নারীর প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণ

ইতিহাসের পাতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে নিবন্ধিত দেশ বাংলাদেশ। সেই মুক্তিযুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করেছিল। দেশটা সবার, তাই যুদ্ধটাও সবার। কিছু পাকিস্তানপন্থি রাজাকার, আলবদর আর সাড়ে ৬ কোটি মানুষের মধ্যে হাজার পাঁচেক মানুষ বাদে বাকি সবাই ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। এই স্বাধীনতার পর যে শাসনতন্ত্র আমরা পেয়েছি, তাতে নারী-পুরুষ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছিল। এরপরও শিক্ষাদীক্ষা ও সামগ্রিকভাবে নারীরা পিছিয়ে ছিল দীর্ঘ সময়। আশির দশকে আমরা লক্ষ্য করি, গার্মেন্ট শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নারী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নারীদের অংশগ্রহণ, পাশাপাশি সরকারের কতিপয় সিদ্ধান্ত, যেমন- নারীদের প্রাথমিক শিক্ষা থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত অবৈতনিক করার সিদ্ধান্ত বদলে দিয়েছে নতুন দেশের প্রেক্ষাপট। কিছুদিন আগেও মেয়েদের ফুটবল-ক্রিকেট খেলা ছিল নিষিদ্ধ, অথচ আজ আমাদের মেয়েরা ফুটবলে সাফ গেমসে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জয় করে এনেছে। এত দারিদ্র্য-দৈন্যের ভেতর তাঁরা খেলেছে এবং জিতেছে, তাতে আমি ব্যক্তিগতভাবে অভিভূত। আমি বিশ্বাস করি, সমগ্র দেশবাসীও অভিভূত। আমি যখন ২০০৪ সালে বার কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হই, তখন নারী আইনজীবীর সংখ্যা ছিল ৫০০-এর মতো। আজ সেই সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। শুধু সংখ্যার দিক দিয়ে নয়, পেশাগতভাবেও অগ্রসর হয়েছে নারী। আশির দশকে হাতে গোনা দু-তিনজন নারী বিচার বিভাগে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ স্তরে অসংখ্য নারী কর্মব্যস্ত দিন অতিবাহিত করছেন। মেধার দিক থেকে নারীরা পিছিয়ে নেই, শক্তির দিক থেকেও তাঁরা পিছিয়ে নেই। তাহলে কেন তাঁদের এই সামগ্রিক পিছিয়ে থাকা? কারণ, আমরা তাঁদের মানসিকভাবে দমন করে রাখতে চাই। নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশনে এক ভার্সিটিপড়ূয়া তরুণীকে যেভাবে আরেক নারী দ্বারা হেনস্তার শিকার হতে হলো, তা আমরা সবাই শুনেছি ও দেখেছি। এই যে নারীদের হীনম্মন্য করার মানসিকতা- তা একদিনে দূরীভূত হবে না।
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের নেতা গোলাম কুদ্দুসের সঙ্গে দেখা হলে কথায় কথায় তিনি বললেন, ‘গত ১০ বছরে বাংলাদেশে যাত্রাশিল্পের কোনো যাত্রা হয়নি।’ মানে হয়তো হয়েছে দু-একটা, কিন্তু তা দিয়ে তো শিল্প বাঁচে না। যাত্রার বেলায় জেলা প্রশাসন হোক বা পুলিশ প্রশাসন, তারা অনুমতি দেয় না। কিন্তু যাত্রার জায়গা দখল করে ফেলেছে ওয়াজের নামে আরেক যাত্রা। যে অশালীন ভাষায় তারা নারীকে আক্রমণ করে, অন্য ধর্মকে আক্রমণ করে, আমাদের জাতীয় সংগীতকে আক্রমণ করে- এসব অবর্ণনীয় অনাচার। দেখা যায়, ওয়াজ-নসিহতের মাঝে এক হুজুর আরেক হুজুরকে গালিগালাজ করছে, গান গাইছে, নাচছে, একটা ভাঁড়ামির মতো অবস্থা। এদের কারণে ধর্ম সম্পর্কে মানুষের মনে ভ্রান্ত ধারণা প্রবেশ করছে। প্রশাসন থেকে বাধা-নিষেধ পাচ্ছে না তারা।
কায়েদে আযম জিন্নাহ যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেন, তখন মুসলিম লীগ উইমেন্স গার্ড ছিল; তাদের সঙ্গে জিন্নাহ সাহেবের ছবিতে আপনি উইমেন্স গার্ডদের কারও মাথায় হিজাব দেখবেন না। ইদানীং সারাপৃথিবী তোলপাড় হচ্ছে, বিশেষত ইরানে একজন হিজাব না পরার কারণে পুলিশ তাঁকে মারধর করতে করতে মেরেই ফেলে। আইসিইউতে নেওয়ার পর সেই নারীকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে পুরো ইরান আজ রাস্তায় নেমে এসেছে, প্রকাশ্যে হিজাব পুড়িয়ে দিচ্ছে, দেশের পতাকা নামিয়ে তারা চুল দিয়ে পতাকা সাজিয়ে প্রতিবাদ করছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে এসব সংবাদ প্রচারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। দুর্ভাগা নারীরা এ যুগেও মানুষ হিসেবে সম্মান আদায়ের লড়াইয়ে ব্রতী হয়েছে- যা অত্যন্ত লজ্জার! কতখানি সভ্য হতে পেরেছি তাহলে আমরা? আমরা নারীকে মনে করি মানুষ উৎপাদনের যন্ত্র। ওয়াজ-নসিহত করার সময় বলে যে, স্বামী ডাক দিলে স্ত্রীকে যেতেই হবে, না গেলে মহাপাপী হবে। বাংলাদেশ যদিও ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার পর্যায়ে এখনও যায়নি, এতটাও নারীবিদ্বেষী হয়নি। তবে আতঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ চারপাশে ঘটছে।
আপনি পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে দেখুন, সেখানে হিজাবের প্রচলন সেভাবে আর নেই, আফগানিস্তানে যদিও আছে। কিন্তু ইরানে যা চলছে, তারা রীতিমতো অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে প্রতিবাদ করেছে। এতটাই অবস্থা তাদের খারাপ, কীভাবে তারা প্রতিবাদ করবে, সেটাই বুঝতে পারছে না। পাকিস্তানের নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই বলেছিল, সে মেয়ে হলেও শিক্ষা গ্রহণ করবে, তাই তার গালের পাশ দিয়ে গুলি চলে গিয়েছে। এই শিক্ষাগ্রহণ হলো প্রতিবন্ধকতাগুলো কাটিয়ে ওঠার একমাত্র উপায়। আপনি দেখেন মাদাম কুরি, জুলিও কুরি, হেলেন কেলার- তাঁরা নোবেল পেয়েছেন এবং সেই সঙ্গে সমাজ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছেন। ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, একাত্তরে লাখো মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা, ময়মনসিংহের বীরাঙ্গনা সখিনা, আরও কত অজানা নারীর সাহসিকতার ভূমিকা রয়েছে ইতিহাসের পাতায়। আমাদের চিফ জাস্টিস প্রকাশ্যে একটি মিটিংয়ে বলেছেন, গত কয়েক বছরে বিজেএস পরীক্ষায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়েছেন নারী। অর্থাৎ সুযোগ দেওয়া হলে তাঁদের মেধার বিকাশ ঘটবে, বেড়ে উঠবে ঘরে ঘরে অনন্য নারী। সে জন্য সামগ্রিকভাবে নারীদের নির্বিঘ্নে বেড়ে ওঠা, মুক্তমনা পরিবেশ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
একজন নারী তাঁর নিজ ইচ্ছায় নিজ পছন্দে বিয়ে করবে, পরিবার থেকে বিয়ে দিতে চাইলে যদি তাতে নারীর সম্মতি থাকে তাহলে আপত্তি নেই। আজ আমাদের দেশে নারী সাংবাদিক, ক্যামেরাওম্যান আছে, ভালোই লাগে। আজ প্রেস ক্লাবের সভাপতি নারী, পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে আছে নারীরা, এমন অনেক সফল নারী কর্মক্ষেত্রে ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আজ অনেক নারী আইনজীবী দেখতে পাবেন, যাঁরা কাজে দক্ষ এবং আমি বিশ্বাস করি, তাঁদের উপযুক্ত নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু তাঁদের হাতে ক্ষমতা কীভাবে যাবে- যদি কালো টাকার রাজনীতি বন্ধ না হয়? অপরদিকে নির্বাচন কমিশন বলেছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী দাঁড়াতে পারবে না, দাঁড়াতে হলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তিবর্গের সহমত স্বাক্ষর লাগবে। এই নিয়ম বাতিল হওয়া দরকার। এতে করে নিরপেক্ষ স্বতন্ত্র ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। হ্যাঁ, ভোট পাওয়া বা না পাওয়া তো অন্য বিষয়, কিন্তু এতে নির্বাচন কমিশনের কিছু বলার থাকতে পারে না। দল হলে নিবন্ধনের বিষয় আসে, মেজর জিয়াউর রহমানের সময় এই নিবন্ধনের বিষয়টি জোরদার হয়। এর আগে তো বিষয়টি নিয়ে এত বাধ্যবাধকতা ছিল না। নিবন্ধনের বিষয়ই যদি আসে তাহলে জামায়াতে ইসলামী কীভাবে রাজনীতি করে? আমি প্রকাশ্য আদালতে এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছিলাম এবং বিচারপতি নির্বাচন কমিশনের আইনজীবীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন এখনও এসব সরিয়ে নেওয়া হয়নি? আইনজীবী বলেছিলেন, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ওয়েবসাইট থেকে, কিন্তু আমরা তো তাদের স্টেটমেন্ট দেখতে পাই পত্রপত্রিকায়। আমাদের রুজি হালাল কিনা সেটা দেখি না, কিন্তু বাকি ক্ষেত্রে হারাম-হালাল খুঁজি, বিয়ের ক্ষেত্রে সুন্নত খুঁজি। ধর্ম দিয়ে ব্যক্তিগত পুরুষতান্ত্রিক সুবিধা নিতে আমরা সচেষ্ট কিন্তু ধর্মের মূলনীতির প্রতি খেয়াল নেই। আমাদের প্রয়োজন দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করা, সে জন্য বিচারাঙ্গনকে সর্বপ্রথম দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নয়, মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দিতে শেখাতে হবে দেশকে।
মোটা দাগে কয়েকটি বিষয় উত্তরণের উপায় হিসেবে নিল্ফেম্ন উল্লেখ করছি-
১. শিক্ষাব্যবস্থা এবং পাঠ্যক্রমে নারীদের ভূমিকাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ছোটবেলা থেকেই প্রতিটি শিশু যেন নারীকে একজন মানুষ ভাবতে পারে সেভাবে পাঠ্যক্রম সাজাতে হবে। মানবাধিকারসংক্রান্ত তথ্যের অন্তর্ভুক্তি থাকতে হবে।
২. বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে এবং প্রশাসনকে নারীদের সুরক্ষায় আরও বেশি সচেষ্ট হতে হবে। নারীদের জন্য যে হেল্পলাইন আছে তা প্রচার, প্রসার ও অধিকতর সক্রিয় করতে হবে।
৩. মুসলিম নারী ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বী নারীদের তালাকের প্রসিডিউর সহজ করতে হবে এবং আইনের মাধ্যমে জোরদার করতে হবে। নারীদের পিতার সম্পদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
৪. সামগ্রিকভাবে নারীবান্ধব মানসিকতার উত্তরণ ঘটাতে হবে সচেতনতার মাধ্যমে। যেমন- মিডিয়ার সচেতন উদ্যোগ, মানুষের মধ্যে সহনশীলতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম ইত্যাদি।
৫. জনপ্রিয় ব্যক্তিবর্গের এ বিষয়ে লেখা ও বারংবার বিভিন্ন মাধ্যমে বলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক : চেয়ারপারসন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র


লেখকঃ জেড আই খান পান্না
চেয়ারপারসন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র
প্রকাশিত লিঙ্কঃ নারীর প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণ