সম্পাদকীয়
   প্রচ্ছদ-কাহিনী
   আইন-আদালত
   তদন্ত
   সংবাদ সম্মেলন
   মত-অভিমত
   কর্মশালা
   ফলোআপ
   তথ্যচিত্র

   যোগাযোগ
    সম্পাদক, বুলেটিন
    আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
      ২৬/৩ পুরানা পল্টন লাইন
      ঢাকা-১০০০
      ইমেইল- ask@citechco.net,
            publication@askbd.org

আইন-আদালত

অন্যায় গ্রেফতার ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা

আসল আসামির পরিবর্তে খুনের মামলায় প্রায় ৩ বছর জেল খেটেছেন নিরপরাধ জাহাঙ্গীর

শাহ আফ্রোদিতি পান্না


“খালি এই জল্পনা-কল্পনাই করতাম যে, আমি কার সাজা খাটতাছি? কী পাপ করলাম আমি? রেকজনের মামলার সাজা খাটতেছি আমি! আমার কি কেউ নাই?... জেলখানার ভেতর আমি অস্থিরের মতো থাকতাম, সারাদিন সারারাত ঘুম নিদ্রা নাই... আমার মা, বউ, বালবাচ্চা, বোন সবাই তো আমার ওপর নির্ভরশীল, আমি কর্ম করে খাওয়াইছি... আমার বাপ একটা কাজ করতে পারে না ... আমি তারার টেনশানই করাম, না জেল খাইট্যা আইয়াম! আমি খালি এইগুলা ভাবতাম, আর কানতাম ... এক বৎসর খালি কানতাম। হের ফলে আমার বাবারে কইছি, বাবা, আমি তো আর কানতে পারি না, আমার চোখের পানি সব শুকায়া গেছে!... আমি ধারণা করছি না যে আমার বাপে আমারে বাইর কাইরা আনতে পারব, এত দৌড়াদৌড়ি কইরা, আফনেরার কাছে আইয়া!”
এ কথাগুলো জাহ্‌ঙ্গীরের। জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর তার মুক্তির ব্যাপারে যারা কাজ করেছেন আইন ও সালিশ কেন্দ্র কার্যালয়ে তাদের সাথে দেখা করতে এসে তিনি তার জীবনে ঘটে যাওয়া দূঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেন এভাবেই।

কুমিল্লার দেবীদ্বার থানার সুলতানপুর গ্রামের নিরপরাধ জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে (২৭) ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৬ তারিখ মধ্যরাতে ঘুম থেকে ডেকে তুলে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। জাহাঙ্গীরের বাবা শামসুল হক ঘটনার বিবরণে জানান, সুলতানপুর বাজারে জাহাঙ্গীরের ছোট একটি চায়ের দোকান ছিল। ঐ দোকানে স্ত্রীকে নিয়ে জাহাঙ্গীর রাতে থাকতেন। ২০০৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত দুটা/আড়াইটার দিকে জাহাঙ্গীর যখন দোকানে ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন তখন ৪-৫ জন পুলিশ এসে ডাক দেয়। পুলিশ তাকে নাম জিজ্ঞাসা করলে তিনি তার নাম জাহাঙ্গীর আলম বলে জানান। পুলিশ তখন বলে, ‘তোর নাম জাহাঙ্গীর আলম না, তোর নাম মোঃ আলম। তোর নামে কেইস আছে, চিটাগাংয়ের মামলায়।’১ এ কথা শুনে জাহাঙ্গীর বোকার মতো হয়ে যান। বলেন, আমার নামে তো কোনো মামলা নাই! এই কথা বলার পর ‘এ্যাই কুত্তার বাচ্চা তোর নামে মামলা নাই?’ বলে পুলিশ জাহাঙ্গীরকে একটা লাথি মারে।২ জাহাঙ্গীরকে পুলিশ ধরেছে খবর পেয়ে জাহাঙ্গীরের বাবা দৌড়ে আসেন এবং বলেন, ‘স্যার ও তো আলম না, ওর নাম জাহাঙ্গীর’- এই কথা বললে দারোগা তাকে থাপ্পড় মারে। একই কথা জাহাঙ্গীরের স্ত্রী বললে পুলিশ তাকে দুটি লাথি মারে। জাহাঙ্গীরের বাবা আরও জানান, সেদিন ছিল একুশে ফেব্রুয়ারির রাত। এর জন্য এলাকার স্কুলের কিছু ছেলে আশপাশে ছিল। পুলিশ তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করে, ‘ওর নাম কি?’ তারা উত্তর দিলো, ‘জাহাঙ্গীর।’ কিন্তু দারোগা কারও কথাই মানেনি। আলম বলে তাকে ধরে নিয়ে গেছে।৩
থানায় নিয়ে যাওয়ার পর রিমান্ড এবং মামলার ভয় দেখিয়ে থানার দারোগা জাহাঙ্গীরের পরিবারের কাছে টাকা দাবি করে। জাহাঙ্গীরের স্ত্রীর বক্তব্য, ‘ধইরা নিয়া গিয়া আমাদের ফোন কইরা কইছে সাত দিনের রিমান্ডে নিছে। আমাদের কাছে টাকা চাইছে। বলছে, যদি টাকা না দেই ২০টা মামলা করবো। ২০ হাজার টাকা দিলে ছাইড়া দিবো। তার পরে আমি, আমার শ্বশুর টাকা নিয়া গেছি। রিমান্ড কাটানোর লাইগ্যা হাতে-পায়ে ধইরা ৬ হাজার টাকা দিছি।’ জাহাঙ্গীরের বাবা জানান, ধরে নেয়ার পরদিন ছেলের বউকে নিয়ে থানায় যান। ‘স্যার হঠাৎ করে ২০ হাজার টাকা আমি কোত্থেকে দিমু, আমি গরিব মানুষ’ কান্নাকাটি করে তিনি এই কথা বলার পর থানার দারোগা তখন বলে, ‘টাকা না দিলে চালান কইরা দিমু। চিটাগাংয়ের মামলা যেটা আছে সেটার মধ্যে ঢুকায়া দিমু।’ এই কথা শোনার পর তিনি যখন বলেন যে, স্যার ওর নামে তো চিটাগাংয়ের কোনো মামলা নাই। দারোগা তখন বলে, ‘মামলা না থাকলেও আমরা ঢুকায়া দিলে বারো দ্যাশ ঘুইরা আওন লাগবো।’ জাহাঙ্গীরের বাবা জানান, দারোগার কথা শুনে তিনি ভয় পেয়ে যান। তিনি কাঁদতে কাঁদতে তখন দারোগাকে জানান, ৬ হাজার টাকা দিতে পারবেন। ৬ হাজার টাকা দেয়ার পর দারোগা আর মামলা দেবে না বলে জানায়। এ কথা শোনার পর জাহাঙ্গীরের বাবা নিশ্চিত ছিলেন যে, জাহাঙ্গীরকে কেসে ঢুকানো হবে না।

কিন্তু পরের দিনই জাহাঙ্গীরকে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা মামলা নং ২২৯/১৯৯৯-এর সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখিয়ে কোর্টে প্রেরণ করা হয় এবং কোর্ট তাকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়।
গ্রেফতারের সপ্তাহখানেক পর কুমিল্লায় জাহাঙ্গীরের বাবা জাহাঙ্গীরের জামিন প্রার্থনা করেন। কিন্তু এই মামলার রায় চট্টগ্রামের আদালতে সম্পন্ন হওয়ায় তাকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম আদালতে। জাহাঙ্গীরের বাবা ছুটে যান চট্টগ্রামে। ৮ জুন ২০০৬ তারিখে সেখানে নাম বিভ্রাটের কারণে নিরপরাধ ছেলেকে গ্রেফতারের বিষয়টি আদালতকে অবহিত করার পরও সেখান থেকে জানানো হয়, ইতোমধ্যে মামলার রায়ে অভিযুক্ত আলম নামের ব্যক্তির ১১ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং মামলার অন্য আসামিরা জামিনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে নিয়ে গেছেন। তাই চট্টগ্রাম আদালতে এই আসামির জামিনের বিধান নেই। জাহাঙ্গীরের বাবা হতাশ হয়ে দেবীদ্বারে ফিরে আসেন এবং স্থানীয় দুই ইউপি চেয়ারম্যানের সহায়তায় অনুসন্ধান করে নিশ্চিত হন খুনের মামলার প্রকৃত আসামি আলম ৬ নং ফতেহাবাদ ইউনিয়নে সুলতানপুর গ্রামের বাসিন্দা।৪

যে মামলায় জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার দেখায়
১৯৯৬ সালের ১০ নভেম্বর চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ এলাকায় সন্ত্রাসীরা একটি কোম্পানির মাইক্রোবাসচালককে গুলি করে চার লাখ টাকাসহ অন্যান্য মালামাল লুট করে নেয়। হাসপাতালে নেয়ার পর চালকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে দায়েরকৃত চার্জশিটে ১০ অভিযুক্তের একজন ছিলেন কুমিল্লার দেবীদ্বার থানার সুলতানপুর গ্রামের শামসুল হকের পুত্র আলম। ৭ জুন ২০০৫ তারিখে চট্টগ্রাম আদালত মামলার রায়ে অভিযুক্ত প্রধান আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং কুমিল্লার দেবীদ্বার থানার আলমসহ বাকি ৯ জনকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডসহ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। দেবীদ্বারের আলম পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। কিন্তু প্রকৃত আসামি আলমকে পুলিশ গ্রেফতার না করে নিরপরাধ জাহাঙ্গীর আলম সরকারকে গ্রেফতার করে।৫
৯ অক্টোবর ২০০৬ তারিখে ‘পুলিশের ভুলের খেসারত : খুন না করেও ১১ বছরের সাজা ভোগ করছে কুমিল্লার জাহাঙ্গীর’- শিরোনামে দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত রিপোর্টের মাধ্যমে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়। বিষয়টি জানার পর দ্রুততার সাথে আসক থেকে ৩ সদস্যের একটি দল কুমিল্লায় ঘটনাস্থলে যায় এবং জাহাঙ্গীরের পরিবারের সদস্য, কুমিল্লা কারাগারের জেলার, ডেপুটি জেলার ও কারাগারে আটক জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা বলে।
তাছাড়া আসক তদন্ত দল স্থানীয় লোকজনসহ ফতেহাবাদ ও সুলতানপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের সাথে কথা বলে এবং চেয়ারম্যানের ইস্যুকৃত নাগরিকত্ব সনদপত্র সংগ্রহ করে। যাতে স্পষ্ট দেখা যায়, উক্ত মামলার প্রকৃত আসামি ও কারাগারে আটক জাহাঙ্গীর এক ব্যক্তি নয়। প্রকৃত সাজাপ্রাপ্ত আসামির নাম মোঃ আলম, পিতার নাম সামসু মিয়া, গ্রাম সুলতানপুর, ইউনিয়ন ৬নং ফতেহাবাদ, থানা দেবীদ্বার, জেলা কুমিল্লা এবং কারাভোগকারী নিরপরাধ ব্যক্তির নাম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, পিতা শামসুল হক সরকার, গ্রাম সুলতানপুর, ইউনিয়ন ১৪নং সুলতানপুর, থানা দেবীদ্বার, জেলা কুমিল্লা। এছাড়া স্থানীয় ভোটার লিস্ট সংগ্রহ করে আসক তদন্ত দল দেখতে পায় মামলার আসামি আলমের ভোটার নম্বর-০০৩১৬ এবং কারাভোগকারী নিরপরাধ জাহাঙ্গীর আলম সরকারের ভোটার নম্বর-০০৩৪৮।
প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানের পরবর্তীকালে ৯ মে ২০০৭ তারিখে আইন ও সালিশ কেন্দ্র জাহাঙ্গীরের মুক্তির ব্যাপারে হাইকোর্টে মামলা করে (ফৌজদারি বিবিধ মামলা নং-৫৯৪৯/২০০৭)। কুমিল্লা এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসককে ১৯ জুলাই ২০০৭-এর মধ্যে জাহাঙ্গীরের বিষয়ে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দেন। সব তথ্য-প্রমাণে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ায় ৩০ জুন ২০০৮ হাইকোর্ট জাহাঙ্গীরের আটক অবৈধ ঘোষণা করেন এবং তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের নির্দেশের পরও জাহাঙ্গীরের মুক্তি পেতে ৩ মাসেরও বেশি সময় লাগে। নির্দোষ জাহাঙ্গীর দীর্ঘ প্রায় সাড়ে ৩ বছর কারাভোগ করার পর ৮ অক্টোবর ২০০৮ তারিখে কুমিল্লা কারাগার থেকে মুক্তি পান।

পুলিশের ভুলে গ্রেফতারের ফলে জাহাঙ্গীরের পরিবার আজ সর্বস্বান্ত। জাহাঙ্গীরের বৃদ্ধ বাবা ছেলের মুক্তির জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে নিঃস্বপ্রায়। ছোট্ট দুটি চায়ের দোকান, অল্প কিছু চাষের জমি এবং বাজারে আসা-যাওয়ার জন্য একটি সাইকেল ছিল। সবকিছু বিক্রি করেছেন ছেলেকে জেল থেকে ছাড়ানোর জন্য। জাহাঙ্গীরের বাবা, স্ত্রী, সন্তান সবাই অনাহারে-অর্ধাহারে থেকে আজ কঙ্কালসার। জাহাঙ্গীরের ৮ বছরের মেয়েটি স্কুলে পড়তো, এখন তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ। জেল থেকে বের হওয়ার পর দেশের সরকারের কাছে জাহাঙ্গীরের প্রশ্ন, কী দোষ করেছিল সে? ধ্বংস হয়ে যাওয়া তার এই পরিবার কি ফিরিয়ে দিতে পারবে কেউ?য়

অন্তটীকা
১ পুলিশের ভুলের খেসারত ‘খুন না করেও ১১ বছরের সাজা ভোগ করছে কুমিল্লার জাহাঙ্গীর’, প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদন, আসক।
২ জাহাঙ্গীরের বাবার সাক্ষাৎকার, ৪ মে ২০০৮ তারিখে জাহাঙ্গীরের মুক্তির ব্যাপারে খোঁজ নেয়ার জন্য তার বাবা এবং স্ত্রী আসক কার্যালয়ে এলে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়।
৩ প্রাগুক্ত।
৪ ‘পুলিশের ভুলের খেসারত : খুন না করেও ১১ বছরের সাজা ভোগ করছে কুমিল্লার জাহাঙ্গীর’, দৈনিক ইনকিলাব, ৯ অক্টোবর ২০০৬।
৫ প্রাগুক্ত।

 

যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে জাবি শিক্ষকের অব্যাহতির আদেশ কেন অবৈধ নয়-হাইকোর্ট

সারোয়ার হোসাইন

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ছানোয়ার হোসেনকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ থেকে অব্যাহতিদানের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), নিজেরা করি, কর্মজীবী নারী ও দু’জন বিশিষ্ট নাগরিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও সাংবাদিক কামাল লোহানীর দায়ের করা রিট মামলায় হাইকোর্ট ছানোয়ার হোসেনকে অব্যাহতিদানের আদেশকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না মর্মে রুল জারি করেন। দায়ের করা রিট আবেদনে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত রিট বেঞ্চ এই রুলনিশি জারি করেন।

ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোঃ ছানোয়ার হোসেন সানীর বিরুদ্ধে ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা তার বহিষ্কার ও উপযুক্ত শাস্তির দাবিতে বিগত প্রায় ৮ মাস ধরে আন্দোলন করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত নিপীড়নের বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। পরপর দুটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি তথ্যানুসন্ধানে সানীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এবং এ বিষয়ে আরো তদন্ত প্রয়োজন বলে মত দেয়। পরবর্তীকালে তৃতীয় তথ্যানুসন্ধান কমিটি, তদন্ত কমিটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে তার রিপোর্ট প্রদান করে। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট রহস্যজনকভাবে উক্ত রিপোর্টের তথ্যানুসন্ধান প্রকাশ না করেই সন্তোষজনক কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি- এই ভিত্তিতে ১৩.৯.২০০৮ তারিখে ছানোয়ার হোসেনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি প্রদান করে। সিন্ডিকেটের এরূপ সিদ্ধান্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা তদন্ত প্রতিবেদনের প্রকাশ ও ছানোয়ার হোসেনকে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এরূপ আন্দোলনের মধ্যে ছানোয়ার হোসেন বহিরাগত পরিবেষ্টিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করলে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং অভিযোগকারী নিপীড়িত চার ছাত্রীসহ নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট মোট সাতজন ছাত্রছাত্রীকে সাময়িক বহিষ্কার করে।

আদালতের রায়
* কেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩-এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী সম্পাদিত তদন্ত অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
* কেন নতুন তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে না।
* অভিযুক্ত শিক্ষক সানোয়ার হোসেন সানীর অব্যাহতিদানের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
* কেন উক্ত আইনের ৫১ ধারা মোতাবেক দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও সুপ্রিম কোর্টের সাবেক একজন বিচারপতির সমন্বয়ে একটি নতুন তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে না।
* আদালত অভিযোগকারী ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের বহিষ্কারাদেশকে তিন মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন।
রিট আবেদনকারীদের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ড. শিরীন শারমীন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট রমজান আলী সিকদার, অ্যাডভোকেট আইনুন নাহার সিদ্দিকা এবং অ্যাডভোকেট অবন্তী নুরুল। মামলার সার্বিক সহযোগিতায় আসক লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড পলিসি রিফর্ম ইউনিটের কর্মীবৃন্দ দায়িত্ব পালন করেন।য়

 

 

বিষাক্ত
বর্জ্যবাহী জাহাজ কাটার
ওপর নিষেধাজ্ঞা

মিল্লাত হোসাইন

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘গ্রিনপিস’-এর কালো তালিকাভুক্ত জাহাজ ‘এমটি এন্টারপ্রাইজ’ আমদানি ও কাটা নিয়ে এর আমদানিকারক ও এখানকার পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) আইনি লড়াইয়ের পর শুনানি শেষে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর আমদানি করা জাহাজ ‘এমটি এন্টারপ্রাইজ’ কাটার ওপর ফের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।
‘বেলা’র আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত জাহাজ ভাঙা বন্ধ রাখার আদেশ দেন। জাহাজ আমদানিকারক ‘মেসার্স মদিনা এন্টারপ্রাইজ’কে এ নির্দেশ দেয়া হয়। গত ৩০ নভেম্বর বিচারপতি মো. ঈমান আলী ও বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই স্থগিতাদেশ দেন।
আদালত পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে জাহাজ ভাঙার ক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ রোধ ও শ্রমিক স্বাস্থ্য রক্ষায় কী ব্যবস্থা নেয়া হয় তা পরিদর্শন করে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে যে জাহাজগুলো ভাঙা হচ্ছে সেগুলোর কোনো পরিবেশগত ছাড়পত্র আছে কি না বা যে ডকইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙা হয় ওই ডকইয়ার্ডের ছাড়পত্র আছে কি না তা জানাতেও পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া হয়।
মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য রয়েছে এ অভিযোগে এ জাহাজটি ভাঙার ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে বেলা গত অক্টোবরে রিট আবেদন দায়ের করে। এরপর হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ জাহাজ ভাঙার ওপর স্থগিতাদেশ দেন। এর আগে এ ধরনের জাহাজ আমদানি করা হচ্ছে- এ খবর পেয়ে জাহাজ যাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে না পারে, সে নির্দেশনা চেয়ে বেলা একটি রিট করে। শুনানি শেষে হাইকোর্ট এ জাহাজ যাতে ঢুকতে না পারে, সেজন্য সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
পরে জাহাজ আমদানিকারকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে জাহাজ ভাঙার ওপর হাইকোর্ট রিটটি শুনানি করার নির্দেশ দেন। হাইকোর্ট বিভাগ শুনানির সময় তিনজন বিশেষজ্ঞের বক্তব্য শুনে এ নির্দেশ দেন।
অভিযোগ রয়েছে, আমদানিকারক মদিনা এন্টারপ্রাইজ মিথ্যা তথ্য প্রদানের মাধ্যমে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে জাহাজটি বাংলাদেশে আনার অনাপত্তি সনদ (No Objection Certificate) নিয়ে নেয়। পরবর্তীকালে পরিবেশবাদীদের আপত্তির মুখে মন্ত্রণালয় গ্রিনপিস জাহাজটিকে বিষাক্ত হিসেবে কালো তালিকাভুক্ত করেছে- এই কারণ দেখিয়ে ১৩ আগস্ট ’০৮ তারিখের অনাপত্তিপত্র (নং-০৮০৭০৩৮৪) বাতিল করে।
আমদানিকারক এর বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট আবেদন দাখিল করে। আদালত সংশ্লিষ্টদের জাহাজটি বিচিং (কাটার জন্য সৈকতের কাছাকাছি আনা) না করতে নির্দেশ দেন। এরপর আমদানিকারকরা আদালতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে প্রদত্ত একটি ইন্সপেকশন সনদ দাখিল করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, পরিদর্শনে জাহাজে বিষাক্ত বর্জ্যের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যার ওপর ভিত্তি করে হাইকোর্ট বিভাগ আমদানিকারকদের তাদের কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেন।
এই জাহাজটি মানবদেহ ও পরিবেশের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর এসবেস্টস, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, কপার, দস্তা ইত্যাদি জমে রয়েছে বলে জানা গেছে, যা দেশের উপকূলীয় সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থানের ব্যাপক ক্ষতি করবে। এদেশের পরিবেশবাদীদের প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও পরিবেশ মন্ত্রণালয় অনাপত্তিপত্র দিলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) জনস্বার্থে জাহাজ কাটার বিরুদ্ধে রিট আবেদনটি দাখিল করে।
ইতোপূর্বেও এসএস নরওয়ে, এমটি আলফাশিপ এবং এমটি এপশেরন নামক তিনটি বিষাক্ত বর্জ্য সংবলিত জাহাজের এদেশে আগমন প্রতিহত করেছেন এদেশের পরিবেশবাদীরা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সমুদ্রসীমায় এ ধরনের জাহাজ আসার অনুমতি দেয়া ১৯৮৯ সালের রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরে বিপজ্জনক বর্জ্য স্থানান্তর সংক্রান্ত বাসেল কনভেনশনের লঙ্ঘন (Basel Convention on the Control of Transboundary Movement of Hazardous Wastes and their Disposal, 1989), বাংলাদেশ যা ১৯৯৩ অনুসমর্থন করেছে।
উল্লেখ্য, ২০০১ সালে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) প্রকাশিত জাহাজ কাটা শিল্প শ্রমিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭০-এর দিকে অনেকগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ জাহাজ কাটা হয়। প্রথমদিকে ইউরোপ-আমেরিকায় এ কাজগুলো করা হতো। কিন্তু পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে সেগুলো এশিয়ার দিকে সরিয়ে নেয়া হয়। বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরা যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের মধ্যে আছে তা হলো- তাদের আশঙ্কা, যদি একবার এ ধরনের বিষাক্ত বর্জ্যবাহী জাহাজ এদেশে কাটা সম্ভব হয় তাহলে অপরাপর আমদানিকারকরা উৎসাহিত হয়ে ভবিষ্যতে আরো ব্যাপকভাবে এধরনের জাহাজ আমদানি করা শুরু করবেন, যা দেশের পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

 

র‌্যাব কর্তৃক আটক হওয়ার পর নিখোঁজ মোঃ হাসান খানকে আদালতে উপস্থাপন করতে হাইকোর্টের রুল
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও অন্য একজন বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য

সারোয়ার হোসাই

 

গাজীপুর জেলার টঙ্গী থানার উত্তর দত্তপাড়া বাসিন্দা মোঃ হাসান খান র‌্যাবের হাতে আটক হওয়ার পর নিখোঁজ হলে তাকে আদালতের সামনে উপস্থাপন করার জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দায়ের করা এক রিট আবেদনে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের রিট বেঞ্চ র‌্যাবের উদ্দেশে রুল জারি করেছেন।

মামলার বিষয়বস্তু
মোঃ হাসান খান, পিতা-মৃত মোঃ মোতালেব খান, উত্তর দত্তপাড়া, থানা-টঙ্গী, জেলা-গাজীপুর, তিনি ২০০০ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবে কর্মরত থেকে দেশে ফিরে এসে পরিবহন ব্যবসা আরম্ভ করেন, পাশাপাশি এলাকায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়লে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার হন। প্রায় সাত বছর কারাভোগ করে ৫ মে ২০০৮ তারিখে কারাগার থেকে ছাড়া পান। তৎপরবর্তীকালে তিনি তার পূর্বের অপরাধমূলক জীবন থেকে বের হয়ে এসে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে থাকেন। ঘটনার দিন ২৫ মে ২০০৮ তারিখে তিনি তার স্ত্রী হাসি বেগমকে (পিটিশনার নং-২) সঙ্গে নিয়ে তার ওপর দায়ের হওয়া পূর্ববর্তী একটি দায়রা মামলায় গাজীপুর কোর্টে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে টঙ্গী কলেজ রোড বাসস্ট্যান্ডের কাছে এলে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) একটি দল তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ সময় তার স্ত্রী র‌্যাব সদস্যদের কাছে তার স্বামীকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব এর কোনো উত্তর প্রদান না করেই হাসান খানকে একটি মাইক্রোবাসে করে নিয়ে যায়। হাসি বেগম সিএনজি অটোরিকশাযোগে র‌্যাবের মাইক্রোবাসের পিছু নিয়ে দেখেন যে, তার স্বামীকে উত্তরা র‌্যাব-১-এর অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসি বেগম র‌্যাব-১ অফিসে তার স্বামীর গ্রেফতারের কারণ জানতে প্রবেশ করতে চাইলে র‌্যাব-১ এর গেটে কর্মরত র‌্যাব সদস্য তাকে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং তার স্বামীর গ্রেফতারের কারণ জানতে স্থানীয় টঙ্গী থানায় যোগাযোগ করতে বলে। হাসি বেগম তাৎক্ষণিকভাবে টঙ্গী থানায় যোগাযোগ করলে টঙ্গী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে তার স্বামীর গ্রেফতারের কারণ টঙ্গী পুলিশের জানা নেই বলে জানান। হাসি বেগম তার স্বামীর আটক সম্পর্কে একটি সাধারণ ডায়েরি লিপিবদ্ধের আবেদন করলে টঙ্গী থানা সে আবেদন ফিরিয়ে দেয়।
গ্রেফতারের দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও হাসান খানকে আদালতে উপস্থাপন না করলে ও তার পরিবারকে গ্রেফতার সম্পর্কে কোনো খবর না দিলে তার স্ত্রী ২৯ মে ২০০৮ তারিখে হাসান খানের গ্রেফতারের কারণ ও অবস্থান জানতে চেয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবরে আবেদন করেন। পুলিশ সদর দপ্তর তার কোনো উত্তর প্রদান করেনি। পরবর্তীকালে হাসি বেগম ২২ জুন ২০০৮ তারিখে পুনরায় তার স্বামীর গ্রেফতার ও নিখোঁজ প্রসঙ্গে রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। তাতেও কোনো কাজ না হলে তিনি মানবাধিকার ও আইন সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (পিটিশনার-১) সহযোগিতা চান। আসক ২৩ জুলাই ২০০৮ তারিখে মহাপরিচালক র‌্যাবের বরাবরে হাসান খানের অবস্থান ও অবস্থার সংবাদ তার পরিবারকে প্রদানের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি প্রদান করে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে চিঠির কোনো উত্তর বা হাসান খানের আটক ও তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো খবর প্রদান করা হয়নি। পরবর্তীকালে ২৩.১০.২০০৮ তারিখে উল্লিখিত হাসান খানকে আদালতে উপস্থাপন করার জন্য উপরোক্ত হেবিয়াস কর্পাস রিট মামলাটি দায়ের করা হয়।
মামলার যুক্তি
* হাসান খানের গ্রেফতার পরবর্তীকালে তার অবস্থান ও অবস্থার খবর তার পরিবারকে প্রদান না করা কর্তৃপক্ষের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও আইনের লঙ্ঘন।
* গ্রেফতারের কোনো বৈধ আদেশ ও কারণ ছাড়াই হাসান খানকে র‌্যাব কর্তৃক গ্রেফতার ও পরবর্তীকালে বলবৎ আইন অনুযায়ী আদালতে উপস্থাপন না করা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি।
* গ্রেফতার ও পরবর্তীকালে আদালতে উপস্থাপন না করা এমনকি তার পরিবারকে তার অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে সংবাদ প্রদান না করায় হাসান খান তার আইনগত ও সংবিধান প্রদত্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা অবৈধ এবং সুস্পষ্টভাবে কর্তৃপক্ষের আইনের লঙ্ঘন।

প্রার্থিত প্রতিকার
মামলার কারণ, বিষয়বস্তু ও আইনগত যুক্তির বিচারে আদালতের কাছে নিম্নোক্ত প্রতিকার প্রার্থনা করা হয়-
* গ্রেফতারকৃত হাসান খানকে আদালতের সামনে উপস্থাপন করা।

আদালতের আদেশ
শুনানিঅন্তে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি মোঃ আবু তারিকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ২৬.১০.২০০৮ তারিখে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হাসান খানকে তিন সপ্তাহের মধ্যে আদালতের সামনে উপস্থিত করার জন্য রুলনিশি জারি করেছেন। মামলাটি বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

 

আদালতের হস্তক্ষেপে
ডা. হুমায়রার মুক্তি
নারীর জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার বিপন্নতা

কামরুন্নেসা নাজলী

 

চিকিৎসা বিদ্যায় উচ্চতর শিক্ষা অর্জন ও কর্মসংস্থান সূত্রে লন্ডনে বসবাসরত একজন বাংলাদেশী নাগরিক হুমায়রা আবেদীন। অসুস্থ মাকে দেখতে গত আগস্ট মাসে ঢাকায় আসার পর থেকে ১৪ ডিসেম্বর ২০০৮ আদালতে উপস্থিত করানোর আগ পর্যন্ত যিনি ছিলেন পরিবার কর্তৃক বন্দী। বাংলাদেশে পড়াশুনা শেষে লন্ডনের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান ২০০২ সালে। তখন থেকেই শিক্ষানবিশ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করছেন লন্ডনে এবং আর এক বছর পরেই জেনারেল প্র্যাকটিশনার হিসেবে তাঁর শিক্ষানবিশ কাল শেষ করার কথা। মা গুরুতর অসুস্থ- এমন মিথ্যা খবর দিয়ে আগস্ট মাসে ঢাকায় আনানো হয় হুমায়রাকে। বাসায় পৌঁছার পর থেকেই তাঁকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, লুকিয়ে ফেলা হয় তাঁর পাসপোর্ট, প্লেনের টিকিট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ক্রেডিট কার্ড। বাবা মার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করতে তাঁকে দীর্ঘ পাঁচ মাস শুধু জোর করে আটকই রাখা হয়নি, করা হয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। মানসিকভাবে অসুস্থ প্রতিপন্ন করতে ভর্তিও করা হয়েছিল মানসিক হাসপাতালে। বন্ধু, স্বজনের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল অজ্ঞাত স্থানে।
এ ঘটনা জানতে পেরে ডা. হুমায়রার জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তরফে নেয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। এ ব্যাপারে সহযোগিতা চেয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় জিডি করা হয় আগস্ট মাসে। থানার সহযোগিতায় আসক-এর পক্ষ থেকে হুমায়রার সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হয়। হুমায়রার নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দ্রুত উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দেওয়া হয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে।
কোনো ফলাফল না পেয়ে অক্টোবর ২০০৮, হুমায়রার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও সশরীরে তাকে আদালতে উপস্থিত করাতে উচ্চ আদালতের নির্দেশ চেয়ে হুমায়রার খালাতো বোন ডা. শিপ্রা চৌধুরী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস রিট পিটিশন দায়ের করে (রিট পিটিশন নং ৭৯৭৭/২০০৮)। এই রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৭ অক্টোবর হাইকোর্ট বিভাগ প্রথম বারের মতো হুমায়রাকে আদালতে উপস্থিত করানোর জন্য তার বাবা, মা ও চাচার বরাবরে আদেশ দেন। আদালতে এই আদেশ পালনে হুমায়রার পিতামাতা ব্যর্থ হওয়ায় হাইকোর্ট বিভাগ ডা: হুমায়রার উদ্ধার নিশ্চিত করতে মহাপুলিশ পরিদর্শকের বরাবর ১০ নভেম্বর আরেকটি আদেশ দেন। ২৩ নভেম্বর হুমায়রার বাবা-মার পক্ষের আইনজীবী হাইকোর্টের আদেশের স্থগিতাবস্থা প্রার্থনা করতে আপীল বিভাগের শরণাপন্ন হবেন মর্মে সময়ের আবেদন জানান। এবং ২৪ নভেম্বর হুমায়রাকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত করানোর হাইকোর্টের উল্লেখিত নির্দেশ স্থগিত করার প্রার্থনা জানিয়ে আপীল বিভাগে আবেদন করার অনুমতি চাইলে আপীল বিভাগের চেম্বার জাজ সে আবেদন প্রত্যাখান করে।
কিন্তু নির্ধারিত ২৬ নভেম্বর তারিখেও আদালতের নির্দেশ অনুসারে হুমায়রাকে আদালতে উপস্থিত করেনি তার পরিবার। এ অবস্থায় হাইকোর্ট আদালতের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগে হুমায়রার বাবা, মা এবং চাচার প্রতি আদালত অবমাননার নোটিশ জারী করে এবং পরবর্তী ৩ ডিসেম্বর ২০০৮ হুমায়রাকে আদালতে হাজির করাসহ হুমায়রার বাবা, মা এবং চাচাকে সশরীরে আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। উচ্চ আদালতের এই আদেশের প্রেক্ষিতে ৩ ডিসেম্বর হুমায়রার বাবা, মা এবং চাচা আদালতে হাজির হলেও হুমায়রাকে আদালতে উপস্থিত করেনি। আদালত ১৪ ডিসেম্বর ২০০৮ হুমায়রাকে আদালতে উপস্থিত করানোর জন্য পুনরায় হুমায়রার বাবা মার প্রতি নির্দেশ দেন।
হুমায়রাকে মুক্ত করার বাংলাদেশে এই চেষ্টার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের একজন মানবাধিকার কর্মী এ্যান মেরি হাচিনসন ডা. হুমায়রা আবেদীনের পক্ষে বাদী হয়ে ৮ ডিসেম্বর ’০৮ ইংল্যান্ডের হাইকোর্ট অব জাস্টিস-এর ফ্যামিলি ডিভিশনে পিটিশন দায়ের করেন। যার প্রেক্ষিতে ফোর্সড ম্যারেজ এ্যাক্ট-এর আওতায় আদালত ডা. হুমায়রা আবেদীনকে জোরপূর্বক বিবাহ দেওয়ার কোন উদ্যোগ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে এবং এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণে অন্য কাউকে প্ররোচিত না করতে হুমায়রার বাবা মা এবং চাচার বরাবরে আদেশ জারি করেন। ইংল্যান্ডের উচ্চ আদালত এ সময় অবিলম্বে ডা. হুমায়রা আবেদীনকে যেন ইংল্যান্ড অথবা ওয়েলস-এর ভূখণ্ডে ফেরৎ পাঠানোসহ তাঁকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) অথবা ব্রিটিশ ফরেন কমনওয়েলথ কার্যালয় অথবা ব্রিটিশ হাই কমিশনের কার্যালয়ে হাজির অথবা উপরে উল্লেখিত কার্যালয় সমূহের প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলার সুযোগ সৃষ্টি করার আদেশ দেন। উল্লেখ্য, ফোর্সড ম্যারেজ এ্যাক্ট-এর আওতায় প্রথম বারের মতো ইংল্যান্ডের হাইকোর্ট অব জাস্টিস ইংল্যান্ড প্রবাসী কারো পক্ষে এই আদেশ প্রদান করেন।
ইংল্যান্ডের উচ্চ আদালতের এই আদেশ এবং ডা. হুমায়রাকে আদালতে উপস্থিত করানোর বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের পুনর্বৃত্তিক নির্দেশের চাপের মুখে ১৪ ডিসেম্বর ২০০৮ হুমায়রার পরিবার হুমায়রাকে আদালতে উপস্থিত করে। আদালত হুমায়রার সাথে একান্তে আধ ঘণ্টারও বেশি সময় কথা বলে। সে সময় হুমায়রা পরিষ্কার ভাষায় তাঁর পাঁচ মাসের অবরুদ্ধ জীবনের কথা বলে ও তাঁর শিক্ষা ও পেশাজীবন অব্যাহত রাখার জন্য লন্ডনে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। হুমায়রার বক্তব্য শুনে আদালত হুমায়রার পাসপোর্ট, প্লেনের টিকিট ফেরত দিতে তাঁর বাবা মার প্রতি নির্দেশ দেন। তাছাড়া লন্ডন প্রবাসী হুমায়রাকে বাংলাদেশস্থ ব্রিটিশ হাইকমিশনে পৌঁছে দেয়ার জন্য পুলিশ কমিশনারের প্রতি নির্দেশ দেন এবং হুমায়রাকে নিরাপদে লন্ডন পৌঁছাবার সব ব্যবস্থা করতে ব্রিটিশ হাইকমিশনকে অনুরোধ জানান। হাইকোর্ট বিভাগ তাঁর আদেশে ইংল্যান্ডের হাইকোর্টের আদেশের বিষয়টিও উল্লেখ করেন।
হুমায়রা আবেদীনের মামলায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের উল্লিখিত আদেশ নারীর জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষণে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ যা ভবিষ্যৎ নজির হিসেবে কাজ করবে। উল্লেখ্য, হুমায়রা আবেদীন সংক্রান্ত মামলাটির বিচারকার্যে ছিলেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এবং বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের বেঞ্চ আদালত এবং শিপ্রা চৌধুরী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে মামলাটি পরিচালনা করেন যথাক্রমে সারা হোসেন, মুরাদ রেজা, রমজান আলী সিকদার ও নীনা গোস্বামী। হুমায়রার বাবা-মার পক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুবুদ্দিন আহমেদ ও রুহুল কুদ্দুস কাজল।
হুমায়রা বিষয়ে সবশেষ সংবাদ হলো, তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী লন্ডন ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছেন। আদালতের হস্তক্ষেপে হলেও মুক্ত হয়ে তাঁর পেশা ও শিক্ষাজীবনে ফিরে যেতে পেরেছেন। কিন্তু এরকম অনেক নারী নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ের ঘটনায় পরিবার কর্তৃক শারীরিক, মানসিক নির্যাতনসহ বিভিন্ন অধিকার লঙ্ঘর শিকার হচ্ছে, যেগুলো সব সময় প্রকাশ হয় না, হলেও কার্যকর সহায়তার অভাবে প্রতিকারহীনভাবেই থেকে যায়। আবার হুমায়রার মতো উচ্চ শিক্ষিত প্রাপ্তবয়স্ক, অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল নারীর জীবন বাস্তবতা আমাদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সাথে মনে করিয়ে দেয়- শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতা কোনোটিই এককভাবে নারীর জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে যথেষ্ট নয়। হুমায়রাকে আদালতে উপস্থিত না করানোর যুক্তি হিসেবে হুমায়রার বাবা-মা’র পক্ষের নিযুক্ত আইনজীবীরা মিথ্যাভাবে কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাঁকে মানসিকভাবে অসুস্থ দাবি করে এবং বলে ‘হুমায়রা মানসিকভাবে অসুস্থ, অসুস্থ কোনো ব্যক্তি শিশুরই মতো। বাবা মা’র হেফাজতই তার জন্য উপযুক্ত’। তাঁরা এও যুক্তি দেখায়, ‘অবিবাহিত’ বিধায় হুমায়রা বাবা মার হেফাজতই থাকবে। মামলায় হুমায়রার বাবা-মার পক্ষে নিযুক্ত উচ্চ আদালতের সিনিয়র আইনজীবীদের এমন যুক্তিও কি কম শঙ্কার?


মৃত্যুদণ্ড মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন

মাবরুক মোহাম্মদ

 

গত ১০ অক্টোবর পালিত হলো বিশ্ব মৃত্যুদণ্ড বিলোপ দিবস। এ দিন সারা বিশ্বে আবারও মৃত্যুদণ্ড বিলোপের ব্যাপারে আওয়াজ তোলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। ২০০৭ সালের ১৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের জন্য একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। যদিও এই প্রস্তাব আইনগতভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপর বাধ্যতামূলক নয় তথাপি এটি যথেষ্ট নৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। প্রস্তাবটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের ব্যাপারে তাদের কাজ করার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মৃত্যুদণ্ড বিলোপে অনিচ্ছুক দেশগুলোকে তাদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ণে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশে বলবৎ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৩০২ ধারার অধীনে প্রদত্ত সর্বোচ্চ শাস্তি। এছাড়াও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং এসিড সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইনের অধীনে এই শাস্তি প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০০৮ বাংলাদেশ বিষয়ক বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী গত বছর ৯০ জন পুরুষ ও ৩ জন মহিলাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয় এবং কমপক্ষে ৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
বিশ্বব্যাপী শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং দাবি উঠেছে শাস্তি হিসেবে এই বিধান রহিত করার। প্রায়োগিক দিক থেকে মৃত্যুদণ্ড বৈষম্যমূলক। মৃত্যুদণ্ড থাকা সত্ত্বেও সারা বিশ্বেই হত্যাসহ গুরুতর অপরাধগুলোর সংখ্যা কমছে না বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৃত্যুদণ্ডের অকার্যকারিতা প্রমাণের জন্য কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। কানাডা অনেক বছর আগেই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে, অপরপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে এখনও এটি বহাল আছে। কিন্তু কানাডায় অপরাধের হার যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। মৃত্যুদণ্ড তুলে দেয়ার পর কানাডা তাদের দণ্ডনীতিতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে। তারা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে শুরু করে এবং অপরাধীদের পুনর্বাসনের ওপর জোর দেয়। এ ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো ফল দেয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অপরাধ কমাতে মৃত্যুদণ্ডের তেমন ভূমিকা নেই, বরং এর সাথে সম্পর্ক আছে প্রতিশোধপরায়ণতার। বিভিন্ন দেশে এটি দরিদ্র, বর্ণ ও জাতিগত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের বিরুদ্ধে নির্বিচারে ব্যবহৃত হয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে এটিকে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়।
শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিতের মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। সর্বজনীন মানবাধিকর ঘোষণাপত্র প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড এই অধিকার লঙ্ঘিত করে। অনেক সময় বলা হয় ‘অপরাধীর আবার মানবাধিকার কি’। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যদি অপরাধীর অধিকার রক্ষার জন্য প্রস্তুত না থাকি তবে নির্দোষ ব্যক্তির অধিকার রক্ষাও আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ ছাড়াও ঘোষণাপত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কাউকেই অত্যাচার বা নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অসম্মানজনক শাস্তি প্রদান করা যাবে না। মৃত্যুদণ্ড এই অনুচ্ছেদেরও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, কারণ এটি সুস্পষ্টভাবে নিষ্ঠুর ও অমানবিক শাস্তি। অপরাধ নিরোধে অন্যান্য শাস্তির তুলনায় মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতা কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাতেই প্রমাণিত হয়নি। জাতিসংঘ পরিচালিত হত্যার হার ও এ বিষয়ে মৃত্যুদণ্ডের যোগসূত্র বিষয়ক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষাকৃত কম শাস্তি যেমন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের তুলনায় অধিক নিবৃত্তিমূলক- এই ধারণাটি মোটেই যথার্থ বলে প্রমাণিত হয়নি। বরঞ্চ মৃত্যুদণ্ড পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড যা রাষ্ট্রকে অবদমিত এবং সমাজকে আরও সহিংস করে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাধ্যমে রাষ্ট্র ঠাণ্ডা মাথায় একজন মানুষকে হত্যা করে এবং এটি অন্যান্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগের জন্য রাষ্ট্রের প্রস্তুতিও প্রদর্শন করে।
সারা বিশ্বেই মৃত্যুদণ্ড সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকগণ মনে করেন যে, মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি সংশোধনের অযোগ্য এবং তাকে মুক্ত করা হলে সে আবারও অপরাধে জড়িত হবে। কিন্তু এমন অনেক অপরাধীর উদাহরণ আছে যারা সমাজের মূল স্রোতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং পুনরায় অপরাধ করেনি। মৃত্যুদণ্ড ভিকটিমের জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে না। এটি তার পরিবারের দুর্দশা উপশম করতে তো পারেই না অধিকন্তু দীর্ঘ বিচারিক ও আপিল প্রক্রিয়া তাদের দুর্দশাকে প্রলম্বিত করে। এই প্রক্রিয়ায় সবসময় নিরপরাধ ব্যক্তির সাজা পাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রদত্ত তথ্য মতে, ১৯৭৩ সাল থেকে এই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ১১৬ জন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পর তারা নিরপরাধ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘদিন কনডেম সেলে থাকার পর অল্পের জন্য রক্ষা পান। বিচারিক প্রক্রিয়ার এই ত্রুটির জন্য প্রসিকিউশন ও পুলিশ কর্মকর্তার অনিয়ম, সন্দেহজনক সাক্ষ্য ও সাক্ষীর পুনঃপুনঃ পরীক্ষা এবং আসামি পক্ষের আইনজীবীর দুর্বলতাকে দায়ী করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে এই চিত্র সেখানে আমাদের দেশের কথা বলাই বাহুল্য।
মৃত্যুদণ্ড কেবল দণ্ডিতকেই নয় তার পরিবার, আত্মীয় ও বন্ধুদেরও প্রভাবিত করে। দণ্ডিত যদি তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হয় তবে তাদের দুর্দশার সীমা থাকে না। হত্যাকাণ্ডের ফলে ভিকটিমের পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় সন্দেহ নেই; কিন্তু এ জন্য মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে আরেকটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হোক তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
মানবাধিকার একটি সর্বজনীন, সামগ্রিক ও পরস্পর-নির্ভরশীল বিষয়। বিভিন্ন সভ্যতায় এর ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও শান্তির ভিত্তি হিসেবে মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি। এখানে উল্লিখিত অধিকারগুলো প্রত্যেক ব্যক্তির জন্মগত অধিকার। এগুলো কারো প্রতি রাষ্ট্রের দয়া নয় যে রাষ্ট্র সন্তোষ-জনক আচরণের জন্য পুরস্কার হিসেবে প্রদান করবে আবার ভুল আচরণের জন্য প্রত্যাহার করে নেবে। ইউরোপের ২৮টি দেশ মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে। যু্‌ক্তরাজ্যে একমাত্র রাষ্ট্রদ্রোহ ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে একে বিলুপ্ত করা হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভুটান ও নেপাল মৃত্যুদণ্ডকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে এবং মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা অনেক আগেই মৃত্যুদণ্ড বিলোপ করেছে এবং কার্যকরভাবে অনুশীলন করে আসছে। সময় এসেছে আমাদের দেশেও মৃত্যুদণ্ডকে বিলুপ্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ করে মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে এখনই কাজ শুরু করতে হবে, জনগণকে বিষয়টি অবহিত করতে হবে এবং জনমত গঠন করতে হবে। এ কাজে মিডিয়ার সহায়তাও প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট

দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের যুগান্তকারী রায়
প্রিপেইড মিটারিং অসাংবিধানিক, ন্যূনতম পরিমাণ পানি বিনামূল্যে দিতে হবে

মিল্লাত হোসাইন

ন্যূনতম পরিমাণ পানি পাওয়াকে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার ঘোষণা করেছে দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ আদালত। গত ৩০ এপ্রিল ২০০৮ দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ হাইকোর্টের বিচারপতি মোরোয়া পি সোকা (Moroa P Tsoka) এই রায় দেন।
লিন্ডে মাজিবুকো ও অন্যান্য বনাম সিটি অব জোহানেসবার্গ ও অন্যান্য মামলায় তিনি এই মর্মে মন্তব্য করেন যে, পানির অপর নাম যদি জীবন হয়ে থাকে, তবে পয়ঃনিষ্কাশন হচ্ছে তার মর্যাদাস্বরূপ- আর এই মোকদ্দমাটি হয়েছে পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার মৌলিক মানবাধিকার এবং মানবিক মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করার জন্যই। দক্ষিণ আফ্রিকার বৃহত্তম পৌর এলাকা সোয়েটোর উপশহর ফিরিতে নগদে পানি সরবরাহ (prepaid metering) প্রকল্পের বিরুদ্ধে সেখানকার পাঁচ অধিবাসীর দায়ের করা মামলায় হাইকোর্ট এই রায় দেন। বিচারকের এ সিদ্ধান্ত পানির অধিকারকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একটি বৈশ্বিক মাইলফলক (global precedent) হিসেবে প্রশংসা পেয়েছে।
২০০৩ সালে কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত দারিদ্র্য ও এইডসপ্রবণ উপশহর ফিরিতে প্রিপেইড মিটার বসাতে শুরু করে জোহানেসবার্গ সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন সেবা সংস্থা, জোহানেসবার্গ ওয়াটার। এরূপ করার পেছনে জোহানেসবার্গ ওয়াটারের যুক্তি হলো- দীর্ঘদিন ধরে এ এলাকার মানুষ বিল পরিশোধ করছে না। সেখানকার বর্ণবাদী শাসনামলে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎসহ নানা সেবা খাতের বিল না দেয়ার সংস্কৃতি এখনো বজায় রাখছে এখানকার মানুষেরা।
এই প্রকল্পের ফলে, শহরের পক্ষ থেকে প্রদত্ত বিনামূল্যের ৬০০০ লিটার পানি শেষ হওয়ার পর আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যেতো পানি সরবরাহ। এরপর যে ভোক্তা অতিরিক্ত পানির মূল্য অগ্রিম পরিশোধ করতে পারবে কেবল তার সরবরাহ চালু থাকবে। একে বৈষম্যমূলক ও অসাংবিধানিক আখ্যায়িত করে ফিরি শহরতলির ৫ বাসিন্দা জনস্বার্থে এই মামলাটি দায়ের করেন। আর্জিতে তারা আদালতের কাছে সিটি করপোরেশনকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দেশিত অন্যূন পরিমাণ (জনপ্রতি দৈনিক ৫০ লিটার) পানি বিনামূল্যে সরবরাহ করা এবং নগদে পানি সরবরাহের বদলে প্রচলিত বাকিতে পানি সরবরাহের(post-paid metering) সুবিধা তাদের জন্যও উন্মুক্ত রাখার নির্দেশ দেয়ার আবেদন জানান।
বিচারক তার রায়ে বলেন- পানি কম খরচের জন্য মানুষ ব্যবহার্য পানির পরিমাণ হ্রাস করবে, স্বাস্থ্য বিপন্ন করে হলেও টয়লেট ফ্ল্যাশের সংখ্যা কমিয়ে পানি জমিয়ে রাখবে- এমন চিন্তাভাবনার মানেই হলো তাদের সুস্বাস্থ্য এবং মর্যাদাবান জীবনযাপনের অধিকারকে নস্যাৎ করা। তিনি আরো বলেন, যদি জোহানেসবার্গের অধিবাসীদের প্রচলিত মিটারিংয়ের বদৌলতে বাকিতে পানি পাওয়ার অধিকার থাকে অথচ সোয়েটো অধিবাসীরা প্রিপেইড মিটারিংয়ের ফলে একই সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেটা তাদের সাংবিধানিক সমতার অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করবে।
তিনি আরো বলেন- আমার মতে, প্রিপেইড মিটারিংয়ের পেছনে যে যুক্তি, তা হলো বাকিতে পানি সরবরাহকে নিয়ন্ত্রণ করা (credit control)। তাই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এই নিয়ন্ত্রণ কেন শুধু ঐতিহাসিকভাবে দরিদ্র ও কৃষ্ণাঙ্গরা বসবাস করে এমন জায়গাতে প্রয়োগ করা হবে আর ধনী ও শ্বেতাঙ্গদের এলাকায় হবে না, সেটা কিছুতেই আমার মাথায় আসছে না। খেলাপিদের কেবল গায়ের রঙ বা অঞ্চল ভিত্তিতে চিহ্নিত করা যায় না। তদুপরি, বাকিতে পানি সরবরাহের সুবিধা পানেঅলারা বিলখেলাপের ক্ষেত্রে সরবরাহ লাইন কাটার আগে নোটিশ এবং নগর পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করাসহ বকেয়া পুনঃতফসিলিকরণের সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। অন্যদিকে নগদে পানি সরবরাহের সুবিধা পানেঅলাদের এর কোনোটির অধিকার নেই। আদালতের চোখে যা কেবল অযৌক্তিক, অস্বচ্ছ এবং সমতাবিরোধীই নয়, এটা একই সাথে এমন এক চূড়ান্ত প্রকৃতির বৈষম্যের উদাহরণ, যার একমাত্র ভিত্তি হচ্ছে গায়ের রঙ।
এসব কিছু বিচার-বিবেচনা করে বিচারক আবেদন মঞ্জুর করে সিটি অব জোহানেসবার্গের জনপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ লিটার বা পরিবারপ্রতি মাসে ৬ হাজার লিটার পানি বিনামূল্যে দেয়ার সিদ্ধান্তকে বাতিল করেন।
পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের অপরাপর পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ না দিয়ে ফিরি শহরে জোরপূর্বক প্রিপেইড ওয়াটার মিটার স্থাপনকে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে এবং সিটি অব জোহানেসবার্গকে মামলার ৫ আবেদনকারী ও ফিরি শহরের অপরাপর বাসিন্দাদের বিনামূল্যে জনপ্রতি দৈনিক ৫০ লিটার পানি, সিটির খরচে মিটার বসানো এবং বাদি পক্ষের মামলার খরচ প্রদানেরও নির্দেশ দেন।
এই মামলার সিদ্ধান্ত ও তার মর্মার্থ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নগদে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ এবং পানিসম্পদকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে তৎপর বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর প্রতি একটি সতর্কবার্তা বহন করছে বলে অনেকের বিশ্বাস।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট