২০১৬ সালের আগস্টে ইউনাইটেড আরব আমিরাতের একজন মানবাধিকারকর্মী আহমেদ মুনসুরের আইফোনে ব্যর্থ ইনস্টলেশন প্রচেষ্টার পর আমরা পরিচিত হই পেগাসাসের সঙ্গে। সবচেয়ে অত্যাধুনিক স্মার্টফোন আক্রমণ হিসেবে এ ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা হয়। ২০১৯ সালে হোয়াটসঅ্যাপ অভিযোগ করে, একটি সাধারণ হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে পেগাসাস বিশ্বব্যাপী প্রায় দেড় হাজার ‘টার্গেটেড ডিভাইস’ সংক্রমিত করেছে। পেগাসাস নামীয় এই স্পাইওয়্যারের মাধ্যমে একজন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট ব্যক্তির সব বার্তা, ফোনকল, ছবি, ভিডিও ইত্যাদি পেয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ফেসবুক, জিমেইল ইত্যাদি থেকেও পেগাসাস অথবা পেগাসাসের মাধ্যমে অন্য কেউ একান্ত তথ্যও সংগ্রহ করতে পারে। কারও ফোনের ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন অজান্তে সক্রিয় করতে পারে পেগাসাস। অর্থাৎ এর মাধ্যমে ব্যক্তির গোপনীয়তা বলে আর কিছু থাকছে না।
অ্যান্ড্রয়েড কিংবা আইফোন ডিভাইসে পেগাসাস ইনস্টল করা সবচেয়ে সহজ। শুরুতে সংক্রমিত বিভিন্ন লিংক এসব ডিভাইসে পাঠানো হতো এবং ছোট্ট একটি ক্লিকের মাধ্যমে আপনার ডিভাইসে ইনস্টল করার দরকার পড়ত। কিন্তু এখন কোনো ধরনের ক্লিক ছাড়াই পেগাসাস যে কোনো ডিভাইসকে টার্গেট করতে পারে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহারকারীর ইন্টার অ্যাকশনের প্রয়োজন ছাড়াই বিনামূল্যে আপনার ডিভাইসের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে পারে। ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এনএসও একে তাদের ‘যুগান্তকারী গুপ্তচরবৃত্তির হাতিয়ার’ বলছে। কানাডিয়ান সাইবার সিকিউরিটি সংস্থা সিটিজেন ল্যাবের নথিপত্র অনুযায়ী ৪৫টির মতো স্থানে বা দেশে পেগাসাসের আক্রমণ সন্দেহ করা হচ্ছে। যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, লেবানন, পাকিস্তান, উগান্ডার মতো উন্নয়নশীল দেশের নাম। এই গবেষণার আগে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাজাখস্তান, মেক্সিকো, মরক্কো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশে আপত্তিজনক পেগাসাস ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইতিহাস রয়েছে এমন রাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের পেগাসাস ব্যবহারের রেকর্ড পাওয়া যায়। সিটিজেন ল্যাব আরও দাবি করে, তারা পেগাসাসের ব্যবহার শুধু অপরাধমূলক তদন্তের জন্যই নয়, রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত এবং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ইস্যুতেও খুঁজে পেয়েছে, যা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন করে।
গুপ্তচরবৃত্তি অথবা নজরদারি প্রযুক্তির মোকাবিলায় সাইবার নিরাপত্তা আইনের অভাব সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত করা যায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা ইউএনসিটিএডি-এর মতে, বিশ্বব্যাপী ১২৮টি দেশ ডাটা এবং প্রাইভেসি সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করেছে। এশিয়াজুড়ে চীন, ভিয়েতনাম এবং সিঙ্গাপুরে সাইবার নিরাপত্তা আইন উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন বা আইসিটি অ্যাক্ট ২০০৬ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ ছাড়া নিবেদিত সাইবার সুরক্ষা আইন নেই। উল্লেখ্য, এই দুটি আইন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত দশকে গুপ্তচরবৃত্তি প্রযুক্তি অথবা নজরদারি প্রযুক্তির অস্বাভাবিক উন্নয়ন এবং এর ফলে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা তুলনামূলক দুর্বল। বাংলাদেশ সংবিধানে অনুচ্ছেদ ৪৩(খ)-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকদের গোপনীয়তা অর্থাৎ প্রাইভেসি রক্ষা করে। আইসিটি আইন, ২০০৬-এর ধারা ৬৩, গোপনীয় এবং ব্যক্তিগত ইলেকট্রনিক রেকর্ড, বই, রেজিস্টার, চিঠিপত্র, তথ্য, নথি বা অন্যান্য উপাদান সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি ছাড়া প্রকাশ করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংবিধিবদ্ধ করেছে; অর্থাৎ এ ধরনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেআইনি। সেই সঙ্গে এ ধরনের রেকর্ড বেআইনিভাবে প্রকাশের শাস্তি দুই বছর কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ধারা ২৬ ব্যক্তিগত ডাটাকে পরিচয় তথ্য হিসেবে বর্ণনা করে। এজন্য সংগ্রহ, বিক্রয়, সংরক্ষণ, সরবরাহ অথবা ব্যবহার করার জন্য সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির সুস্পষ্ট সম্মতি এবং অনুমোদন প্রয়োজন। এই বিধান লঙ্ঘনে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা এবং পুনরাবৃত্তি ঘটালে সাত বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর অধীনে হ্যাকিংকে গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সাইবার আইন লঙ্ঘন করলে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ড প্রযোজ্য হতে পারে। টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১-এর ধারা ৭১ অনুযায়ী টেলিফোন কথোপকথনে আড়ি পাতা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ, যার লঙ্ঘনে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। কিন্তু ২০০৬ সালে এই আইনের সংশোধনী হয় ধারা ৯৭-ক-এর অধীনে যেখানে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ট্র্যাকিং কিংবা পর্যবেক্ষণ সরকার কর্তৃপক্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তবে জনস্বার্থের নামে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের ডিজিটাল অধিকার এবং স্বাধীনতা সেই সঙ্গে তথ্য সুরক্ষা এবং প্রাইভেসির অধিকার লঙ্ঘন হতে পারে খুব সহজেই। অদূর ভবিষ্যতে আরও অনেক সহজ এবং সাশ্রয়ী নজরদারি প্রযুক্তি সমাজের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়বে। পেগাসাসের চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে প্রাইভেসি অধিকার বলিষ্ঠ করতে উপযুক্ত কৌশল গ্রহণের এখনই সময়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ গত দশকে যেমন সাফল্য পেয়েছে তেমনি দ্রুতগতিতে এর আরও বিকাশ হচ্ছে। ব্লকচেইন, ক্রিপ্টোকারেন্সি, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি- এগুলো এক সময় ভবিষ্যৎ স্বপ্ন মনে করা হলেও এখন তা আমাদের জীবনে সম্পূর্ণরূপে বাস্তব। তাই সাইবার ইকো-সিস্টেমের বিভিন্ন স্বতন্ত্র চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ঝুঁকিতে পড়বে। রাষ্ট্র এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ডিজিটাল এবং নিরাপত্তার স্বাধীনতা বজায় রাখতে সামগ্রিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
লেখকঃ আদিবা জাহান পায়েল
শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি
প্রকাশিত লিঙ্কঃ পেগাসাস স্পাইওয়্যার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা












Visit Today : 317
Visit Yesterday : 728
Total Visit : 388227
Who's Online : 3