তদন্ত
পুলিশ হেফাজতে এক ব্যক্তির ‘ক্রসফায়ারে মৃত্যু’নরসিংদীতে
জন অসিত দাস
২০ জানুয়ারি ২০০৯ তারিখে বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত খবরে পুলিশের সূত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘ডাকাতির প্রস্তুতিকালে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে’ ডাকাতদল পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করলে পুলিশও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এক পর্যায়ে আলাউদ্দিন নিহত হয়। পুলিশের বক্তব্যে আলাউদ্দিনকে ডাকাত সর্দার ও তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ১০টি মামলা থাকার কথাও বলা হয়। এ খবরের সূত্র ধরে আসক তদন্ত ইউনিটের পক্ষে একটি তদন্ত দল ঘটনাটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধানে গিয়ে এলাকাবাসী, নিহতের পরিবারের আত্মীয়স্বজন ও থানার কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে।
নিহতের পরিচয়
নিহত আলাউদ্দিনের বাড়ির কাছে বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ থানাধীন কালিদাসিয়া গ্রামের চৌরাস্তার মোড়ে ৪-৫টি দোকান রয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি, সোমবার দুপুরে সেখানে পৌঁছে দোকানদারদের কাছে ‘আলাউদ্দিন ডাকাত’ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। ১০-১২ জন স্থানীয় লোকের উপস্থিতিতে দোকানদার সবুজ (৩০), সত্তরোর্ধ্ব স্থানীয় মুরুব্বি মোঃ ইসাহাক হাওলাদার জানান- শামসুল হক হাওলাদারের ছেলে আলাউদ্দিন (৪৫) ডাকাত ছিল এটা সে মারা যাওয়ার পর পত্রিকা সূত্রে তারা জেনেছেন, যা মোটেই সত্য নয়। কেউ কখনো তাকে ডাকাতি বা সন্ত্রাসী কাজ করতে দেখেনি, শোনেনি। বিভিন্ন সময়ে ভারত থেকে মালামাল এনে ঢাকায় বিক্রি করা আলাউদ্দিনের প্রধান পেশা ছিল। ঘটনার দু’এক মাস আগে পৈতৃক চাষের জমি জোরজবরদস্তি ভোগদখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় এবং চাষকৃত জমির ফসল কেটে নিয়ে যাওয়ার সময়ে বাধা দেয়ার কারণে আত্মীয় মোল্লার ছেলেদের সাথে তার বিবাদ হয়। তাজেম মোল্লার দু’ছেলে আর্মিতে ও বিডিআরে কর্মরত আছে, এদের একজন সেদিন ঘটনাস্থলেও উপস্থিত ছিল। এ ঘটনায় মোল্লারা আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। এ ধরনের আরো একটি মামলা আছে। এ দুটি ছাড়া আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা আছে বলে তারা জানেন না। মৃত আলাউদ্দিনের পিতা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও অনুরূপ তথ্য পাওয়া যায়।
যেখান থেকে যেভাবে আলাউদ্দিন আটক ও নিহত হয়
আলাউদ্দিনের গ্রেফতার ও মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাইলে ইসাহাক ও সবুজ জানান, রোববার (১৮-১-০৯) বিকেলে এখানে ৫০-৬০ জনের উপস্থিতিতে (কালিদাসিয়া মোড়ে) আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টায় হঠাৎ করে দু’ তিনজন পেছন দিক থেকে আলাউদ্দিনের কোমর পেঁচিয়ে ধরে। এক পর্যায়ে আরো কয়েকজন পুলিশ সেখানে (আগে থেকেই এরা ছড়িয়ে ছিল) উপস্থিত হয় এবং নিজেদের ‘আইনের লোক, পুলিশ’ বলে পরিচয় দিয়ে প্রায় উলঙ্গ অবস্থায় আলাউদ্দিনকে নিয়ে যায়। আটকের স্থান কালীদাসিয়া মোড় বাকেরগঞ্জ থানায় হলেও আটককারীরা কোতোয়ালি থানার পুলিশ ছিল। পরে রাত আনুমানিক ১০-১১টায় তারা খবর পান- গ্রেফতারের পরে দিনারের মোড় থেকে বরিশাল কোতোয়ালি থানার দিকের রাস্তার বিপরীতে উত্তর-পূর্ব দিকের রাস্তায় আনুমানিক দু’কিলোমিটার দূরত্বে দুর্গাপুর ইউনিয়নের যাত্রাকাটা ব্রিজের নির্জন এলাকায় রাত ১০টার পরে পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় আলাউদ্দিন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। নিহত ব্যক্তির চোখের দিক থেকে গুলি লেগে মাথার পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যাওয়াসহ মৃতদেহে আরও তিন-চারটি গুলির ক্ষত ছিল। সেক্ষেত্রে ঘন গাছ-গাছালিপূর্ণ জঙ্গলের ভেতরে পলায়নপর এক ব্যক্তি কীভাবে মাথার সম্মুখভাগে গুলিবিদ্ধ হলো বা অতিরিক্ত তিন-চারটি গুলি কীভাবেই-বা তার শরীরে লাগল সে প্রশ্ন থেকে যায়।
গুলিবর্ষণ/কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়- দিনার মোড় থেকে সাহেবের হাটের দিকে প্রধান সড়কের যাত্রাকাটা ব্রিজের পাশে গাছ-গাছালিপূর্ণ জায়গায় কয়েকটি ঘর আছে, যা সন্ধ্যার সময়ে দেখা সম্ভব নয়। ব্রিজ (আনুমানিক ১০ গজের) পার হয়ে ওই বাড়িতে গেলে বাড়ির লোকজন জানান, গত রোববার (১৮-১-০৯) রাত আনুমানিক নয়টা-সাড়ে নয়টার দিকে দিনার মোড় থেকে ফেরার পথে কুন্ডবাড়ির রাস্তা পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছিল। আনুমানিক পৌনে দশটায় তিন-চারটি গুলির শব্দ তারা শুনতে পান। একটু পরে আরো কয়েকটি গুলির শব্দ বাড়ির বাগানে শুনতে পেয়ে বাড়ির মহিলা ও শিশুরা ভয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে থাকে। প্রায় সাথে সাথেই পুলিশের পোশাক পরা দু’জন তাদের ঘরের সামনে আসে এবং জানায়- ভয়ের কিছু নেই, তারা পুলিশের লোক। তারা এ বাড়ি থেকে জল চেয়ে খায় বলেও এ বাড়ির এক মহিলা জানান। পানি খাবার সময়ে পুলিশ জানায়, তারা ভাবতে পারেনি এখানে কোনো বাড়িঘর আছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বৃদ্ধ আলতাফ (৫০) জানান, গুলির একটু পরে ফারুক ও রাসেল নামে দু’যুবকসহ তিনি ব্রিজের কাছে এলে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়- পুলিশের ওপর গুলি করে কয়েকজন এ পথে পালিয়েছে। কিন্তু পুলিশ পলাতকদের বা অস্ত্রের সন্ধানে কোনো স্থানে বা বাড়িতে অনুসন্ধান বা অভিযান চালায়নি। তিনি আরো জানান- পুলিশের টর্চের আলোতে কাঁঠালগাছ তলায় মৃত অবস্থায় আলাউদ্দিনকে পড়ে থাকতে দেখা গেলে, পুলিশ তাদের মৃত ব্যক্তিটিকে ডাকাত বলে জানায়। পরে থানার ওসি এসে মৃতদেহ নিয়ে যায়। পুলিশ একটি কাগজে তাদের স্বাক্ষর নিয়েছে বলেও তারা জানান। তবে তাতে কী লেখা ছিল তা জানেন না।
পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের বক্তব্য
মৃত আলাউদ্দিনের বৃদ্ধ বাবা শামসুল হক হাওলাদার (৭৫) জানান- সম্ভবত জমি সংক্রান্ত এ বিরোধের কারণে পুলিশকে দিয়ে আলাউদ্দিনকে গ্রেফতার ও হত্যা করা হয়েছে। শামসুল হক হাওলাদারের মতে, মোল্লার ছেলেরা, যারা বিডিআর ও আর্মিতে কাজ করে, তারা আলাউদ্দিনকে পূর্বেও গ্রেফতার করিয়েছিল, দেখে নেয়ার হুমকিও দিয়েছিল। প্রশ্নোত্তরে হাওলাদার জানান- পুলিশ বাড়ির কাছ থেকে আলাউদ্দিনকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময়ে বা মেরে ফেলার পরেও পরিবারকে কোনো খবর দেয়নি। বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়ার পরে গত ১৯-১-০৯ সোমবার বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গ থেকে ময়নাতদন্তের পরে লাশ নিয়ে এসে বাড়িতেই সন্ধ্যায় দাফন করা হয়েছে। মৃত আলাউদ্দিনের স্ত্রী ও বোনসহ কয়েকজন জানান- আলাউদ্দিনের চোখের ভেতর দিয়ে গুলি ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। মাথার পেছনের খুলির কিছু অংশ ছিল না, বাঁ দিকে বুকে, হাতে ও কোমরের দু’পাশেও গুলির চিহ্ন ছিল।
আলাউদ্দিনের চাচা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আলী হাওলাদার বলেন, আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে এমন কোনো অপরাধ বা অভিযোগের কথা তারা জানেন না, যার কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যেতে পারে বা গুলি করে মারা হতে পারে। তিনি অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের সাথে বলেন, মানুষ বিপদে পড়ে, আক্রান্ত হয়ে আইনের বা পুলিশের আশ্রয় আশা করে। সেই আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বা পুলিশ কাউকে আটক করে গুলি করে মেরে ফেললে এবং ঘটনাকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে ‘ক্রসফায়ার’ বলে চালিয়ে দিলে সাধারণ মানুষ কার কাছে আশ্রয় চাইবে। দেশে আইনের শাসন, বিচার ইত্যাদি আছে বলে মনে হয় না। তিনি আরো বলেন, এ ঘটনার পরে এলাকার কিশোর-যুবকেরা এ ধরনের ঘটনার শিকার হতে পারে, পুলিশি নির্যাতন, হয়রানির শিকার হবে এ আশঙ্কার মধ্যে রয়েছে। আলাউদ্দিনের স্ত্রী, পিতা, চাচাসহ সব আত্মীয়-স্বজন এ ঘটনার বিচার আশা করেন। তবে সরকার বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা হলে প্রতিশোধমূলক হয়রানির আশঙ্কা প্রকাশ করেও মামলা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান। বিনা বিচারে হত্যা, নির্যাতন বন্ধ এবং ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের স্বার্থে পুলিশি হেফাজতে প্রশ্নবিদ্ধ এই কথিত ক্রসফায়ারের ঘটনাটি নিরপেক্ষ ও প্রকাশ্য তদন্তের দাবি রাখে।
থানা-পুলিশের বক্তব্য
আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গ্রেফতার ও মৃত্যু সম্পর্কে জানার জন্য বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার কর্তব্যরত ডিউটি অফিসার প্রথম পর্যায়ে দুটি মামলার এজাহারের ফটোকপি দিতে চান। কিন্তু প্রায় আধাঘণ্টা অপেক্ষা করার পরে জানান, ওসি সাহেবের (ফোনে) পরামর্শ মোতাবেক এ বিষয়ে এসআই আনোয়ারের সাথে কথা বলতে পারেন।
সেকেন্ড অফিসার (যিনি ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন) এসআই আনোয়ারকে ঘটনা সম্পর্কে জানাতে অনুরোধ করলে তিনি সংক্ষেপে জানান- এ ঘটনায় ইতোপূর্বে দুটি মামলা হয়েছে; প্রথম মামলা নং ৪১, তাং- ১৯/১/০৯, ধারা ১৪৭, ১৪৮, ১৪৯, ১৮৬, ৩৫৩, ৩৩২, ৩০৭, ২০২ দ.বি. এবং দ্বিতীয় মামলা নং ৪২, অস্ত্র আইনের ১৯(ক) ধারায়। নিহত আলাউদ্দিন ও অজ্ঞাত সাত-আটজন সহযোগীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত উভয় মামলার বাদি এসআই শেখ মোঃ মাহমুদ ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আলমগীর।
এসআই আনোয়ারের কাছে ঘটনা বিস্তারিত ভাবে জানতে চাইলে তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, ঘটনার রাতে আলাউদ্দিনকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসার পথে তার সহযোগীরা পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণ করলে পুলিশও গুলিবর্ষণ করে। তখন আলাউদ্দিন মারা যায়। একজন এএসআই রুহুল কাদের ঘটনায় আহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে মৃতদেহের কাছ থেকে একটি রিভলবার, কয়েকটি ছোরা-রামদা ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। আলাউদ্দিনকে বাকেরগঞ্জ থানাধীন তার বাড়ির কাছে কালিদাসিয়া মোড় থেকে গ্রেফতারের কথা তিনি অস্বীকার করেন। ‘ডাকাতির প্রস্তুতিকালে পুলিশের প্রতি গুলি ও পাল্টা গুলিবর্ষণে আলাউদ্দিনের মৃত্যু হয়েছে’- ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার দেয়া এ তথ্যের সাথে তার বক্তব্যের অমিল দেখিয়ে দিলে এজাহারে যা আছে, সেটাই ঠিক বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য, আলাউদ্দিনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো মামলার কথা তিনি উল্লেখ করতে পারেননি। তিনি একটি নথি দেখে তথ্য দেন, তবে মামলার এজাহারের কপি দেখতে চাইলে বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া কোনো নথি বা এজাহার দেখাতে পারবেন না, বর্তমানে থানায় কোনো নথিপত্র নেই। এ পর্যায়ে থানার ওসির সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনিও জানান- এ মুহূর্তে থানায় কোনো নথিপত্র নেই।
গাজীপুরে হকারের গায়ে পুলিশের গরম তেল নিক্ষেপ
শাহ আলম ফারুক
গাজীপুরে পুলিশের ছোঁড়া গরম তেলে
ঝলসে গেছে এক হকারের শরীর। ২৮ জানুয়ারি ২০০৯ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদের সূত্রে পরদিন ২৯ জানুয়ারি এ ব্যাপারে তথ্যানুসন্ধানে গাজীপুর গেলে কথা হয় ঘটনার শিকার মোঃ আবু মাসুম, তার দোকানের মালিক শামীম মিয়া, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মীসহ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী হকারের সাথে। পরবর্তীকালে জেলা পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিসার-২ মোঃ শফিকুল ইসলামের সাথে টেলিফোনে কথা হয়। 
গাজীপুর সদর হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের ৯নং বেডে চিকিৎসাধীন মোঃ আবু মাসুম (১৬) আসক তদন্তকারীকে জানায়- ২৪ জানুয়ারি শনিবার সন্ধ্যার পর পুলিশ হকারদের উচ্ছেদ করার জন্য আসে। এ সময় মাসুম চৌরাস্তা-কোনাবাড়ী সড়কে নাসির মার্কেটের সামনে ভ্যানে দোকান সাজিয়ে বেচাকেনা করছিল। চান্দনা চৌরাস্তা-টঙ্গীর রাস্তায় গাড়ি রেখে পুলিশ হকারদের ধাওয়া শুরু করলে নাসির মার্কেটের সামনে থেকে ভ্যানে সাজানো দোকান নিয়ে মাসুম অন্যত্র যেতে শুরু করে। পশ্চিমদিকে আনুমানিক ১০-১৫ হাত যাওয়ার পর কনস্টেবল এনামুল এসে তার দোকানে থাকা জিনিসপত্র হারিকেন, কেরোসিন তেল, লাঠির আঘাতে ফেলে দেয়। পরে গরম তেলের কড়াইয়ের এক হাতলে লাঠি ঢুকিয়ে তা ফেলে দিতে চাইলে মাসুম অনুরোধ করে বলে- স্যার! এটা গরম তেল...। মাসুম জানায়- গরম তেল না ফেলার অনুরোধ জানাতে না জানাতেই ওই কনস্টেবল লাঠির মাথা দিয়ে ধাক্কা মেরে গরম তেলের কড়াই মাসুমের গায়ের মধ্যে ছুঁড়ে মারে। মাসুম জানায়- সে মাথাটা ঘুরিয়ে নেয়াতে মুখের একাংশ ঝলসে গেলেও মুখের অন্যদিক রক্ষা পায়। তারপরও মুখের নিচের দিকের বাম পার্শ্ব, বুক, ডান হাতের কনুইয়ের ওপর থেকে নিচের দিক ঝলসে যায়। এ অবস্থায় গায়ে থাকা গেঞ্জি তাৎক্ষণিক কেটে ফেলাতে তার বুকের নিচের দিক রক্ষা পায়।
মাসুমের বাবা রুস্তম আলী বেপারী জানান, মাসুমদের বাড়ি গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নুরুন গ্রামে। তার ছেলে গত ২০-২২ দিন ধরে চান্দনা চৌরাস্তায় এসে কাজ করছিল। এর মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল।
মাসুমের নিয়োগকর্তা শামীম (পিতা- জালাল হাওলাদার, গ্রাম-পশ্চিম টুমচর, থানা-মুলাদী, জেলা-বরিশাল) জানান- গত প্রায় ১০ বছর ধরে চান্দনা চৌরাস্তায় ভ্যানগাড়িতে দোকান দিয়ে সে ব্যবসা করছে। মাসুম কয়েকদিন ধরে কাজ করছিল। সে ৭০ টাকা করে দিনে মজুরি পেতো। ঐদিন আনুমানিক সাড়ে ৭টার দিকে মাসুম পুলিশের ছোঁড়া গরম তেলে আহত হলে তাকে রাস্তা থেকে তুলে তিনি নিকটবর্তী সেবা হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে আজাহার দারোগা তাকে দেখতে আসে এবং সেখান থেকে পুলিশের গাড়িতে মাসুমকে গাজীপুর সদর হাসপাতালে এনে ভর্তি করানো হয়। দারোগা আজাহার সেবা হাসপাতালে ১ হাজার টাকা (বিল হয়েছিল ১২০০ টাকার অধিক) দেয়। হাসপাতালে আনার পর ওষুধের জন্য পরে আরো ৫০০ টাকা দিয়ে যায়। তথ্যানুসন্ধানের দিন ২৯/১/০৯ সকাল ১০টায় দারোগা আবারো হাসপাতালে এসে খরচপাতি দেবে বলে আগের দিন (২৮/১/০৯) বলে গেছে। তদন্তকারীকে শামীম জানান, সকালে দারোগার জন্য হাসপাতালে অপেক্ষা করলেও দারোগা আসেননি।
হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে রক্ষিত মাসুমের চিকিৎসার ফাইল দেখতে চাইলে একজন নার্স এজন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে বলে জানান। পরে মাসুমের চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার এবং আবাসিক মেডিক্যাল কর্মকর্তার (আরএমও) সাথে কথা বলার জন্য অপেক্ষা করেও পূর্ব নির্ধারিত প্রোগ্রামে তারা ব্যস্ত থাকায় কথা বলা যায়নি। হাসপাতালের অভ্যর্থনাস্থলে গিয়ে রেজিস্টার খাতা দেখে সদর হাসপাতালের একজন স্টাফ জানান-২৪/১/০৯ রাত সাড়ে আটটায় তাকে ভর্তি করা হয়। তার ভর্তির রেজিস্ট্রেশন নম্বর ৩৭১/৩৭। য/ড়, ইঁৎহ-এর চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে আনা হয়। রেজিস্টার খাতার এন্ট্রি অনুসারে তার শরীরের ২০% পুড়ে গেছে।
গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে কথা হলে তিনি এ ব্যাপারে পুলিশ সুপারের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। পুলিশ সুপার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিসারের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে টেলিফোনে গাজীপুর পুলিশ লাইনের রিজার্ভ অফিসার-২ মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান- কনস্টেবল এনামুল এএসপির (হেডকোয়ার্টার, গাজীপুর) দেহরক্ষী ছিল। তাকে বর্তমানে ‘পুলিশ লাইনে নিচের পদে দেয়া হয়েছে’। এখন থেকে সে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে ডিউটি করবে। এখন তাকে সাধারণ কনস্টেবলদের মতো রাস্তায়ও ডিউটি করতে হবে। ২৯/১/০৯ তথ্যানুসন্ধানের দিন মাসুমের বাবা জানান- তারা উক্ত কনস্টেবলের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।