শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে

২০০৮ সালের ৭ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী কর্মস্থল এবং শিক্ষাঙ্গনে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য দিকনির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি রিট দায়ের করেন। উক্ত রিটের শুনানি শেষে ১৪ মে ২০০৯ তারিখে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। ওই রায়ে হাইকোর্ট দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সব প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ গ্রহণের জন্য ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনসহ বেশ কিছু নির্দেশনামূলক নীতিমালা দিয়েছিলেন। মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে যতদিন পর্যন্ত আইন প্রণয়ন না হবে ততদিন পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কর্মক্ষেত্রে প্রদত্ত নীতিমালা অনুসরণ ও পালন করা হবে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যে কোনো বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধস্তন সব আদালতের জন্য অবশ্য পালনীয় হবে। এই অনুচ্ছেদের অধীনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত নির্দেশনা ও নীতিমালা কার্যকর করা হবে, যতদিন পর্যন্ত জাতীয় সংসদে যৌন হয়রানি রোধে কোন আইন প্রণয়ন করা না হয়।

যৌন হয়রানিমুক্ত শিক্ষা ও কর্মপরিবেশ তৈরিতে মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত নীতিমালার ৪(১) ধারায় যৌন হয়রানির দেয়া সংজ্ঞা অনুসারে যৌন হয়রানি বলতে বোঝায়Ñ ক) অনাকাক্সিক্ষত যৌন আবেদনমূলক আচরণ (সরাসরি বা ইঙ্গিতে); খ) প্রাতিষ্ঠানিক এবং পেশাগত ক্ষমতা ব্যবহার করে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করা; গ) যৌন হয়রানি বা নিপীড়নমূলক উক্তি; ঘ) যৌন সুযোগ লাভের জন্য অবৈধ আবেদন; ঙ) পর্নোগ্রাফি দেখানো; চ) যৌন আবেদনমূলক মন্তব্য বা ভঙ্গি; ছ) অশালীন ভঙ্গি, অশালীন ভাষা বা মন্তব্যের মাধ্যমে উত্ত্যক্ত করা, অশালীন উদ্দেশ্য পূরণে কোনো ব্যক্তির অলক্ষ্যে তার নিকটবর্তী হওয়া বা অনুসরণ করা, যৌন ইঙ্গিতমূলক ভাষা ব্যবহার করে ঠাট্টা বা উপহাস করা; জ) চিঠি, টেলিফোন, মোবাইল, এসএমএস, ছবি, নোটিস, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার-টেবিল, নোটিস বোর্ড, অফিস, ফ্যাক্টরি, শ্রেণীকক্ষ, বাথরুমের দেয়ালে যৌন ইঙ্গিতমূলক অপমানজনক কোন কিছু লেখা; ঝ) ব্ল্যাকমেইল অথবা চরিত্র হননের উদ্দেশ্যে স্থির বা ভিডিও চিত্র ধারণ করা; ঞ) যৌন হয়রানির কারণে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং শিক্ষাগত কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হওয়া; ট) প্রেম নিবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হয়ে হুমকি দেয়া বা চাপ প্রয়োগ করা; ঠ) ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বা প্রতারণার মাধ্যমে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা স্থাপনে চেষ্টা করা।

উল্লিখিত আচরণসমূহ নারীর স্বাস্থ্য ও সুরক্ষার জন্য হুমকি স্বরূপ এবং অপমানজনক। কোন নারী যদি এ ধরনের আচরণের শিকার হন এবং তিনি যদি মনে করেন যে, এই বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তার কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষাক্ষেত্র বা যেখানে তিনি আছেন সেখানকার পরিবেশ তার উন্নয়নের জন্য বাধা বা প্রতিকূল হতে পারে, তাহলে উক্ত আচরণসমূহ নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত হবে।

একই সঙ্গে এই গাইডলাইনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন অশোভন আচরণসমূহ সম্পর্কে যদি অপরাধের শিকার নারী অভিযোগ করতে চায়, তাহলে তা গ্রহণের ব্যবস্থা থাকতে হবে এবং এর প্রতিকারের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করার জন্য অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখতে হবে পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অভিযোগকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কমপক্ষে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট অভিযোগ গ্রহণকারী কমিটি গঠন করা হবে, যার বেশিরভাগ সদস্য হবেন নারী এবং কমিটির দুজন সদস্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে এমন প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে হবে, যারা জেন্ডার এবং যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করেন।

অভিযোগের ক্ষেত্রে মৌখিক প্রমাণ ছাড়াও পরিস্থিতিগত প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। উভয় পক্ষের নিরাপত্তার জন্য অভিযোগ কমিটি ও অভিযোগকারীদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। সাক্ষ্য গ্রহণের সময় গোপনীয়তা বজায় রাখতে হবে। অভিযোগকারী যদি কোনো কারণে অভিযোগ তুলে নিতে চায় তাহলে তদন্ত করে এর কারণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করতে হবে। অভিযোগ যদি দন্ডবিধির যে কোনো ধারা অনুযায়ী অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নিতে হবে, যা পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচার হবে।

ওই রায়ের পর প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও রায়টি এখনও কার্যত বাস্তবায়ন হয়নি। বেসরকারি গবেষণা-প্রতিষ্ঠান অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ২০১৮-এ করা ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ : আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারিতা’ নিয়ে গবেষণায় জানা যায়, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৭ শতাংশ শিক্ষার্থীই আদালতের নির্দেশনা জানেন না। ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী এর কথা জানলেও বিস্তারিত জানেন না। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা, পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানে ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ কর্মজীবী জানেন না হাইকোর্টের নির্দেশনাটি। ১৪ শতাংশ নির্দেশনাটি জানলেও পরিষ্কার ধারণা নেই তাদের।

নির্দেশনার বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্র কর্তৃপক্ষের অসচেতনতা ও না মানার ঝোঁকের কারণে সার্বিকভাবে সচেতনতার অভাব এবং যৌন হয়রানি বন্ধ বা প্রতিকারে করণীয় কী, তা নিয়ে সচেতনতাও কম বলে গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে। ন্যাশনাল গার্ল চাইল্ড অ্যাডভোকেসি ফোরাম কর্তৃক প্রকাশিত কভিড ১৯ চলাকালীন কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ১৩টি জেলার ৩৯০ জন কর্মজীবী নারীকে নিয়ে করা এই সমীক্ষায় জানা যায়, ১৩৫ জন কর্মজীবী নারী জানিয়েছেন যে তারা কোভিড-১৯ চলাকালীন কর্মক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।

জানা যায়, সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৮১.৪৮ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী কখনোই কর্মক্ষেত্রে তাদের উচ্চ পদমর্যাদার কাউকে এ বিষয়ে অবহিত করেননি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ কর্তৃক গৃহীত নারীর প্রতি সব প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও)-এর স্বীকৃত অধিকারসমূহের পূর্ণ বাস্তবায়ন অর্জনের লক্ষ্যে অনুস্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেয় বাংলাদেশ। সিডও সনদের ১০ অনুচ্ছেদ অনুসারে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং ১১ অনুচ্ছেদ অনুসারে সমতার ভিত্তিতে পেশা ও চাকরি স্বাধীনভাবে বেছে নেয়ার অধিকার, সব নিরাপত্তা, পদোন্নতিও বৈষম্যহীনভাবে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগের অধিকারের কথা বলা থাকলেও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণসহ যৌন হয়রানির মতো ঘটনা ঘটে চলছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য সংরক্ষণ ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২১ সালে জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ১৯০ জন, যার মধ্যে ১১৬ জনই নারী। এর মধ্যে ১০ জন আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

উচ্চ আদালতের দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে সেই অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠন না করায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়

গত ২১ অক্টোবর, ২০২১ তারিখে রায়টির বাস্তবায়ন চেয়ে পুনরায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। উচ্চ আদালতের দেয়া নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে সেই অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশুদের যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠন না করায় হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়। ওই রিটে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ ৪০টি মন্ত্রণালয়ের সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার জেনারেল, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে বিবাদী করা হয়। একই সঙ্গে রিট আবেদনে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের আরজি জানানো হয়। রিটের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট সৈয়দা নাসরিন ও অ্যাডভোকেট মো. শাহীনুজ্জামান। আসকের পক্ষে রিটকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহীনুজ্জামান জানান, আবেদনটি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে শুনানির জন্য রয়েছে। এর আগে গত ২৮ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসারে কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না জানতে চেয়ে রিট দায়ের করেন। উক্ত রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট ২১ জনকে বিবাদী করা হয়।

আসকের পক্ষ থেকে পুনরায় রিট আবেদনের পর গত ৩ নভেম্বর ২০২১ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়, ২০০৯ সালের হাইকোর্টের রায়ের আলোকে যৌন হয়রানিসংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ, অভিযোগ অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথকে। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কাজী জিনাত হক, আপিল বিভাগের রেজিস্ট্রার মো. বদরুল আলম ভূঞা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফৌজিয়া করিম ও তামান্না ফেরদৌসকে কমিটির সদস্য করা হয়।


লেখক : ফারিয়া ইফফাত মীম,মানবাধিকারকর্মী

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

প্রকাশিত লিঙ্কঃ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে