সংবাদ সম্মেলন
কোরাইল বস্তি উচ্ছেদ প্রচেষ্টার প্রতিবাদে
২২ ডিসেম্বর ২০০৮
রিপোর্টার্স ইউনিটি (ভিআইপি লাউঞ্জ), সেগুনবাগিচা, ঢাকা
আয়োজক: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর (কাপ), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ (সি ইউ এস)।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা ও উপস্থিত সুধীমণ্ডলী
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), কোয়ালিশন ফর দ্য আরবান পুওর (কাপ) এবং সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ (সিইউএস)-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। আমরা উল্লিখিত সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বস্তিবাসীদের আবাসনের অধিকার নিয়ে কাজ করে আসছি। পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আমরা বিভিন্ন সময় আইনগত পদক্ষেপও গ্রহণ করেছি।
উপস্থিত সুধীমণ্ডলী
গত ১১ জানুয়ারি ২০০৭ জরুরি অবস্থা জারির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক মাত্রায় বস্তি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়। এসব উচ্ছেদ অভিযানে অসংখ্য বস্তিবাসী আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উক্ত সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মাননীয় উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎ করা হলে তিনি উচ্ছেদ হওয়া বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন এবং এ উদ্দেশ্যে গঠিত কমিটি রাজধানীর মিরপুর এলাকায় পুনর্বাসন প্রকল্পের জন্য পাঁচ একর জমি নির্ধারণ করে। সরকারের এসব অঙ্গীকার ও উদ্যোগের প্রেক্ষিতে আমরা আশা করেছিলাম, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে বস্তি উচ্ছেদের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না। কিন্তু আমরা যারপরনাই বিস্মিত ও আশাহত হই যখন ১৬ নভেম্বর ২০০৮, সরকারের গণপূর্ত বিভাগ লিখিত নোটিশ জারির মাধ্যমে গুলশান এলাকার ত্রিশ/পঁয়ত্রিশ বছর ধরে এক লাখের অধিক মানুষ বসবাসরত কোরাইল বস্তির বাসিন্দাদের অনতিবিলম্বে নিজ দায়িত্বে সব স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেয়। অন্যথায় বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা অপসারণ করা হবে বলে উল্লিখিত নোটিশে বলা হয়।
সাংবাদিক বন্ধুগণ
এ বিষয়ে উক্ত বস্তির বাসিন্দারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে গত ৪ ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে একটি রিট মামলা দায়ের করা হয়। ১৮ ডিসেম্বর ’০৮ তারিখে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ উল্লিখিত বস্তির স্থাপনা অপসারণের নোটিশ প্রদান কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না এবং বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের নীতিমালা অনুসরণে কর্তৃপক্ষকে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না মর্মে কারণ দর্শানোর জন্য সরকারের প্রতি রুলনিশি জারি করেন। একই সাথে আদালত ৫ জানুয়ারি ২০০৯ পর্যন্ত বস্তি উচ্ছেদ না করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন। এদিকে আমরা জানতে পেরেছি, মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ওই এলাকায় সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করবেন ২৬ ডিসেম্বর ২০০৮। আমরা মনে করি, এটি একদিকে যেমন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার নিজের করা অঙ্গীকারের বরখেলাপ, অন্যদিকে তা আদালত অবমাননারও শামিল। তাছাড়া এ ধরনের উদ্যোগ সুবিধাভোগী সরকারি কর্মকর্তাদেরকে বস্তি উচ্ছেদের জন্য অতি উৎসাহী করে তুলতে পারে।
সুধীমণ্ডলী
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য বা শোষণ-বঞ্চনার শিকার অগণিত মানুষ জীবন ও জীবিকার তাগিদে শহরে আসে এবং অপেক্ষাকৃত ভালো বিকল্প না পেয়ে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই বস্তিতে আশ্রয় নেয়। শুধু ঢাকা শহরেই ২৫ থেকে ৩০ লাখ লোক বিভিন্ন বস্তিতে বাস করে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখই রয়েছে গার্মেন্টস শ্রমিক, যারা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রিকশাচালক, গৃহকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার লোক বস্তিতে বাস করে এবং নগরীর অর্থনৈতিক জীবনে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য। পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি উচ্ছেদ করার ফলে বস্তিবাসীদের জীবন ও জীবিকার অধিকার যেমন লঙ্ঘিত হয়, তেমনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সাথে নাগরিক জীবনেও এর বিরূপ প্রভাব পড়ে। তার চেয়েও বড় কথা ওই নাগরিকদের অর্থ উপার্জনের ন্যায়সঙ্গত অধিকারকেও লঙ্ঘন করা হয়। তাছাড়া এটা নাগরিকের বাসস্থানের অধিকার পূরণ ও রক্ষায় সরকারের করা সাংবিধানিক অঙ্গীকারেরও বরখেলাপ। আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে যেখানে সব দলের প্রার্থী বস্তি উচ্ছেদ না করার জন্য অঙ্গীকার করছেন, সে মুহূর্তে নতুন করে বস্তি উচ্ছেদের উদ্যোগের পেছনে কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের দুরভিসন্ধি থাকতে পারে বলে আমাদের আশঙ্কা। আমরা আশা করি, বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাদের মেয়াদের এই অন্তিম লগ্নে আর কোনো বস্তি উচ্ছেদের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না।