প্রতারণারোধে ই-কমার্স নীতিমালা

লোভনীয় অফার দিয়ে আকৃষ্ট করার প্রতিযোগিতা চলছেই-কমার্স বাণিজ্যে। কোন কোন সময় কয়েক ঘণ্টার জন্য সেই অফারে পণ্যের মূল্য ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ছাড় দেয়া হয়। ধামাকা অফার পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রি করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূলধন এরইমধ্যে আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে গেছে।

ব্যান্ড অ্যাম্বাসাডারদের ‘তারকা খ্যাতি’ কাজে লাগিয়ে চটকদার বিজ্ঞাপনে মানুষকে প্রলুব্ধ করে প্রতারণা করার অভিযোগ উঠেছে কয়েকটি ই-কমার্স কোম্পানির বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত কোম্পানিগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট তারকাদের অবস্থান জানতে চাইলে তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি। কারণ হিসেবে চুক্তিতে আইনগত বাধার কথা উল্লেখ করেন। গ্রাহকরা বলছেন, বড় বড় তারকাকে দেখে তারা এসব কোম্পানির ওপর আস্থা রেখে প্রতারিত হয়েছেন। ইভ্যালিসহ কয়েকটি ই-কমার্স কোম্পানির অনিয়ম উদ্ঘাটনের পরও এসব তারকাকে পদত্যাগ করতে দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে কোটি কোটি টাকা নিয়ে অভিযুক্তই-কমার্র্স কোম্পানির প্রতারণার নৈতিক দায় এসব তারকাও এড়াতে পারেন না।

বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘ব্র্যান্ডের মুখপাত্র কিংবা অ্যাম্বাসাডররা কোম্পানির আইনগত বিষয়গুলো দেখে সাধারণত চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু আইনের বাইরেও আরও কথা থেকে যায়- কোম্পানিটি সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ কিনা, নেতিবাচক এমন কিছু করছে কিনা, যা মানুষের ক্ষতি করছে। ছয় মাস পর দেখা গেল সংশ্লিষ্ট ব্র্যান্ড একটা প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম করল। এতে অ্যাম্বাসাডরের আইনগত দায়বদ্ধতা না থাকলেও নৈতিক দায় থেকে যায়। কোন কিছু এনডোর্স করলে অবশ্যই তা বিশ্বাস করা উচিত। বিশ্বাসের সঙ্গে না গেলে সেই কাজ করা উচিত নয়। আমাদের এখন সময় এসেছে নৈতিকভাবে দায়বদ্ধ হওয়ার। আইন ও নৈতিকতার মাঝে একটা বড় জায়গা আছে, সেটা নিয়েও আমাদের ভাবতে হবে। আমার কারণে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলো, আমি হয়তো তার দায়ভার নেব না। কিন্তু আমি না থাকলে হয়তো অনেক মানুষ যেত না।

ই-কমার্স প্রতারণার আরেক অনুসন্ধানে দেখা যায়, অফিস ছাড়া শুধু অনলাইনে একটি ওয়েব পেজ দিয়ে ৬৭টি ওয়েব পেজ-সর্বস্ব কোম্পানি পণ্য কেনা-বেচায় বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় অফার ও মুনাফার আশ্বাস দিয়ে কৌশলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ২০১৯ সাল থেকে ওয়েব পেজগুলোর মাধ্যমে গ্রাহক সংগ্রহ করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৭ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে সাইটগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানে টাকা দিয়ে তিনভাগের দুইভাগ গ্রাহকই পণ্য পাননি, প্রতারিত হয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে বা অন্যের নাম ব্যবহার করে এ কাজ করেছেন। প্রতিষ্ঠানের কোনো নিবন্ধন নেই, সরকারি কোষাগারে এক টাকাও ভ্যাট-ট্যাক্স দেয়নি।

বাংলাদেশে ই-কমার্স ব্যবসায়ের উত্থান বেশি দিনের নয়। একদশক ধরে সীমিত পরিসরে শুরু হলেও গত দেড় বছরে এর জয় জয়কার। এখন করোনা মহামারীতে সব বন্ধ থাকায় রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। ক্রেতা ধরার প্রতিযোগিতায় আস্থা হারাচ্ছে ভালো ই-কমার্স কোম্পানিগুলো। প্রতারণার শিকার হচ্ছেন ক্রেতারা।

ক্রেতারা অনেক সময়ই বুঝতে পারেন না, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কোনটি বিশ্বাসযোগ্য কিংবা কোনটিতে প্রতারণার আশঙ্কা আছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করলে আপনি বেঁচে যেতে পারেন প্রতারণার হাত থেকে। প্রতারকচক্র অনেক সময়ই বিখ্যাত কিংবা প্রতিষ্ঠিত কোনো অনলাইনের ওয়েব সাইটের হুবহু প্রতিরূপ তৈরি করে। কখনো বানানে সামান্য পরিবর্তন আনে, কখনও ডিজাইনে। সুতরাং আপনার কাক্সিক্ষত ওয়েব সাইটে ঢোকার আগে বানান ও ডিজাইনের দিকে খেয়াল করুন। দেখুন আপনি সঠিক ওয়েব সাইটে ঢুকছেন কিনা। প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানি বা ব্র্যান্ড হুটহাট তাদের নামের বানান বা লোগোর ডিজাইন পরিবর্তন করে না।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আফিফা আব্বাস বলছেন, ‘সত্যিকারের ওয়েব সাইটে ঢুকছেন কি না, সেটা দুইভাবে বোঝা যায়। প্রথমত, একটি অরিজিনাল ওয়েব সাইটের অ্যাড্রেসের শুরুতে অবশ্যই https থাকবে এবং ওয়েব সাইটটির একটি পূর্ণ ডোমেইন নেইম থাকবে, অর্থাৎ ডব্লিউডব্লিউডব্লিউডট (WWW.), এর পরে কোনো একটি নাম এবং শেষে ডটকম (.com) থাকবে। দ্বিতীয়ত, ওয়েব সাইটটি কোনো র‌্যানডম নম্বর দিয়ে শুরু হবে না।’

ই-কমার্সকে শৃঙ্খলায় নিয়ে আসতে একটি নীতিমালা তৈরি করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, যেটা চূড়ান্তের পথে। সেখানে পণ্যের অর্ডার দেয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া, তাতে ব্যর্থ হলে অগ্রিম নেয়া মূল্য জরিমানাসহ ফেরত দেয়া এবং খারাপ ও মানহীন পণ্য সরবরাহকে ফৌজদারি আইনের আওতায় এনে প্রতারণা হিসেবে গণ্য করা হবে। সেটির প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে এখন থেকে গ্রাহকের কাছ থেকে পণ্য বা সেবার অগ্রিম মূল্য সরাসরি নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে নিতে পারবে না ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাদি নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৯ আগস্ট একটি সার্কুলার জারি করে দেশের কার্যরত সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ই-কমার্স নীতিমালা ২০২১-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে। এখন সে খসড়ায় সংশ্লিষ্টদের মতামত নেয়া হচ্ছে। মতামত নেয়া শেষ হলে এটি চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হবে। বিদ্যমান অসংগতি কমানোর পাশাপাশি গ্রাহকের স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে সরকার ই-কমার্স খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


লেখক : জাহিদুর রহমান, মানবাধিকারকর্মী
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
সংবাদ লিঙ্কঃ প্রতারণারোধে ই-কমার্স নীতিমালা