জেল আপিল ও নিয়মিত আপিলের অসামঞ্জস্যতা

একটি দেশের নাগরিক হিসেবে উপযুক্ত বিচার পাওয়া তার সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার। মানবাধিকারের প্রতিচ্ছবি-সংবলিত একটি সংবিধান হলো আমাদের সংবিধান। এর আদলে গড়ে ওঠা বিচারিক কাঠামো দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করলে সংবিধানের মূল বিষয়গুলোই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

১৯৯৪ সালের ২৮ জুন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় সংঘটিত খুনের ঘটনায় ২০১৮ সালের ১৭ এপ্রিল উক্ত অভিযোগে আটককৃত ২৬ জনের মধ্যে তিনজনকে মৃত্যুদন্ডাদেশ, দুই জনকে যাবজ্জীবন ও বাকিদের খালাস দেয়া হয়।

বিচারিক আদালতে রায়ের পর নিয়মানুসারে মামলাটি হাইকোর্টে আসে, যার ডেথরেফারেন্স নম্বর ছিল- ৩৯/২০০৮। পুনরায় হাইকোর্টে ২০১৩ সালের ৭ ও ৮ জুলাই ঘোষিত রায়ে মোকিম ও ঝড়ু নামক দুই ব্যক্তির মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রেখে বাকিদের খালাস দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মোকিম (আপিল নম্বর ১১১/২০১৩) এবং ঝড়ু (আপিল নম্বর ১০৭/২০১৩) আপিল দায়ের করে, যা তদারকির দায়িত্ব পান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. হুমায়ুন কবির।

দীর্ঘ আট বছর পর যখন শুনানির কার্যতালিকা আসে তিনি আসামিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, আসামিদের ফাঁসি আরো চার বছর পূর্বে ২০১৭ সালে যশোর কারাগারে কার্যকর করা হয়েছে। উক্ত ফাঁসি কতটা আইনসিদ্ধ এ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. হুমায়ুন কবিরের প্রশ্নে নানারকম যুক্তি কর্তৃপক্ষ উত্থাপন করে ঘটনার যৌক্তিকতা প্রমাণের জন্য।

প্রথমত, খুলনার ডিআইজি প্রিজন্স মো. সগির মিয়ার ভাষ্যমতে, ২০০৮ সালে ফাঁসির রায়ের পর ২০১৩-তেও হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্সে ফাঁসির রায় বহাল থাকে। তাদের জেল আপিল ও আপিল বিভাগ ২০১৬-তে নিষ্পত্তি করে মৃত্যুদন্ড বহাল রাখে। সর্বশেষ সাংবিধানিক অধিকার বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করলে তিনি তা নামঞ্জুর করেছিলেন। তাই আইনি প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে অবহিত করেছেন।

আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকও এই প্রক্রিয়ায় ফাঁসি কার্যকরের ঘটনাকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও আইনের ব্যত্যয় হয়নি মর্মে উল্লেখ করেছেন।

বিগত ১০০ বছরের ইতিহাসে ব্রিটিশ আমলে নন্দকুমারের ঘটনার প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় মোকিম ও ঝড়ুর ঘটনায়। ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনামলে যেখানে প্রতারণার সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল সাত বছরের কারাদন্ড, সেখানে ব্রিটেনের আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়েছিল। তাকে আপিলের আগেই ফাঁসি দেয়া হয়, যার মাধ্যমেই ‘জুডিশিয়াল মার্ডার’ শব্দটির উদ্ভব হয়। মোকিম ও ঝড়ুর বিষয়টি এখানে আইনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়-

(ক) সাংবিধানিক অসংগতি : সংবিধানের ৩১ নম্বর অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার কিংবা অনুচ্ছেদ ২৭-এর মাধ্যমে আইনের দৃষ্টিতে সমতা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট বিধান থাকা সত্ত্বেও মোকিম ও ঝড়ুর ক্ষেত্রে তা পরিলক্ষিত হয়নি। শুধু জেল আপিলের মাধ্যমে আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, নিয়মিত আপিলকে প্রাধান্য দেয়াই হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহ্দীন মালিক বলেন, জেল আপিল ও নিয়মিত আপিলের শুনানি একসঙ্গে করার নিয়ম থাকলেও তা না মেনে আইনজীবীকে অবগত না করে কিংবা নিয়মিত আপিল শুনানি না করে ফাঁসি কার্যকরের যৌক্তিকতা রীতিমতো প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে। সুস্পষ্টভাবে, সংবিধানের ১০৩ নম্বর অনুচ্ছেদ মতে, আপিল শুনানির আগে ফাঁসি কার্যকরের নিষেধাজ্ঞা আরোপ সত্ত্বেও তা লঙ্ঘন গণতন্ত্র ও মানবাধিকার তথা সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থি।

(খ) অন্যান্য আইনের সঙ্গে অসংগতি : আইনজীবীর পরামর্শ নেয়া প্রতিটি আসামির সাংবিধানিক অধিকার হলেও উক্ত ফাঁসির ঘটনায় তার ব্যত্যয় ঘটেছে।

ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর ৪১৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি আপিল দরখাস্ত ও রায়ের কপি সহযোগে আসামির আইনজীবীর মাধ্যমে উপস্থাপন করতে হবে। ৪২১ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে শুনানি ব্যতিরেকে কোন আপিল খারিজের বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে। এই নিয়মাবলি এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি সঠিকভাবে।

অন্যদিক থেকে ভাবলে একজন আইনজীবীকে তার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছে। নিয়মিত আপিলের বিষয়টি এক্ষেত্রে অনুসরণ করা হয়নি। ১৯৯০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর কিউবার হাভানায় অনুষ্ঠিত ‘অপরাধ প্রতিরোধ ও অপরাধীর চিকিৎসা’ বিষয়ক জাতিসংঘ কংগ্রেসের ৮ম অধিবেশনে আইনজীবীর ভূমিকা-সংবলিত (ইউএনবেসিক প্রিন্সিপাল অন রোল অফ ল-ইয়ার) পেশাগত জীবনে আইনজীবীর প্রাপ্য অধিকারসংক্রান্ত নীতিমালা সদস্য দেশসমূহের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল অনুচিত হস্তক্ষেপ ছাড়া আইনজীবীদের সহায়তায় আইনের শাসন, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা। ২৯ ধারা-সংবলিত এ মূলনীতির ১৬ নম্বর ধারায় মুক্তভাবে মক্কলের সঙ্গে পরামর্শ, সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদনের সুযোগ, তার নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় জোরদার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নীতিমালাও এক্ষেত্রে অনুপস্থিত ছিল কারণ আইনজীবীকে তার দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হয়নি জেল আপিলের দোহাই দিয়ে। জাতিসংঘের সদস্য দেশ হিসেবে এর সমস্ত নীতি মেনে চলা প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের কর্তব্য। এই মূলনীতিগুলোই বিভিন্ন চুক্তি হিসেবে গৃহীত হয়েছে, যা বাংলাদেশ গ্রহণ করা সত্ত্বেও এর সুষ্ঠু প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদন্ডে ও বিচারব্যবস্থা কতটা যৌক্তিক ও বিবেচ্য বিষয়।

সবশেষে বলা যায়, মামলায় দীর্ঘসূত্রতা, পক্ষগণের মধ্যে যোগাযোগের অসংগতি, কর্তৃপক্ষের অবহেলা সামগ্রিক বিষয়ই উক্ত ঘটনার জন্য দায়ী। এ রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধকল্পে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ একান্ত জরুরি। বিচারিক প্রক্রিয়া যেন সংবিধানের মূলনীতি ও বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ না করতে পারে, রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নকারী ও কার্যকরকারী সংস্থাকে সেদিকে আশু দৃষ্টি দিতে হবে।


লেখক: তামান্না-ই-নূর, শিক্ষার্থী, আইন ও বিচার বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ জেল আপিল ও নিয়মিত আপিলের অসামঞ্জস্যতা