অস্ট্রেলিয়ায় জুরির বিচার ও আইনি সহায়তা

২০১৮ সালে আমার অস্ট্রেলিয়া সফরের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আইন ও বিচার বিভাগের ‘অধস্তন আদালত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণে আইন ও বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ’ প্রকল্পের আওতায় ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশের বিচারকদের জন্য আয়োজিত একটি কোর্সে অংশ নেয়াই ছিল সফরের উদ্দেশ্য। কোর্সের মধ্যেই এক দিন ছিল অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টসহ জেলা পর্যায়ের আদালত পরিদর্শন। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ আদালতের নাম হাইকোর্ট, যা রাজধানী ক্যানবেরাতে অবস্থিত। আর, প্রাদেশিক সর্বোচ্চ আদালতের নাম সুপ্রিম কোর্ট। সেদেশে বিচার বলতে মূলত জুরির বিচার (Jury trial)’কেই বোঝায়। ছোটখাট বিরোধের ক্ষেত্রেই কেবল বিচারককেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা চালু আছে, যা আমাদের দেশের একেবারেই বিচারককেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থার বিপরীত।

অস্ট্রেলিয়া সফরের বিষয়টি ভাবনায় আসারও অনেক আগে থেকে জুরির বিচার দেখার একটা দুর্দমনীয় ইচ্ছা জেগে ছিল আমার মধ্যে। এমন বাসনার উদ্গম হয় অসংখ্য কোর্টরুম মুভি দেখে দেখে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখা যায় যে, কমন ল’ ব্যবস্থায় মূলত মামলার পক্ষরাই আইনি লড়াই করেন, আর বিচারক আম্পায়ারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সিদ্ধান্ত দেন। তাতে সাধারণত গুরুতর বিষয়ের বিচার জুরির মাধ্যমে হয়। এতে মামলার ফলাফল কি হবে, অর্থাৎ আসামি দোষী না নির্দোষ কিংবা বাদী মামলায় জিতলেন না হারলেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিচারকের কোনো ভূমিকা নেই। ফয়সালা করেন ১২ জন ব্যক্তি, যাদের সমাজের সাধারণ মানুষদের মধ্যে থেকে কিছু মানদন্ড ধরে বেছে নেয়া হয় দৈবচয়নের ভিত্তিতে। এরাই হলেন জুরি।

এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দর্শন হলো- বিচারকেরা হলেন আইনে বিশেষজ্ঞ, তাদের বিচারধারা সমাজের সাধারণের বিচারধারার সমান না হয়ে উচ্চমার্গীয় ধরনেরই হওয়ার কথা, যা কাম্য নয়। সমাজের একেবারে সাধারণ মানুষের চোখে বা বিবেচনায় যিনি বা যারা দোষী কিংবা নির্দোষ বলে গণ্য হবেন; অথবা মামলায় জিতলেন কি হারলেন, তাদেরই দোষী বা নির্দোষ বলে সাব্যস্ত করাটাই বাস্তবসম্মত। জুরি ফলাফল ঘোষণার পর দন্ডের বা প্রতিকারের প্রকৃতি, সময়, অর্থমূল্য ইত্যাদি সাব্যস্ত করার দায়িত্ব বিচারকের। ব্রিটিশ আমলে আমাদের দেশেও এই জুরির বিচার চালু ছিল। পরে সেটা বাতিল হয়ে বর্তমানের বিচারককেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থা চালু হয়। প্যারাম্যাটা শহরতলীতে সব আদালত এক জায়গাতেই অবস্থিত। সেখানে আমাদের জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারক মার্ক কার্টিস মারিয়েন ছোটখাটো একটা ব্রিফিং দিলেন। তাতে অন্যান্য কথার মধ্যে কাজের যে কথাটি বললেন তা হলো- এক সঙ্গে ৪০ জন দর্শনার্থী বসার মতো ব্যবস্থা এজলাসগুলোতে (আদালত কক্ষ) নেই। তাই দুটি দলে ভাগ হয়ে আমাদের এক দলকে নিয়ে যাবেন সুপ্রিম কোর্টের জুরির বিচার দেখাতে, আর আরেক দলকে নিয়ে যাবেন অন্য আদালতে। বিধি বাম, আমি পড়লাম অন্য আদালতে।

কয়েক স্তরের অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে আমরা এজলাসে পৌঁছলাম। গিয়ে দেখি সেখানে সুনসান নীরবতা। আমরা ছাড়া মাত্র দুজন নারী সাংবাদিক আর ৪/৫ জনকে দেখলাম দর্শক সারিতে। স্বদেশে আইনজীবী, মক্কেল, সাক্ষী, পুলিশ, সংবাদকর্মীতে মিলে গিজগিজ করা অতি কোলাহলপ্রবণ এজলাসে বিচার কাজ পরিচালনা করতে অভ্যস্ত আমাদের সবারই কেমন যেনো লাগলো এই রাজ্যের নিরবতা! বিচারক মারিয়েন মহাশয় এসে অত্যন্ত নিচু গলায় আবার ব্রিফিং করলেন এই বলে যে- এই আদালতে আজ অত্যন্ত আলোচিত ও গুরুতর একটি মামলার বিচার হবে। এরপর কিছুটা কুণ্ঠিত অবস্থায় মামলার একমাত্র আসামি ও তার বিরুদ্ধে অভিযোগের যে বয়ান তিনি দিলেন তাতে আমাদের মাথাই হেঁট হয়ে গেল।

অভিযুক্ত একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসিতে পড়ুয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণ ইহসাস খান (২৫)! তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো- তিনি ছুরি হাতে আল্লাহু আকবার বলে একজন নিরীহ অস্ট্রেলীয় পথচারী ওয়েইন গ্রিনহালজের (৫৭) ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ক্রমাগত ছুরিকাঘাত করতে থাকেন। এই সময় তিনি ইরাকে বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তাকে হত্যা করছেন বলেও চিৎকার করতে থাকেন। গুরুতরভাবে জখম হলেও পাশের একটি চুল কাটার দোকানে ঢুকে যেতে পারায় আক্রান্ত ব্যক্তি প্রাণে বেঁচে যান। ঘাতক ইহসাসকে অস্ট্রেলিয়ার চলমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ বলে চিহ্নিত সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে হত্যাচেষ্টার দায়ে অভিযুক্ত করা হলো। অভিযুক্ত জবাবে এর সবই স্বীকার করেন। তবে, তার বক্তব্য ছিল- তিনি এই সময় মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন।

এজলাসে পরচুলা পরা ব্যারিস্টার, প্রসিকিউটর, তাদের সহকারী, মার্শাল ও আদালতের কর্মকর্তারা ব্যস্ত হলেও বিচার শুরু হতে দেরি হচ্ছিল। আমরাও উশখুশ করছিলাম দেখে বিচারক মারিয়েন মহাশয় আবার আসলেন। অভিযুক্তপ্রবর নাকি সেদিনই আদালতে আসার আগে নিরাপত্তারক্ষীদের মারধর করেছেন, সেজন্যই দেরি হচ্ছে এবং বিচার আজকের জন্য মুলতবিও হয়ে যেতে পারে।

কিছুক্ষণ পর এজলাস থেকে আর সবাইকে বের করে দিয়ে আমাদের কাছে আসলেন স্বয়ং বিচারপতি জেফ্রি জন বেলো। এসে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন যে- আজকে বিচার মুলতবি করতে হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তারক্ষীদের মারধরের ঘটনায় একদিকে যেমন অভিযুক্তের আবারও সহিংস হয়ে উঠার আশঙ্কায় আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা হতে পারে; অন্যদিকে, তেমনি আসামি পক্ষের ব্যারিস্টার সাহেবও আজকে শুনানি করতে ইচ্ছুক নন। কারণ, তার মতে, আজ অভিযুক্তের মানসিক অবস্থা বিচারের মুখোমুখি হওয়ার মতো নয়। তার আরও আশঙ্কা যে, জুরিদের সামনে বিচারের সময় যদি তার মক্কেল অসংযত বা হিংসাত্মক আচরণ করেন তাহলে বিচার ফয়সালার সময় জুরিদের মতামত তাতে অভিযুক্তের বিপক্ষে প্রভাবিত হয়ে যেতে পারে।

এরপর বিচারপতি বেলো আমাদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার জবাব দিলেন। তিনি জানালেন যে, অভিযুক্তের পক্ষে যে ব্যারিস্টার লড়ছেন তিনি সেরা আইনজীবীদের একজন। তার ফি সবচেয়ে বেশি। বিপরীতে যিনি সরকারপক্ষের প্রসিকিউটর, তিনিও অত্যন্ত উচ্চমানের ব্যারিস্টার। তখন স্রেফ কৌতুহলবশত আমি প্রশ্ন করলাম যে, অভিযুক্ত যদি মানসিকভাবে অসুস্থতারই দাবি করেন তবে তার পক্ষে এত উচ্চ ব্যয়ের ব্যারিস্টার নিয়োগ করলেন কে? তার পরিবার কি খুব অবস্থাসম্পন্ন? এক বাক্যে জবাব এলো-না, তার পরিবার তার পক্ষে দাঁড়ায়নি; প্রাদেশিক আইনগত সহায়তা সংস্থাই আসামির পক্ষে এই দামি কৌঁসুলিকে নিয়োগ করেছে। এই একটি কথাতেই সে দেশের সঙ্গে আমাদের আইনগত সহায়তার ধরন ও ব্যাপ্তির পার্থক্য বেরিয়ে এলো। আমাদের আইনগত সহায়তা দেবার যে ধরন-ধারণ তাতে দেখা যায় যে, বার সমিতিগুলোর আইনজীবীদের মধ্যে যারা দক্ষতা- যোগ্যতায় সেরা তারা আইনগত সহায়তা কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকেন না বললেই চলে। এর কারণ অনেক। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-

এই কাজের জন্য যে ফি সরকারিভাবে বরাদ্দ থাকে তা অতি সামান্য। সেরা আইনজীবীর ফি তার অনেকানেক গুণ বেশি। জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি ইচ্ছা করলেই প্রয়োজনীয় ফি দিয়ে উচ্চমানের আইনজীবীকে নিয়োগ দিতে পারেন না। তাদের একটি বিশেষ আইনজীবী প্যানেল থেকেই নিয়োগ দিতে হয়। কম ফি’র জন্য সেরা আইনজীবীরা এই প্যানেলেও অন্তর্ভুক্ত হতে চান না। মক্কেল যদি কোনো আইনজীবীকে পছন্দ করেন তাহলে তাকে নিয়োগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে জেলা আইনগত সহায়তা কমিটির। সাধারণত দেখা যায় যে, একজন আইনজীবীই মামলা নিয়ে আসেন যাতে পরোক্ষে মক্কেল তাকেই আইনজীবী হিসেবে পছন্দ করতে দেখা যায়। বলাই বাহুল্য যে, সেরা আইনজীবীদের এই প্রক্রিয়ায় দেখা যায় না। কারণ, তাদের উচ্চ ফি দিয়ে নিযুক্ত করার মক্কেল এতো বেশি থাকে যে, তারা আইনগত সহায়তার মামলার মতো ‘ঝুটঝামেলা/বাধ্যবাধকতা’য় আসতে অনিচ্ছুক থাকেন। সর্বোপরি, আমাদের আইনগত সহায়তায় মূলত আইনজীবীর খরচ বাবদ অর্থ দেয়া সম্ভব হয়। সাক্ষীদের যাতায়াত ভাতা দেয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় দলিলপত্র তোলার সময় কিছু ক্ষেত্রে অর্থ পাওয়া সম্ভব হলেও তার প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও জটিল। ফলে, মক্কেলরা তাতে উৎসাহিত হন না। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি আইনগত সহায়তা পাওয়ার পরও দেখা যায় যে, তাকে মামলার অনেক খরচ বহন করতে হয়।

জেলা আইনগত সহায়তা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন ও বিচারক হিসেবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে আরও কিছু বিষয় জানা যায়। যেমন-

ফৌজদারি বিচারে শুধু জামিন শুনানি আর দেওয়ানি ক্ষেত্রে কিছু পারিবারিক মামলায় আইনজীবীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। মূল বিচার প্রক্রিয়ায় প্যানেল আইনজীবীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য নয়।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে এমন অভিযোগ আসে যে, নিযুক্ত প্যানেল আইনজীবী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন না।

কখনো দেখা যায় কম দক্ষ আইনজীবী নিয়োগের ফলে তার অভিজ্ঞতার অভাবে মামলার মেরিট নষ্ট হয় বা প্রার্থী ইপ্সিত প্রতিকার পান না।

আবার, প্যানেল আইনজীবী থাকার পরও মক্কেলরা ব্যক্তিগতভাবে আইনজীবী নিয়োগ দিচ্ছেন, এমন ঘটনা আকছারই ঘটতে দেখা যায়।

প্রচলিত আইন-বিধি-নীতিমালায় আইনি সেবাপ্রার্থীর প্রকৃত আর্থিক সামর্থ নিরূপণের ব্যবস্থা না থাকায় ঢালাওভাবে আইনগত সহায়তা দিতে হয়, এক্ষেত্রে জেলা কমিটির তেমন কিছু করার থাকে না।

মাঝেমধ্যে দেখা যায়, আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিরাও ‘লিগ্যাল এইডের মামলা’ হিসেবে নিছক আদালতের সহানুভূতি পাওয়ার উদ্দেশ্যেও আইনজীবী নিয়োগের প্রার্থনা করেন। বিচারাধীন বন্দীদের ক্ষেত্রে এই ঘটনা বেশি ঘটতে দেখা যায় ইত্যাদি।

এটা অস্বীকার করার জো নেই যে, অস্ট্রেলিয়ার মতো একটি আর্থিকভাবে উন্নত দেশের আইনগত সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে বাংলাদেশের মতো নিম্নমধ্যবিত্ত রাষ্ট্রের তুলনা চলে না। তাছাড়া, সেই দেশটা বাংলাদেশের চেয়ে আয়তনে ৫০ গুণ বড় হলেও এর জনসংখ্যা আমাদের ১/৮ অংশমাত্র। ফলে, তারা আইনগত সহায়তায় অনেক বেশি অর্থ-মেধা-শ্রম ব্যয় করার সামর্থ্য রাখেন।

আবার, সেখানে মামলার সংখ্যাও আমাদের তুলনায় অত্যন্ত কম। আমাদের পরিদর্শনের দিন সুপ্রিম কোর্টে শুধু ১টি মামলাই বিচারের জন্য তালিকাভুক্ত ছিল। এর আগে যখন ক্যানবেরাস্থ অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট পরিদর্শনে যাই, সেদিনও সেখানে শুধু ১টি মামলাই তালিকাভুক্ত ছিল। কম মামলা থাকার অন্য কারণও অবশ্য আছে। সেখানকার নাগরিকদের মধ্যে আইন মেনে চলার উচ্চমানের সংস্কৃতি রয়েছে। অপরাধ স্বীকার করা ও আপসে মামলা নিষ্পত্তির হারও অনেক বেশি। সেখানে আবার মিথ্যা ফৌজদারি মামলা করার সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ রাষ্ট্রপক্ষে শুধু পুলিশই মামলা করতে পারে। যে কোন অভিযোগ পেলেই পুলিশ তা আমলে নিয়ে তদন্ত করতে বাধ্য থাকে। আবার, অকাট্য প্রমাণ ছাড়া আদালত পুলিশের মামলাও বিচারে নেন না। আর দেওয়ানি, ফৌজদারি বা পারিবারিক যে কোন মামলাতেই পরাজিত পক্ষকেই মামলার সম্পূর্ণ খরচ বহন করতে হয়। এ খরচ অনেক অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে মামলার খরচ বহন করতেই মানুষ ফতুর হয়ে যান। ফলে, পক্ষদেরও যেমন মামলার ব্যাপারে চরম সতর্ক থাকতে হয়; তেমনি, সলিসিটর/ব্যারিস্টাররাও জেতার ভালো সম্ভাবনা নেই-এমন মামলা হাতে নেন না। কারণ, হারলে তাদের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়, যা তাদের পরবর্তী ব্রিফ পেতে অসুবিধার সৃষ্টি করে। স্পষ্টতই কম মামলা থাকার সঙ্গে উচ্চমানের আইনগত সহায়তা দেয়ার সম্পর্ক ওতপ্রোত।

এটাও সত্যি যে, অত্যন্ত অল্প সময় ও অপ্রতুল অর্থ বরাদ্দ নিয়েও আমাদের জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা দেশে আইনগত সহায়তার ধারণাটিকে জনারণ্যে পরিচিত, প্রতিষ্ঠিত ও অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর করে তুলতে পেরেছে। তবে, আমাদের আরও উন্নতি করার সুযোগ আছে। অস্ট্রেলিয়ার মানে না হলেও আমাদের বিদ্যমান আইনগত সহায়তা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও অর্থবহ করা সম্ভব। এর জন্য কিছু আইন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। সেই রকম কিছু পর্যবেক্ষণ হলো-

জেলা কমিটির আওতায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি প্লিডার/প্রসিকিউটরের স্থায়ী পদ সৃষ্টি করা, যারা নিজেরাই মামলা পরিচালনা করবেন। তাদের নিয়োগ হবে, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে। তারা প্রয়োজন মনে করলে কমিটির মতামত লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা নিয়ে মামলার গুরুত্ব বুঝে দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ করবেন। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সেবার মান বাড়ানো সম্ভব হবে; অন্যদিকে, জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা যাবে।

বর্তমানে আইনগত সহায়তার কার্যক্রমের ব্যাপ্তি ঘটেছে নানাভাবে। নিয়মিত কাজের বাইরে মামলার আগে পরামর্শ থেকে আরম্ভ করে বিচারাধীন মামলায় মধ্যস্থতাসহ অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে, শুধু একজন এবং তা-ও আবার সিনিয়র সহকারী জজ পদমর্যাদার বিচারকের পক্ষে এ গুরুদায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত দুরূহ। তাই একজন জেলা জজ অথবা কমপক্ষে অতিরিক্ত জেলা জজ পদমর্যাদার বিচারকের অধীনে একজন করে যুগ্ম জেলা জজ ও সিনিয়র সহকারী জজ বা সহকারী জজ নিয়োগ করলেই ইপ্সিত ফলাফল পাওয়া যেতে পারে।

আইনজীবীর ফি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়ে তা আলোচনাসাপেক্ষে রাখতে হবে।

সাক্ষী ভাতা ও মামলার প্রয়োজনীয় খরচ নির্বাহের জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ রাখতে হবে।

আইনগত সহায়তা প্রার্থীর প্রকৃত আর্থিক সামর্থ্য নিরূপণ ও মামলার গুণগতমান (Merit) বিবেচনার জন্য কিছু কার্যকর পদ্ধতি সৃষ্টি করার মাধ্যমে সহায়তার পরিধি ও আর্থিকসীমা বাস্তবসম্মত করে সেবার মান উন্নত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

যেহেতু মামলার সংখ্যার সঙ্গে আইনগত সহায়তা সেবার উচ্চমানের বিষয় জড়িত, সেহেতু মামলার হারই কমিয়ে দেয় এমন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ আইনগত সংস্কার আনতে হবে। যেমন-

পরাজিত পক্ষকেই মামলার প্রকৃত খরচ বহন করার বিধান করা।

ভূমি, জরিপ ও নিবন্ধন ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠন করা।

বিচার বিভাগের অধীনে পৃথক ও জবাবদিহিপূর্ণ তদন্ত সংস্থা গঠন করা।

সম্পূর্ণ বিচারব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন করা।

স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল মাধ্যমেও মামলার কার্যক্রম পরিচালনার লক্ষ্যে আদালত কর্তৃক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার আইন, ২০২০-এর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

পুনশ্চ

আমাদের সংক্ষিপ্ত সময়ের কোর্স শেষে দেশে ফিরে আসার পরও ইহসাস খান আমার পিছু ছাড়েননি। তার জুরির বিচার আমার অন্যতম আগ্রহের বিষয়বস্তু হয়েই থেকে যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বিচারের খবর রাখতে থাকি। একদিন খবর মেলে যে-বিচার শেষে ইহসাস খানের ‘তিনি ঘটনার সময় মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন আর একটা জ্বীন তাকে হত্যা করার হুকুম দিয়েছিল’- এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে জুরি তাকে দোষী সাব্যস্ত করে। এরপর প্রাগুক্ত বিচারপতি বেলো অভিযুক্তকে ৩৬ বছরের কারাদন্ডের সাজা দেন, যার মধ্যে ২৭ বছর পর্যন্ত তিনি জামিনে মুক্তি লাভের যোগ্য হবেন না।


লেখক : মিল্লাত হোসেন, প্রাবন্ধিক
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ অস্ট্রেলিয়ায় জুরির বিচার ও আইনি সহায়তা (প্রথম অংশ)
অস্ট্রেলিয়ায় জুরির বিচার ও আইনি সহায়তা (দ্বিতীয় অংশ)