তদন্ত
নরসিংদীতে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে
নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু
শাহ আলম ফারু
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ প্রভাবশালীরা জোর
করে নরসিংদী পৌর এলাকার নাগরিয়াকান্দির বাসিন্দা শরীফুল ইসলামকে (৫৭) নরসিংদী শহরের একটি কথিত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির ১৫ দিন পর শরীফুল লাশ হয়ে বাড়ি ফেরে। চিকিৎসার নামে নির্যাতন করে শরীফুলকে মেরে ফেলা হয়েছে বলে তার স্বজনরা অভিযোগ করেছেন। গত ৮ জানুয়ারি ২০০৮ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘নরসিংদীতে মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রে নির্যাতনে যুবকের মৃত্যু’ শীর্ষক সংবাদের প্রেক্ষিতে আসক তদন্ত ইউনিটের পক্ষ থেকে তথ্যানুসন্ধান করা হয়। তথ্যানুসন্ধান ও ঘটনার পূর্বাপর পরিস্থিতি বিবেচনায় স্বজনদের অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পরদিন নিহত শরীফুল ইসলামের বাড়িতে গেলে কথা হয় তার মা মেহেরুন নেছা, স্ত্রী দিনা বেগম, চাচাতো ভাই বাবলু ভুঁইয়া, বড় ভাই শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে শফিকুল জানান- গত (২০০৭) কোরবানির ঈদের ১০-১২ দিন আগে শরীফুল এক টিন বিক্রেতার কাছে তাদের এলাকার একজনের পাওনা টাকা আদায় করতে গেলে গোলমালের সূত্রপাত হয়। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে শরীফুল ঐ টিন বিক্রেতাকে তার দোকানের মধ্যে লাথি মারে। এ ব্যাপারে টিন দোকানদার স্থানীয় পৌর চেয়ারম্যান লোকমান হোসেনের কাছে বিচার দেয়। পাশাপাশি এই ঘটনার জের ধরে টিন বিক্রেতার ছোট ভাই আপেল, ইয়াসিন ও ইলিয়াস শরীফুলকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে মারধর করে। চেয়ারম্যান শরীফুলকে পাঁড় মাতাল বলে অ্যাখ্যা দেন এবং তাকে অশ্রু মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা করাতে হবে বলে সিদ্ধান্ত দেন। চেয়ারম্যানের নির্দেশমতো শরীফুলকে ঈদের ২ দিন পর ২৩ ডিসেম্বর ০৭ তারিখে ভর্তি করা হয়।
পাওনা টাকা আদায় করা প্রসঙ্গে শরীফুলের ভূমিকার বিষয়ে প্রশ্ন করলে শফিকুল জানান, শরীফুল এলাকার বিভিন্ন মানুষের উপকারে কাজ করতো, তাই সে এলাকার একজনের উপকার করতে গিয়ে এই ঘটনা ঘটিয়েছে।
শরীফুলের মা মেহেরুন নেছা জানান- শরীফুল নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি হতে চায়নি। সে বলেছিল- ‘আমাকে জেলে ঢুকিয়ে রাখ, তবু অশ্রুতে দিও না; ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ জোরপূর্বক শরীফুলকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভর্তির পর তাদের পরিবারের কাউকে শরীফুলের সাথে দেখা করতে দেয়নি বলে মেহেরুন নেছা অভিযোগ করেন। তিনি আরো জানান- শনিবার (৫ জানুয়ারি ২০০৮) রাত ৯টায় নিরাময় কেন্দ্রে ফোন করলে সেখানকার এক পরিচালক মাহবুব জানান, শরীফুল ভালো আছে। ৬ জানুয়ারি বিকেলে নিরাময় কেন্দ্র থেকে শরীফুলকে একটি টেম্পোতে করে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। টেম্পোচালক মজিবর ও অশ্রু থেকে আসা সাইফুল, আপেল ও মাহবুব ওই সময় শরীফুলের সঙ্গে ছিল। হাসপাতালে নেয়ার পর সেখানকার ডিউটিরত ডাক্তার চেমনআরাকে তারা শরীফুলের মুখের মধ্যে অক্সিজেনের পাইপ ঢুকিয়ে দিতে বলে। তখন ডাক্তার তাদের বলে, মৃত রোগীর মুখে অক্সিজেন দেব কেমনে?
মৃতের ভাই শফিকুল অভিযোগ করেন, তিনি পরে জানতে পেরেছেন তার ভাইকে নিরাময় কেন্দ্রে পাঁচ জন পরিচালক নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে। এই পাঁচজনের মধ্যে চারজন হাত-পা ধরে রাখে ও একজন নাকে-মুখেপানি ঢেলে দেয়। ওইদিন (৬ জানুয়ারি ২০০৮) সন্ধ্যায় নরসিংদী মডেল থানায় গিয়ে মামলা করতে চাইলে ওসি মামলা করতে নিষেধ করে বলেন, এখন মামলা করা ঠিক হবে না, আগে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট আসুক তারপর মামলা করেন। ওইদিন মামলা না করে ফিরে এসে পরদিন থানায় গেলে মামলা গ্রহণ করে। এসআই তরিকুল শরীফুলের সুরতহাল করেন। সুরতহাল রিপোর্টে উল্ল্লেখ করা হয় যে- মৃত শরীফুলের ডান পায়ের চামড়া থেঁতলানো, অণ্ডকোষে আঘাতের কালো দাগ ও পেছনের ঘাড়সহ শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
শরীফুলের চাচাতো ভাই বাবলু ভুঁইয়া জানান- শরীফুলরা তিন ভাই ছিল। তাদের বড় ভাইকেও হত্যা করা হয়েছে। অশ্রু মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সম্পর্কে তিনি জানান- অশ্রুর বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। সমপ্রতি অশ্রুর পরিচালকদের বিরুদ্ধে একটি কিডন্যাপের মামলা হয়েছে।
শরীফুলের স্ত্রী দিনা বেগম বলেন- ‘ নিরাময় কেন্দ্রে আসলে কী ঘটেছিল, আমার স্বামীকে নিয়ে ওখানে কী করা হয়েছে- তা আমরা জানতে চাই। আমার স্বামী ক্যামনে মরলো সেটা বুঝবার চাই।’ তিনি জানান- তার তিন ছেলেমেয়ে। বড় ছেলে রফিকুলের বয়স ১১, বড় মেয়ে প্রীতির বয়স ৭ এবং ছোট মেয়ে প্রমার বয়স ৫। দিনা বেগম বিলাপ করে বলেন- ‘এই অবুঝ সন্তানদের নিয়ে আমি এখন কী করবো, আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’ প্রসঙ্গত তিনি জানান, শরীফুলের মৃত্যুর পর লোকমান চেয়ারম্যান বলেন, সে হার্ট স্ট্রোকে মারা গেছে। লাশ দাফনের আগেই চেয়ারম্যান মিটমাটের প্রস্তাব দেন।
নিরাময় কেন্দ্রের লোকজনের বক্তব্য
অশ্রু মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে গেলে কথা হয় স্বপন, রফিক ও শামীমসহ কয়েকজন রিকভারির সঙ্গে। তারা জানান- তারা নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। মামলার কারণে ডিরেক্টররা আত্মগোপনে রয়েছে, এ কারণে তারা এখন অশ্রুতে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রশ্নোত্তরে রফিক জানান- অশ্রুতে ভর্তির জন্য জনপ্রতি ১২ হাজার টাকা করে নেয়া হয়। তবে ক্ষেত্র বিশেষে ২-৩ হাজার টাকা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও রোগী ভর্তি করা হয়। অশ্রুর ডিরেক্টর ৫ জন। তারা হলেন- ১. তপন ২. রিপন ৩. কবীর ৪. সুমন ও ৫. মাহবুব। মানসিক রোগের কোনো ডাক্তার নেই। তবে ডিরেক্টর তপন রোগীদের মাঝে মধ্যে কাউন্সেলিং করিয়ে থাকেন।
অশ্রুর মধ্যে নির্যাতনের ফলে শরীফুলের মৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন করলে শামীম জানান- অশ্রুতে নির্যাতন করা হয় না এটুকু জানি, তবে শরীফুল কীভাবে মারা গেল তা বলতে পারবো না। আত্মগোপনে থাকা অশ্রুর একজন ডিরেক্টর তপনের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি জানান- শরীফুল বোধহয় আগে থেকেই কিডনি সংক্রান্ত জটিল রোগে ভুগছিল। নির্যাতনে শরীফুলের মৃত্যুর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অশ্রুতে নির্যাতনের বিষয় অস্বীকার করেন। মৃত অবস্থায় শরীফুলের লাশ হাসপাতালে নেয়া এবং হাসপাতালে আনার পর অশ্রুর লোকজনের হাসপাতাল থেকে দৌড়ে পালানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মৃত অবস্থায় শরীফুলের লাশ হাসপাতালে নেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং জানান, ওদের পক্ষের লোকজন হাসপাতালে উপস্থিত হলে ভয়ে তারা দৌড়ে পালিয়েছে।
আইনগত পদক্ষেপ
নরসিংদী মডেল থানায় গেলে ডিউটি অফিসার এসআই শাহজাদী জানান- উক্ত ঘটনায় মডেল থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলা নং ১৫, তারিখ- ০৬.০১.০৮ ইং, ধারা-৩০২ দ.বি.। মামলার বাদি মোঃ শফিকুল ইসলাম এবং আইও এসআই তরিকুল। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থানায় পৌঁছায়নি।
ফলোআপ
গত ৮ মে ০৮ ফলোআপ তথ্যানুসন্ধানে গেলে কথা হয় ভিকটিম শরীফুল ইসলামের মা মেহেরুন নেছার সাথে। তিনি জানান- পুলিশ এ মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দিয়েছে। ডাক্তার ও নেয়ামত দারোগা (আইও) মিলে মামলাটা নষ্ট করেছে। পুলিশ ফাইনাল রিপোর্ট দেয়ার আগে মামলার বাদি শফিকুল (ভিকটিম শরীফুল ইসলামের ভাই) এবং ভিকটিমের মা মেহেরুন নেছা বা ভিকটিম পক্ষের কারো সাথে কথা বলেনি। তিনি অভিযোগ করেন- ডাক্তাররা ‘লাখ টাকা খাইয়া ভুয়া রিপোর্ট দিছে।’ প্রসঙ্গত তিনি জানান- সহকারী পুলিশ সুপারের (সদর সার্কেল) অফিসে ১৫ এপ্রিল ০৮ তারিখে তাদের ডাকা হয়। তিনি, মামলার বাদি শফিকুল, ভিকটিমের স্ত্রীকে নিয়ে সার্কেল অফিসে গিয়েছিলেন; কিন্তু প্রথম দিন এএসপির সাথে দেখা হয়নি। পরে আরো একবার সার্কেল অফিসে গেলে তাদের পরামর্শ দেয়া হয়- যেহেতু এ মামলার বিষয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে, সেহেতু আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিষয়টি বিচারাধীন, এ অবস্থায় নারাজি আবেদন দিয়ে যেন পুনরায় মামলাটির তদন্ত করার আবেদন জানানো হয়।
পর্যবেক্ষণ
সরেজমিনে অশ্রু মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়- অন্ধকারাচ্ছন্ন, সংকীর্ণ ও নোংরা পরিবেশে কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়- ঐ কেন্দ্রে কোনো কাউন্সিলর, সার্বক্ষণিক কর্মরত কোনো নার্স, ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞ নেই। প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালের কোনো এক ডাক্তারকে ডেকে আনা হয়। তাছাড়া খোঁজ নিয়ে জানা যায়- অশ্রু এবং এ ধরনের অনেক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, লোকবল এবং সরকারি অনুমোদন নেই। তারপরও এধরনের প্রতিষ্ঠান নির্বিঘ্নে প্রশাসনের নাকের ডগায় তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
আঞ্চলিক মানবাধিকার নাট্যোৎসব ২০০৮
আনিছা পারভীন জলী
‘সবার আগে মানবাধিকার’ এই ব্রত নিয়ে গত ৩০ ও ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদ, নওগাঁ শাখার উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আঞ্চলিক মানবাধিকার নাট্যোৎসব-২০০৮। ‘বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নিক দুর্বৃত্ত’ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত শপথে এই মানবাধিকার নাট্যোৎসব আয়োজিত হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালিয়ে উক্ত উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। আঞ্চলিক মানবাধিকার নাট্যোৎসবে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদের সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক কামাল লোহানী, সাধারণ সম্পাদক মোতাহার আখন্দসহ বিভিন্ন খ্যাতনামা সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যবৃন্দ।
বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদের অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৫৫টি ইউনিয়নের বিভিন্ন পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত মানবাধিকার নাট্যদলের নাট্যকর্মীরা আঞ্চলিক মানবাধিকার নাট্যোৎসবে ইস্যুভিত্তিক নাটক মঞ্চায়ন, র্যালি, গুণীজন সম্মাননার আয়োজন করে।
নাট্যোৎসবে অসংখ্য নারী নাট্যকর্মীর অংশগ্রহণ উৎসবে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে, যা নারী-পুরুষ সাম্যের প্রতীকরূপে দৃশ্যমান হয়।
আঞ্চলিক মানবাধিকার নাট্য উৎসবে বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা করা হয়। অতিথি বক্তাদের বক্তব্যে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিটি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। গত ডিসেম্বরের ১ ও ২ তারিখে ময়মনসিংহ জেলার নাট্যোৎসবের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় সমগ্র দেশব্যাপী আঞ্চলিক মানবাধিকার নাট্যোৎসব- ২০০৮।