সামাজিক ন্যায়বিচারের চিত্র ~সমকাল

প্রকাশিতঃ ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১, সমকাল
লিঙ্কঃ সামাজিক ন্যায়বিচারের চিত্র


দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা, লিঙ্গ সমতা, অভিবাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অপরাধ ইত্যাদি বিষয় মোকাবিলার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শান্তি, সম্প্রীতি, সমৃদ্ধি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব সামাজিক ন্যায়বিচার দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। দিবসটিকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমাজের কয়েকটি পর্যায়ে সামাজিক ন্যায়বিচারে চিত্র তুলে ধরা হলো…

আধুনিক সমাজ বা রাষ্ট্রনীতিতে একটি দেশের উন্নয়ন, সমৃদ্ধি এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম মূল শর্ত হিসেবে মানা হয় ‘সোশ্যাল জাস্টিস’ বা ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’। যে রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচারবোধের প্রয়োগ আছে, সে রাষ্ট্র বা সমাজ ততটা উন্নত এবং সমৃদ্ধ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক ন্যায়বিচারের অবস্থা যে তথৈবচ, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তবে তার আগে জানতে হবে ‘সামাজিক ন্যায়বিচার’ কাকে বলে। সামাজিক ন্যায়বিচার বলতে সমাজের এমন একটি পরিবেশকে বোঝায়, যেখানে জাতি-লিঙ্গ-ধর্ম বা বর্ণ-নির্বিশেষে সবার সমানভাবে বেঁচে থাকার, জীবনযাপন করার এবং কাজ করার সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়। সামাজিক ন্যায়বিচার যেমন অগ্রগতি, সমৃদ্ধি, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করে, তেমনি বয়স-বর্ণ-ধর্ম-লিঙ্গ বা শারীরিক পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট বৈষম্যকেও কঠোরভাবে নির্মূল করে।

বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে বিশ্বায়নের যে নানা সুযোগ-সুবিধা, সেগুলো পাচ্ছে কেবল সমাজের বিশেষ একশ্রেণির মানুষ। এই সুবিধা গ্রহণে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে প্রান্তিক শ্রেণির মানুষ। বিশ্বায়নের প্রভাবে নতুন নতুন প্রযুক্তি, নতুন ভাবনার দ্রুত স্থানান্তর, পণ্য ও সেবার দ্রুত বিনিময়, পুঁজির দ্রুত স্থানান্তর প্রভৃতি কারণে কোনো কোনো দেশে বাড়ছে কর্মসংস্থান, অর্থনীতির গতি ও উৎপাদন। অন্যদিকে আবার কোনো কোনো দেশ এই দ্রুত গতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। ফলে সেসব দেশে বাড়ছে বৈষম্য, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য। বাংলাদেশ আছে শেষের অবস্থানে।

শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামাজিক ন্যায়বিচারের গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০০৭ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০ ফেব্রুয়ারিকে বিশ্ব সামাজিক ন্যায়বিচার দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয়। দিবসটি প্রথমবার পালিত হয় ২০০৯ সালে। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা, লিঙ্গ সমতা, অভিবাসন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অপরাধ ইত্যাদি বিষয় মোকাবিলার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী শান্তি, সম্প্রীতি, সমৃদ্ধি ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এ দিবসটি পালন করা হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশে সামাজিক ন্যায়বিচার কতটা প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। লিঙ্গ সমতার অভাব, আয় বৈষম্য, বেকারত্ব বৃদ্ধি, নারী নির্যাতনের মহামারি এবং আইনের শাসনের অভাব- এমন দিক বিবেচনায় বাংলাদেশে সামাজিক ন্যায়বিচার অনেকটাই রাতের আকাশের ওই দূরের তারার মতোই।

নারীর প্রতি সহিংসতার দিকে যদি দৃষ্টি দিই, তবে এক ভয়াবহ চিত্রই ফুটে ওঠে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ২০ হাজার ৭১৩ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের নভেম্বর পর্যন্ত দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এক হাজার ৫৪৬ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৫১ জনকে, আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। ৯৭৪ শিশু হয়েছে ধর্ষণের শিকার। ২০১৯ সালে এক হাজার ৪১৩ জন নারী ও ৯৮৬ জন শিশু এবং ২০১৮ সালে ৭৩২ জন নারী ও ৪৪৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা তার চেয়েও বেশি। অনেক সময় পারিবারিক চাপ কিংবা লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতিত নারী তাদের ওপর অত্যাচারের কথা চেপে যান। কখনও আবার প্রভাবশালীরা এ ধরনের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বাধ্য করে।

আইন অনুযায়ী ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হচ্ছে না। এ অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা অনুযায়ী অতিরিক্ত মামলার চাপ থাকায় ১৮০ দিনের সময়সীমা মেনে চলা বাস্তবিকভাবে সম্ভব হয়ে ওঠে না। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে দেশে আইন থাকলেও বিচারের আওতায় আসছে না অপরাধীরা। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের নিম্ন আদালতে বর্তমানে এক লাখ ৬৫ হাজার ৩২৭টি নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে ৩৪ হাজার ২৩৩টি মামলা পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এ ছাড়া উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত থাকা মামলার সংখ্যা এক হাজার ১৩৯টি।

দারিদ্র্য ও আয় বৈষম্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, করোনাকালে দেশে আয়ের বৈষম্য এবং দারিদ্র্যের হার দুটোই বেড়েছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার তথ্য মতে, করোনাভাইরাসের কারণে শহুরে ও গ্রামীণ শ্রমিকের আয় কমেছে যথাক্রমে ৮০ ও ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, করোনার প্রথম চার মাসেই দেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১০ গুণ। আর্থিক সংকটে পড়া ৪৬ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভেঙে এবং ৪৩ শতাংশের বেশি পরিবার আত্মীয়স্বজনের সাহায্য-সহায়তার ওপর নির্ভর করে সংসার চালিয়েছে। ১১ শতাংশ পরিবার জমি বিক্রি বা বন্ধক রেখেছে। সরকারি ত্রাণ বা অনুদান পেয়েছে মাত্র ২১ শতাংশ পরিবার। ২০২০ সালের প্রথমাংশে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ছিল প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ। বিআইডিএসের গবেষণা অনুযায়ী দেখা যায়, করোনার আঘাতে নতুন ১ কোটি ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের কাতারে যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়, শ্রমিকের নূ্যনতম মজুরিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলেও ২০১০ থেকে ২০১৯ সময়কালে শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি ৫ দশমিক ৯ শতাংশ হারে কমেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, করোনার আঘাতের আগেই দেশের মহানগরগুলোয় ৮ দশমিক ২২ শতাংশ পরিবারের কোনো না কোনো সদস্যকে খাবার না খেয়ে ক্ষুধার্ত অবস্থায় রাত কাটাতে হয়েছে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৮-এর তুলনায় ২০২০ সালে দ্বিগুণ হয়েছে দারিদ্র্যের হার। করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশে সার্বিক দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশ। ২০১৮ সালে যা ছিল ২১ দশমিক ৬ শতাংশ।

শনিবার (২৩ জানুয়ারি) করোনায় দারিদ্র্যের হার নিয়ে এক অনলাইন আলোচনা সভায় গবেষণার ফল তুলে ধরে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। ২০১৮ সালের সঙ্গে গত বছর দেশের দারিদ্র্য এবং জীবিকার সঙ্গে তুলনামূলক গবেষণা করেছে সানেম। গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০২০ সালে করোনার প্রভাবে দেশে দারিদ্র্যের হার দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। সানেমের হিসাবে করোনাকালে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে অক্টোবরের মধ্যে বেতন কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ চাকরিজীবীর। এ ছাড়া আয় কমেছে ২৯ শতাংশ শ্রমিকের ও ৩২ শতাংশ উদ্যোক্তার। সংস্থাটির জরিপ অনুসারে, দেশে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্যের হার রংপুর বিভাগে। দুই বছরে প্রায় ১৮ শতাংশ দারিদ্র্য বেড়েছে রংপুরে। জেলাটিতে ৫৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্য নিয়ে বসবাস করছে। এ ছাড়া সিলেটে ৩৫ শতাংশ, রাজশাহীতে ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ, খুলনায় ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ, ঢাকায় ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ, চট্টগ্রামের ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ ও বরিশালে ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষের দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস।

বিগত বছরে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা অক্সফামের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ধনী-দরিদ্র্যের বৈষম্যের এক করুণ চিত্র। সংস্থাটির তথ্য মতে, বর্তমানে ২৬ জন ধনী ব্যক্তির কাছে যে পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তা পৃথিবীর সব গরিব লোকের অর্ধেকের সমান। অর্থাৎ ২৬ জন মানুষের হাতে ৩৮০ কোটি মানুষের সমান সম্পদ!

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি সহিংসতা, আইনের দীর্ঘসূত্রতা এবং আয় ও দারিদ্র্য- এই কয়টি বিষয়ে পর্যালোচনায় দেখা যায়, সামাজিক ন্যায়বিচারের অবস্থা আদতেই সংকটাপন্ন। সরকারের আন্তরিকতার অভাব না থাকলেও বিভিন্ন উদ্যোগের বাস্তবায়নে সমস্যা এবং আইন প্রয়োগে অভাবে সব চেষ্টাই বৃথা যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ এবং কল্যাণকর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেওয়ার এখনই সময়।