ দুটির প্রয়োজনীয় সংশোধন করবে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, শুধু প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত সভাপতির বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলোই সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে নিযুক্ত একজন বিচারকের সমান হবে না বরং এই সুবিধাগুলো পরবর্তীকালে নিয়োগপ্রাপ্ত সব সভাপতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এই মামলার রায় কয়েকটি ব্যাপারে আমাদের চোখ খুলে দেয়- ১. পরিবেশ সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো সমস্যা উদ্ভূত হলে সেক্ষেত্রে বিচার পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার; ২. এই অধিকারটি প্রয়োগের জন্য থাকতে হবে একটি আইনসম্মত কর্তৃপক্ষ; ৩. অবশ্যই সেই কর্তৃপক্ষকে হতে হবে কার্যকর; ৪. আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যাপারটি লক্ষ্যণীয় তা হচ্ছে, নির্বাহী বিভাগের উদাসীনতার কারণে যদি কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তাহলে বিচার বিভাগ সেখানে এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে।
বাংলাদেশে ড. মহিউদ্দিন ফারুক বনাম নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য (৪৬ ডি এল আর, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা ২৩৫) হচ্ছে প্রথম মামলা যার ফলশ্রুতিতে আদালত পরিবেশ দূষণ রোধের বিষয়টি আমলে নেয়। উল্লেখ্য, মামলাটি আদালতের সামনে এসেছিল জনস্বার্থমূলক মামলার আকারে। পরবর্তীকালে ‘পরিবেশ আদালত আইন ২০০০’-এর ধারা ৪ এবং ধারা ১২ অনুযায়ী যথাক্রমে পরিবেশ আদালত এবং পরিবেশ আপিল আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই আদালতগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারতের এই মামলার রায় আমাদের দেশের জন্যও উল্লেখযোগ্য একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।