হাসেম ফুডসে অগ্নিকান্ডে হতাহতদের ‘পর্যাপ্ত’ ক্ষতিপূরণ দিতে আদালতের নির্দেশ
প্রতি বছরই বিভিন্নভাবে বেড়ে চলেছে অগ্নিদুর্ঘটনা। সাধারণত কারখানাগুলোতেই মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডের ঘটনা বেশি ঘটে থাকে। ৮ জুলাই ২০২১ আনুমানিক বিকাল সাড়ে ৫টা, নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাসেম ফুডস লিমিটেড কারখানায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। কারখানাটিতে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয় নবনির্মিত ছয়তলা ভবনের নিচতলা থেকে। কারখানাটিতে প্রায় ২ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। ভবনটিতে তখন প্রায় ৪০০ শ্রমিক কাজ করছিলেন। এ সময় মারা গেছেন অর্ধশতাধিক মানুষ, আহত হয়েছেন অন্তত ৩৫ শ্রমিক। নিহতদের অধিকাংশই আগুনে এমনভাবে পুড়েছে যে তাদের অবয়ব পর্যন্ত ছিল না। অধিকাংশ মরদেহের পরিচয় নির্ধারণে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে আত্মীয়স্বজনের কাছে হস্তান্তর করতে হয়েছে। ভবন নির্মাণ, শিশু শ্রমিক নিয়োগ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ নানা বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলার সংবাদ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন সময় অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর ভবন মালিকদের দায়িত্বহীন কর্মকান্ড, নিয়মকানুন না মানা, অগ্নিকান্ডের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনাগুলো ঘটে থাকে।
এ বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ও সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে। রিট পিটিশন নম্বর ৯৬৮২/২০২১। এ রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ৭ নভেম্বর ২০২১ মাননীয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও মাননীয় বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেন। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুডস কারখানায় অগ্নিকান্ডে হতাহতদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বিবাদীদের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না- তা জানতে চেয়েছেন আদালত। সেই সঙ্গে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক, ফায়ার সার্ভিস এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে।
ক্ষতিপূরণ নিয়ে শ্রম আইনের বিধান পুনর্বিবেচনায় কমিটি গঠনের নির্দেশ
কর্মক্ষেত্রে আহত ও নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে বিদ্যমান শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান পুনর্বিবেচনা ও ক্ষতিপূরণ নিরূপণে মাপকাঠি নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে নিয়ে কমিটি গঠন করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আইন সচিব এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিবের প্রতি ওই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে মাননীয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও মাননীয় বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। কমিটিকে তিন মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আদালতের দেওয়া রুলে কর্মক্ষেত্রে আহত ও নিহত শ্রমিকের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে ২০০৬ সালের শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান ও তপশিল সংশোধনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। আইন সচিব এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
শ্রম আইনের ক্ষতিপূরণ বিধান অপ্রতুল উল্লেখ করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) এবং সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি ওই রিট করে। ২০০৬ সালের শ্রম আইনের তফশিল ও বিধানে কর্মক্ষেত্রে আহত ও নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। এক্ষেত্রে শ্রমিক মারা গেলে ২ লাখ টাকা এবং আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারালে আড়াই লাখ টাকা পাবেন। এছাড়া আহত হলে বেতনের আনুপাতিক হারে ক্ষতিপূরণ পাবেন- এটি অপ্রতুল ও অপর্যাপ্ত। যে কারণে শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিধান ও তফশিল চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়।
চট্টগ্রামে ড্রেনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সেহরীন মাহবুব সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণে হাইকোর্টের রুল
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের শেখ মুজিব সড়কসংলগ্ন নবি টাওয়ারের পাশের নালায় পড়ে নিখোঁজ হন সেহেরীন মাহবুব সাদিয়া। তিনি চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে সাদিয়ার মরদেহ উদ্ধার করেন। চট্টগ্রাম নগরীতে নালায় পড়ে সেহরীন মাহবুব সাদিয়ার মৃত্যুতে দায় নিতে চাইছে না সিটি করপোরেশন বা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-সিডিএ। দুটি সংস্থা একে অন্যকে দোষ দিচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বলছে- দুই দিকে ফুটপাত করলেও খালের মুখটি অরক্ষিত রেখেছে সিডিএ। তাই এর দায় সিডিএর। সিডিএ বলছে, খালের মালিকানা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। তাই খালের মুখে সুরক্ষা নিশ্চিতের দায়িত্বও তাদের। নালা-খালে একের পর এক মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ নগরবাসী। তারা বলছেন, দায় এড়ানোর এ প্রবণতাই প্রমাণ করে সেবা সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবর্তে নগরবাসীর ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।
১১ নভেম্বর ২০২১ নিখোঁজের পর মারা যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী সেহরীন মাহবুব সাদিয়ার (১৯) পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। ২৫ নভেম্বর ২০২১ চট্টগ্রামে ড্রেনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সেহরীন মাহবুব সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), চিলড্রেন চ্যারিটি ফাউন্ডেশন ও মো. জাহিদ উদ্দিন বেলাল রিট দায়ের করেন। এই রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ৫ ডিসেম্বর ২০২১ মাননীয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও মাননীয় বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ আদেশ দেন। সেহরীন মাহবুব সাদিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি কোনো উন্নয়নমূলক কাজ চলাকালে পথচারীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই ঘটনাস্থলে প্রকৃত অবস্থা কেমন এবং সেখানে আর কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কিনা, সেসব বিষয়ে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
লেখক : মো. শাহীনুজ্জামান, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিংকঃ তিনটি মামলা ও আদালতের রুল












Visit Today : 300
Visit Yesterday : 728
Total Visit : 388210
Who's Online : 4