৮ মার্চ ২০২৬
সংবাদ বিবৃতি
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
অধিকার, মর্যাদা ও সমতায় এখনো অনেক পথ বাকিঃ আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বব্যাপী নারী অধিকার, মর্যাদা ও সমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে স্মরণ ও নতুন করে অঙ্গীকার করার এই দিনটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও গভীর তাৎপর্য বহন করে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে রাষ্ট্র নির্মাণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির প্রতিটি পর্যায়ে বাংলাদেশের নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অবদান রেখে চলেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীরা যেমন নির্যাতন, আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার এক অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তেমনি স্বাধীনতা-উত্তর রাষ্ট্র গঠনেও তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করেছে। কৃষি, পোশাক শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, ব্যক্তি উদ্যোক্তা কার্যক্রম এবং প্রবাসী আয়ে নারীর অবদান আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং নীতি পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি যা গত কয়েক দশকে ইতিবাচক পরিবর্তনের বলিষ্ঠ উদাহরন।
তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি বাস্তবতা হচ্ছে-বাংলাদেশে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার এখনো নানামাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। নারী ও কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিবাহ, মানবপাচার, পারিবারিক সহিংসতা এবং অনলাইন সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, ভয় ও বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য, নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সীমিত অংশগ্রহণ নারীর ক্ষমতায়নের পথে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হয়ে আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন পরিসরে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী অধিকার বিষয়ে কিছু গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নারী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও আচরণের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। নারীর পোশাক, চলাফেরা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও এমন কিছু বক্তব্য প্রকাশিত হচ্ছে যা নারীর মৌলিক অধিকার এবং মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদিও এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধের প্রতিফলন নয়, তবুও এ ধরনের প্রবণতা সমাজে বৈষম্য ও সহিংসতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করতে পারে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, সংবিধান প্রদত্ত সমতা, মর্যাদা ও স্বাধীনতার নীতির আলোকে নারী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও আচরণের বিরুদ্ধে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধান নারী-পুরুষের সমতা ও বৈষম্যহীনতার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করেছে। সংবিধানের ২৭, ২৮ ও ২৯ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য নিষিদ্ধকরণ এবং রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধায় সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নারী অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন চুক্তি ও সনদে অঙ্গীকারাবদ্ধ। নারী বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও), শিশু অধিকার সনদ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এ স ডিজি) বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারী ও কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রাষ্ট্র গ্রহণ করেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের পাশাপাশি তার কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। সহিংসতার শিকার নারীর জন্য সহজপ্রাপ্য ও ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা জোরদার করা, বাল্যবিবাহ ও মানবপাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সুযোগে নারীর সমান প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, নারীর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি উন্নয়নমূলক লক্ষ্য নয়; এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মৌলিক শর্ত। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতামুক্ত একটি সমাজ গড়ে তুলতে রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ এবং সকল মানুষের সম্মিলিত ও দায়বদ্ধ উদ্যোগ অপরিহার্য।













Visit Today : 252
Visit Yesterday : 507
Total Visit : 391438
Who's Online : 4