প্রচ্ছদ-কাহিনী
৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গে
“আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে জরুরি এবং গ্রহণযোগ্যতাটা থাকলে এটা সাসটেইন করবে।”
আহমেদ জিয়াউদ্দিন
নানা ঘাত-প্রতিঘাত সত্ত্বেও বর্তমানে ৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রসঙ্গটি আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে আছে। এ ব্যাপারে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণের কথাও শোনা যাচ্ছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট-১৯৭৩-এর অধীনে বিচার এবং জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা গ্রহণ ইত্যাদি। এসব বিষয় বিস্তারিতভাবে জানার জন্য ২৩ মার্চ ২০০৯, আইসিসি (ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট)-এর জন্ম লগ্ন থেকে যুক্ত, ইনডিপেনডেন্ট কনসালটেন্ড আহমেদ জিয়াউদ্দিনের একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। আসক-এর পক্ষ থেকে এতে অংশগ্রহণ করেন আতিয়া নাজনীন, তাপস বন্ধু দাস, কামরুন্নেসা নাজলী ও শাহীন আখতার।
প্রশ্ন: প্রথমে আমরা জানতে চাচ্ছি আপনি কীভাবে আইসিসির সঙ্গে যুক্ত হলেন?
উত্তর: ১৯৭১ আমার মূল চিন্তা, স্টাডি এবং রিসার্চের বিষয়বস্তু ছিল। ’৭১-এর অভিজ্ঞতাই আসলে আন্তর্জাতিক বিচার এবং জাস্টিস এরিয়াতে নিয়ে আসে। আমি এখন মূলত এশিয়াতে আইসিসির পক্ষে কাজ করি, একজন ইনডিপেনডেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে। বিভিন্ন দেশে যাচ্ছি, সেসব দেশের আইন দেখছি, আইসিসির আইন তাদের সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ, কী কী জায়গায় পরিবর্তন করা দরকার, সেসব তৈরি করার ক্ষেত্রে কাজ করি এবং অ্যাডভাইস করি সরকারকে, টেকনিক্যাল অ্যাডভাইস এবং অ্যাডভোকেসি এরিয়াতে কাজ করি। আইসিসি প্রতিষ্ঠার আলোচনা শুরু হওয়ার সময় থেকেই ছিলাম।
প্র: ইদানীং আইসিসি ছাড়াও যে আরো কয়েকটা ট্রাইব্যুনাল হয়েছে- এ ব্যাপারে আমাদের একটু বলবেন-
উ: পৃথিবীতে এখন কয়েক ধরনের প্রক্রিয়া আছে। একটা হচ্ছে আইসিসি, যেটা একটা স্থায়ী আদালত এবং স্থায়ী প্রক্রিয়া, যেটা হেগে অবস্থিত এবং সেটা এখন মোটামুটিভাবে ৪টা বড় সিচুয়েশন বা কেস নিয়ে কাজ করছে।
আরেক ধরনের ট্রাইব্যুনাল আছে যেটা অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল, যেমন- যুগোশ্লাভিয়াকে নিয়ে, যাকে আইসিটি-ওয়াই বলা হয়। আরেকটা হচ্ছে রুয়ান্ডাকে নিয়ে আইসিটি-আর। এসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদ জাতিসংঘ সনদের সপ্তম অধ্যায়ের অধীনে তাদের দায়িত্ব পালনের জন্য এই ট্রাইব্যুনালগুলোকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই ট্রাইব্যুনালগুলোর এখতিয়ার নির্দিষ্ট সময় এবং ঘটনাকেন্দ্রিক। যেমন আইসিটি-ওয়াই শুধু যুগোশ্লাভিয়াকে নিয়ে এবং ১৯৯৩ সালের আগে অথবা পরের বিষয় এখানে বিবেচ্য নয়। শুধু ১৯৯৩ সালের ঘটনাকে ভিত্তি করে একটা আদালত গঠন করা হয়েছে। রুয়ান্ডাতেও একই কথা। যেখানে আইসিটিআর শুধু ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডাকে নিয়ে।
আইসিটিআর এবং আইসিটি-ওয়াই নুরেমবার্গ ট্রায়ালের পর প্রথম চালু হওয়া অ্যাডহক পদ্ধতি। কিন্তু তারপর পৃথিবীতে আরও অনেক ঘটনা ঘটেছে, যেজন্য একটা স্থায়ী আদালত করা হয়েছে। তবে ২০০২ সালের আগের ঘটনা আইসিসির এখতিয়ারে আসবে না।
আবার ১৯৭৫-৭৬ সালে কম্বোডিয়াতে যখন জেনোসাইড, ক্রাইম এগেনেস্ট হিউমেনিটি এবং certain extent-এ ওয়ার ক্রাইমস্ হয়েছে, তার বিচারের জন্য একটা মিশ্র প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। যেখানে যৌথভাবে ইউএন এবং কম্বোডিয়ান সরকার জড়িত আছে। আন্তর্জাতিক বিচারকেরাও আছেন আবার কম্বোডিয়ান বিচারকেরাও আছেন।
আরেকটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেমন- সিয়েরালিয়নে যে ট্রাইব্যুনালটা চলছে, সেটা সিয়েরালিয়নে না হয়ে এখন হেগে এসেছে। কারণ সিয়েরালিয়ন নিরাপদ নয়। ওটাকে সরিয়ে আনা হয়েছে আইসিসিতে। সেটাও এক ধরনের মিশ্র ট্রাইব্যুনাল। তার মানে এক্ষেত্রে তিন ধরনের পদ্ধতি আছে-
১. স্থায়ী পদ্ধতি
২. অ্যাডহক পদ্ধতি
৩. মিশ্র পদ্ধতি
প্র: এবার ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে আসি। তা কি ’৭৩-এর ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্টে করা সম্ভব?
উ: ’৭৩-এর আইন দিয়ে আমরা সামগ্রিকভাবে ’৭১-এ যেসব অপরাধ ঘটেছে সেসব অপরাধের পূর্ণাঙ্গ বিচার করতে পারবো কিনা- সেটা দেখতে হবে। এটা নিয়ে কনসেনসের প্রয়োজন আছে, জনগণের অংশগ্রহণেরও দরকার আছে। ’৭৩-এর আগে ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি আরেকটি আইন করা হয়েছিল যেটাকে আমরা দালাল আইন বলি। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন আমরা একই অপরাধের জন্য দুটা আইন করলাম? এই প্রশ্নের উত্তর আমি এখনও পাইনি।
প্র: এখনকার যে দাবি তাহলো দেশীয় দালালদের বিচার করা। অনেকে আবার বলছে যে, মূল অপরাধী তো পাকিস্তানিরা। আপনি এটা কীভাবে দেখেন-
উ: এভাবে চিন্তা করা একদমই ভুল যে- মূল এবং সহযোগী। আইনে মূল এবং সহযোগীর মধ্যে কোনো ভিন্নতা নেই। যেক্ষেত্রে ভিন্নতা হতে পারে সেটা হচ্ছে- যখন শাস্তির প্রশ্ন আসবে তখন সর্বোচ্চ দায় যার আছে, তার তুলনায় কম দায় যার, তার ক্ষেত্রে আদালত বিশেষ বিবেচনা করতে পারে।
কিন্তু এটার জন্য ভিন্ন আইনের প্রয়োজন নেই। তবে স্বাভাবিকভাবেই ’৭১-এর বিচার প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ হবে না, যদি যারা দায়ী, যে দেশের নাগরিকই হোক না কেন, তাদের যদি এই জবাবদিহিতার ভেতরে না আনা যায়- এই কথাটা কিন্তু মনে রাখতে হবে। অর্থাৎ আমরা যেন শুধু একটা ছোট্ট গোষ্ঠী বা কিছু ব্যক্তিবর্গের বিচারের কথা না ভাবি।
প্র: এক্ষেত্রে ফেয়ার ট্রায়ালের ব্যাপারে আপনার কী সুপারিশ- বাংলাদেশ এ ব্যাপারে কী করতে পারে?
উ: ’৭৩-এর আইনে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়ার কথা বলা আছে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, এটা ১৯৭৩ সালের আইন। ’৭৩ সালের আগে একমাত্র নুরেমবার্গ ট্রায়াল ছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচারের আর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না এবং আমাদের ’৭৩-এর আইনের বৃহদাংশ নুরেমবার্গ ট্রায়ালের নীতিগুলো থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে।
যেহেতু আমরা সময়ের কাজ সময়ে করলাম না, তাই এখন এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে আমাদের সামনে। ’৭১-এর বিচার যদি ’৭৩-এ করতাম তাহলে কিন্তু এটা আমাদের জন্য অনেক সহজ হতো। ’৭৩-এর পর থেকে ২০০৯ পর্যন্ত পৃথিবীতে বিচারের একাধিক পদ্ধতি চালু হয়ে গেছে। সেখান থেকে অনেক jurisprudence বেরিয়ে এসেছে, মানুষের চিন্তাভাবনার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। অপরাধের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডটা মোটামুটি একই আছে। তবে ওই সময় যেটাকে ফেয়ার ট্রায়াল বলা হতো, এখন কিন্তু সেটা নিয়ে চিন্তার ব্যাপার আছে। কারণ এখন আইসিসি এসে গেছে, সেখানে সুস্পষ্টভাবে একটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড আছে। সেটারও ১০ বছর হয়ে গেছে প্রায়। আজকের দুনিয়াতে যখন এই বিচারটা হবে তখন কিন্তু সবাই এই মানদণ্ডে বিষয়টা দেখবে।
প্র: তার মানে কি আপনি বলতে চান এখন ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচার করাটা জটিল?
উ: যত বেশি পুরনো হবে তত বেশি সাক্ষ্য-প্রমাণ যোগাড় করে একটা প্রমাণসাপেক্ষ মামলা করা তো চ্যালেঞ্জ হবেই। কিন্তু আমি যেটা বলতে চাচ্ছি, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ফেয়ার ট্রায়ালের স্ট্যান্ডার্ড যেটা, আইসিসি তার মধ্যে অন্যতম। এ মাপকাঠিতে ’৭৩-এর অ্যাক্টকে যদি মাপা হয়, তাহলে কিন্তু অনেক প্রশ্ন উঠবে।
প্র: কীরকম প্রশ্ন?
উ: প্রথম বিষয়টা হলো ট্রাইব্যুনালের স্বাধীনতা অর্থাৎ ’৭৩-এর আইনের অধীনে যে ট্রাইব্যুনালটা হবে, তা স্বাধীন হবে কিনা? ওই আইনে কোথাও বলা নেই যে, ট্রাইব্যুনালটা স্বাধীন হবে। এখন যেটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, তা হচ্ছে যে কোনো বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষকে স্বাধীন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ট্রাইব্যুনালের বিচারক জেনারেল কোর্ট মার্শালের বিচারকও হতে পারে এবং উচ্চ আদালতের বিচারকেরা সদস্য হতে পারবেন। যদি কোনো ট্রায়ালের ভেতরে একজন সামরিক অফিসার থাকেন আর একজন উচ্চ আদালতের বিচারক থাকেন, তখন সেটা নিরপেক্ষ এবং স্বাধীন বলে গণ্য হবে কি না সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তখন এটা চিন্তা করা হয়েছিল কারণ ’৭৩-এর আইন মূলত পাকিস্তানি সেনাদের বিচারের জন্যই করা হয়েছিল। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই একজন মেজর জেনারেল থাকতে পারে। তখন পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল, পৃথিবী ভিন্ন ছিল। বাংলাদেশ একটা ভিন্ন প্রেক্ষিতে ছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন কিন্তু বলতে পারে মেজর জেনারেল সাহেবরা বিচারক হলে, সেখানে তো আর ফেয়ার ট্রায়াল থাকলো না। এই জিনিসগুলো কিন্তু সরকারকে মনে রাখতে হবে। বিচার প্রক্রিয়াটা যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডটাকে পূরণ করে।
পদ্ধতিগত দিক থেকেও সমস্যা আছে। সাক্ষীদের ক্ষেত্রে বলা আছে, প্রশ্ন করলে সাক্ষীদের উত্তর দিতেই হবে- অর্থাৎ ট্রাইব্যুনাল প্রশ্ন করলে ‘নো’ বলা যাবে না; কিন্তু আমি উত্তর নাও দিতে পারি। এটাতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করে না। আরেকটা ব্যাপার, জানা ঘটনার ক্ষেত্রে আদালত ‘judicial notice’ নেবে অর্র্থাৎ ধরে নেবে যে এটা সত্যি। এটা ওই প্রেক্ষিতে হয়তো-বা চালানো যেত; কিন্তু আজকের প্রেক্ষিতে যদি বলা হয় আমরা সবাই জানি অমুক দোষী, কাজেই দোষী- তাকে ফাঁসি দেয়া হোক। এটা কিন্তু এখন গ্রহণযোগ্য হবে না।
প্র: অনেকেই বলছেন, ’৭৩-এ যে আইনটা আছে, এর কোনো সংশোধনীর দরকার নেই- এই আইনেই বিচার সম্ভব?
উ: এটা আমরা বুঝতে পারছি যে কেন তারা করতে চাচ্ছে না। তারা মনে করছে যে, তাহলে একটু বেশি সময় লেগে যাবে। আমাদের বাংলাদেশের যে অভিজ্ঞতা, সেটা হচ্ছে বিচারের বিষয়টা ঝুলে যেতে পারে। আওয়ামী লীগের পিরিয়ডে যদি শেষ না হয়, তাহলে সন্দেহ আছে এটা আর শেষ হবে কিনা। প্রথম ১-২ বছরে না হলে শেষের দিকে আর হয়তো হবে না। কারণ তখন অনেক রাজনৈতিক বিবেচনা চলে আসবে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এবং পৃথিবীর যে কোনো দেশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা যদি বিচারের ভেতরে চলে আসে তাহলে কিন্তু বিচারও হয় না, রাজনৈতিক বিবেচনাও হয় না। ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রক্রিয়া যতটুকু রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে আলাদা করতে পারবো, আমরা কিন্তু তত বেশি সফল হবো। দ্বিতীয়ত, বিচারের ফলাফলটাকে সাসটেইন করতে হবে এবং এর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে, এটাকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।
প্র: আইনটা পরিবর্তন করা কি বেশি কঠিন হবে?
উ: এ ব্যাপারে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পরিবর্তন করতে গেলে বিশেষ কোনো কিছু করা লাগবে না। কারণ সংসদে তার যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব আছে। বুঝতে হবে, একাত্তরের বিচারটা আমরা কেন চাই। প্রথমত, ভিকটিমদের জন্য। একাত্তরের ভিকটিম কিন্তু আমরা সবাই। এক অর্থে আমরা সবাই ভিকটিমের উত্তরাধিকারী। দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার যে পরিবেশটা আছে, আমি মনে করি ’৭১ থেকেই আমাদের এই ‘culture of impunity’ বিরাজ করছে। ’৭১-কে ঠিকমতো এড্রেস করতে পারলে এই অবস্থায় আমরা না-ও আসতে পারতাম। তৃতীয়ত, আইনের শাসনকে নতুনভাবে শক্তিশালী করতে হবে। বিচারটা করতে গিয়ে আইনের ভিত্তিটা যেন শক্তিশালী হয়। আরেকটা ব্যাপার, আমরা ’৭১-এর বিচার করবো এবং ভবিষ্যতে জেনোসাইড বা এই ধরনের কোনো অপরাধের বিচারের পথও খোলা রাখব।
প্র: অপরাধের দায় যাদের সবচেয়ে বেশি ছিল তাদেরকে কি বিচার করা যায়, কম্বোডিয়াতে যেমন হয়েছে?
উ: যারা অপরাধ করেছে তারা সবাই কিন্তু আসলে দায়ী। স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন কারণে আমরা তো এখন ১০ লাখ মানুষকে বিচার করতে পারবো না বা এক লাখ মানুষকে বিচার করতে পারবো না। যেমন রাজাকার অর্ডিন্যান্সের ভেতরে যারা মেম্বার হয়েছে, ধরে নেয়া হচ্ছে এক লাখ রাজাকার ছিল। মনে রাখতে হবে, তখন বাংলাদেশে সাড়ে সাত কোটি মানুষ ছিল এবং এক কোটি ইন্ডিয়াতে চলে গিয়েছিল। এক লাখের তো আমরা বিচার করতে পারবো না।
বঙ্গবন্ধু কিন্তু বারবার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সবার বিচার আমরা করব। সবার বিচার কিন্তু করা সম্ভব নয়। সর্বোচ্চ অপরাধের দায় যাদের আছে, যারা কমান্ড এবং কন্ট্রোলে ছিল, তাদের টার্গেট করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিচার না করলেই অন্যদের ছেড়ে দেয়া হবে- এটা কিন্তু ঠিক না। বিচার ছাড়াও আরও অনেক প্রক্রিয়া পৃথিবীতে আছে। যেমন 'truth seeking’ একটা প্রক্রিয়া করা যেতে পারে। অপরাধীর কাছ থেকে তার অপরাধের স্বীকারোক্তি নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাকে কিন্তু ক্ষমা করা হচ্ছে না।
প্র: এবার পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গে আসি। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের ওপর রাষ্ট্রীয়ভাবে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ কতটুকু ভূমিকা রাখবে?
উ: বিচার প্রথমে করতে হবে আসলে যারা অপরাধ করেছে তাদের- এই হলো ব্যানার অর্থাৎ এই হলো premise। যেমন, যেসব বাংলাদেশি ব্রিটেনে আছে বা আমেরিকায় আছে, তারা আমেরিকান বা ব্রিটিশ নাগরিক। তারা যদি ’৭১-এ অপরাধ করে থাকে, তারাও কিন্তু ঐ একই আইনের ভেতরে আসবে। তাদের বর্তমান নাগরিকত্ব এক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করবে না। এটা করতে গেলে স্পষ্টতই আমেরিকান বা ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা লাগবে। একইভাবে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হলে পাকিস্তান সরকারও জানে বিষয়টা তাদের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি করবে, যদি আমরা কোনো পাকিস্তানি সৈন্য বা জেনারেলকে ধরে আনতে নাও পারি। কিন্তু পদ্ধতিটা যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের, বৈধ ও স্বচ্ছ হয়, তাহলে দুই-চারজন জেনারেলকে যে আমরা ধরতে পারবো না, তাও নয়।
প্র: সেক্ষেত্রে in absentia বিচার কি করা যায়?
উ: আসলে আন্তর্জাতিক আইনে in absentia বিচারের কোনো অবস্থানই নেই। অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থন করার যে অধিকারটা, তা হচ্ছে মৌলিক অধিকার।
প্র: আপনার এবারের বাংলাদেশ সফর কি আমাদের আগামী ট্রাইব্যুনাল উপলক্ষে?
উ: আসলে কী হচ্ছে, সরকার কী ভাবছে- সেটা আগে জানা দরকার। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমি এসেছি। যেহেতু ’৭১ হচ্ছে বাংলাদেশের পরিচয়, বাংলাদেশের শুরু, কাজেই ’৭১-এর বিচারটা যেন সঠিক হয়, যেন বিতর্কের সৃষ্টি না হয়, যেন গ্রহণযোগ্য হয়- এ ব্যাপারে আমি মনে করি, আমাদের জানার দায়িত্ব আছে। এবং আমরা যেন একসাথে এটা করি। এটা শুধু সরকারের না, এটা সবার দায়িত্ব। সরকার অবশ্যই বিচার শুরু করবে। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের একটা ভূমিকা আছে এবং এই ভূমিকাটা যেন আমরা সবাই পালন করি। সবাই যেন সহযোগিতা করি। সেটাই হচ্ছে একটা প্রধান উদ্দেশ্য আমার এখানে আসার। আমরা অনেক দিন থেকে বিচার দাবি করে আসছি। এখন সেই সময়টা এসে গেছে। কিন্তু বিচারটা আবার ঠিকঠাক না করতে পারলে ’৭১ প্রশ্নবিদ্ধ হবে। যেমন একজন ভুল লোককে হাজির করে দিলাম কোর্টের সামনে, অথবা একটা নিরপরাধ লোককে ধরে বসিয়ে দিলাম। এটাতে তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। তা ছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার আগে সরকারকে নিশ্চিত হতে হবে যে, সহযোগিতাটা পাওয়া যাবে। কারণ সহযোগিতা চাইলাম ইউএন বা অন্য কোনো সংস্থা সহযোগিতা দিল না, এটা কিন্তু ’৭১-কে এফেক্ট করবে সরাসরি।
প্র: তাহলে এই সরকার আসার পর যুদ্ধাপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে ইউএন এবং অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতার ব্যাপারগুলো যে সামনে চলে আসছে, এটাকে আপনি কোন জায়গা থেকে দেখেন?
উ: এখানে যেটা বলা দরকার সরকার ইউএনের সাথে কথা বলেছে কিন্তু আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে এরকম কোনো তথ্য আমাদের হাতে নেই। সরকার যে কথা বলেছে, এটা তারা সঠিক কাজই করেছে, কথা তারা সবার সাথেই বলতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে বিচারটা আমরা ৩৭ বছর পরে করছি। আমাদের একটা আইনি ভিত্তি আছে। তবে অনেকের প্রশ্ন, শুধু ’৭৩ সালের আইন যথেষ্ট হবে কিনা। আজকের পরিস্থিতিতে, মানে অপরাধের দিক থেকে যথেষ্টও যদি হয়, প্রক্রিয়ার দিক থেকে যথেষ্ট হবে কিনা? কারণ অপরাধগুলো অবশ্য ওখানে বলা আছে এবং এটা নিয়ে কোনো বড় বিতর্কও নেই। অপরাধের উপাদানগুলোর ভেতরে হয়তো আমরা কিছু যোগ করতে পারি। কিন্তু প্রক্রিয়া নিয়ে নিশ্চিতভাবেই প্রশ্ন আছে।
আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা কিন্তু জরুরি আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে আর আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে এবং গ্রহণযোগ্যতাটা থাকলে হবে কি। এটা সাসটেইন করবে। অর্থাৎ এর পরবর্তী যদি কোনো সরকার আসেও, পারহেপস যদি ইন্টারন্যাশনাল কোনো ইনভলবমেন্ট থাকে তাহলে এটার সাসটেনেবিলিটি বাড়তে পারে- এটা কিন্তু অনেকগুলো ইতিবাচক দিক আছে। নেতিবাচক দিক হচ্ছে এটা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
কিন্তু এটা যে ইউএন কিনা- এ নিয়ে আমি খুব পরিষ্কার না। কিন্তু আমি মনে করি না যে, এটা কেবল ইউএন। আমি মনে করি এই সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয়ভাবেও সরকার নিতে পারে অন্য রাষ্ট্র থেকে। যেমন- তদন্ত ক্ষেত্রে যাদের বেশি অভিজ্ঞতা আছে, আমরা তাদেরও বলতে পারি যে, আপনি আমাকে তদন্তকারী পাঠান। তারা আমার তদন্তকারী টিমের সাথে কাজ করতে পারে। আমরা কিন্তু প্রসিকিউটরদের কাছ থেকে প্রসিকিউশনের ক্ষেত্রে হেল্প নিতে পারি। প্রথমত, আমাদের independent investigation agency নেই, দ্বিতীয়ত, independent prosecuting agencyও নেই। তাছাড়া আমাদের প্রসিকিউটরকে তো আন্তর্জাতিক আইন বুঝতে হবে, তারপর না প্রসিকিউট করবে- সেখানেও আবার কিছু হেল্পের দরকার হতে পারে। ডিফেন্স ল’ইয়ার নেই, কারণ আসামি যে তাকে ডিফেন্ড করবে সেখানেও দেখা যাবে সমস্যা আছে। International defense association আছে, বিভিন্ন রকম অর্গানাইজেশন আছে। তারা আমাদের হেল্প করতে পারবে।
একইভাবে বিচারকের ক্ষেত্রেও বলা যায়, আমাদের বিচারকদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন সম্পর্কে কতটুকু অভিজ্ঞতা আছে। সেখানেও কিন্তু আমাদের কিছু কিছু ওরিয়েন্টেশনের জন্য, ট্রেনিংয়ের জন্য, পারস্পেকটিভ দেয়ার জন্য হেল্পের দরকার হতে পারে। ইউএন দিতে পারে। দ্বিপাক্ষিকভাবে অন্য কোনো রাষ্ট্রও দিতে পারে, ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশনগুলো দিতে পারে। আমরা যদি আমাদের প্রয়োজনটা জানি, তাহলে বিভিন্নভাবে সহায়তা পেতে পারি।
প্র: কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান/সংস্থাও হয়তো হেল্প করতে পারে।
উ: এনজিও এবং সিভিল সোসাইটির ক্ষেত্রে যেটা হয়, আমরা যেহেতু সবাই স্বতন্ত্রভাবে চিন্তা করি, তখন কিন্তু চট করে একটা মতৈক্য হয় না। যেমন, আসক-এর মতো আইনি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাজের প্রথম ধাপ হবে- ’৭৩-এর আইনটাকে স্টাডি করা, ক্লিয়ারলি একটা পজিশন পেপার তৈরি করা যে আমরা মনে করি, এই আইনটা এই অবস্থায় আছে। আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড হচ্ছে এটা, এখানে আমরা মনে করি এই জিনিসগুলো করা উচিত। এটা কিন্তু বিশ্লেষণাত্মক একটা পর্যালোচনা হতে পারে। আইনটা ’৭৩-এ করা হয়েছে- এটা এখন আমি কীভাবে দেখব, এটা আজকের দিনের জন্য কতটুকু প্রযোজ্য? কিন্তু অপরাধটা যুদ্ধাপরাধ, প্রথাসিদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন এটাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করছে।
প্র: পাকিস্তানি জেনারেলদের বিচারের ক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তান সিমলা চুক্তি কোনো প্রভাব ফেলবে কি?
উ: অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো চুক্তি দিয়ে কাউকে অপরাধ থেকে দায়মুক্তি দেয়া যায় না। অপরাধ আর দায়মুক্তি একসাথে কখনও চলতে পারে না।
প্র: একটা কথা, সিমলা চুক্তিতে কিন্তু ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দির বিচারের কথা বলা হয়েছিল, বিচারটা পাকিস্তান করেনি।
উ: শুধু সেটা না, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সালে আইসিজেতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিস) মামলা করেছিল, যখন ১৯৫ জনকে বাংলাদেশ মোটামুটি আইডেন্টিফাই করলো সর্বোচ্চ অপরাধের দায়ের জন্য। অর্থাৎ যারা কমান্ডিং পজিশনে ছিলেন। এই শব্দটা তখন ব্যবহার করা হয়নি, কিন্তু কাছাকাছি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে এবং তারা সবাই ভারতের হেফাজতে ছিল তখন যুদ্ধবন্দি হিসেবে। আইসিজেতে মামলার পিটিশনে পাকিস্তান পরিষ্কার করে ’৭১-এর জেনোসাইডের দায়িত্বটা স্বীকার করে নেয়। এবং আইসিজিকে তারা অনুরোধ করে- ভারত যেন ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো থেকে বিরত থাকে।
বাংলাদেশ চাইছিল এই ১৯৫ জনের বিচার করতে। কিন্তু পাকিস্তান চেয়েছিল, তারা জেনোসাইড কনভেনশনের পার্টি, সুতরাং তার নাগরিকদের তারাই বিচার করবে ওই অপরাধের জন্য যা পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমানাতে সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ পাকিস্তান কিন্তু স্বীকার করে নেয় যে, তার ভূখণ্ডে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে) জেনোসাইড হয়েছে এবং এতে তার নাগরিকরা জড়িত ছিল। একই পিটিশনে পাকিস্তান বলে যে, তার নাগরিকরা কোনো যুদ্ধাপরাধ করেনি। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধও করেনি। সুতরাং আদালত যেন ভারতকে বিরত রাখে। ভারত কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই আইসিজে’র এখতিয়ার স্বীকার করেনি। ফলে ঐটা বেশি এগুতে পারেনি। তার মাঝখানে আবার সিমলা চুক্তি হয়ে গেল। তখন তো আর এই ইস্যুটা রইল না। এই কেসটা ঐতিহাসিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দলিল। পাকিস্তান জেনোসাইড কনভেনশনকে invoke করলো, জেনোসাইড কনভেনশনের ভিত্তিতে আইসিজেতে গেল, এডমিট করলো তাদের নাগরিকেরা জেনোসাইডের সাথে জড়িত ছিল, যদিও তারা বলছে যে, তারা যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সাথে জড়িত ছিল না। কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশে ’৭১-এর ওপর উল্লেখযোগ্য স্টাডিজ নেই এবং পাকিস্তানে তো নিশ্চিতভাবেই কিছু নেই- তাই এ যাবৎ অনেক কিছু উঠে আসেনি।
প্র: বিচারের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের এই স্বীকারোক্তি কাজে লাগবে?
উ: ডেফিনেটলি আমরা বলতে পারবো এবং প্রসিকিউটর ডেফেনিটলি বলবে যে, পাকিস্তান স্বীকার করেছে। এটা ঐতিহাসিক দলিল এবং ইউএন রেকর্ডেও আছে। এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে পাকিস্তানিরা এখন শুধু এডমিট করে না, তারা বাংলাদেশকে এখন ভিন্নরকম দৃষ্টিতে দেখে। পাকিস্তানি মানবাধিকার কর্মীদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ অনেক বেশি এগিয়ে আছে মানবাধিকার আন্দোলনে এবং মানবাধিকার পরিস্থিতিতে।
প্র: আমাদের এখানে ’৭১ নিয়ে যেসব ডকুমেন্টস আছে, বিচারের ক্ষেত্রে তা কি পর্যাপ্ত মনে হচ্ছে নাকি আরও কাজ করা দরকার?
উ: ’৭১ হচ্ছে ৯ মাসের একটা বিশাল ব্যাপার। ৯ মাসের নিশ্চয়ই লাখ লাখ দলিলপত্র, প্রমাণাদি আছে। কোথাও না কোথাও আছে অথবা নষ্ট হয়ে গেছে। কাজেই এই কাজটা তো অবশ্যই চলতে হবে। আজকেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নতুন ডকুমেন্ট বেরিয়ে আসে। আর ডকুমেন্টের তো কোনো শেষ নেই।
প্র: আইসিসির যেহেতু ২০০২-এর আগের অপরাধের ওপর কোনো এখতিয়ার নেই আবার বাংলাদেশও রোম সংবিধিতে অনুসমর্থন দেয় নি, সেক্ষেত্রে যুদ্ধাপরাধের বিচারে আইসিসি বাংলাদেশকে কীভাবে সাহায্য করতে পারে?
উ: টেকনিক্যাল সাপোর্ট হয়তোবা দিতে পারে। আইসিসির কোনো Jurisdiction নেই যেহেতু এটা ২০০২-এর আগের ঘটনা। কিন্তু আইসিসির statute যদি implement করা হয়, তাহলে আইসিসির বিভিন্ন এক্সপার্টরা আসবেন এবং তারা অ্যাডভাইস দেবেন- কীভাবে ওই আইনটাকে এ দেশে বাস্তবায়ন করা যায় এবং বাস্তবায়নের প্রেক্ষিতে বিচারের ব্যবস্থা করা যায়। যেমন আমাদের দেশে ১৯৭৩ সালের আইন যুদ্ধাপরাধের বিচারের একটা ভিত্তি তৈরি করেছে, যেখানে বড় বড় ৫-৬ ধরনের অপরাধের কথা বলা আছে। কিন্তু সমস্যা যেটা হচ্ছে, ১৯৭৩-এর আইন একটা বিশেষ ধরনের আইন, যা একটা প্রেক্ষিতে করা হয়েছে, এটা কিন্তু একটা সাধারণ আইন না।
প্র: ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয়ভাবে মামলা হচ্ছে- এক্ষেত্রে আপনার কী মতামত?
উ: এখানে দুটা ব্যাপার- যেহেতু যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, জেনোসাইড এদের সংজ্ঞা শুধু ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস্ অ্যাক্টে দেয়া আছে- পেনাল কোড বা অন্য কোনো দণ্ড ধারাতে এ ধরনের কোনো সংজ্ঞা নেই। কাজেই এ ধরনের অপরাধের বিচার একমাত্র ক্রাইমস্ অ্যাক্টে হবে। এর বাইরে কোনো সুযোগ নেই। আর এটা একমাত্র সরকারই করতে পারে। এটা একটা ব্যক্তি উদ্যোগ নিয়ে করা সম্ভব নয় কারণ এটা আইনে অনুমতি দেয়া নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার এ প্রক্রিয়া শুরু না করছে ততক্ষণ পর্যন্ত ভিকটিম মামলা করতেই পারে, এটা তাদের অধিকার। কিন্তু এগুলো যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং গণহত্যার বিরুদ্ধে অপরাধের মামলার আওতায় পড়বে না।
প্র: কিন্তু বিচ্ছিন্নভাবে মামলাগুলো কি যুদ্ধাপরাধের বিচারকে হালকা করে দিতে পারে?
উ: না, এটাকে আমি ঐভাবে দেখি না। একটা ব্যাপার হচ্ছে- যেহেতু ভিকটিমরা এতদিন ধরে কোনো পরিবেশই পায়নি যেখানে অভিযোগ করতে পারে। যেহেতু একটা পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, মানুষ বুঝতে পারে এখন আমি কষ্টের কথা, দুঃখের কথাগুলো বলতে পারি, আমি মনে করি, এটার পেছনে এই মোটিভেশনটা কাজ করেছে। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন এটা পাঁচ বছর আগে হলো না? কারণ হচ্ছে যে, তখন পরিবেশটাই ছিল না। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলে এই বিচ্ছিন্ন মামলাগুলোকে সরকার নিশ্চিতভাবে তখন বিবেচনায় নিয়ে আসতে পারে।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল
আতিয়া নাজনীন
যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি আজকের বিশ্বায়নের যুগে রাষ্ট্রীয় সীমানায় আবদ্ধ নেই। এই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের নানা প্রান্তে সংঘটিত হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার। এর কোনোটি হচ্ছে যেসব রাষ্ট্রসমূহে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে সেসব রাষ্ট্রের নিজস্ব বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আবার কোনোটি জাতিসংঘের সহায়তায়। এখানে অতিসমপ্রতি গঠিত এইরকম তিনটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রেক্ষিত এবং এদের কার্যক্রম সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করার একটি প্রয়াস নেয়া হল।
যুগোশ্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়
১ জানুয়ারি - ২০ জুন ১৯৯৯ সালে সাবেক যুগোশ্লাভিয়া ও সার্বিয়া সরকারের সামরিক বাহিনী দ্বারা কসোভো অঞ্চলে বসবাসরত আলবেনীয় জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত অপরাধগুলোর (হত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যৌন নির্যাতন, অমানবিক আচরণ, যুদ্ধ চলাকালীন নীতিগুলোর লঙ্ঘন) অভিযোগে অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে সমপ্রতি রায় প্রদান করেছে জাতিসংঘের সহায়তায় স্থাপিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ নেদারল্যান্ডের হেগে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এ যুগান্তকারী রায় প্রদান করে।
মামলা পর্যালোচনায় দেখা যায়,আশির দশকের পর আলবেনীয় অধ্যুষিত কসোভোতে রাজনৈতিক সঙ্কট শুরু হয়, পরে যা রূপ নেয় সেনা সংঘর্ষের। এ অবস্থা চলতে থাকে পুরো নব্বইর দশকজুড়ে। ১৯৯৮ সালের মাঝামাঝিতে এ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে যুগোশ্লাভিয়া ও সার্বিয়ার সেনাবাহিনী এবং কসোভো লিবারেশন আর্মি (কেএলএ)। আর এ ভয়াবহ সেনা সংঘর্ষের সময় যুগোশ্লাভিয় ও সার্বীয় বাহিনী কসোভোতে বসবাসরত বেসামরিক জনগণের জীবন ও সম্পদের প্রতি চালায় অবর্ণনীয় নির্যাতন। হাজার হাজার লোক হত্যা, নির্যাতনের শিকার হয়, ধর্ষণের শিকার হয় অনেক নারী, বহু লোক উৎখাত হয় বাসস্থান থেকে। একটা উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা আরো স্পষ্ট হয়ে যাবে- ১৯৯৯ সালের এপ্রিলের দিকে প্রায় ২৮৭ জন কসোভো আলবেনীয় নিখোঁজ হয়, পরে যাদের লাশের সন্ধান মেলে ‘বাটাজনিকা’ নামক শহরের একটি গণকবরে। প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দিতে এটি প্রমাণিত হয়, এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের মূল হোতা ছিল এই দুই বাহিনী। যাই হোক, ন্যাটো বাহিনীর হস্তক্ষেপের কারণে যদিও ১০ জুন ১৯৯৯ যুগোশ্লাভিয়া ও সার্বিয়ার সেনাবাহিনী কসোভো থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যুগোশ্লাভিয় ও সার্বীয় বাহিনীর লক্ষ্যবস্তুর ওপর ন্যাটো বাহিনীর বোমা নিক্ষেপের কারণে এই সময়ে প্রায় ৭,১৫,১৫৮ জন আলবেনীয় বাড়িঘর ছেড়ে আলবেনিয়া ও মেসিডোনিয়ায় পালাতে বাধ্য হয়।
আদালত পর্যাপ্ত প্রমাণসাপেক্ষে লক্ষ্য করে যে, সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি স্লোভোদান মেলোসোভিচ, যুগোশ্লাভিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী, যুগোশ্লাভিয়ার সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং দেশ দুটির আরও দু’জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কসোভো সঙ্কটের সময় যুগোশ্লাভিয়া ও সার্বীয় সেনাবাহিনীর মূল কর্তৃত্বে ছিল এবং আলবেনীয় জনগণের ওপর তাদের নির্যাতন সম্পর্কে অবগত ছিল। মূলত তারাই ছিল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নির্দেশদাতা। তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিশেষ আদালত সংবিধির অনুচ্ছেদ ৭(১) অনুযায়ী ব্যক্তিগত ভাবে এবং ৭(৩) অনুযায়ী উর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে রায় প্রদান করেন। উল্লেখ্য, অনুচ্ছেদ ৭(১) অনুযায়ী অপরাধে নিজে লিপ্ত হওয়া বা পরিকল্পনা, প্ররোচনা, নির্দেশদান বা অন্য কোনোভাবে সমর্থন বা সহযোগিতার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অপরাধের দায় বর্তায় আর অনুচ্ছেদ ৭(৩) অনুযায়ী ঊর্ধ্বতন কর্মকতা হিসেবে সংঘটিত অপরাধের দায় বর্তায়।
সিয়েরালিওনের বিশেষ আদালতের রায়
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, সিয়েরালিওনের বিশেষ আদালত এক দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধ চলাকালে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে ইসা হাসান সিসে, মরিস কেলন, অগাস্টিন গ্যাবো নামক তিন বিদ্রোহী নেতাকে ব্যক্তিগতভাবে ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেন। এদের বিরুদ্ধে হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অমানবিক কার্যক্রম, যৌন দাসত্ব, বলপূর্বক বিবাহ, শারীরিক নির্যাতনসহ আট ধরনের অভিযোগ আনা হয়। একইসাথে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ ছিল, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী দলের সদস্যদের হত্যার মাধ্যমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন করা।
ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে ‘রাফ’ নামক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর আক্রমণের ফলশ্রুতিতেই সিয়েরালিওনে শুরু হয় সেনা সংঘর্ষ। একপর্যায়ে ১৯৯৬ সালে তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দেশটির প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ শুরু করে এবং ২৫ মে ১৯৯৭ সিয়েরালিওন সামরিক বাহিনীর কতিপয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে সামরিক শাসন জারি করে। সামরিক সরকারে ‘রাফ’কেও আমন্ত্রণ জানানো হয়- একসাথে তারা গঠন করে আর্মড ফোর্সেস রিভ্যুলশনারি কাউন্সিল (এএফআরসি)। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতায় আধিপত্য বিস্তার এবং হীরার খনি সমৃদ্ধ এলাকাগুলো হস্তগত করা। যদিও তাদের ক্ষমতার মেয়াদ ছিল খুবই অল্প সময় অর্থাৎ ২৫ মে ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮-এর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত কিন্তু তারা উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে বেসামরিক জনগণের ওপর যে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়েছে তা এককথায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিটারিয়ান ল’) চরমতম লঙ্ঘন। উল্লেখ্য, ইউনিমগ (UNIMOG) কর্তৃক আর্মড ফোর্সেস রিভ্যুলশনারি কাউন্সিল (এএফআরসি) উৎখাত হওয়ার পরও ‘রাফ’ সদস্যরা তাদের নির্যাতনমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখে, যার জের চলতে থাকে ২০০০ সাল পর্যন্ত। উক্ত সময়ে সংঘটিত অপরাধগুলোর নেপথ্যে অংশগ্রহণকারী হিসেবে সুস্পষ্ট প্রমাণসাপেক্ষে বিশেষ আদালত ‘রাফ’ বাহিনীর ওই তিন বিদ্রোহী নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করে।
১ মে থেকে ৩০ নভেম্বর ১৯৯৮ বোম্বালি জেলায় এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর ১৯৯৮ কুইনাডুগু জেলায় উল্লিখিত অপরাধগুলো সংঘটনের প্রেক্ষিতে এবং জেনেভা কনভেনশনের অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের কারণে বিশেষ আদালত সংবিধির অনুচ্ছেদ ২ (ক), (গ), ৩ (ক), (ঘ), (ছ), ৪ (গ), ৬(১) এবং ৬ (৩) অনুযায়ী তাদের দোষী সাব্যস্ত করে। এখানে একটি ব্যাপার উল্লেখ্য, ১৯৯১-এ সেনা সংঘর্ষের পর থেকেই উল্লিখিত অপরাধগুলো সংঘটিত হলেও এখতিয়ারের অভাবে আদালত কেবল ৩০ নভেম্বর ১৯৯৬-এর পরে সংঘটিত হওয়া অপরাধগুলো আমলে আনতে সমর্থ হয়। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, মামলাকালীন সময়ে আদালত এই ব্যাপারটির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে যে, যদিও মামলাটিকে ‘রাফ’ মামলা হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে তথাপি এটিকে ‘রাফ’ নামক পুরো বিদ্রোহী বাহিনীটির বিরুদ্ধে না বলে বরং রাফ (RUF)-এর এই তিন নেতার বিরুদ্ধে মামলা বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত।
সুদানের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা
৪ মার্চ ২০০৯ গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ এনে আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর-আল-বশিরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এই প্রথম আইসিসি কো
নো রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করল।
ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুদানিজ লিবারেশন মুভমেন্ট (এসএলএমএ) এবং জাস্টিস অ্যান্ড ইক্যুয়ালিটি মুভমেন্ট (জেইএম) নামক দুটি সংস্থা শুরু থেকেই সম্পদ ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দাবিতে সুদান সরকারের বিরোধিতা করে আসছিল। এই বিদ্রোহী সংস্থা দুটিকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট ওমর-আল-বশির ব্যক্তিগতভাবে তার সামরিক ও মিলিশিয়া বাহিনীকে নির্দেশ দেন। যার ফলশ্রুতিতে বশির বাহিনীর ভয়াবহ রোষের মুখে পড়ে সুদানের পশ্চিমাঞ্চলীয় দারফুরে বসবাসরত তিনটি আদি জনগোষ্ঠী- ফুর, মাসালিত ও জাঘাওয়া। এর পেছনে তারা যে কারণ দাঁড় করায় তা হচ্ছে, এই তিন আদি জনগোষ্ঠীর সাথে বিদ্রোহী সংস্থা দুটির যোগাযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের ভাষ্যমতে, বশির বাহিনীর হামলায় সেসময় প্রায় ২৫ লাখ মানুষ হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, লুণ্ঠনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আর শত শত নারী শিকার হয় ধর্ষণের।
আন্তর্জাতিক আদালত এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, বশির এবং তার সামরিক ও মিলিশিয়া বাহিনী সংবিধির ৭(১)(ক), (খ), (ঘ), (ছ), (জ) এবং ৮(২) অনুচ্ছেদের অধীনে যথাক্রমে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধ সংঘটনকারী হিসেবে স্পষ্টভাবে জড়িত ছিল। আর এই কারণেই আদালত সংবিধির ২৫(৩) ধারা অনুযায়ী ওমর-আল-বশিরকে এসব অপরাধের নেপথ্য ইন্ধনদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি লইস মেরিনো ওকামপো সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের ৩০ জনের বেশি সাক্ষী রয়েছে। তারাই বলবেন, কীভাবে বশির সবকিছু ঠিকঠাক রেখেছেন ও নিয়ন্ত্রণ করেছেন।’ মেরিনো সুদানের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধসহ দশটি অভিযোগ আনতে চাচ্ছেন।
ওমর-আল-বশিরকে গ্রেফতারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ার কতটুকু?
ক্স দারফুর পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই ৩১ মার্চ ২০০৫ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫৯৩ নং রিজ্যুলিউশন গৃহীত হয় যেখানে স্পষ্টভাবে দারফুরে শান্তি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সদস্যদেশসমূহ তথা বিশ্ব সমাজের পক্ষ থেকে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস ব্যক্ত করা হয়। এদিক থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত অবশ্যই এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে।
* আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রস্তাব- নাতেই বলা আছে, গুরুতর অপরাধ এবং অপরাধ সংঘটনকারী, উভয়ই সমগ্র মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ- অবশ্যই এদেরকে শাস্তিবিহীন থাকতে দেয়া যাবে না।
* সবশেষে, ওমর-আল-বশিরের ব্যাপারে বলা যায়, রাষ্ট্রপ্রধান হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাছ থেকে কোনো ছাড় তিনি পাবেন না। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সংবিধির ২৭(১) এবং (২) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, সংবিধির বিধানগুলো সবার ওপর সমভাবে প্রযোজ্য হবে।
আদালত এই মত ব্যক্ত করেন যে, সুদান যদিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত সংবিধির স্বাক্ষরকারী দেশ নয়, তারপরও রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুদানের কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কারণ, ওমর-আল-বশির ও তার বাহিনীর কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রতি হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
সূত্র: প্রথম আলো ও www.icty.org, www.icc-cpi.net