প্রযুক্তির অপব্যবহারে উন্মাদনা

এ দেশে সম্প্রীতির বন্ধন নিয়ে প্রশ্ন ছিল না, বরং সামাজিক আচার-আচরণ আর বন্ধনের চিহ্ন আমাদের মধ্যে বিরাজমান। হঠাৎ করে আমাদের এ ভূখণ্ডে কী হলো? বিগত এক দশকে আমরা লক্ষ্য করছি, ফেসবুক নামের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় বিষয় নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট, অতঃপর জ্বালাও-পোড়াও আর ভাঙচুর। কক্সবাজারের রামু দিয়ে শুরু, এরপর পাবনার সাঁথিয়া হয়ে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ভোলা, রংপুর, সুনামগঞ্জ হয়ে দাবানলের মতো ঘুরছে সারাদেশ। কী ছিল সেসব পোস্টে? আক্ষরিক অর্থে কী ধরনের বক্তব্য বা কী ধরনের ছবি? আমার ধারণা, অধিকাংশ নাগরিক সেসবের কিছুই জানে না। এসব ঘটনার অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে, কখনও কখনও যিনি পরিস্থিতির শিকার তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন। অতঃপর দীর্ঘ হাজতবাস শেষে নিশ্চয়ই সন্ত্রস্ত জীবন কাটাচ্ছেন।
ফেসবুককেন্দ্রিক গুজবের ঘটনায় শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। অথচ শুরু থেকেই এ ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব সহকারে দেখার অপরিহার্যতা ছিল। বিভিন্ন জায়গায় এর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কাউকেই শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আমরা পেশাদার এবং উন্নত প্রশিক্ষিত বাহিনী হিসেবে অনেক সময় দাবি করে থাকি। এ রকম একটি কার্যত বাহিনী এসব ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে না পারার ব্যর্থতা আমাদের ভাবাচ্ছে। অন্যদিকে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা ভীষণভাবে লক্ষ্য করা যায়। যেখানে একের পর এক এ ধরনের ঘটনার অবতারণা হচ্ছে, সেখানে একই ধরনের কনটেন্ট বা পোস্ট কীভাবে ফেসবুক প্রচারে অনুমোদন দিচ্ছে। এ ধরনের প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।
দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার জানামতে, বিগত এক দশকে এসব ঘটনার একটিরও বিচার হয়নি। প্রাথমিকভাবে অভিযুক্তরা কে কোথায় আছে, তারও সঠিক চিত্র জানা নেই। এমনকি মামলাগুলোর অগ্রগতিও আমাদের জানা নেই।
সারা দুনিয়ার মধ্যে এশিয়া এবং বিশেষত দক্ষিণ এশিয়াতে ধর্ম নিয়ে মাতামাতি লক্ষণীয়। গণমাধ্যমের সুযোগে আমরা সেসব সংবাদ ক্রমাগত দেখে যাই। সেসব দেশেও তুচ্ছ কারণে হানাহানি, রক্তাক্ত সহিংসতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে নানা প্রান্তে দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক সময় সেসব ঘটনার রেশ আমাদের দেশেও ছুঁয়ে যায়। বিশেষত শুক্রবার আমাদের জাতীয় মসজিদে নামাজ-পরবর্তী সময়ে বিশেষ শ্রেণির বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের ব্রিফিং প্রায় নিয়মিত দেখতে হয় কিংবা শুনতে হয়। অনেক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপ-আমেরিকার কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতীয় মসজিদ থেকে প্রতিবাদ শুরু করে থাকেন তারা, অনেক ক্ষেত্রে তারা পুলিশের বাধা পেয়ে মারমুখী হয়ে ওঠেন; এমনকি সড়কে থাকা সাধারণ মানুষের গাড়ি পর্যন্ত ভাঙচুরের ঘটনাও আমাদের নজরে পড়ে।
আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের বছরে আবার ধর্মীয় উন্মাদনার শিকার হতে হলো হিন্দু ধর্মের নাগরিকদের। আমাদের অগ্রগতি, আমাদের অর্জন ম্লান করার জন্য এ ধরনের ঘটনাই যথেষ্ট। তবে এটাও ঠিক আমাদের ব্যর্থতাগুলো ঢাকারও একটা চেষ্টা রয়ে যাচ্ছে।
চলমান সহিংসতা বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিশ্চয়ই সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট। তবে সব ঘটনার অতি দ্রুত তদন্ত শেষে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে যেন শাস্তির আওতায় আনা যায় সে রকম পদক্ষেপ সবাই দেখতে চায়। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের প্রতি সরকার যেন সব ধরনের অঙ্গীকার দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করে। রাজনৈতিক দলগুলো দেশের এমন ক্রান্তিকালে গঠনমূলক এবং দায়িত্বশীল আচরণের মধ্য দিয়ে যেন জেগে ওঠে।
সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা লজ্জিত, মর্মাহত এবং একই সঙ্গে ক্ষুুব্ধ। এ দেশ অনেক চড়াই-উতরাই পার করে পঞ্চাশ ছুঁয়েছে; সব শ্রেণির নাগরিকের অংশগ্রহণে আজকের সমৃদ্ধি। আমরা কোনো গোষ্ঠীর অনাচারে পরাভূত হবো না। আমরা আস্থা রাখতে চাই- রুখে দেওয়ার অঙ্গীকারে।


লেখকঃ আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, মানবাধিকারকর্মী
সমকাল লিঙ্কঃ প্রযুক্তির অপব্যবহারে উন্মাদনা