সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   তদন্ত
   সংবাদ সম্মেলন
   মত-অভিমত
   কর্মশালা
   ফলোআপ
   তথ্যচিত্র

   যোগাযোগ
    সম্পাদক, বুলেটিন
    আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
      ২৬/৩ পুরানা পল্টন লাইন
      ঢাকা-১০০০
      ইমেইল- ask@citechco.net,
            publication@askbd.org

ফলোআপ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন
আন্দোলনকারী ছয় শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত

শাহ আফ্রোদিতি পান্না

 

যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচারের দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ ছয় মাসের আন্দোলনের সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো আন্দোলনকারী ছয় শিক্ষার্থীর বহিষ্কার। গত ২১ অক্টোবর অভিযুক্ত শিক্ষক (অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায়’ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যাকে অব্যাহতি দিয়েছে) ছানোয়ার হোসেন সানী শিক্ষার্থীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হন। শিক্ষক লাঞ্ছনার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে ছয়জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার (সাময়িকভাবে) করা হয়।

গত ৩ মে ২০০৮ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাটতত্ত্ব বিভাগের চারজন ছাত্রী ওই বিভাগের শিক্ষক ও বিভাগীয় সভাপতি ছানোয়ার হোসেন সানীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে ছাত্রছাত্রীরা অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়নের দাবিতে (যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা জাবিতে ১০ বছর ধরে চলমান একটি দাবি) আন্দোলনে নামেন। পরবর্তীকালে ওই চার ছাত্রীসহ মোট ১৭ জন ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টিতে আন্তরিক পদক্ষেপ না নেয়ায় দীর্ঘ চার মাস নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ থাকে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ৫ মে ‘সত্যতা যাচাই কমিটি’ নামে একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি, ২৮ মে অনুষ্ঠিত বিশেষ সিন্ডিকেট সভায় অধিকতর তদন্তের জন্য একটি ‘অধিকতর সত্যতা যাচাই কমিটি’ এবং পরে অধিকতর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুসারে ২৯ জুন অস্থায়ী উপাচার্যকে প্রধান করে ‘উচ্চতর সত্যতা যাচাই কমিটি’ নামে একটি কমিটি১ - এরূপ দফায় দফায় তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। অবশেষে আন্দোলনের পাঁচ মাসের মাথায় এসে ১৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট অভিযুক্ত শিক্ষক ছানোয়ার হোসেনকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি প্রদান করে। সিন্ডিকেটের এই সিদ্ধান্তকে মেনে না নিয়ে আন্দোলনকারীরা ছানোয়ার হোসেনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
২১ অক্টোবর ২০০৮ দুপুরের দিকে ছানোয়ার হোসেন বিভাগে এলে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। উত্তেজনার এক পর্যায়ে যৌন নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন ছাত্রছাত্রীদের হাতে লাঞ্ছনার শিকার হন। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, সে সময় ছাত্রদল এবং ছাত্রলীগের ক্যাডাররা ঘটনাস্থলে এসে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় এবং একটি শিক্ষক কক্ষসহ কয়েকটি শ্রেণীকক্ষ ভাংচুর করে। তাদের হামলায় পাঁচজন শিক্ষার্থী আহত হয়। জানা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর নিজেই ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের ডেকে আনেন।২
শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন লিখিত অভিযোগ করলে সেদিন সন্ধ্যায়ই এক জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকা হয়। এই সভায় তাৎক্ষণিকভাবে ছয়জন শিক্ষার্থীকে (এদের মধ্যে তিনজন অভিযোগকারী এবং তিনজন আন্দোলনকারী) সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয় এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়।
‘অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি’ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, অভিযুক্ত শিক্ষক ছানোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ‘শক্ত’ কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সিন্ডিকেট ঘোষণা করে, অভিযোগ ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায়’ ছানোয়ার হোসেনকে অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত ছাত্রছাত্রীসহ দেশের সব সচেতন মানুষকে বিস্মিত করে। কারণ সবারই সুনিশ্চিত প্রত্যাশা ছিল, ১৩ সেপ্টেম্বরের সিন্ডিকেট সভায় আন্দোলনের দাবি মেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সিদ্ধান্ত শোনার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা; হতাশায় বিমর্ষ হয়ে ওই স্থানেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন কয়েকজন। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্পষ্ট ছানোয়ার হোসেনের পক্ষ নিয়ে এই রায় দিয়েছে। দেশের মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠন, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন এবং এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন এবং ওই দিন সিন্ডিকেটে কী আলোচনা হয়েছে তা প্রকাশের দাবি জানান।
‘শক্ত’ প্রমাণ না পাওয়ার কথা বলে অভিযুক্ত শিক্ষককে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে যুক্তিসঙ্গতভাবেই প্রশ্ন ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয় গঠিত প্রথম ‘সত্যতা যাচাই কমিটি’র তদন্ত প্রতিবেদনসাপেক্ষে আরো অধিকতর প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই কর্তৃপক্ষ ‘অধিকতর সত্যতা যাচাই কমিটি’, ‘উচ্চতর সত্যতা যাচাই কমিটি’ নামে পরপর আরো দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। অভিযোগের সত্যতা না থাকলে ‘অধিকতর সত্যতা যাচাই’, ‘উচ্চতর সত্যতা যাচাই’ এই তদন্ত কমিটিগুলোর বিষয় কোথা থেকে এলো? কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও৩ ‘শক্ত’ প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৭ জন ছাত্রীর অভিযোগ থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে সম্পূর্ণভাবে অব্যাহতি দিয়েছে। ‘শক্ত’ প্রমাণ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। যৌন নিপীড়নের মতো ঘটনায় সবসময় শক্ত প্রমাণ পাওয়া কঠিন। প্রমাণ রেখে সাধারণত কেউ এসব কাজ করে না। ২০০৭ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে মোবাইলে লিখিত বার্তা প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এই ধরনের প্রমাণ সবসময় পাওয়া যাবে এমন নয়। বরং একবার প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর পরবর্তীকালে যারা এই ধরনের কাজ করেন তারা এসব প্রমাণ না রাখার ব্যাপারেই সতর্ক থাকবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্বৈত ভূমিকা
শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন ছাত্রছাত্রীদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার পর দ্রুততার সাথে সেদিন সন্ধ্যায়ই জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকা হয় এবং ছানোয়ার হোসেনের অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে ছয়জন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু একই শিক্ষকের বিরুদ্ধে যখন যৌন নিপীড়নের মতো গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হলো, তখন অভিযোগ প্রমাণের জন্য একের পর এক তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো। কিন্তু শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ওই শিক্ষকের অভিযোগ প্রমাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনো তদন্ত কমিটি গঠনের প্রয়োজন অনুভব করেনি। যদি ধরে নেয়া যায় যে, শিক্ষক লাঞ্ছনার মতো ঘটনার অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ার সাথে সাথে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোরাল গ্রাউন্ড বা নৈতিক অবস্থান থেকে ত্বরিত পদক্ষেপ হিসেবে অভিযুক্তদের সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে, প্রকৃত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যা সিদ্ধান্ত আসে তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা হবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নৈতিক অবস্থান শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত অভিযোগের বেলায় দেখা যায়নি বরং দেখা যায় ভিন্ন অবস্থান। ১৭ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষক ছানোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনা এবং প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও ওই শিক্ষককে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়নি। ‘শিক্ষক লাঞ্ছনা’র মতো ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য ঘটনা নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যৌন নিপীড়নে মতো ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে কি কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য ঘটনা?

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষক সমিতির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। যৌননিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার এবং যৌন নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবিতে ছাত্রছাত্রীদের দীর্ঘ পাঁচ মাসের আন্দোলনে শিক্ষক সমিতি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চুপ থেকেছে। অথচ বর্তমানে তারা অভিযুক্ত শিক্ষক ছানোয়ার হোসেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সাময়িকভাবে বহিষকৃৃত শিক্ষার্থীদের স্থায়ী বহিষকার দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিরতি পালন করছে। অন্যদিকে একই দিনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে মারধর করা, শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষ ভাংচুরকারীদের সম্পর্কে শিক্ষক সমিতি কিছুই বলছে না। শিক্ষক সমিতির এই ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, সমালোচনা বিভিন্ন মহলে যেমন উচ্চারিত হচ্ছে, তেমনি ‘প্রশাসনিক রাজনীতি’ বা কোনো প্রতিশোধ স্পৃহা থেকে অভিযোগকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে নতুন করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের পুনর্তদন্তের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচারের দাবিও জোরালোভাবে উত্থাপিত হচ্ছে।য়

* এ বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়েছে। বিস্তারিত দেখুন আইন-আদালত অধ্যায়ে পৃষ্ঠা ১০-এ।

অন্তটীকা
১. ‘অভিযুক্ত শিক্ষকের অপসারণ দাবিতে জাবিতে ভাংচুর, ভিসি রেজিস্ট্রার অবরুদ্ধ’, জনকন্ঠ, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৮।
২. ‘অভিযুক্ত শিক্ষকের লাঞ্ছনা ও শিক্ষার্থী বহিষ্কার : নতুন করে তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান কাম্য’, প্রথম আলো, ২৭ অক্টোবর ২০০৮।
৩. প্রাগুক্ত