মদের মাহাত্ম্য ও রাতের রানী

ছোটবেলাতেই আমার এক অতি নিকট গুরুজনকে বলতে শুনতাম, ‘জিদে পুরুষ হয় বাদশাহ, আর মেয়েলোকে হয় বেশ্যা!’ অনেকটা প্রবাদবাক্যের মতো করেই তাকে এটা আওড়াতে শুনতাম। পরে আরও অনেকের মুখেই এটা শুনেছি। বড় হয়ে কথাটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখলাম, জিদ করে কেউ চাইলে বাদশাহ মানে খুবই ধনী কিংবা সত্যি সত্যিই বিরাট মাপের কিছু যেমন নেতা, লেখক, খেলোয়াড়, গায়ক অভিনয়শিল্পী, চাকরিজীবী, রাষ্ট্রনায়ক ইত্যাদি হলেও হতে পারেন। কিন্তু, জিদ করে এক-আধটা মেয়ের ‘বেশ্যা’ হওয়ার ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটতে পারলেও ৯৯.৯৯ শতাংশ মেয়েরই জিদ করে ‘বেশ্যা’ হওয়ার কোনো কারণই নেই। তাহলে এমন কথা কোথা থেকে আসে? কিন্তু কথাটা যদি এভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, জিদ করলে মেয়েদের ‘বেশ্যা বানানো’ হয়! তাহলে কিন্তু আর অত মিথ্যা মিথ্যা মনে হয় না প্রাগুক্ত গুরুজন বাক্যটি। আমাদের সমাজে এটা কিন্তু অহরহই দেখতে, শুনতে পাওয়া যাবে। শুধু সমাজে না, ১৮৭২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশের চলমান বিচারব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য আইনেও কিছুটা ‘জিদ্দি মেয়ে’কে ‘বেশ্যা’ বলে দাগিয়ে দেওয়া যাবে আইনগতভাবেই।

একবার এক আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে জড়ো হয়ে ৫-৬ জন করে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে আমরা মাঠে কাজ করি, ক্লাস করি, খাই-দাই, আড্ডা দিই আর তাঁবুতে ঘুমাই। তো এ ধরনের প্রশিক্ষণ শিবিরের শেষ দিনে একটা নৈশভোজ-পরবর্তী বা পূর্ববর্তী একটা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা আয়োজন করা মোটামুটি দস্তুরই বলা যায়। সেখানে প্রশিক্ষণার্থীরাই নানান বিষয়ে নিজ নিজ কেরদানি, হেকমত ইত্যাদি রাষ্ট্র করে দেন। ব্যাপক মজা-মৌজ-মাস্তি আর খানাপিনা হয়। একে মেসনাইটও বলা হয়। তো আমাদের দলের একজনের ইচ্ছে হলো, তিনি মেসনাইটে একটা নাটিকা মঞ্চস্থ করবেন। প্রায় সারা দিন একসঙ্গে কাজ করার কারণে দলের সবার সব কাজই জানা হয়ে যায় সবার। খাতায় আস্তে আস্তে উঁকি দিতে দেখা যায় নাটিকার বিভিন্ন সংলাপ, দৃশ্য ও চরিত্রের নামধাম। নেহাত শখের অভিনয়-নাটক ইত্যাদিকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চমানের বুদ্ধিবৃত্তির কিছু মনে না হওয়া আমার প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া ছিল ওহ, আচ্ছা; বেশ হচ্ছে, চালিয়ে যান! আর মনে মনে বলি, দূর হও, কী সব ছাতামাথা! কিন্তু তিনি নাছোড়, লিখেই যাচ্ছেন; পড়ে শোনান বা পড়তেও দেন। ব্যাজার মুখে পড়ি বা শুনতেই হয়, দলের লোক বলে কথা। তবে দু-চার দিনের মাথায় ব্যাপারটা জমে ওঠে। কারণ, প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন মজার ও বহুল চর্চিত শব্দে নাম রাখা হয় নাটিকার চরিত্রদের। আর ঘটনাগুলোও ক্যাম্পের চেনাজানা গল্প ঘিরে। অচিরেই একটা খসড়া দাঁড়িয়ে যায়। নাট্যকার-পরিচালক নিজেই প্রধান ও জটিল চরিত্রটিতে অভিনয় করবেন, বাকি চরিত্রের জন্য ক্যাম্পের মধ্য থেকে অভিনয়শিল্পী জোগাড় করার অভিপ্রায় প্রকাশের পর ভুলেও যদি ছুটকা-ছাটকা কোনো রোলে অভিনয় করতে বলেন, এই ভয়ে সটকে পড়ি। দূর থেকে আড়চোখে দেখি একে-তাকে ধরছেন, জোরাজুরি করছেন বিভিন্ন পার্ট নেওয়া ও মহড়া দেওয়ার জন্য। ব্যাপারটা ভালোই চলছে ধারণা করে ভুলে যাই। কয়েক দিন পর এমনিই নাটকে কে কোন রোলে অভিনয় করছে জানতে চেয়ে শুনি এক আধজন নিমরাজি হলেও অন্য কেউ তেমন রাজি হচ্ছে না, তাই নাটকই নাকি ভেস্তে গেছে। আর এটুকু প্রকাশ করতে গিয়ে যে হাহাকার আর রোদনভরা আর্তি ঝরে পড়ে আর এর আগে নাটক লেখা, অভিনয় ও নির্দেশনা নিয়ে তার যে প্যাশন ও নিষ্ঠার পরিচয় পেয়েছিলাম; দুইয়ে মিলে এত মায়া লাগল যে, নাটক হতেই হবে এবং আমিই অভিনয় করব বলে ঘোষণাই দিয়ে ফেললাম। নাটকের প্রধান পুরুষ চরিত্রটি আসলে ভিলেন আর নায়কের পার্ট হলো মূলত এক্সট্রার, যে কেবল শেষদৃশ্যে আবির্ভূত হবে। অনেক চিন্তা-পরিকল্পনা করে প্রধান চরিত্রে রিহার্সাল দিতে গিয়ে দেখি রীতিমতো নাকানিচুবানি খেতে হচ্ছে।

বিশ্বসেরা চলচ্চিত্রে দিকপাল অভিনয়শিল্পীদের কাজ দেখে মুগ্ধ চোখ আর মনে আমার স্রেফ বিভীষিকা। ২/৩ দিনের মাথায় রণে ভঙ্গ দেওয়া। এবার বলা হলো, নায়কের খুব ছোট পার্টটা করতে। খাদে পড়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাসে আরও বড় চিড় ধরে অভিনয় আরও ভয়াবহ রকমের খারাপ হলো। বলাইবাহুল্য যে, লোকের অভাবেই আমাকে এসবে জড়াতে হয়। ইতোমধ্যে মহড়া জমে ওঠায় উৎসাহীদের পাওয়া হয়ে যায়। শেষমেশ ভিলেনকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রেপ্তার করা পুলিশের ভূমিকা দেওয়া হলেও হঠাৎই অন্য একজন এসে জায়গাটা নিয়ে নেওয়ায় আমার যেন ঘাম দিয়ে জ্বর সারল। তারপর থেকে অভিনয়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধ দ্বিগুণ বেড়ে গেল।

আসামির বাড়ি-ঘর থেকে হররোজ আবশ্যিকভাবে মদ বা অন্যান্য মাদকদ্রব্য উদ্ধার হতে দেখে জনমানসে নানান প্রশ্নের উদ্রেক ঘটছে মর্মে দেখা যায়, আরে ভাই সব সময় খালি মদই উদ্ধার হতে হবে কেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তো এই বিষয়ে দু-এক লাইন আলাপ করা যেতে পারে। মামলার ক্ষেত্রে মদ বা মাদকদ্রব্যের কেস হলো, মোটামুটিভাবে অব্যর্থ মোকদ্দমা। আরও খুলে বললে বলতে হয়, এই মামলা জামিনযোগ্য নয়, মানে মামলা হলেই জেলে যাওয়াটাই নিয়ম। উদাহরণ দিয়ে বলি, ১টি ইয়াবার জন্য দুদিন, ১ বোতল বিলাতি মদের জন্য তিন দিন জেল খাটা লাগে কমসেকম এটাই অলিখিত দস্তুর বলে অভিজ্ঞজনদের মত। অভিযোগ জামিনযোগ্য না হলেও কম-বেশি জামিনে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু মাদকের ক্ষেত্রে গাণিতিক হিসাব মেলাতে হয়। আর বেশি মাদক হলে গণিতে কুলাবে না, জ্যামিতিক হারে চলে যায় সেটা! আর যদি এলএসডি, ক্রিস্টাল মেথ বা আইসজাতীয় নতুন কিছু হয় তবে গণিত, জ্যামিতি ফেল; জ্যোতিষশাস্ত্রের এখতিয়ারে চলে যাবে। মদ বা মাদকের সামাজিক ভাবমূর্তি কিন্তু যাচ্ছেতাই রকমের খারাপ। গোপনে যাই হোক, প্রকাশ্যে মাদক নিয়ে কেউ ধরা পড়লেন তো তার সামাজিক দফারফা হয়ে গেল। ব্যক্তিকে, তার নৈতিক মনোবলকে ধূলিসাৎ করে দিতে এর জুড়ি নেই। আবার, মুসলিমদের মদ খাওয়া হারাম। খেতে চাইলে লাইসেন্স নিয়েই খেতে হবে। এখন লাইসেন্স নিয়ে খেলেও যদি একবার প্রকাশ হয়ে পড়ে জনসমক্ষে যে, লোকটা ‘মদ খায়’, তখন লাইসেন্স তেমন কাজে দেবে না। কে ই-বা জনে জনে লাইসেন্স দেখিয়ে বেড়াবেন যে ভাই দেখো, আমি লাইসেন্স করেই মদ খাই! এতে হিতে বরং বিপরীতই বেশি হবে।

আর সবচেয়ে গুরুতর হলো, সাধারণ মামলায় অভিযোগ প্রমাণের দায় অভিযোগকারীর ওপর বর্তায়। মানে যিনি অভিযোগ করবেন তাকেই সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে নিশ্চিত করতে হবে যে আসামি অপরাধ করেছেন। আসামি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলেও কোনোই অসুবিধা নেই। তাকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাবে না। এভাবে অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত ‘সাধারণভাবে আসামিকে নির্দোষ’ বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে এই অপাপবিদ্ধতার অনুমান নিরঙ্কুশ নয় অবশ্য, সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় মাত্র। কারণ, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেও আসামিকে নানান শাস্তিমূলক অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে হয় আইনগতভাবেই। মাদকের মামলায় আসামির এই সুবিধাটুকুও নেই। মাদকদ্রব্য উদ্ধার দেখানো হলেই অভিযোগকারীর কাজ সারা। ঠিক তখন থেকেই আসামিই দায়ী বলে ধরে নেওয়া হয়। এবার আসামিকেই প্রমাণ করতে হবে যে, উদ্ধার করা এসব জিনিস মাদকদ্রব্য নয় বা মাদক হলেও তা আসামির হেফাজত থেকে উদ্ধার করা হয়নি। মদের মাহাত্ম্য আছে, বলতেই হচ্ছে! ব্যক্তি মানুষটিকে ঘরে-বাইরে একেবারেই ধ্বস্ত করে তুলতে মোক্ষম ভূমিকা পালন করে এমন মাহাত্ম্যপূর্ণ আরও কিছু জিনিস হলো নারী ও শিশু মামলা, পর্নোগ্রাফি, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ডিভোর্সি নারীদের ক্ষেত্রে সন্তানের কাস্টডি কিংবা সাম্প্রতিককালের ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল’ করে দেওয়া বা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত করা ইত্যাদি।

প্রাগুক্ত গুরুজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় তেমন একটা শিক্ষিত নন, কোনো ডিগ্রি হাসিল করেননি, নেহাতই সাদাসিধা গাঁয়ের মানুষ। তার বাক্যে আহত হলেও বিস্ময়ের কিছু নেই। সমাজের প্রতিভাসমাত্র। উপযুক্ত সময় আসলেই আলোকপ্রাপ্ত ও উত্তরাধুনিক সময়ের মানুষজনরাও ‘ডাইনি মারা’র কালে একই আচরণ করেন। হয়তো শব্দটা কিছুটা বদলে ‘রাতের রানী’ করেন, আর অভিনয়শিল্পীদের ভাবেন ‘নটী’ বা ‘রূপের রানী’, রূপ বিকিয়ে, সুরার মাহফিলে মনোরঞ্জন করে ক্ষুন্নিবৃত্তি করে, এই যা তফাত! দেড়শো বছর পরে আইনটি বদলানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সরকার। কিন্তু ভদ্রজনমানসের দৃষ্টি ও মনের কানুন বদলাবে কীসে বা কবে?


লেখক : মিল্লাত হোসেন, প্রাবন্ধিক
দেশ রুপান্তর লিংকঃ https://www.deshrupantor.com/editorial-news/2021/08/24/311197