কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা ~সমকাল

প্রকাশিতঃ ১৭ জানুয়ারি ২০২১, সমকাল
লিঙ্কঃ কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা


গত বছর শিশু অধিকার লঙ্ঘনের চিত্র ছিল ভয়াবহ। শিশু হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, বলাৎকার, অনলাইনে যৌন হয়রানি, সরকারি শিশু-কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো বছরজুড়ে অব্যাহত থেকেছে। ওই বছর শারীরিক নির্যাতনের কারণে মৃত্যু, ধর্ষণের পরে হত্যা, ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নিহত হয় মোট ৫৮৯ শিশু

দিনাজপুরের পার্বতীপুরের জমিয়াহাট তকেয়াপাড়ায় ২০১৬ সালের অক্টোবরে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয় পাঁচ বছরের এক কন্যাশিশু। যে মামলার বিচার প্রক্রিয়া আজও সম্পন্ন হয়নি। ২০১৯ সালের এপ্রিলে বিরলে আঁখিমণিকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটে। ২০২০ সালে কলেজছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল নবাবগঞ্জে। একই বছরের অক্টোবরে রামপুর ইউনিয়নের আমেরিকান ক্যাম্পে ৯ বছর বয়সী এক কন্যাশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করলেও আসামি ইসহাক আলী পেশিশক্তি ও টাকার দাপটে ১৪ ডিসেম্বর জামিন পেয়ে যায়। বর্তমানে পরিবারটি আতঙ্কে দিনযাপন করছে।

বিশিষ্টজনের মতে, দিনাজপুরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অসংখ্য শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যা ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। অথচ বেশিরভাগ ঘটনাই আলোচনার বিষয় হিসেবে মনোযোগ পায়নি। ফলে লোক দেখানো সালিশের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। অথবা ভুক্তভোগীর পরিবারকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। শুধু অভিযোগ আমলে না নেওয়া ও বিচারহীনতার কারণে অপরাধীরা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে তারা উৎসাহ পাচ্ছে। যে কারণে ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার ঘটনা ঘটিয়েও সমঝোতার মাধ্যমে অপরাধী পার পেয়ে যায়।

দেশে প্রতিনিয়তই বাড়ছে শিশুর প্রতি সহিংসতা, যার কারণ আমাদের অনিরাপদ সমাজ ব্যবস্থা। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ছে কন্যাশিশুরা। একইসঙ্গে শিকার হচ্ছে বাল্যবিয়েরও। আইনজীবী সুরাইয়া পারভীন সমকালকে বলেন, নির্যাতনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী ও শিশুর প্রতি নৃশংসতার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করা সম্ভব হয়নি। দোষীদের খুঁজে বের করা বা দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং যে সকল অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে তাদের দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেক অপরাধী জামিনে মুক্ত হয়েছে, নানা কৌশলে অনেকে বিচার এড়িয়ে চলছে। তিনি আরও বলেন, নারী নির্যাতনের ঘটনা ও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, সামাজিক, অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী বিশেষ করে নির্যাতনের শিকার শিশু বা তার পরিবার বিচার চাইতেই ভয় কিংবা লজ্জাবোধ করছে। সমাজে ঘটনাগুলো মেনে নেওয়ার মতো প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারী-পুরুষসহ সকল শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-গোষ্ঠীর মানুষের সহাবস্থানের উপাদানগুলোকে এসব নির্যাতনের ঘটনা ধ্বংস করে সমাজ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে।

এদিকে, আইন অনুযায়ী ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। এ অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা অনুযায়ী অতিরিক্ত মামলার চাপ থাকায় ১৮০ দিনের সময়সীমা মেনে চলা বাস্তবিকভাবে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানোসহ বাজেট ব্যবস্থাপনার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। একইসঙ্গে সরকারকে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর মানসিক, আর্থিক, সামাজিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত বছর মোট ৩ হাজার ৪৪০ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৭৪ জন ধর্ষণ, ২৩৬ জন গণধর্ষণ ও ৩৩ জন ধর্ষণের পর হত্যা ও ৩ জন ধর্ষণের কারণে আত্মহত্যাসহ মোট ১৩৪৬ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এছাড়া ২০০ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত বছর শিশু অধিকার লঙ্ঘনের চিত্র ছিল ভয়াবহ। শিশু হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, বলাৎকার, অনলাইনে যৌন হয়রানি, সরকারি শিশু-কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো বছরজুড়ে অব্যাহত থেকেছে। ওই বছর শারীরিক নির্যাতনের কারণে মৃত্যু, ধর্ষণের পরে হত্যা, ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা, অপহরণ ও নিখোঁজের পর হত্যাসহ বিভিন্ন কারণে নিহত হয় মোট ৫৮৯ শিশু। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৮৮। এছাড়া ২০২০ সালে বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয় ১৭১৮ শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয় ১০১৮ শিশু, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয় ২৭৯ শিশু। বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৫২ ছেলেশিশু, বলাৎকারের পর ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

সম্প্রতি ‘১৮০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশনা কতটুকু মানছি আমরা :প্রসঙ্গ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা’ শীর্ষক এক সভায় জানানো হয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এ ধারা ২০(৩) এ বলা আছে, বিচারের জন্য মামলার প্রাপ্তির তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল কাজ শেষ করতে হবে। ২০১৬ সালের ৫ ডিসেম্বর বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম এবং জে.বি.এম হাসানের সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন, ২০০০-এর অধীন সমস্ত মামলার ট্রাইব্যুনাল ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠনের নির্দেশনা দেন। অথচ আজ পর্যন্ত বহু মামলার ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। সেসব মামলা দীর্ঘদিন ধরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের ৫ বছরের শিশু ধর্ষণের মামলা অন্যতম। আজ চার বছর ধরে এ মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে গত অক্টোবর মাসে বাগেরহাটের এক শিশু ধর্ষণের মামলায় মাত্র ৭ কার্য দিবসে রায় দেওয়ার নজিরও সৃষ্টি হয়েছে। এই উদাহরণের ফলে বোঝা যাচ্ছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাগুলো ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ১৮০ দিনে মামলা নিষ্পত্তি করা প্রসঙ্গে ড. মিজানুর রহমান জানান, অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর মানসিক, আর্থিক, সামাজিক পুনর্বাসনের দায়িত্ব গ্রহণ জরুরি। তবেই দ্রুত সময়ে মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে। বিচার প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের পরিচালক জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ গোলাম কিবরিয়া বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাক্ষীদের সময়মতো হাজির না হওয়ার অন্যতম কারণ সাক্ষীর অর্থনৈতিক অবস্থা। রাষ্ট্র যদি সাক্ষীর যাতায়াতের খরচ বহন করে, সেক্ষেত্রে অনেক সাক্ষীই সঠিক সময়ে হাজির থাকবেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) মো. সোহেল রানা বলেন, প্রতিটি থানায় নারী, শিশু, প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘বিশেষ ডেস্ক’ রয়েছে। তিনি জানান, প্রায় ৬ হাজার ৯১২টি ফেসবুক পেজ থেকে নিয়মিত নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। বহু থানাতেই দ্রুত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে সময়মতো সাক্ষী হাজির না করা কিংবা পরিবার কর্তৃক মেডিকেল টেস্ট করাতে অসম্মতি প্রদানের জন্য পুলিশের কাজে বাধার সৃষ্টি হয়। তিনি মামলা গ্রহণ করা এবং তদন্ত করার পদ্ধতিতে পুলিশের পৌরুষ মানসিকতা এবং আচরণের কথাও উল্লেখ করেন।

আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের নির্বাহী সমন্বয়কারী জিনাত আরা হক বলেন, আইন প্রণয়ন করে নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব না। প্রয়োজন নারীর প্রতি সমাজের অবমূল্যায়িত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। প্রয়োজন একটি সামাজিক আন্দোলন। তিনি জানান, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সর্বত্র নারীর জন্য অধিকতর নিরাপদ স্থান পরিণত করার জন্য আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট কাজ করছে। আমরাই পারি জোট নারী সমাজের অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের ৫৫টি জেলার ৪৭২টি উপজেলার ২৩৮৪টি ইউনিয়ন পরিষদ ও ওয়ার্ডের ১৬৬৬৬টি গ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ১০ লাখেরও বেশি মানুষকে চেঞ্জমেকার হিসেবে অঙ্গীকারবদ্ধ করেছে, যারা নারী নির্যাতন বন্ধে নিজের মধ্যে পরিবর্তন এনেছেন এবং অন্যদের অনুপ্রাণিত করছেন। ঘরের বাইরে সংঘটিত নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বিশেষ করে যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে নারী নিরাপত্তা জোট আন্দোলন করে আসছে।