প্রচ্ছদ-কাহিনী
যুদ্ধাপরাধের বিচারে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা
বাংলাদেশের জন্য পথনির্দেশ
কামরুন্নেসা নাজলী
কয়েক শতক আগে থেকেই যুদ্ধাপরাধ বিষয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে প্রথাগত আইন বিদ্যমান ছিল। এই প্রথাগত আইনগুলোকেই যথাক্রমে ১৮৯৯ এবং ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশনের মাধ্যমে বিধিবদ্ধ করা হয়। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জার্মানি ও জাপানের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত ন্যুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক আইনের আধুনিক ধারণার সূচনা। ১৯৪৫ সালের ৮ আগস্ট প্রকাশিত লন্ডন সনদের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধ, শান্তি ও মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ সংজ্ঞায়িত করে।
এরপর ১৯৪৮ সালে গৃহীত হয় গণহত্যা সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশন, যেখানে গণহত্যা সংঘটনের পরিকল্পনা, সহায়তা, প্ররোচনা বা চেষ্টাকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং গণহত্যাকে সংজ্ঞায়িত করার পাশাপাশি গণহত্যার ঘটনায় বিচার, শাস্তি প্রদান এবং গণহত্যা প্রতিরোধের ব্যাপারে পক্ষরাষ্ট্রের ওপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। যুদ্ধকালীন সবধরনের মানবতাবিরোধী কার্যক্রম থেকে যুদ্ধরত পক্ষকে বিরত রাখতে এবং বেসামরিক জনসাধারণ, লোকালয় ও স্থাপনাগুলো রক্ষার্থে ১৯৪৯ সালে চারটি পৃথক কনভেনশনের মাধ্যমে গৃহীত হয় জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ এবং ১৯৭৭ সালে জেনেভা কনভেনশনের বর্ধিত দুটি প্রটোকল গৃহীত হয়। ১৯৭২ ও ১৯৮৪ সালে জেনেভা কনভেনশনে কিছু সংযোজন করে বলা হয়- কোনো দেশের অভ্যন্তরেও যদি কোনো জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্যোগ নেয়া হয়, সেটা যুদ্ধাপরাধ বলে বিবেচিত হবে। উল্লিখিত আইনি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময়ে সাবেক যুগোশ্লাভিয়া ও রুয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারে জাতিসংঘের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় যথাক্রমে যুগোশ্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল ও রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পৃথক দুটি রেজুলেশনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় অস্থায়ী বিশেষ এই ট্রাইব্যুনালগুলো।
যুগোশ্লাভিয়া ট্রাইব্যুনাল
যুগোশ্লাভিয়া ট্রাইব্যুনালের আওতায় ইতিমধ্যে অন্যতম অভিযুক্ত সার্বনেতা রাদোভান কারাজ্জিচ গ্রেফতার হয় ২১ জুলাই ২০০৮। গ্রেফতারের পর ৩০ জুলাই তাকে ট্রাইব্যুনালের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ পর্যন্ত যুগোশ্লাভিয়া ট্রাইব্যুনালে ১৬১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে ১০৪ জনের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে ট্রাইব্যুনাল। ২০১০ সাল নাগাদ এই ট্রাইব্যুনালের সমস্ত বিচার সম্পন্ন করার কথা। অন্যদিকে একই আদলে গড়া রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ৪০টি বিচার সম্পন্ন করেছে, যার মাধ্যমে ৩৪ জন দোষী সাব্যস্ত হয়। ২৩ টি মামলা এখনও বিচারাধীন এবং ৮টি মামলা বিচার শুরুর অপেক্ষায়। ১৮ ডিসেম্বর ২০০৮ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্নেল থিওনেস্টে বাগোসোরাসহ সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তাকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংগঠিত হত্যাকান্ডে রুয়ান্ডার সেনাবাহিনী এবং ইনতারাহাল্ফ্বে হুতু মিলিশিয়া বাহিনী কর্তৃক আট লাখেরও বেশি সংখ্যালঘু তুতসি এবং উদারপন্থি হুতুকে হত্যা করা হয়। নৃশংস এই হত্যাযজ্ঞ সংগঠনের পরিকল্পনা, সংগঠন ও ইনতারাহাল্ফে হুতু মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে এই তিন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এই দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
অস্থায়ী ভিত্তিতে হলেও ন্যুরেমবার্গ ও টোকিও ট্রাইব্যুনালের দুর্বলতাকে কাটিয়ে এই দুটি ট্রাইব্যুনালেই অভিযুক্তের আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যবস্থাসহ আপিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত
যুদ্ধাপরাধের বিচারে অস্থায়ীভাবে গঠিত ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, টোকিও ট্রাইব্যুনাল এবং যুগোশ্লাভিয়া ও রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের অভিজ্ঞতা থেকেই যুদ্ধাপরাধীসহ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যান্য গুরুতর অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিকভাবে স্থায়ী একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি সামনে আসে। এবং যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গের বিচারে স্থায়ী কার্যকর আন্তর্জাতিক আদালত প্রবর্তনে ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে রোমবিধি নামে এক চুক্তি গৃহীত হয়। প্রয়োজনীয় ৬০টি রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার পর ২০০২ সালের ১ জুলাই রোমবিধি কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’-এর যাত্রা শুরু হয়।
রোমবিধি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত- যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ এবং জেনোসাইড ইত্যাদি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, ব্যক্তিবর্গের বিচারের এখতিয়ার রাখে এবং উল্লিখিত অপরাধগুলো যখন রোমবিধির পক্ষ কোনো রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সংঘটিত হয় অথবা পক্ষরাষ্ট্রের কোনো নাগরিক যদি এরূপ অপরাধে অভিযুক্ত হয় অথবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক প্রেরিত কোনো অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচার করার এখতিয়ার এই আদালতের আছে। রোমবিধি অনুযায়ী ২০০২ সালের ১ জুলাই বা এর পরে সংঘটিত অপরাধ বিচারে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’-এর এখতিয়ার থাকবে এবং বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় বিচারিক ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে রাষ্ট্র যখন ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত’-এর এখতিয়ারভুক্ত অপরাধের বিচার করতে অসমর্থ হবে তখনই কেবল এ আদালত তার এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারবে। নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের স্থায়ী কার্যালয় অবস্থিত। তবে প্রয়োজনে অন্য স্থানেও এই আদালত বসানোর বিধান আছে।
যাত্রা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত যথাক্রমে উগান্ডা, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক এবং সুদানের দারফুর ঘটনায় মোট চারটি মামলা আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারাধীন আছে। এর মধ্যে উগান্ডা, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো এবং সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিকের মামলা এই তিনটি পক্ষরাষ্ট্র কর্তৃক এবং দারফুর বিষয়টি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক এই আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আদালত উল্লিখিত মামলাগুলোতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিসহ বেশ অগ্রগতি সাধন করেছে। উগান্ডার ঘটনায় আদালত জোসেফ কোনিসহ লর্ডস রেজিস্টেন্স আর্মির চার শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ২০০৭ সালের মে মাসে সুদানের মানবিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রী আহমেদ মুহাম্মদ হারুন ও জানজাবিদ নেতা আলি মুহাম্মদ আলি আবদ আল রহমানের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। অন্যদিকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির প্রেক্ষিতে কঙ্গোর মামলায় টমাস লুবাঙ্গা (১৭ মার্চ ২০০৬) ও জার্মেন কাতাঙ্গা (১৭ অক্টোবর ২০০৭) আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। ২০০৮ সালের মে মাসে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক মামলায় বিদ্রোহী দল মুভমেন্ট দি লিবারেশন ডিউ কঙ্গোর নেতা জ্যঁ পিয়েরি বেম্বা গম্বোর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠনের অভিযোগ গঠন করা হয়।
এক্সট্রা অর্ডিনারি চেম্বার, কম্বোডিয়া
মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিচারে স্থায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সমান্তরালে জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগে সামপ্রতিক সময়ে বিশেষ হাইব্রিড ধরনের বিচার ব্যবস্থাও প্রত্যক্ষ করা যায়। যেমন, সত্তর দশকে খেমাররুজ বাহিনী কর্তৃক কম্বোডিয়ায় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, জোরপূর্বক নির্বাসনে পাঠানো, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের মতো মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারে জাতিসংঘ ও কম্বোডিয়া সরকারের যৌথ পরিচালনায় এক্রট্রা অর্ডিনারি চেম্বার নামের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বর্তমানে কাজ করছে। জাতিসংঘ ও কম্বোডিয়া সরকারের মধ্যে সম্পাদিত সমঝোতা চুক্তি (২০০৩) ও খেমাররুজ শাসনামলে সংঘটিত বিভিন্ন গুরুতর অপরাধ বিচারে ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ২০০১ সালে প্রণীত বিশেষ আইন অনুসারে এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় এবং ২০০৬ সালে এই ট্রাইব্যুনাল কাজ শুরু করে। কম্বোডিয়া এবং জাতিসংঘের যৌথভাবে প্রতিষ্ঠিত এ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল- কম্বোডিয়ান এবং আন্তর্জাতিক বিচারক, প্রসিকিউটর এবং তদন্তকারীদের সমন্বয়ে গঠিত মিশ্র ধরনের ট্রাইব্যুনাল। এটি কম্বোডিয়ার আদালত ব্যবস্থার আওতায় খেমাররুজ শাসনামলে সংঘটিত অপরাধের বিচারে গঠিত বিশেষ আদালত। এই এক্সট্রা অর্ডিনারি চেম্বারের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে নমপেনে। তিন বছর সময়সীমার এই ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার জ্যেষ্ঠ খেমাররুজ নেতা এবং গুরুতর অপরাধের জন্য প্রধানত দায়ী ব্যক্তিদের বিচারেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কারা খেমাররুজ নেতা এবং কারা সংঘটিত ঐসব অপরাধের জন্য প্রধানত দায়ী- তা বিবেচনার দায়িত্ব ট্রাইব্যুনালের। বিচারে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। তবে ট্রাইব্যুনাল অভিযুক্তের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে। এর মধ্যে ২০০৭ সালের জুলাই মাসে ৫ জন সম্ভাব্য অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রস্তুত করা ট্রাইব্যুনালের তরফে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এবং এখন পর্যন্ত আটক খেমাররুজ নেতার সংখ্যা পাঁচ। তারা হলেন- খেমাররুজ আমলের এস-২১ নামে পরিচিত নির্যাতন ক্যাম্পের অধিনায়ক ক্যাং কেক লিও ওরফে কমরেড ডুম, ব্রাদার টু নামে পরিচিত নিওন চিয়া, খেমাররুজ সরকারের বিদেশ মন্ত্রী ইয়েং স্যারি, তার স্ত্রী তৎকালীন সামাজিক সম্পর্ক বিষয়ক মন্ত্রী ইয়েং থিরিথ এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খিউ সাম্পান। আটক এসব খেমাররুজ নেতার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮। বিচারপূর্ব শুনানি শুরু করেছে ট্রাইব্যুনাল এবং এ প্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, মামলার কার্যক্রমে নাগরিক পক্ষ হিসেবে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ এই ট্রাইব্যুনালের একটি বিশেষ দিক।
স্পেশাল কোর্ট ফর সিয়েরালিওন
হীরা খনি অধ্যুষিত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সিয়েরালিওনে ১৯৯১ সাল থেকে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এ লক্ষ্যে জনসাধারণের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করতে লাইবেরিয়া সমর্থিত বিদ্রোহী রিভ্যুলশনারি ফ্রন্ট (আরইউএফ) ব্যাপক মাত্রায় গণধর্ষণ ও জোরপূর্বক অঙ্গচ্ছেদনের মতো নৃশংস অপরাধে লিপ্ত হয়। এসবের সাথে জড়িতদের বিচারে জাতিসংঘ ও সিয়েরালিওনের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় স্পেশাল কোর্ট ফর সিয়েরালিওন নামের বিশেষ আদালত। সিয়েরালিওনে অবস্থিত রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বিচারকদের সমন্বয়ে গঠিত এই আদালত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে উল্লিখিত গৃহযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচারের লক্ষ্যে ২০০৪ সালের জুন মাসে কার্যক্রম শুরু করে। ৬ বছরমেয়াদি এই ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছে এবং এর মধ্যে ৮ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, সিয়েরালিওনের গৃহযুদ্ধের অন্যতম মদদদাতা ও সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত লাইবেরিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি চার্লস টেইলরের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন। যদিও নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নে টেইলরের বিচার কার্যক্রম হেগে স্থানান্তর করা হয়েছে।
পূর্ব তিমুর
১৯৯৯ সালে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী ও ইন্দোনেশিয়া সমর্থিত তিমুর সেনাবাহিনীর সদস্যরা ইন্দোনেশিয়া থেকে স্বাধীনতা প্রত্যাশী পূর্ব তিমুরের প্রায় দুই হাজার লোককে হত্যা করে এবং প্রায় ৫ লাখ লোককে জোরপূর্বক ঘরবাড়ি ছাড়া করে। এ সহিংসতার বিচারে ইন্দোনেশিয়া কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করা হয় অ্যাডহক হিউম্যান রাইটস ট্রাইবুন্যাল। একে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ বিচারের জন্য জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক চাপকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস বলে অভিহিত করে মানবাধিকার কর্মীরা ইন্দোনেশিয়ার এই উদ্যোগকে খারিজ করে দেয়। পরবর্তীকালে জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্বাধীনতা অর্জনকারী পূর্ব তিমুরে সে সময় অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জাতিসংঘ তদন্ত পরিচালনা ও বিচারের লক্ষ্যে সিরিয়াস ক্রাইমস ইনভেস্টিগেশন ইউনিট গঠন করে। এ প্রক্রিয়ায় ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের অভিযুক্ত করা হয়। তবে ইন্দোনেশিয়ার সরকার কর্তৃক এই ব্যবস্থার স্বীকৃতি না দেয়া এবং অভিযুক্তদের সমর্পণে ইন্দোনেশিয়ার অস্বীকৃতির কারণে এ প্রক্রিয়া তেমন এগোতে পারেনি।
এ অবস্থায় উল্লিখিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত এবং আইনি কার্যক্রম বিষয়ে সুপারিশ প্রদানের লক্ষ্যে ২০০০ সালে গঠন করা হয় কমিশন ফর রিসিপশন, ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন নামের একটি কমিশন। সংঘটিত নির্যাতনের বিস্তৃত বয়ান তুলে ধরে ২০০২ সালে কমিশন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অন্যদিকে সিরিয়াস ক্রাইমস ইনভেস্টিগেশন ইউনিটও এ বিষয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে পূর্ব তিমুরের সরকারের অবস্থান রিকনসিলিয়েশনের পক্ষে, যা কিনা অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে কোনো আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল গঠনের পথের অন্তরায়।
মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিচারে উল্লিখিত সব ব্যবস্থার সম্ভাবনার পাশাপাশি দুর্বলতাও আছে। যেমন, কম্বোডিয়া ও সিয়েরালিওনের প্রথাগত ন্যায়বিচার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ক্ষতিপূরণের বিধান। কিন্তু মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারে ওপরে বর্ণিত বিশেষ ব্যবস্থায় দারিদ্র্যপীড়িত ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণের অনুপস্থিতি কতটুকু স্বস্তি দিতে পারে, সেটা অবশ্যই বিবেচনার বিষয়। আবার অসংখ্য অপরাধীর মধ্যে গুটিকয় অপরাধীর বিচার ভবিষ্যতে এরকম অপরাধ সংঘটনের নিবারণ এবং সার্বিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে সে বিষয়ে বিতর্ক থাকাটাও স্বাভাবিক। তবে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিকে দূর করতে এ বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অনেক।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
উল্লিখিত সব উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়- যুদ্ধাপরাধসহ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিচারের বিষয় কখনো তামাদি হয় না এবং এরকম অপরাধের বিচারের অর্থ শুধু অভিযুক্তকে শাস্তি প্রদান নয় বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একই রকম অপরাধের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করে সুস্থ, শুদ্ধ সমাজের নিশ্চয়তা দেয়া, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। যুদ্ধাপরাধসহ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারের এসব অভিজ্ঞতা বিশেষ করে কম্বোডিয়ার খেমাররুজদের বিচারে কম্বোডিয়া-জাতিসংঘ যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বিশেষ বিচারিক ব্যবস্থা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধসহ মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিচারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে অনুসরণীয় হতে পারে।
যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক সব আন্তর্জাতিক কনভেনশনের পক্ষরাষ্ট্র বাংলাদেশ। তাছাড়া স্বাধীনতার পর উল্লিখিত আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতির অনুসরণে একাত্তরে সংঘটিত অপরাধের বিচারে ১৯৭৩ সালে প্রণীত হয় International Crimes (Tribunals) Act, 1973. যুদ্ধাপরাধের বিচারের এ বিধান সংবিধানের ৪৭(৩) অনুচ্ছেদেও সংযোজিত আছে। ১৯৭৩-এর আইনটি এখনও বলবৎ আছে, যার মাধ্যমে একাত্তরে সংঘটিত হত্যা-নির্যাতন ও ধ্বংসযজ্ঞের অপরাধের সাথে জড়িতদের যথাক্রমে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে, শান্তির বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের অভিযোগে বিচারের সম্মুখীন করা সম্ভব। তবে তার জন্য দরকার ’৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধসহ মানবতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধের বিচারে সরকারের দৃঢ় অবস্থান। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন নয়, দরকার এদের বিচারে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এ বিষয়ে জোর আলাপ-আলোচনার সূত্রপাত ঘটানো এবং প্রয়োজনে জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সম্ভাব্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা।
পাহাড়তলী বধ্যভূমি
মাহবুব এলাহী
সেদিন ছিল ২০ রমজান, ১০ নভেম্বর ১৯৭১। স্থান-পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম; বর্তমান চট্টগ্রাম টিভি কেন্দ্রের বিপরীতে। হঠাৎ করেই ঝলসে উঠলো পাক হানাদার ও তাদের এদেশের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনীর অস্ত্র। পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন কলোনি থেকে নিরীহ বাঙালিদের ধরে এনে উক্ত জায়গায় জবাই করে হত্যা করা হয়। শুধু শহীদ লেন, মাস্টার লেন, গোয়ানিজ কোয়ার্টার ও সরাইপাড়া থেকে গোলাম ইয়াজদানী, আবদুল খালেক, আলী করিম, আহমদ আলী মোড়ল, আলী আজম, আনছার আলী, ফজল মিয়া, মোসলেম আলী তালুকদারের মতো শত শত বাঙালিকে একই দিনে হত্যা করা হয়েছিল এই বধ্যভূমিতে, যাকে স্থানীয়ভাবে জল্লাদখানা বলা হতো। 
চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-দোহাজারী রুটের ট্রেন থামিয়ে মোঃ ফকরুল ইসলাম, রমণী কুমার দাস, জাহিদ, এম এ চৌধুরী, এল আর খান এবং তাঁর কন্যা (নাম সংগ্রহ করা যায়নি) সহ শত শত বাঙালিকে নামিয়ে এনে উক্ত জায়গায় হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। এছাড়াও রেলওয়ে অফিসার মোঃ শফিসহ আরো ১৩ জনকে ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়েছিল জল্লাদখানার একটু সামনেই। শুধু সেদিনের হত্যাযজ্ঞে মোট ১২০ জনের নাম পাওয়া গেছে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে। তবে স্থানীয় লোকদের ধারণা, এখানে প্রায় ২০ হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছে। এই বধ্যভূমিতেই পাকবাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. গাজী সালেহ উদ্দিনের পিতা শহীদ আলী করিমকে।
মহান মুক্তিযুদ্ধের মর্মন্তুদ স্মৃতি বহন করা পাহাড়তলী বধ্যভূমি দেশের আলোচিত এবং অন্যতম বৃহৎ একটি বধ্যভূমি। মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে এ ভূখণ্ড পাকিস্তানের হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়, তখন পাক হায়েনার দল ও তাদের এ দেশীয় দোসররা এ আক্রমণ চালায়। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল ফাতেমীর নেতৃত্বে এবং আলী আকবর নামে এক রাজাকার ও তার সাঙ্গপাঙ্গ, পাকিস্তানি মিলিশিয়া ও বিহারিরা একত্র হয়ে পাহাড়তলী বধ্যভূমিতে এই গণহত্যা চালায়। স্বাধীনতার পর এই বধ্যভূমি থেকে সংগৃহীত কঙ্কালের চিত্র এখনও চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ‘স্মৃতি অম্লান’ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্বজন, বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি, প্রায় দুই একর আয়তনের এ বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হোক। ওয়ার সিমেট্রির আদলে এখানে নির্মাণ করা হোক একটি স্মৃতিসৌধ। এই প্রেক্ষিতে ১৯৯৮ সালের ২০ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পাহাড়তলী বধ্যভূমি সংরক্ষণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের নির্দেশ দেন এবং ১৯৯৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি একইভাবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে জমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেয়া হয়। ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাসে চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর বধ্যভূমিসহ দেশের অন্যান্য এলাকার নয়টি বধ্যভূমি সংরক্ষণে সাত কোটি ছয় লাখ টাকা বাজেটের একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। এর আওতায় তৎকালীন সরকার পাহাড়তলী বধ্যভূমির জন্য ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় দুই একর জমিতে মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এদিকে একই সালের ৪ মে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পাহাড়তলী বধ্যভূমির জন্য এক দশমিক ৭৫৪ একর জায়গা অধিগ্রহণে কোনো বাধা নেই মর্মে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবহিত করেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিবের পক্ষ থেকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি অধিগ্রহণ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠানো হয়, যার স্মারক নং-১৩.৩৯.১৬.০০.০০.০৫.৯৮-১৫১০ তাং ২০/১২/১৯৯৮। এ ব্যাপারে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ডিসি বরাবর ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের ফলে পাল্টে যায় সবকিছু। এমনকি প্রকল্পের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মন্ত্রণালয়ের ৯৪ লাখ টাকা ফেরত নেয়ার জন্য বারবার তাগাদা দেয়া হয়। আর বধ্যভূমির প্রায় পুরো জায়গা কিনে নিয়ে সেখানে একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ভবন তৈরির কাজ শুরু করে। এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধাসহ চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানায়। তাদের দাবি ছিল গোটা বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হোক। বধ্যভূমিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ প্রহসন বলে উল্লেখ করেন তারা। ওই সময় এর প্রতিবাদে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের কাছে খোলা চিঠি দেয়া হয় এবং শহীদদের স্বজনদের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে পাহাড়তলী বধ্যভূমি সংরক্ষণের দাবি জানানো হয়। এ ব্যাপারে উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রো-ভিসি আবদুল্লাহ আল হাসান এক প্রশ্নের জবাবে প্রথম আলো পত্রিকাকে জানান, ‘সরকার কেন এই জায়গা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করছে জানি না। মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে কিছু করতে চাই না আমরা। বধ্যভূমি নিয়ে প্রজন্ম ’৭১ নামে একটি সংগঠন আমাদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। তারা মানববন্ধন করেছে, সংবাদ সম্মেলন করেছে।’ তিনি মনে করেন, ‘প্রজন্ম ’৭১ এর-সাথে ইউএসটিসিকে সম্পৃক্ত করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিলেই বিষয়টির সমাধান হবে। আর এই উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে’ (সূত্র : ১৬ জুলাই ২০০৬, দৈনিক প্রথম আলো)।
বধ্যভূমির জমিতে স্থাপনা নির্মাণ কাজ বন্ধের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য ২০০২ সালের ১৬ নভেম্বর তৎকালীন সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডারের পক্ষে লে. কর্নেল মোঃ দেলোয়ার হোসেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে অনুরোধ জানান (স্মারক নং-১৩০২/১১/কিউ)। জানা যায়, ২০০২ সালে উক্ত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি জনৈক রেহেনা বেগম গংয়ের কাছ থেকে পাহাড়তলী মৌজার বি এস ১৫২ ও ১৫৩ দাগের আন্দর এক দশমিক ৭৫৪ একর জায়গা এক কোটি ২০ লাখ টাকায় ক্রয় করে, যার দলিল নং ৩৮২০। সদর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে ২০০২ সালের ১৯ মে এটি রেজিস্ট্রি হয়। কিন্তু তৎকালীন সরকার পূর্ববর্তী সরকারের প্রকল্প কাটছাঁট করে মূল বধ্যভূমিকে পাশ কাটিয়ে পার্শ্ববর্তী ৮-১০ শতক জায়গায় দায়সারাগোছের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন উক্ত জমিটি তাদের- এই দাবি করে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেয়। সিটি করপোরেশনের অভিযোগ, তাদের জমিতে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় বধ্যভূমির স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমতি নেয়নি। সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালে ভূমির মালিক সিটি করপোরেশনকে ১০ গণ্ডা ভূমি বধ্যভূমির জন্য দান করে।
এরপর শুরু হয় বিভিন্নমুখী আইনি লড়াই ও দাপ্তরিক চিঠি চালাচালি। ১৮ নভেম্বর ২০০২ চট্টগ্রাম যুগ্ম জেলা জজ-২ আদালত কর্তৃক বধ্যভূমির জন্য চিহ্নিত জমির দাবিদার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অধিগ্রহণ বন্ধের জন্য দায়েরকৃত মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বরাবরে অভিযোগ করে এবং নির্মাণ কাজ বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান, যার স্মারক নং-পিউ/এনওসি/২০০২/১৬৫/৪৭ তারিখ ০৬.০৩.২০০৩। যুগ্ম জেলা জজ আদালতের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ কর্তৃক হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন মামলা দায়ের (মামলা নং- ১৮৯১/২০০৩) এবং হাইকোর্ট থেকে যুগ্ম জেলা জজের ১৩ এপ্রিল ২০০৩ তারিখের প্রত্যাহার আদেশ ছয় মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কর্তৃক ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এল এ কেস নং- ১/২০০৩-২০০৪ নথিভুক্ত করা হয় এবং ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন থেকে তিন ধারা নোটিশ প্রদান করা হয়। তৎপরবর্তী আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের মধ্যে অনেক চিঠি চালাচালি হয়; কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত ২৬ এপ্রিল ২০০৫ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে ১.৭৫৪ একরের পরিবর্তে ২০ শতক জমি অধিগ্রহণের জন্য অনুরোধ করে এবং ১৮ মে ২০০৬ এল এ কেস বাতিল করে জমি অধিগ্রহণে প্রদত্ত ৯৪ লাখ টাকা ফেরত প্রদানের জন্য পত্র প্রদান করে।
বর্তমানে মূল বধ্যভূমিতে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ভবনের দ্বিতীয় তলার কাজ চলছে এবং পার্শ্ববর্তী জমিতে একটি নামমাত্র স্মৃতিস্তম্ভ করা আছে। বিভিন্ন দিবসে প্রজন্ম ’৭১, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন এখনো মূল বধ্যভূমিতেই পুষ্পস্তবক, মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বলন করে থাকে। কিন্তু বিষয়টি এখনও নিস্পত্তি না হওয়া সত্ত্বেও ভবনটির কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অন্যদিকে আশার বিষয় হলো, খুবই সমপ্রতি শহীদ পরিবারের সন্তানদের প্ক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন (নং-৯৯২৭) করা হলে মহামান্য হাইকোর্ট ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার জন্য নির্দেশ দেয়। আমাদের কাম্য, সরকার এ ব্যাপারে সুদৃষ্টি দেবে এবং মূল বধ্যভূমিতেই মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স হবে। চট্টগ্রামবাসী তাকিয়ে আছে অদূর ভবিষ্যতের দিকে। য়
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা
১. ১৬ জুলাই ২০০৬, আলোকিত চট্টগ্রাম, প্রথম আলো।
২. ১৯ জুলাই ২০০৬, দৈনিক আজাদী।
৩. ড. গাজী সালেহ উদ্দিন, ডিন, সমাজবিজ্ঞান অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, প্রজন্ম ’৭১।
৪. বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাবেক জাতীয় অধ্যাপক ডা. নুরুল ইসলামের কাছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারের সদস্যদের খোলা চিঠি।
৫. চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।
৬. বিভিন্ন দাপ্তরিক চিঠি।
নির্বাচন ও মানবাধিকার
মিল্লাত হোসাইন
বেশ কয়েক দফা সংশোধনের পর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের
চূড়ান্ত তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ অনুষ্ঠিত হবে ভোট প্রদান (এই লেখা যখন পাঠকের হাতে পৌঁছবে ততোদিনে আশা করা যায় যে নির্বাচন সম্পূর্ণ হয়ে ফলাফলও নির্ধারিত হয়ে যাবে)। ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে। অর্থাৎ ভোট গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ ছাড়া নির্বাচনের যাবতীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হয়েছে বলা যায়।
নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা এবং মানবাধিকার কর্মীরাও তাদের কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে এরকম দুটি উল্লেখযোগ্য বিষয় তুলে ধরা হলো।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সংখ্যালঘু নির্যাতন রোধে এসএএইচআর
বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় সংখ্যালঘু সমপ্রদায় বিশেষভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা এবং আরেকটু সুনির্দিষ্টভাবে বললে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নির্বাচন-পূর্ব, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনোত্তর ভয়-ভীতি ও সামপ্রদায়িক সহিংসতার মুখোমুখি হতে হয়। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনের সময় যা এদেশে এক বিভীষিকার সৃষ্টি করে যার স্মৃতি এখনো অমলিন।
২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দৈনিক খবরের কাগজে প্রকাশিত সংবাদ থেকে সংখ্যালঘুদের ভীতি প্রদর্শন, সহিংসতা ও নির্যাতন করার ৩৯১টি ঘটনা চিহ্নিত করেছে। এই বাস্তবতায় এবারকার নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এর পুনরাবৃত্তির ভীতি রয়েছে যথেষ্ট।
সেই শঙ্কা থেকে দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস সংক্ষেপে এসএএইচআর নির্বাচনকেন্দ্রিক সংখ্যালঘু নির্যাতন রোধ করার জন্য নির্বাচন কমিশন, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি কিছু আহ্বান ও কিছু সুপারিশ পেশ করেছে।
এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
* নির্বাচনের পূর্বে সংখ্যালঘুদের ভয়-ভীতি প্রদর্শনের খবর পেলেই তার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া;
* মসজিদসহ অপরাপর প্রতিষ্ঠান থেকে যেন বিদ্বেষ ছড়ানো না হয় তা নিশ্চিত করা;
* পর্যবেক্ষকদের নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা বা সহিংসতার প্রস্তুতির খবর নির্বাচন কমিশন ও জেলা নির্বাচন কমিটিকে জানানো;
* অভিযোগগুলো গণমাধ্যম, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে অবহিত করা;
* ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে জনগণের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা;
* সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা দেয়া এবং দলবদ্ধভাবে ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করা।
গত ১৪ ডিসেম্বর ২০০৮ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসএএইচআর এসব আহ্বান জানায়।
মানবাধিকার মেনিফেস্টো-২০০৮
বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীদের পক্ষ থেকে গত ৮ ডিসেম্বর ২০০৮ প্রকাশ করা হয়েছে- ‘২০০৮ সালের নির্বাচনের জন্য মানবাধিকার মেনিফেস্টো।’ ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচিত তাদের স্ব-স্ব নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে মানবাধিকার সংক্রান্ত ইস্যু অন্তর্ভুক্তির জন্য এটি প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক/নির্বাচন ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়কদের কাছে পাঠানো হয়।
এতে আইনের শাসন, শ্রমজীবী, সামাজিকভাবে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী, নারী, প্রবাসী শ্রমিক, কারাবন্দি, প্রতিবন্ধী, সংখ্যালঘু ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার, ভূমি সংস্কার ও ভূমির ব্যবহার সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন, বাক্-স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা নিয়ে বেশ কিছু সুপারিশ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু সুপারিশ হলো-
* ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা;
* নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ সব মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীকে বিচারের সম্মুখীন করা;
* বিচার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং বিচারক নিয়োগ ও বিচার বিভাগে দুর্নীতি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া;
* বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করা ব্যতীত কোনোরূপ উচ্ছেদ অভিযান না চালানো;
* কল-কারখানার শ্রমিকদের জন্য রেশন এবং বেকার ভাতার ব্যবস্থা করা;
* জাতিগত সংখ্যালঘুদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান;
* ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন করা এবং সেখান থেকে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা;
* নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়ন ও সিডও সনদ থেকে সব শর্ত সংরক্ষণ প্রত্যাহার করা;
* জাতীয় সংসদের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নারীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান করা;
* মানবাধিকার কমিশনকে কার্যকর করার ব্যবস্থা করা এবং সমস্ত মানবাধিকার দলিল অনুসমর্থন করা ইত্যাদি।