আমরা কি স্বচ্ছ বাছাই-নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করতে পারি?

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বর্তমান চেয়ারপারসন ও সদস্যদের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। ২০১৯ সালের ২২ সেপ্টেম্বর চতুর্থ কমিশন হিসেবে সাবেক ঊর্ধ্বতন সচিব নাসিমা বেগমের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের এ কমিশন গঠিত হয়েছিল।

২০১৯ সালের জুনে কাজী রিয়াজুল হকের অবসরের পর বেশ কয়েক মাস কমিশন নেতৃত্বশূন্য ছিল। নানা জল্পনা-কল্পনা শেষে জানা যায়, বর্তমান চেয়ারপারসন ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

কাজী রিয়াজুল হকের নেতৃত্বে কমিশনের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার কয়েকদিন আগে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নাগরিক সংগঠন ও অংশীজনদের নিয়ে গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করেছিল।

বক্তারা মানবাধিকার সংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্তদের নিয়ে, প্যারিস নীতিমালা ও জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানসংক্রান্ত বৈশ্বিক জোটের সুপারিশ অনুযায়ী উন্মুক্ত এবং অংশগ্রহণমূলক বাছাই-নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মানবাধিকারবান্ধব কমিশন গঠনের আহবান জানিয়েছিলেন।

বাস্তবে নাগরিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। কমিশন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্যারিস নীতিমালা বা নাগরিক সংগঠনের আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে আলোচনা বা পরামর্শসভার আয়োজন করা হয়নি।

নিয়োগের আগ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেননি কারা, কী বিবেচনায় কমিশনের জন্য মনোনীত বা নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯ এর ৭ (৪) ধারা অনুসারে, প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ২ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও কাদের নাম প্রস্তাব করা হচ্ছে এবং কোন বিবেচনায় করা হচ্ছে—তা কখনো গণমাধ্যম বা নাগরিক সংগঠনগুলোকে জানানো হয় না।

২০১৯ সালে নতুন কমিশন গঠনের পর নাগরিক সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের হতাশ হতে দেখা যায়। কমিশনের অধিকাংশ সদস্যই ছিলেন সাবেক আমলা। তারা কর্মজীবনে নানান ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও অধিকাংশের সরাসরি মানবাধিকার কিংবা এ সংক্রান্ত কাজে সম্পৃক্ততা ছিল না।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ক্রমশ আমলানির্ভর ও সরকারের পছন্দের ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠছে বলে সে সময় এর ব্যাপক সমালোচনা হয়।

বর্তমান চেয়ারপারসন শুরু থেকেই বলে আসছেন যে, মানবাধিকার সংক্রান্ত কাজের অভিজ্ঞতা নেই—এমন অভিযোগ বা মন্তব্য অর্বাচীন। দীর্ঘদিন তিনি সমাজকল্যাণ এবং নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন।

তিনি আরও বলেছেন যে, তিনি কথার নয়, কাজে বিশ্বাসী। সেদিক থেকে এই কমিশনের গত কয়েক বছরের কার্যাবলী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়— বর্তমানে কমিশনে নিয়মিত অভিযোগ ব্যবস্থাপনার জন্য বোর্ড বসছে।

উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে শিশু গৃহকর্মী খাদিজাকে নির্যাতনের ঘটনায় ক্ষতিপূরণের সুপারিশ করে কমিশন। কিছুটা কালক্ষেপণ হলেও ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত ঘটনায় স্বপ্রণোদিত হয়ে বা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবেদন পাঠানোর সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।

প্রতিবেদন বা মন্ত্রণালয়ের উত্তরে সন্তুষ্ট না হলে তা মন্ত্রণালয়কে জানানো হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজেরা তথ্যানুসন্ধান বা তদন্ত করছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তর না আসলে অনলাইন শুনানি হচ্ছে। এরপরও মন্ত্রণালয় থেকে চিঠির উত্তর আসা আগের তুলনায় বেড়েছে।

যৌন হয়রানি সংক্রান্ত আইনের খসড়া আইনমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং কমিশনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ধর্ষণ বিষয়ে জাতীয় শুনানি আয়োজন করা হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ সংশোধন করে এর সীমাবদ্ধতা বা অস্পষ্টতা দূর করতে আইন সংশোধনের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসনকে মানবাধিকার বিষয়ে সক্রিয় করতে দেশের ৬৪ জেলায় মানবাধিকার কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিশনের এ উদ্যোগ সমালোচিত হয়েছে। কারণ, এ কমিটিগুলোর নেতৃত্বে আছেন ডেপুটি কমিশনার এবং সহ-সভাপতি হিসেবে আছেন পুলিশ সুপার ও সিভিল সার্জন।

যাদের দপ্তরের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগ বেশি, তাদের নিয়েই এ কমিটি গঠিত হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিকার বিধানের প্রক্রিয়াকেও তারা প্রভাবিত করতে পারেন বলে আশঙ্কা করেন মানবাধিকারকর্মীরা।

সমসাময়িক গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশন সোচ্চার না হওয়ায় মানবাধিকারকর্মীরা হতাশ হয়েছেন। বিশেষ করে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যু, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে—কমিশন নাগরিক সংগঠনগুলো থেকে নিজেদের ভূমিকা আলাদা করতে পারছে না। কমিশন অনেক ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো আচরণ করছে।

এ ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় সংগঠনগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনসংক্রান্ত ঘটনায় চিঠির মাধ্যমে কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বা তাদের কাছে অভিযোগ দায়ের করে, যা কমিশনের শুরু থেকে চলে আসছে।

কিন্তু, এ কমিশন গঠিত হওয়ার কয়েকদিন পর সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের ডেকে জানতে চাওয়া হয়, তারা কেন এসব চিঠি বা অভিযোগ দায়ের করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়ার এখতিয়ার কমিশনের নেই বলে জানানোর পাশাপাশি এভাবে চিঠি পাঠাতে নিষেধ করা হয়।

এসব ঘটনার পর নিঃসন্দেহে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব বিষয়ে কমিশনের দ্বারস্থ হতে গিয়ে দ্বিতীয়বার ভেবেছে।

তবে বর্তমান চেয়ারপারসনও কখনো কখনো দুঃখ করে বলেছেন যে, তাদের ভালো কাজ গণমাধ্যমে আসে না। নাগরিক সংগঠনগুলোও সেগুলোকে সেভাবে স্বীকৃতি দেয় না।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে করোনার কারণে দীর্ঘ সময় কমিশন সরেজমিনে কাজ করতে পারেনি। এটাও সত্য যে, সে সময় বা এরপরও খুব কম ক্ষেত্রেই কমিশনকে আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় প্রত্যাশা অনুযায়ী সরব বা কার্যকর ভূমিকা রাখতে দেখেছি।

একই সঙ্গে আগের মতো বিবৃতির মাধ্যমে বা গণমাধ্যমে জোরালোভাবে নিজেদের মত প্রকাশ সচরাচর দেখা যায় না। নতুন আইন প্রণয়নে আগ্রহী হতে দেখা গেলেও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০০৯ অনুসারে, খসড়া আইন ও নীতিমালার বিষয়ে মতামত দেওয়ার যে ক্ষমতা কমিশনের আছে, তা নিয়মিত চর্চা করতে দেখা যায় না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংস্কার বা নতুন খসড়া উপাত্ত সুরক্ষা আইন এবং ওটিটি নীতিমালা মতপ্রকাশ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ক্ষুণ্ণ করবে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করলেও কমিশনকে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মত দিতে দেখা যায়নি।

বৈষম্যবিরোধী আইন নিয়ে মানবাধিকার কমিশন অনেক আগে থেকে কাজ করে আসছে। সরকারের বিলের বিষয়ে নাগরিক সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা মত দিলেও কমিশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে জোরালোভাবে দাবি বা মত তুলে ধরা হয়নি।

নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও মানবাধিকার আইনজীবীরা দীর্ঘদিন পর হলেও আইনটি সংসদে পেশ করায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা আইনে বর্ণিত বৈষম্য নিরসনের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়াবে বলে আশঙ্কা করছেন।

অন্যদিকে, কমিশনের দ্বিতীয় কৌশলগত পরিকল্পনার (২০১৬-২০২০) মেয়াদ শেষ হওয়ার দীর্ঘদিন পর ২০২২ সালের শুরুতে নতুন কৌশলগত পরিকল্পনার খসড়া করা হলেও তা এখনো অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়নি।

আইনে দেওয়া ক্ষমতা অনুযায়ী কমিশনের কার্যাবলী পরিচালনার জন্য বিধিমালা প্রণয়ন অপরিহার্য। বেশ কয়েক বছর ধরে অনেকগুলো বিধিমালা খসড়া পর্যায়ে আছে। এখনো তা চূড়ান্ত করা হয়নি।

এ প্রেক্ষাপটে, কমিশনের প্রথম পর্বের মেয়াদ শেষ হতে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠছে—বর্তমান কমিশনই কি পরবর্তী ৩ বছরের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন নাকি কোনো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে?

নিয়োগকৃত এক সদস্য অন্যত্র চলে যাওয়ায় কমিশনে ইতোমধ্যে সেই পদ গত দেড় বছর ধরে শূন্য। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিবারের মতো এবারো অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা বা বিশ্লেষণ ছাড়াই কমিশন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

যে কয়েকটি কারণে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম সারির মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পাচ্ছে না, এর একটি হচ্ছে—কমিশনের চেয়ারপারসন ও সদস্যদের নিয়োগের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার অনুপস্থিতি।

এক্ষেত্রে বিদ্যমান সমালোচনা ও গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতির দিকে লক্ষ্য রেখে বাছাই কমিটি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে বর্তমান কমিশনের গত ৩ বছরের অর্জন ও চলমান উদ্যোগগুলো বিবেচনা করে আবার নিয়োগের যথার্থতা বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

নতুন কমিশনের জন্য কাদের বিবেচনা করা হচ্ছে এবং কী বিবেচনায় এমনটি করা হচ্ছে তা তুলে ধরে স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক মনোনয়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রচলন করা গেলে তখন হয়তো কমিশন সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। কমিশনের প্রতি তাদের আস্থার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলা যাবে।

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কে প্রতিষ্ঠার সময় বা এরপর মানুষের যে প্রত্যাশা ছিল তা বর্তমানে অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ ধীরে ধীরে কমিশন সম্পর্কে আস্থা হারিয়ে ফেলছে।

এটাও ঠিক যে, স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনকে দ্রুত সক্রিয় ও শক্তিশালী করতে না পারলে অল্পদিন পরেই এর উপস্থিতি বা প্রয়োজনীয়তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। এটি কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বর্তমান সরকার বিশেষ করে আইনমন্ত্রী কমিশনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতা ও অঙ্গীকারের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে ও জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে বারবার জোর দিয়ে তুলে ধরেছেন।

আগামী ৩ বছরের জন্য যে কমিশন গঠিত হতে যাচ্ছে তার নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক করার মাধ্যমে সেই আন্তরিকতা-অঙ্গীকারের সুন্দর বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যায়।


লেখকঃ তামান্না হক রীতি, মিডিয়া অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি ইউনিট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ  আমরা কি স্বচ্ছ বাছাই-নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রত্যাশা করতে পারি?