অধ্যাপক তাহের হত্যা মামলার রায়

‘মিরাক্কেল ইনসেল নং-সেভেন’ সিনেমায় যখন নিষ্পাপ ও আংশিক বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বাবা একটা হত্যা মামলায় ফেঁসে যান এবং মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয় তখন তার কন্যার বয়স এই একটুকুন। কন্যা বড়ো হয়ে আইন পড়ে, আইনজীবী হয়, ওই কেইস রি-ওপেন করে এবং কেইসটা জিতে নেয়। প্রমাণ করে, তার বাবা নির্দোষ ছিলেন। সিনেমাটা কোরিয়ায় ঘটা একটা বাস্তব ঘটনা থেকে নির্মিত। জানার পর মনে হয়েছিল, এমন বাস্তবেও হয়? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক তাহের আহমেদ যখন তারই সাবেক ছাত্র ও সহযোগী অধ্যাপকের হাতে নির্মমভাবে খুন হোন, তখন তার কন্যা সেগুফতা বাবার জন্য সিনেমার গল্পকে হার মানালেন।

২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তাহের আহমেদ নিখোঁজ হন। ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসার বাইরে ম্যানহোলে তাহেরের লাশ পাওয়া যায়। লাশ উদ্ধারের পরদিন ড. তাহেরের ছেলে সানজিদ আলভী মতিহার থানায় মামলা করেন। তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন উপ-পরিদর্শক আহসানুল কবির ২০০৭ সালের ১৮ মার্চ ছয় জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। এতে তাহেরের বিভাগীয় সহকর্মী মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, তাহেরের বাসভবনের তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর, জাহাঙ্গীরের ভাই ও ছাত্রশিবিরের কর্মী আবদুস সালাম, তাদের (জাহাঙ্গীর ও আবদুস সালাম) বাবা আজিমুদ্দীন ও সালামের আত্মীয় নাজমুলকে অভিযুক্ত করা হয়। ড. তাহেরকে বাসায় হত্যা করে নর্দমায় লাশ ঢুকিয়ে রাখা হয় বলে পরবর্তীতে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে আসে। বিভাগে পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ থেকে মিয়া মহিউদ্দিন এই হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা করেন বলে প্রমাণ হয় বিচারিক আদালতে।

৩৯ জনের সাক্ষ্য জেরা নিয়ে ২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল মিয়া মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর, সালাম ও নাজমুলকে মৃত্যুদন্ড দেন। আর সালেহী ও আজিমুদ্দিন মুন্সীকে খালাস দেন নিম্ন আদালত। এরপর দন্ডিতদের মৃত্যুদন্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য রায়সহ মামলার যাবতীয় নথি পাঠানো হয় হাইকোর্টে, যা ডেথরেফারেন্স নামে পরিচিত। অন্যদিকে খালাস চেয়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন আসামিরা। পরে মামলার ডেথরেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি করে বিচারিক আদালতের রায়ের পর ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল রায় দেন হাইকোর্ট। এ রায়ে ড. তাহেরের সহকর্মী ড. মিয়া মো. মহিউদ্দিন এবং ড. তাহেরের বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়। আর সাজা কমিয়ে আবদুস সালাম ও নাজমুলকে দেওয়া হয় যাবজ্জীবন। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল ও জেল আপিল করেন আসামিরা। অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া আসামিদের সাজা বাড়াতে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব আপিল ও আবেদনের ওপর ৮দিন শুনানির পর গত ১৬ মার্চ রায়ের জন্য রেখেছিলেন সর্বোচ্চ আদালত। সে ধারাবাহিকতায় রায় দেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ছয় বিচারকের আপিল বেঞ্চ। আর কোনো বিচারিক ধাপ না থাকলেও চূড়ান্ত রায় প্রকাশের পর ৩০ দিনের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনের সুযোগ রয়েছে। আপিল বিভাগ আবেদনটি খারিজ করলে রাষ্ট্রপতির মার্জনা ছাড়া প্রাণে বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীরের। কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করতে পারবেন তারা। রাষ্ট্রপতি তা নাকচ করলে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরকে।

ঘটনার সময়কাল দুই হাজার ছয় সাল। আজ দুই হাজার বাইশ। ষোলো বৎসরে অনেক কিছু হয়ে গেছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। একজন কন্যা শুধু রয়ে গেছেন স্থির। পাশাপাশি একজন ভাই। ষোলো বৎসর ধরে ভাই সামলেছেন উপড়ে ফেলা বটবৃক্ষপরবর্তী মৃতপ্রায় সংসার। কন্যা পড়েছেন আইন। হয়েছেন আইনজীবী। বাবা হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে তিনি ১৬ বছর ধরে ছায়ার মতো লেগেছিলেন। মামলা দ্রুত শেষ করতে তিনি রাষ্ট্রপক্ষের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য সরবরাহ করেছেন। অবশেষে সর্বোচ্চ আদালত থেকে খুনিদের শাস্তির রায় নিশ্চিত করে ঘরে ফিরেছেন।

তখন সেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়েন। তার শিক্ষক বাবাই তাকে আইন বিষয়ে ভর্তি করেন। বাবা হত্যার বিচার নিশ্চিত করার জন্যই আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে আইনি পেশায় আসেন তাবাসসুম। বাবা হয়তো সেদিন চিন্তাও করেননি, তার কন্যারই আইনি লড়াই করতে হবে বাবা হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে। সেগুফতা তাবাসসুম আহমেদ তার সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইচ্ছে ছিল আইনের শিক্ষক হব। কিন্তু বাবাকে হত্যা করার পর জীবনের লক্ষ্য পাল্টে যায়। তখন সিদ্ধান্ত নিই আমি প্র্যাকটিসিং ল’ইয়ার হব। আইনজীবী হয়ে বাবার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই করব।’ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রাশিদা চৌধুরী নিলু ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘বাবা হত্যার বিচারের সঠিক রায় পেতে কন্যা সেগুফতা তাবাসসুমের দীর্ঘ ১৬ বছরের ক্লান্তিহীন লড়াই বাংলাদেশের ইতিহাসে অনন্য নজির হয়ে থাকবে। ছেলে বা মেয়ে বিষয় নয়; শিক্ষিত, যোগ্য, সাহসী সন্তান প্রয়োজন, তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সেগুফতা।

অধ্যাপক তাহের ছিলেন দেশের অন্যতম অগ্রগামী ইনক্রোপ্যালিওন্টোলজিস্ট, যিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ফরামিনিফেরা, অস্ট্রাকোডা, ন্যানো প্ল্যাঙ্কটন সিটিসি গবেষণার কাজে জড়িত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ, ব্রিটেন এবং জার্মানি থেকে ফোরামিনি ফেরা এবং ওসিরা কোডার বেশ কয়েকটি নতুন প্রজাতি সনাক্ত করেছেন, যা তার জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে। তিনি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নালে পঁচিশটিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। তিনি জার্মানি, ইংল্যান্ড, ইতালি, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া, পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশ সফর করেন। তিনি ছিলেন অসাধারণ স্পষ্টভাষী এবং আপসহীন। তাঁর ৩৩ বছরের উজ্জ্বল একাডেমিক পরিষেবার সময়, একজন সৎ, আন্তরিক এবং নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হিসাবে তিনি দায়িত্বপালন করে গেছেন।

লেখক : নিশাত ছিদ্দিকা, শিক্ষার্থী
আইন বিভাগ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
সৌজন্যে: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ অধ্যাপক তাহের হত্যা মামলার রায়