বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন

বিএম কইটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড। ডিপোর দুর্ঘটনার দুটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে-কমপক্ষে ৯ জন ফায়ার সার্ভিস সদস্যের মৃত্যু, এর আগে কোনো দুর্ঘটনায় এই বাহিনীর এতজন সদস্য প্রাণ হারায়নি; এবং রাসায়নিক ভর্তি কইটেইনারের বিস্ফোরণের মাধ্যমে আগুন ছড়িয়ে পড়া।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য বেশ কয়েকটি কমিটি ইতোমধ্যে গঠন করা হয়েছে। তাদের তদন্ত রিপোর্ট পেতে আমাদের কিছুটা সময় লাগবে। প্রাথমিকভাবে আগুনের উৎস বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ডিপোটিতে রপ্তানির জন্য সংরক্ষিত রাসায়নিক হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের কইটেইনার বিস্ফোরণের খবর আমরা গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচার হতে দেখেছি। হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ভর্তি কইটেইনারের বিস্ফোরণের ফলে আগুনের মাত্রা, ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিস থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ সবাই মতামত দিয়েছেন।

রাসায়নিক বিশেষজ্ঞদের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারছি যে, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড সাধারণ অবস্থায় দাহ্য নয়। তবে এটা অক্সিডাইজিং বা অগ্নিসহায়ক রাসায়নিক হিসেবে কাজ করে। কোথাও হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থাকলে সেই আগুনটা নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। কেননা, অক্সিজেনের জোগানটা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড থেকে আসে। এর ফলে আগুনের তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। আবার হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের নির্দিষ্ট বয়লিং পয়েন্ট (উত্তপ্ত হওয়ার চূড়ান্ত মাত্রা) আছে। আগুনের সূত্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএম কইটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণটা হয়নি। কেননা, বিস্ফোরণের অবস্থায় পৌঁছাতে বেশ কিছুটা সময় দরকার হয়। প্রশ্ন হলো হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড বিপজ্জনক বা বিস্ফোরক দ্রব্য কি না। জাতিসংঘের মডেল আইন অনুযায়ী, বিপজ্জনক পণ্যের ৯টি শ্রেণী রয়েছে। বিপজ্জনক পণ্যের দ্বারা তৈরি বিপদের প্রকৃতি দ্বারা এই শ্রেণীকরণ হয়েছে। শ্রেণীগুলো হচ্ছেবুধবার ১. বিস্ফোরক ২. গ্যাস ৩. দাহ্য তরল ৪. দাহ্য কঠিন পদার্থ ৫. অক্সিডাইজিং এজেন্ট এবং জৈব পার-অক্সাইড, ৬. টক্সিন এবং সংক্রামক পদার্থ, ৭. তেজস্ক্রিয় উপাদান, ৮. ক্ষয়কারী, ৯. বিবিধ বিপজ্জনক পণ্য। এই শ্রেণীকরণ অনুযায়ী হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড অক্সিডাইজিং এজেন্ট এবং নিঃসন্দেহে একটি বিপজ্জনক রাসায়নিক। বিপজ্জনক রাসায়নিক হিসেবে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ এবং আমদানি-রপ্তানিতে সরকারি নিয়মনীতির পরিপালন ও নজরদারি থাকার কথা।

বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন বিষয়ে বাংলাদেশে দুটি আইন প্রচলিত রয়েছে। এদের একটি হলো ডেঞ্জারাস কার্গোস অ্যাক্ট, ১৯৫৩। ছোট্ট এই আইনটিতে ডেঞ্জারাস কার্গোস বা বিপজ্জনক পণ্যের চারটি শ্রেণী উল্লেখ করা হয়েছেবুধবার বিস্ফোরক দ্রব্য, পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ, নিষিদ্ধ ঘোষিত বিপজ্জনক পণ্য এবং অন্য যে কোন দাহ্য বা বিস্ফোরক দ্রব্য, যা সরকার বিপজ্জনক পণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। সংক্ষিপ্ত এই আইনটিতে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন বা মজুদ বিষয়ে কিছুই বলা নেই। এই আইনের মাধ্যমে শুধু সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা কর্তৃপক্ষকে বিপজ্জনক পণ্য বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ বিধি প্রণয়নের ও বিধির যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না, তা দেখভালের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় আইনটি হলো এক্সপ্লোসিভ অ্যাক্ট, ১৮৮৪। প্রথম আইনের তুলনায় এই আইনটি বিস্তৃত। এই আইনে বিস্ফোরক দ্রব্যের বিস্তারিত সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, এই ধরনের দ্রব্যের উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ বিষয়ে বিস্তারিত ও সুস্পষ্টভাবে আইনি বিধানগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এক্সপ্লোসিভ অ্যাক্ট বা বিস্ফোরক আইনের অধীনে ২০০৪ সালে একটি বিস্তারিত বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই বিধিমালায় বিস্ফোরক দ্রব্য উৎপাদন, মজুদ, আমদানি, পরিবহন ও সংরক্ষণের বিষয়ে বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে। ২০০৪ সালের বিধিমালার তফসিল ১-এ বিস্ফোরক দ্রব্যের সাতটি শ্রেণীর উল্লেখ করেছে। এই শ্রেণী বিভাগগুলো করা হয়েছে অতি-বিস্ফোরক, অস্ত্র ও গোলাবারুদসংক্রান্ত এবং পটকা ও আতশবাজিতে ব্যবহৃত বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ে। ফলে বাংলাদেশে প্রচলিত আইন ও বিধিমালায় অন্যান্য বিপজ্জনক রাসায়নিক বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু নেই, তা বলাই যায়। তাই হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো রাসায়নিক দ্রব্য যেগুলো সরাসরি বিস্ফোরক, দাহ্য বা বিপজ্জনক দ্রব্য না হলেও বিশেষ পরিস্থিতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে এবং অত্যন্ত সাবধানতার সঙ্গে যেগুলোকে সংরক্ষণ ও পরিবহন করার প্রয়োজন হয়বুধবার এমন সব রাসায়নিক দ্রব্যের বিষয়ে আইনি বিধান সুস্পষ্ট নয়।

এছাড়া জাতিসংঘের মডেল আইনে উল্লেখকৃত বিপজ্জনক দ্রব্যের শ্রেণী বিভাজনের সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনের শ্রেণীবিভাজনের তেমন মিল নেই। অথচ বিপজ্জনক দ্রব্য আমদানি-রপ্তানিতে যেহেতু আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার প্রয়োজন হয়, তাই এই আইন ও রীতির সঙ্গে আমাদের অভ্যন্তরীণ আইন সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার।

বিস্ফোরক দ্রব্য দেখভালের দায়িত্ব মূলত বিস্ফোরক পরিদপ্তরের। এই দপ্তর বিস্ফোরক অ্যাক্ট, ১৮৮৪; পেট্রোলিয়াম অ্যাক্ট, ২০১৬ এবং এই দুটি অ্যাক্টের অধীন প্রণীত ৯টি বিধিমালার প্রয়োগ ও প্রশাসনের দায়িত্বে নিয়োজিত। বিস্ফোরক বিধিমালা ও পেট্রোলিয়াম বিধিমালা ছাড়াও এলপিজি, সিএনজি, গ্যাসাধার, গ্যাস সিলিন্ডার ও এমোনিয়াম নাইট্রেট বিধিমালার প্রয়োগ ও প্রশাসনের কাজ করে বিস্ফোরক পরিদপ্তর। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের মূল কার্যক্রম হিসেবে তাদের ওয়েব সাইটে বলা হয়েছে উল্লেখিত আইন ও বিধিমালার অধীনে বিস্ফোরক দ্রব্যের উৎপাদন, পরিবহন, মজুদ, আমদানি বিষয়ে লাইসেন্স প্রদান করা, এসব কার্যক্রমের অনুমোদন, পরীক্ষা ও প্রযোজ্য হওয়ার ক্ষেত্রে অনাপত্তি পত্র প্রদানের কথা।

আইনের পর্যালোচনায় দুটি বিষয় উঠে আসছেবুধবার এক. হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডের মতো সরাসরি দাহ্য বা বিস্ফোরক নয় এমন রাসায়নিক বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কাজের আওতাধীন কি না, তা আইন ও বিধিমালায় সুস্পষ্ট নয়, দুই. বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কাজের আওতায় ‘আমদানি’র উল্লেখ থাকলেও ‘রপ্তানি’র উল্লেখ নেই। বিএম কইটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ডে আমরা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডকে দুর্ঘটনা ও তার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বৃদ্ধির জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী হিসেবে পাচ্ছি। আর এই হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানির জন্য ডিপোটিতে রাখা হয়েছিল। গণমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে ডিপোটিতে রাসায়নিক পদার্থ রাখার তথ্য বিস্ফোরক পরিদপ্তরের জানা ছিল না। এই অবস্থায় সঙ্গত কারণেই যে প্রশ্নটি আসে তা হলো, বিএম কইটেইনার ডিপো কি তাহলে আইনগত শূন্যতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছিল? কিন্তু রাসায়নিক পদার্থ রপ্তানির মতো বড় একটি বিষয় আইনগত শূন্যতার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে সেটা বলা সহজ নয়।

এখানে মনে রাখা দরকার যে, প্রচলিত বিস্ফোরক আইন ও বিধিমালায় বিপজ্জনক রাসায়নিক পরিবহন ও মজুতের দেখভালের দায়িত্ব বিস্ফোরক পরিদপ্তরকে দেয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ইনল্যান্ড কইটেইনার ডিপোগুলো (আইসিডি) কাস্টমস বন্ডেড এরিয়া। নীতিমালা অনুসরণের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লাইসেন্স নিয়েই আইসিডিগুলো পরিচালনা করতে হয়। আইসিডি পরিচালনা করতে হলে আইএসপিএস (ইন্টারন্যাশনাল শিপ অ্যান্ড পোর্ট ফ্যাসিলিটি সিকিউরিটি কোড), আইএমডিজি (দ্য ইন্টারন্যাশনাল ম্যারিটাইম ডেঞ্জারাস কোড) মেনে এবং ফায়ার সার্ভিস নির্দেশিত সেইফটি সিকিউরিটি প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হয়।

বেসরকারি আইসিডি, সিএফএস বা অফডক স্থাপন ও পরিচালনাসংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর নির্দেশিত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, বিপজ্জনক এবং বিস্ফোরক জাতীয় পণ্য, কইটেইনার সংরক্ষণ ও হ্যান্ডেলিংয়ের ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ডেঞ্জারাস গুডস (আইএমডিজি) নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। তাই বিএম কইটেইনার ডিপো আইনগত শূন্যতার মধ্যে পরিচালিত হচ্ছিল তা বলার সুযোগ খুবই কম। বরং আইনের শাসনের অভাবই এই দুর্ঘটনায় স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ থেকে রাসায়নিকের মতো বিপজ্জনক পণ্যের রপ্তানি বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। যেমন চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে শুধু হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ২৩ লাখ কেজি। ক্রমবর্ধমান রপ্তানি ও রাসায়নিক থেকে অগ্নিকান্ডের কয়েকটি ঘটনা এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত আইনের প্রয়োজনীয়তার কথাই আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক কনভেনশন ছাড়াও দেশে বিপজ্জনক পণ্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য যুগোপযোগী আইন নেই। ১৯৫৩ সালে প্রণীত ডেঞ্জারাস কার্গো অ্যাক্টে যা রয়েছে, তা বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। কারণ, আমদানি-রপ্তানিতে নতুন নতুন বিপজ্জনক পণ্য যোগ হচ্ছে। ২০২১ সালের ২ জুন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মুখ্য সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভা থেকে এই আইন সংশোধনের সুপারিশ করা হয়। এর আগে বাংলাদেশ ন্যাশনাল অথরিটি ফর কেমিক্যাল উইপেন কনভেনশনের একটি বিশেষজ্ঞ দল এ আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছিল। আইনটির সংশোধনী অথবা নতুন একটি আইন এখন সময়ের দাবি।


লেখক : মাবরুক মোহাম্মদ, মানবাধিকারকর্মী
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ বিএম কনটেইনার ডিপোর অগ্নিকান্ড : আইনি শূন্যতা ও আইনের শাসন