কৃষি সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার কতটুকু?

হিন্দু সম্পত্তিতে নারীরা সম্পত্তির অধিকারে পিছিয়ে আছে| হিন্দু সমাজে সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সম্পর্কিত প্রচলিত নিয়ম দায়ভাগ ও মিতাক্ষর মতবাদ| দুটি মতবাদেই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসেবে পুরুষ প্রাধান্য পেয়েছে| দীর্ঘকাল নারীরা সম্পত্তির ভাগ না পেলেও ১৯৩৭ সালের হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার আইন অনুযায়ী হিন্দু নারীকে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃত দেওয়া হয়েছে| আইন অনুযায়ী, হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার আইন অনুসারে স্বামীর কৃষি-অকৃষি উভয় জমিতে বিধবা নারীর অধিকারের কথা বলা হয়| পরবর্তীকালে ফেডারেল কোর্টে কৃষি সম্পত্তির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হলে কৃষি সম্পত্তি পাবে না বলে ফেডারেল কোর্ট অভিমত দেয়| এই রায়ই এত দিন অনুসরণ করা হতো|

হাইকোর্টের রায় ও হিন্দু নারীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার : সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. মেফতাহ্ উদ্দিন মহোদয়ের একক বেঞ্চ ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর রায়ে বলেছেন, হিন্দু বিধবা নারীরা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে অর্থাত্ স্বামীর রেখে যাওয়া কৃষি-অকৃষি উভয় প্রকার সম্পত্তিতে হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার থাকবে| আদালত সম্পত্তি শব্দটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, সম্পত্তি শব্দের অর্থ সব সম্পত্তি সেখানে স্হাবর, অস্হাবর, বসতভিটা, কৃষিভূমি, নগদ টাকা বা অন্য সব ধরনের সম্পত্তিকে বোঝাবে| কৃষিজমি ও বসতভিটার মধ্যে পার্থক্য করার সুযোগ নেই এবং এ ধরনের সম্পত্তি বিধবার বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয়|

মামলার বিবরণে জানা যায়, খুলনার রাজবিহারী মণ্ডলের দুই ছেলে| তারা হলেন জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল ও অভিমনু্য মণ্ডল| অভিমনু্য মণ্ডল ১৯৫৮ সালে মারা যান| এ অবস্হায় মৃত ভাইয়ের স্ত্রী (গৌরী দাসী) কৃষিজমি পাবেন না, শুধু বসতভিটা থেকে অর্ধেক পাবেন—এমন দাবি নিয়ে ১৯৮৩ সালে নিম্ন আদালতে মামলা করেন জ্যোতিন্দ্রনাথ| তবে মামলায় পক্ষ যথাযথভাবে না করা, ভারতের ফেডারেল কোর্ট ও বাংলাদেশের হাইকোর্টের বিভিন্ন রায় অনুসরণ করে জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডলের আবেদন ১৯৯৬ সালে খারিজ করে রায় দেয় আদালত| এ রায়ের বিরুদ্ধে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আপিল করেন জ্যোতিন্দ্রনাথ| আপিল আদালত ২০০৪ সালের ৭ মার্চ রায় দেয়| রায়ে বসতভিটা ও কৃষিজমিতে গৌরী দাসীর অধিকার থাকবে বলা হয়| এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন জ্যোতিন্দ্রনাথসহ অন্যরা| রিভিশন আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রায় দেয়|

হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, রাজবিহারী মণ্ডলের আগে তার পুত্র অভিমনু্য মারা যান| গৌরী দাসী অভিমনু্যর বিধবা স্ত্রী| বিবাদী গৌরী শুধু বসতভিটার উত্তরাধিকারী এবং তাকে কৃষিজমি থেকে বঞ্চিত করার কারণ দেখা যাচ্ছে না| শ্বশুর মারা যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া বসতভিটায় বাস করেছিলেন গৌরী এবং আপাতদৃষ্টিতে জীবনধারণের জন্য শ্বশুরের কৃষিজমির ওপর নির্ভরশীল তিনি| এই মামলার বিবাদী গৌরী দাসীর ক্ষেত্রে হিন্দু আইনের দায়ভাগা পদ্ধতি প্রযোজ্য| ১৯৩৭ সালের আইনের ৩(১) ধারা অনুসারে বাবার আগে মারা যাওয়া ছেলের মতোই তিনি (গৌরী) তার শ্বশুরের রেখে যাওয়া সব সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবেন|

বর্তমান অবস্হা ও চ্যালেঞ্জ : আইনের এই অসমতাকে দূর করতে সম্পত্তিতে হিন্দু নারী ও পুরুষের সমান অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বেসরকারি সংগঠন ‘হিন্দু আইন প্রণয়নে নাগরিক জোট’-এর পক্ষে ‘খসড়া হিন্দু উত্তরাধিকার আইন, ২০২০’ সুপারিশ করা হয়েছে| এই খসড়া আইনে নারী-পুরুষ বা উত্তরাধিকারীর মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যাঘ্যতার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে| হিন্দু নারীর অধিকারের জন্য খসড়া আইনটি পাশ করাই বড় চ্যালেঞ্জ| ভারত ১৯৫৬ সালে ‘হিন্দু সাকসেশন আইন’ পাশ করেছে এবং এই আইনের মাধ্যমে হিন্দু নারী ও পুরুষের উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে সমান অংশ নিশ্চিত করেছে এবং পরবর্তী সময়ে ২০০৫ ও ২০০৭ সালে তারা আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে আরো যুগোপযোগী করেছে| অথচ বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে| হিন্দু আইন সংস্কার নিয়ে যে আন্দোলন চলছে সেই আন্দোলনকে নতুন করে পথ দেখাবে এই রায়| এই রায়ের মাধ্যমে হিন্দু নারীর সম্পত্তির অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখবে পাশাপাশি সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলো|


লেখক : মো. শাহীনুজ্জামান, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্ম
প্রকাশিত লিঙ্কঃ কৃষি সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার কতটুকু?