|
|
আইনের সংস্পর্শে আসা শিশুরা
বিশ্বের নানা দেশের শিশুরা বিভিন্নভাবে
অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ে। অনুন্নত দেশের শিশুদের চিত্র আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশ তাদের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অভাবের করাল কশাঘাতে শিশুরা সামান্য অর্থের লোভে জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই, মাদকদ্রব্য বিক্রির মতো অপরাধে। কিছু কিছু কিশোরী জড়িয়ে পড়ছে দেহ ব্যবসার সাথে। দেশের বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য টাকার বিনিময়ে বোমা তৈরি এবং বিস্ফোরণ ঘটানো, রিকশা-গাড়ি ভাংচুর, আগুন দেয়া ইত্যাদি অপরাধমূলক কাজগুলো শিশুদের দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে অত্যন্ত জঘন্যভাবে। এসব অপরাধের কারণে শিশু-কিশোররা গ্রেফতার হচ্ছে অথচ প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় মদদদাতারা রয়ে যাচ্ছে অন্তরালে। গ্রেফতারকৃত শিশুদের আশ্রয়স্থল হচ্ছে সনাতন জেলখানা, যেখানে রয়েছে অনেক দাগি অপরাধী।
বাংলাদেশে প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ। অনেক সময় তা শেষ হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। শিশুদের যদি সাধারণ প্রক্রিয়ায় বিচার করা হয় তবে এই দীর্ঘ সময়টুকু তাদের কাটাতে হয় জেলের সেই বয়স্ক দাগি অপরাধীদের সাথে। বিচার প্রক্রিয়া শেষে একটি শিশু যখন মুক্তি পায় তখন দেখা যায় সমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা নেই বা দাগি বয়স্ক অপরাধীদের সংস্পর্শে এসে তারা নানারকম প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হয়, বয়স্কদের কাছ থেকে অপরাধ জগৎ সম্পর্কে ধারণা লাভ করে এবং ঐ জগতের প্রতি প্রলুব্ধ হয়। এতে শিশুটির মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তীকালে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সমাজে গ্রহণযোগ্যতা না পেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিশুটি পুনরায় অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। এভাবে একটি শিশু দেখা যাবে কখনোই অপরাধ জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।
১৮৬০ সালের ইন্ডিয়ান পেনাল কোড বাংলাদেশে যা ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি নামে পরিচিত, এই বিধি অনুযায়ী ৯ বছরের কম বয়সের শিশু সর্বাবস্থায় নিরপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং ৭ বছরের ঊর্ধ্বে ও ১২ বছরের নিচের শিশু, যার বুদ্ধির পরিপক্বতা হয় সেও নিরপরাধ বিবেচিত হবে। ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রণীত হয় জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ। বিশ্বের প্রথম যে ২২টি দেশ এ সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
বাংলাদেশে শিশু আইন ১৯৭৪ জেনেভা ঘোষণা-১৯২৪ এর ওপর ভিত্তি করেই প্রণীত হয়েছে। একমাত্র এই আইনই পারে শিশুদের জন্য প্রণীত আন্তর্জাতিক আইন শিশু অধিকার সনদকে কার্যকর করতে। শিশু আইন ১৯৭৪ এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, একটি মাত্র অপরাধের কারণে শিশুটি যেন চিরদিনের জন্য অপরাধী হিসেবে গণ্য না হয়। এর লক্ষ্য হলো গ্রেফতার থেকে বিচার পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে শিশুকে বয়স্ক অপরাধীর কাছ থেকে পৃথক রাখা। এই আইনকে কার্যকরভাবে প্রয়োগের জন্য ‘শিশু বিধিমালা-১৯৭৬’ প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীকালে ১৯৯৪ সালে গৃহীত হয় ‘জাতীয় শিশুনীতি’। শিশুদের রক্ষার জন্য সরকার ১৯৭৮ সালে প্রথম টঙ্গীতে এবং পরবর্তীকালে ১৯৯৬ সালে যশোরে দেশের দ্বিতীয় কিশোর সংশোধনী কেন্দ্র তথা কিশোর আদালত প্রতিষ্ঠা করে।
উপরোক্ত সব পদক্ষেপ শিশুদের, বিশেষ করে কিশোর অপরাধীদের কল্যাণে গৃহীত হয়েছে। যা বাস্তবায়নে আদালতের বিচারক থেকে শুরু করে থানার পুলিশ, প্রবেশন অফিসার এমনকি সাধারণ জনগণের দায়িত্ব রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এ আইনের যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না।
অপরাধে জড়িয়ে পড়া শিশুদের যদি শিশু আইনের ৪৮ ধারা অনুযায়ী থানা থেকেই জামিন দেয়া হয়, তাদের জন্য যদি আলাদা হাজত ব্যবস্থা রাখা যায়, সঠিক বয়স নির্ণয়পূর্বক আলাদা চার্জশিটের মাধ্যমে যদি কিশোর আদালতে বিচার করা যায়, প্রবেশন কার্যক্রম যদি আরো জোরদার করা যায় সর্বোপরি সংশ্লিষ্ট সবার সচেতনতা যদি বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে অপরাধী মানসিকতা তৈরির আগেই শিশুদের সুরক্ষা দেয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি। য়
মাহবুব এলাহী
সহকারী সমন্বয়কারী, শিশু সুরক্ষা: সামাজিক ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় নীতি
কোডেক, চট্টগ্রাম
রহিমের একদিনের স্বপ্ন
স্বপ্নবদ্ধ জীবনযাপনে কল্পকথার ভিড়। স্বপ্ন
আর বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। আমার কাছে যা স্বপ্ন অনেকের কাছেই সেই স্বপ্নটা দেখাই হয়তো স্বপ্নের মতো। অনেক স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিলাম বাংলাদেশ টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠান ‘স্বপ্নপূরণের গল্প’। এই অনুষ্ঠানের মূল বিষয়টাই ছিল খেটে খাওয়া ছিন্নমূল মানুষদের একদিনের স্বপ্নপূরণ। আমরা যাদের স্বপ্নপূরণ করবো বলে ঠিক করেছিলাম তাদের তালিকায় প্রথমেই জায়গা করে নিয়েছিল শিশুরা। জীবনের রঙিন দিনগুলোতে অর্থাৎ শৈশবে যখন হেসেখেলে দিন কাটানোর কথা সেই সময়টাতে এসব ছিন্নমূল শিশুদের পথে নামতে হয়েছে জীবন এবং জীবিকার প্রয়োজনে। যে সময়টাতে বই-খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা সেই সময়টাতে বেঁচে থাকার জন্য হাতে তুলে নিতে হয়েছে অন্যের বাজারের বোঝা। বাবা-মায়ের দেয়া নাম বদলে ওদের সবার সাধারণ নাম হয়েছে মিন্তি। অনুষ্ঠান ধারণের জন্য গিয়েছিলাম কারওয়ান বাজারে। সেখানেই কথা হয় একজন মিন্তি ওরফে আব্দুর রহিমের সাথে। আব্দুর রহিমের বয়স ১০-১২ বছরের মধ্যে। দ্বিতীয় শ্রেণী অবধি পড়েছে। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে স্কুল ছেড়ে বাবার সাথেই মিন্তির কাজ নিয়েছে। রহিমের সাথে কথা বলতে চাইলে বললো, ‘আফা একটুস দাঁড়ান, সাবের বাজারডা গাড়িতে তুইলা দিয়া আহি।’ আমরা অপেক্ষা করলাম, রহিম বাজার গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আমাদের সাথে কথা বলতে এলো। প্রশ্ন করে জানতে পারলাম, ৮ মাস ধরে এখানে মিন্তিগিরি করছে। দিনে আয় হয় ৮০-১২০ টাকা। এই টাকা তুলে দেয় মায়ের হাতে। বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যখন স্কুলে যাওয়ার কথা সেই সময়টাতে অন্যের বাজারের ব্যাগ টেনে পরিবারের বোঝা কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে রহিমকে।
রহিমকে বললাম, আমরা ওর আজকের দিনের স্বপ্নপূরণ করতে চাই। শুনে প্রথমে খুবই অবাক হলো। তারপর বললো, ‘আফা সাবেরা যেমুন ঝুড়ি ভইরা বাজার নিয়া বাড়িত যায়। আমিও ঐরম ঝুড়ি ভইরা বাজার নিয়া বাড়িত যাইতে চাই।’ মানুষের স্বপ্ন কতটা ছোট- কমের মধ্যে থাকতে পারে, সেটা রহিমের সাথে কথা না বললে হয়তো জানাই হতো না। সামনেই তরকারির দোকান ছিল, ও দৌড়ে তরকারির দোকানে ঢুকে পড়লো। বললো, ‘আফা আমি আলু, টমেটো, পিঁয়াজ, করলা, শসা, লাউ, কপি সব নিতে চাই, যেন আমার ঝুড়ি ভইরা যায়।’ সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমরা বেশি করে কিনে দিতে চাইলেও ও কিছুতেই এক কেজির বেশি নিতে চাইলো না। হয়তো স্বপ্নকে অতিক্রম করার লোভ নেই রহিমের মধ্যে। কিন্তু আমাদের বিস্ময়ের অবধি রইলো না। রহিম যদি আমাদের কাছে মাছ-মাংস, ফল কিনতে চাইতো তাহলে আমরা খুশি হয়েই দিতাম। কারণ আমাদের পরিকল্পনাও তাই ছিল। যাই হোক ঝুড়িভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই বললো, ‘আফা আইজকা আর কাজ করতাম না, বাড়িত যায়া মারে এইগুলা দেইগা, মা খুব খুশি হইবো।’
রহিমের স্বপ্নের কথা যখন জানতে চেয়েছিলাম তখন রহিমেরই বন্ধু আরেক মিন্তি যার নাম মোকলেস, সেও এসেছিল তার স্বপ্নপূরণের আশায়। আমরা তার স্বপ্ন জানতে চেয়েছিলাম। সে বললো, ‘আপা এইখানে বাজারের ঝাকা মাথায় কইরা যখন নিয়া যাই, তহন দেহি স্যারেরা কত আপেল কমলা আঙুর কিনা নেয়। ঐগুলান আমারও খাইতে ইচ্ছা করে।’ আমরা চেষ্টা করেছিলাম ওর ছোট্ট ইচ্ছা বা স্বপ্নপূরণ করতে। আমরা মোকলেসকে ফলের দোকানের সামনে নিয়ে যেতেই ও একটা আপেল ধরে বললো, ‘আফা আমি এইডা খাই?’ দোকানদার কিছু বলার আগেই আমরা তাকে আশ্বস্ত করলাম এবং ও যা চায় দিতে বললাম। মজার বিষয় হচ্ছে, আপেল কমলা আঙুরের বাইরে ও আর কিছুই নিতে চায়নি।
রহিম-মোকলেসের আনন্দমাখা মুখ দেখে খুশি হয়ে আমরাও যার যার গন্তব্যে রওনা হলাম। এই অনুষ্ঠানটি করার কারণ ছিল, আমাদের মধ্যে অনেকেরই সামর্থ আছে এই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ছোট ছোট ইচ্ছে পূরণ করার। অনুষ্ঠান দেখে কেউ যদি অনুপ্রাণিত হয়ে ছিন্নমূল শিশুদের অন্তত একদিনের স্বপ্নপূরণের চেষ্টা করেন সেখানেই আমাদের সার্থকতা।
সোনিয়া ইসলাম স্নিগ্ধা
উপস্থাপক, বাংলাদেশ টেলিভিশন
মানুষ মামুন
কম্পিউটারের হার্ড ড্রাইভ থেকে কত সহজে চাইলে সবকিছু মুছে ফেলা যায় তেমনি যদি কষ্ট দেয়া ঘটনাগুলো মুছে ফেলা যেতো, স্বস্তি হতো। তবে তা যায় না, যাবে না। পিলখানা বর্বরতায় অনেক অমূল্যপ্রাণ ঝরে পড়েছে। শুধু ক্ষোভে ফেটে পড়া কতিপয় মানুষের জিঘাংসার বলি এরা হয়েছেন তা নয়। বর্তমান বিশ্বময় নানা উছিলায় যে বীভৎসতার উৎকট উপস্থিতি আজ তাই কি সহজ করেনি মানুষের এই দানবিক আচরণ?
ঢাকা থেকে ফোনে ব্যথিত ও ভীত গলায় ভাইজি খবর জানালো, ‘মামুন কাক্কু আর নাই’। অনুজের বন্ধু ছিল মামুন। দেখেছি মাঝেমধ্যে। মামুনের বিয়ের কথাবার্তায় জড়িয়ে গিয়েছিলাম আপনজনের মতো। আজ সেনা কর্মকর্তা মামুন নয় বন্ধুরা মানুষ মামুনের কথা ভুলতে পারছে না।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে মামুনের বন্ধুরা রাজপথে প্রাণ তুচ্ছ করে ছুটছে, ছুটছে। পুলিশও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ওদের। আমেরিকা থেকে অঞ্জন বলছে, ‘পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে মামুন সরকারি ভবনে (নাম উহ্য রাখলাম) কতবার যে লুকিয়ে রেখে গ্রেফতার ও পুলিশি অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছে আমাকে’
স্বৈরাচারটি ছিলেন মামুনের মামু।
মেলবোর্ন থেকে অতোশ লিখেছে-Mamun helped me appreciate ‘Khalil Gibran’ ...He was Ershad’s nephew, but had a “so very different psyche”, and this is from me knowing him when Ershad was at his peak! You couldn’t but love him for what he was!
অঞ্জন লিখেছে-I am not the best religious person in the world. In a moment like this, having an Almighty God to lean on is the best you can have. I am quoting a message from a friend I received yesterday, “This verse from the Quran has been in my mind: on that day no soul shall be wronged; and you shall be rewarded for only what you did.” My friend Mamun was not corrupt. My friend never harmed anyone beyond the call of duty.
মামুনের বন্ধুরা বিচার চায়, তবে জিজ্ঞাসাবাদ ও স্বীকারোক্তি আদায়ে গুয়ানতানামোয় চালানো বুশীয় কায়দায় বর্বরতা প্রয়োগের ঘোর বিরোধী তারা। সকল বিবেকবান মানুষ আজ ন্যায্যবিচার চায়, বিচার শেষে ঝুলানো হোক ফাঁসিতে, মরুক পচে জেলেতে, তার আগে নিষ্ঠুর আচরণ কিছুতেই নয়।
দিলরুবা শাহানা
মেলবোর্ন |
|
|
|