মত-অভিমত
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে সরকারের দ্বৈতনীতি
এ টি এম মোরশেদ আলম
আন্তর্জাতিক বা দেশি কোনো আদালতে
যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হবে- গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (সংশোধিত) ২০০৮।
স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর এরূপ একটি আইন জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার করবে এটাই স্বাভাবিক। কোনো নির্বাচিত সরকার যা পারেনি বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার সেটাই করে দেখালো, আইনটি কার্যকর হলে স্বাধীনতার প্রতীক জাতীয় পতাকা লাগানো গাড়িতে স্বাধীনতাবিরোধীরা আর চড়তে পারবে না-এমন সুখবোধ ইতোমধ্যে যাদের মনে উদয় হয়েছে তাদের জন্য বলছি, আপনার কল্পনায় আপাতত লাগাম টানুন, পুরো বিষয়টি আগে জানুন তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন।
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (সংশোধিত) ২০০৮ জারি করে যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তাকে সোজাসাপ্টাভাবে জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি বললে বেশি বলা হবে না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কোনো সাধারণ আদালতে করা সম্ভব নয়। ১৯৭৩ সালে প্রণীত আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন অনুসারে তাদের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এই ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করবে সরকার। কিন্তু এই ট্রাইব্যুনাল কখনোই গঠন করা হয়নি। যেখানে কোনো আদালতই গঠন করা হয়নি, বিচার প্রক্রিয়াই শুরু করা হয়নি, সেখানে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের উক্তরূপ বিধানকে জাতির সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?
আইনটির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের নৈতিক বাধাকে আইনি প্রক্রিয়ায় দূর করা হয়েছে। এখন তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে কোনো বাধা নেই। আইন বলছে, আদালত কর্তৃক দণ্ডপ্রাপ্ত হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা যাবে না এবং যেহেতু আমি আদালত কর্তৃক যুদ্ধাপরাধী ঘোষিত হইনি, সুতরাং আমাকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ঠেকায় কে?
ফিরে দেখা
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সরকারি উদ্যোগ যে একেবারেই নেয়া হয়নি তা কিন্তু নয়। ১৯৭২ সালে দালাল আইন প্রণয়ন করে এদের বিচার শুরু করা হয়। এই আইনের আওতায় সারা দেশে গঠন করা হয় ৭৩টি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। ৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ প্রকৃত অপরাধী ছাড়া অভিযুক্ত অন্য সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ৩৭৪৭১ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে ২৮৪৮ জনের বিচার সম্পন্ন হয় এবং ৭৫২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। অবশিষ্টরা খালাস পায়। সাধারণ ক্ষমার আওতায় প্রায় ২৬ হাজার জনকে ক্ষমা করা হয়। অবশিষ্ট ১১ হাজার জন বিচারের সম্মুখীন হয়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করলে এই ১১ হাজার জনও আপিল করার মাধ্যমে বের হয়ে আসে।১ বিচার প্রক্রিয়ার সফলতা বলতে এটুকুই।
পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের ২০ জুলাই জারি করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন। এই আইনের আওতায় বাংলাদেশি রাজাকার, আলবদর, আলশামসের পাশাপাশি পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধেরও বিচার করা সম্ভব। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে ইতি ঘটে এ বিচার প্রক্রিয়ার। ফলে যা সম্ভব ছিল তা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।২
সরকারি উদ্যোগ ও বর্তমান সরকার
বর্তমান তত্ত্ববধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর যথারীতি যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি তাদের কাছে পেশ করা হয়। সরকার বেশ কিছু বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর ইঙ্গিত দিলে বাংলাদেশ সেক্টর কমান্ডারস ফোরামসহ অন্যান্য সংগঠন ও ব্যক্তিরা যুদ্ধাপরাধ এবং গণহত্যার অপরাধীদের বিচারের দাবিকে জোরদার করে এবং এ ব্যাপারে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংবাদ বিভাগের প্রধান ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সাথে একটি মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বলেন, যদি আইনের আওতায় কেউ যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি বিচারব্যবস্থায় নিয়ে আসতে চান, তাঁকে তিনি স্বাগত জানাবেন। তিনি মনে করেন, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গেলে আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার চেয়ে ভালো কিছু নেই।৩ ১৮ মার্চ ২০০৮ লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের একটি মিট দ্য প্রেস অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির সাথে সরকার একমত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ বিচার হওয়া উচিত। বর্তমান সরকার স্বল্পতম সময়ের মধ্যে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা যায় কিনা তা চিন্তা করে দেখছে।’৪
সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ জাতিসংঘেও উত্তোলন করে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ড. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনকে বলেন, ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থায় বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতিসংঘের সহায়তা চাইতে পারে।’৫
আলামত গায়েব
সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত আসামিদের সব ধরনের অধিকার বাতিল করা হয়। যুদ্ধাপরাধের বিচারের সময় প্রচলিত সাক্ষ্য আইন এবং কার্যবিধির বদলে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে আলাদা কার্যবিধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় সাক্ষী পাওয়ার সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে এই আইনে সংবাদপত্রের খবর, দাপ্তরিক নথি, ফিল্ম এবং রেকর্ড করা টেপকে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করার বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের এই বিধান যুদ্ধাপরাধীদেরও অজানা নেই, বরং সবার চেয়ে তারাই ভালো জানে বোধ হয়। সেই কারণে দালাল আইনে যে বিচার শুরু হয়েছিল সেসব মামলার নথি অনেক আগেই গায়েব হয়ে গেছে। এখন নতুন করে শুরু হয়েছে সংবাদপত্রের কপি গায়েব। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে এবং পাকিস্তানের পক্ষে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান, যুদ্ধাপরাধীদের নাম ও বক্তব্য ছাপা হতো দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায়। এ কারণে সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশন থেকে এই পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা সরিয়ে ফেলার নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে। ‘মুক্তিযুদ্ধে দৈনিক সংগ্রামের ভূমিকা’ গ্রন্থের লেখক ও গবেষক আলী আকবর বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী চক্রটি নিজেদের কুকীর্তি ঢাকার জন্য সম্ভাব্য সব জায়গা থেকে সুপরিকল্পিতভাবে দৈনিক সংগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের কপিগুলো সরিয়ে ফেলেছে। তিনি আরো জানান, ‘আমি আমার গবেষণার জন্য পাবলিক লাইব্রেরি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে ’৭১ সালের সংগ্রাম পত্রিকা খুঁজতে গিয়ে পাইনি। আমি সেখানে গিয়ে জানতে পারলাম, এক সময় এগুলো থাকলেও এখন আর নেই। কেন নেই? এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানতে পারলাম, জামায়াত নেতারা মুক্তিযুদ্ধে তাদের বিরোধিতার প্রমাণ মুছে ফেলতে এগুলো সরিয়ে ফেলেছে।’৬
কোনো সরকারই এসব আলামত রক্ষার ব্যাপারে যত্নবান হয়নি। বিভিন্ন সময় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এসব আলামত সংগ্রহ ও রক্ষার জন্য দাবি জানানো হলেও তা করা হয়নি।
শেষ কথা
যুদ্ধাপরাধের বিচার নতুন করে শুরু করার কোনো প্রয়োজন নেই। যেখানে এসে বিচার থেমে গিয়েছিল সেখান থেকেই শুরু করা যেতে পারে। প্রয়োজন শুধু সরকারি উদ্যোগ। শুধু মুখে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবির প্রতি একাত্ম প্রকাশ করলে চলবে না, দেশে-বিদেশে যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ-আলামত আছে তা সংগ্রহ করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে।য়
এ টি এম মোরশেদ আলম গবেষক ও আইনজীবী
তথ্যসূত্র
১ গণআদালত ১৯৯২: ফিরে দেখা ও মূল্যায়ন- মিল্লাত হোসাইন, যুদ্ধাপরাধ, প্রকাশক আসক, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ৬৬
২ ‘শুরু হয়েও যেভাবে থমকে গেছে যুদ্ধাপরাধের বিচার’, সমকাল ২৭ জানুয়ারি ২০০৮।
৩ ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে আইনের দরজা খোলা আছে’, প্রথম আলো, ১ নভেম্বর ২০০৭।
৪ ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেয়া যায় কি-না ভাবা হচ্ছে’, সমকাল, ২০ মার্চ ২০০৮।
৫ ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গ জাতিসংঘে তুললো সরকার’, সমকাল, ২ এপ্রিল ২০০৮।
৬ ‘বিভিন্ন লাইব্রেরিতে জামাতি অপকর্ম’, ভোরের কাগজ, ১৬ ডিসেম্বর ২০০৭।
জাতীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য
কামরুজ্জাহান ফ্লোরা
নারী কি দুই প্রকার- অবিবাহিত আর বিবাহিত? যদি তাই হয় তাহলে পুরুষও দুই প্রকার- অবিবাহিত ও বিবাহিত। এমনটা যদি না হয় তাহলে কেন বিবাহিত নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে এত বৈষম্য? আমি আমার জীবনযাপনে প্রতিনিয়ত যেসব বৈষম্য দেখি তারই কয়েকটি দিক এ লেখায় তুলে ধরছি-
জাতীয় পরিচয়পত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য
গত ২০ জুলাই আমি এবং আমার স্বামী ভোটার আইডি কার্ড অর্থাৎ জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করি। পরিচয়পত্র দুটি নিয়ে বাসায় ফিরে আমার স্বামী খুব গর্বের সাথে বলেন, তিনি যে আমার স্বামী তা জাতীয়ভাবে স্বীকৃত। কিন্তু আমি তা বলতে পারি না। এর কারণ তার পরিচয়পত্রে যে তথ্যগুলো রয়েছে সেগুলো হলো- তার নাম, তার পিতার নাম, তার মায়ের নাম এবং তার জন্মতারিখ। পক্ষান্তরে আমার পরিচয়পত্রের তথ্যগুলো হলো- আমার নাম, আমার স্বামীর নাম, আমার মায়ের নাম এবং জন্মতারিখ। আমার স্বামীর পরিচয়পত্রের কোথাও আমার নামের উল্লেখ নেই। অর্থাৎ আমি যে তার স্ত্রী সেটা শুধু কাবিননামায় উল্লেখ আছে অথচ তিনি যে আমার স্বামী সেটা জাতীয় পরিচয়পত্রেও উল্লেখ করা হয়েছে।
এমনও তো হতে পারে, আমার এবং আমার স্বামীর মধ্যে বনিবনা হলো না এবং আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। তখন আমি নিশ্চয়ই চাইবো না আমার পরিচয়পত্রে তার নাম থাকুক। সে ক্ষেত্রে এই পরিচয়পত্রটি নতুন করে তৈরি করতে হবে। অথচ তার ক্ষেত্রে ব্যাপারটি কত সহজ। তার কার্ডে তার স্ত্রীর নাম না থাকায় তাকে কখনোই এগুলো নিয়ে ভাবতে হবে না। তিনি খুব সহজেই নতুনভাবে অন্য একজনকে নিয়ে সংসার শুরু করতে পারবেন। এছাড়াও কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তার মৃত্যুও হতে পারে। তখন যদি আমি নতুনভাবে কাউকে নিয়ে সংসার করতে চাই তখনও আমার পরিচয়পত্রটি নিয়ে আমাকে ঝামেলায় পড়তে হবে।
আরেকটা কথা না বলে পারছি না। আমার বিয়ের বয়স এক বছর। বিয়ের পূর্ব পর্যন্ত আমি আমার বাবার নামে পরিচিত ছিলাম। অথচ ভোটার আইডি কার্ডে আমার বাবার নামটিকে বাদ দেয়া হয়েছে। আমি যখন আইডি ফরম পূরণ করি তখন আমার বাবার নামের কলামটিও পূরণ করেছি। অথচ কার্ডে তার নামের কোনো উল্লেখ নেই। শুধু বিবাহিত হওয়ার কারণে আমার পরিচয় থেকে আমার বাবার নাম বাদ দিয়ে আমার স্বামীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আমার স্বামীর ক্ষেত্রে তো তার পূর্ব পরিচয় মুছে ফেলতে হচ্ছে না, তবে আমি কেন আমার পরিচয় মুছে ফেলবো?
আমি পরিচয়পত্রটি হাতে পেয়ে এত বেশি বিস্মিত হয়েছি যে, এটি আমাকে মানসিকভাবে পীড়া দিচ্ছে। পরিচয়পত্রে আমার স্বামীর নাম রয়েছে তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তার কার্ডে কেন আমার নাম থাকবে না? এমন হতে পারতো, তার কার্ডে তার নাম, তার পিতার নাম, তার মায়ের নাম এবং তার স্ত্রীর নাম অর্থাৎ আমার নাম থাকতে পারতো। পক্ষান্তরে আমার কার্ডেও আমার নাম, আমার পিতার নাম, আমার মায়ের নাম এবং আমার স্বামীর নাম থাকতে পারতো।
পাসপোর্টে নারীর পরিচয় সঙ্কট
বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেই পাসপোর্ট করতে পারে। পাসপোর্ট করতে কিছু নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রথমত, পাসপোর্ট ফরম পূরণ করতে হয়। পাসপোর্ট করার জন্য নারী-পুরুষ সবার একই ফরম পূরণ করতে হয়। আমি আমার পাসপোর্ট ফরম পূরণ করে জমা দিই। আমার ফরমে আমি স্থায়ী ঠিকানায় আমার পিতার বাড়ির ঠিকানা উল্লেখ করি। জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতার নাম না থেকে স্বামীর নাম থাকার কারণে পাসপোর্টেও আমাকে স্বামীর নাম উল্লেখ করতে হয়েছে।
পরবর্তীকালে আমার বাসায় ভেরি-ফিকেশনের জন্য একজন পুলিশ আসেন। স্থায়ী ঠিকানার ভেরিফিকেশন করার সময় তিনি বলেন, এটা তো আপনার বাবার বাড়ির ঠিকানা, যেহেতু আপনি বিবাহিত সেহেতু স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে আপনার শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা দিতে হবে। আমি এর প্রতিবাদ করি। তখন তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে প্রত্যেক বিবাহিত নারীর স্থায়ী ঠিকানায় তার স্বামীর স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু আমি মনে করি, পাসপোর্ট হলো বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমার পরিচয়ের দলিল। এখানে অবশ্যই আমার নিজস্ব পরিচয় অর্থাৎ আমার নাম, আমার বাবা-মায়ের নাম, আমার স্বামীর নাম, আমার স্থায়ী ঠিকানা এবং বর্তমান ঠিকানাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য থাকতে হবে। শুধু বিবাহিত হওয়ার কারণে আমার পরিচয় বদলে যাবে এটা কীভাবে সম্ভব?
আমি বাংলাদেশের একজন নাগরিক এটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি বিবাহিত নাকি অবিবাহিত এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পরিচয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিবাহিত নারীদের পরিচয়ের ক্ষেত্রে তার স্বামীর পরিচয়ে তাকে পরিচিত হতে হয়। এটা যে কোনো সভ্য সমাজে একটা অমর্যাদাকর ব্যবস্থা বলে আমি মনে করি।
বাসের সংরক্ষিত আসন
ঢাকায় বসবাসরত অধিকাংশ নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন কাজে নিয়মিত বাসে যাতায়াত করতে হয়। আমাকেও প্রত্যেক দিন ‘রাজধানী এ্রক্সপ্রেস’ নামক ‘সিটিং’ বাসে রিং রোড থেকে পল্টনে অফিস করতে যেতে হয়। প্রতিটি বাসে ড্রাইভারের পেছনের তিনটি সারি অর্থাৎ ৯টি আসন নারী/শিশু/প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত। অথচ রোজ দেখা যায়, বাসে উঠে প্রথমেই কিছু পুরুষ ঐ তিনটি আসনে বসেন। পুরো বাস ফাঁকা পড়ে থাকলেও সামনের ঐ তিনটি আসনে বসার লোকের অভাব হয় না। যারা ঐ তিনটি আসনে বসেন, তারা ঐ সিটের ওপরে সংরক্ষিত আসন লেখা স্টিকার দেখেই বসেন। এমনও দেখা যায়, নারীরা দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করছেন আর দিব্যি ঐ নয়টি আসনে পুরুষ যাত্রীরা বসে আছেন। প্রায়ই যেটা হয় সেটা হলো, কোনো নারী বা যে কেউ যদি সংরক্ষিত আসনে বসে থাকা পুরুষদের বলেন- এটা মহিলাদের সিট, তাহলে আর রক্ষা নেই। এমন কোনো অসম্মানজনক কথা নেই যা তারা বলেন না। প্রথমেই উত্তর আসে, আগে পেছনের আসনে যারা (নারীরা) বসেছে তাদের তোলেন, পরে আমাকে বলবেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঐ আসন ৯টিতে যারা বসেন তারা ‘ভদ্রলোক’- কোনো না কোনো অফিসে কর্মরত। অথচ তারা যে ব্যবহার করেন তাতে বিশ্বাস হতে কষ্ট হয়, তারা নারীদের ন্যূনতম সম্মান করেন। এ রকম কথোপকথনের সময় যারা বাসটিকে নিয়ন্ত্রণ করেন অর্থাৎ ড্রাইভার-হেলপার তারা প্রায়শ কোনো পদক্ষেপ নেন না। তারা ঐ আসনগুলোতে পুরুষরা বসার সময় বলেন না যে, এই আসনগুলো সংরক্ষিত, আপনারা পেছনের আসনগুলোতে বসেন। আমি কৌতূহলবশত একবার একজন হেলপার ও একজন ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- ঐ আসনগুলো যে সংরক্ষিত তারা সেটা জানেন কিনা। তাদের উত্তর ছিল, ‘মালিক বলতে পারবে আমরা জানি না।’ এখন আমার প্রশ্ন হলো, বাস মালিকদের দায়িত্ব শুধু স্টিকার লাগানো নাকি বাসে কর্মরত সব স্টাফকে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করা?
আমি বুঝতে পারি না, বাস কর্তৃপক্ষ কেনই-বা ঐ তিনটি আসনে সংরক্ষিত স্টিকার লাগিয়েছে আর যারা বসেন তারা নিজেদের নারী/শিশু/প্রতিবন্ধী এই তিনটির কোনটি ভেবে বসেন? তারা কি সবাই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী? সংরক্ষণ যদি রাখা হয় তাহলে অবশ্যই তা পালন করা উচিত। শুধু শুধু সংরক্ষিত আসনের নাম করে নারীদের অধিকার সংরক্ষণের বদলে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রয়োজন কোথায়? আর এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষেরই-বা দায়িত্বটা কোথায়? একটা নিয়ম বা আইন করা হলো অথচ সেটার কোনো প্রয়োগ বা ব্যবহার যদি না-ই থাকে তাহলে সেটা মানুষ হিসেবে একজন নারী বা পুরুষের মর্যাদা বাড়ায়, নাকি আরও খাটো করে?য়
কামরুজ্জাহান ফ্লোরা, চাকরিজীবী
সাইবার পর্নোগ্রাফি
প্রতিকার এখনই প্রয়োজন
মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী
অনলাইন পর্নোগ্রাফি বা সেলফোন পর্নোগ্রাফি সম্পর্কে এখন কমবেশি সবাই জানেন। বিশেষ করে উঠতি বয়সের কিশোর, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের কাছে এর চাহিদা ব্যাপক। অনলাইন পর্নোগ্রাফির এই পরিধিতে অজস্র উপায়ে সামাজিকভাবে হেয় এবং হয়রানির শিকার হচ্ছে মেয়েরা। প্রধানত উঠতি বয়সের কিশোরী ও তরুণীরাই এ অপরাধের শিকার।
বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছাত্রীরা মনে করে- সেলফোন পর্নোগ্রাফি বা অনলাইন পর্নোগ্রাফির কারণে তাদের সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিসত্তা অপমানজনক অবস্থানে নেমে আসছে। বিশেষত প্রধান প্রধান শহর এলাকা, রাজধানীর মেয়েরা এই কারণে বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছে।
বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবসায়ে যে সাইটগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি তার তালিকাটি নিম্নরূপ-
ঙ Ularz site-- পাইরেটেড বই, চলচ্চিত্র সংবলিত।
ঙ পর্নোগ্রাফি সাইট।
ঙ Tube-video site- কম দৈর্ঘ্যের ছবি বা ভিডিও আপলোড করা যায়।
ঙ বিভিন্ন ধরনের কমিউনিটি সাইট। যেমন- ফেইসবুক, হাইফাই ইত্যাদি।
ঙ ব্লগ।
তালিকাটি দেখলেই বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফির চাহিদা সম্পর্কে সহজেই স্বচ্ছ ধারণা জন্মে।
যেসব সাইট পরিচালিত হয় সেসব সাইটে কতজন লগ ইন করছেন, কতজন আপলোড বা ডাউনলোড করছেন তার ওপরই নির্ভর করে অনলাইন ব্যবসার সাফল্য। ব্যবসায়িক লাভের চূড়ান্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে পর্নোগ্রাফি সাইটগুলো যে পলিসি প্রয়োগ করছে তা হলো- বহুল পরিচিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বা অধ্যয়নরত মেয়েদের ভিডিও বা চিত্র ধারণ এবং তা আপলোড করা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ভিডিও ধারণ করা হয় মেয়েটির মত না নিয়ে এবং গোপনে। ভিডিওচিত্র ধারণ করার সময় নিশ্চিত করা হয় প্রতিষ্ঠানের লোগোর উপস্থিতি। যার ফলশ্রুতিতে ভিডিও/চিত্রের মেয়েটিকে সহজেই শনাক্ত করা যায়। এরপর হয়রানির শিকার মেয়েটি পারিবারিক, সামাজিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়ে কখনো কখনো আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত বা কর্মরত এই মেয়েরা পেশাদার পর্নোগ্রাফি তারকা নন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, প্রেম হতে উদ্ভূত বিভিন্ন পরিবেশে মেয়েটির দুর্বলতার সুযোগেই এই ভিডিও চিত্রগুলো ধারণ করা হয়েছে। সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার সাথে সাথেই প্রেমিকটি নির্দ্বিধায় এসব ভিডিও বন্ধুদের সাথে শেয়ার এবং ইন্টারনেটে আপলোড করে। পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা এ ক্ষেত্রে কোনো কাজে লাগে না। এমনকি এসব পর্নোগ্রাফি সাইটগুলো ভিজিট করে দেখা গেছে- বিভিন্ন ধরনের যানবাহনে ভ্রমণকালীন মেয়েদের অসতর্ক মুহূর্তের ছবি, ভিডিও ধারণ করেও এসব সাইটগুলোতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।
‘স’ আদ্যাক্ষর সংকলিত একটি বহুল পরিচিত পর্নোগ্রাফি ওয়েবসাইটে দৈনিক আপলোড হয় প্রায় এক হাজার ভিডিও এবং চিত্র, ডাউনলোড হয় প্রায় ২০ হাজার ভিডিও/চিত্র। এই পুরো সাইটটি বাংলাদেশের নাগরিক বলে (রাষ্ট্রে বা দেশের বাইরে অবস্থানরত) গণ্য মেয়েদের ভিডিও/চিত্রের ওপর ভিত্তি করে। অথচ রাষ্ট্র ইচ্ছে করলেই এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারে। এই সাইটটির ওচ অফফৎবংং টি ব্লক করলেই বাংলাদেশে এর ভোক্তারা আর তা ব্যবহার করতে পারবে না এবং ফলে বাংলাদেশের মেয়েদের সামাজিক হয়রানির পরিধিটুকুও অনেক ছোট হয়ে যাবে। এই ওয়েবসাইটটি মূলত পরিচালিত হয় ‘একটেল সুমন-পিন্টু’র তত্ত্বাবধানে। তারা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছে। একটেল সুমন-পিন্টুই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সাধারণ মেয়েদের হয়রানির এই ক্রেজটি চালু করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, দেশের তরুণ সমাজের একটি বিরাট অংশ এখন এই কাজটিকে বিনোদন হিসেবে বিবেচনা করে।
সেলফোন অপব্যবহারের ফলে সৃষ্ট অপরাধের নিমিত্তে আমাদের এখানে কোনো আইন না থাকায় ভিকটিম অপরাধীকে সরাসরি শনাক্ত করতে পারলেও তার বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে না। ইংল্যান্ডে অভিযোগকারীর অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যক্তিগত ল্যাপটপে পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানোর ক্ষমতা পুলিশের আছে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোতে এ সংক্রান্ত আইন পরিলক্ষিত হয়। ইন্টারনেটে ‘পার্সোনাল প্রাইভেসি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার বলে গণ্য হলেও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। ইলেকট্রনিক সামগ্রীর সহজলভ্যতা, ইন্টারনেট ব্যবহারের অবাধ সুযোগের অপব্যবহারের ফলেই এই অপরাধের উৎপত্তি। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন সহিংসতা ও নিপীড়নবিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। পর্নোগ্রাফিভিত্তিক এসব অপরাধের শিকার যেহেতু এখনো দেশের বিরাট অংশ নয়, সেহেতু আমরা চোখে ঠুলি বেঁধে এই দুষ্টক্ষতকে এড়িয়ে চলছি। অথচ এ ব্যাপারে পারিবারিকভাবে নৈতিক শিক্ষা বৃদ্ধির সাথে সাথে রাষ্ট্রের তরফ থেকে সুস্পষ্ট আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অপরাধীকে দমনের জন্য, অপরাধের বিসতৃতি লাভের আগেই সরকারের উচিত এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন।য়
মুক্তাশ্রী চাকমা সাথী, ৪র্থ বর্ষ আইন বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়