প্রকাশিতঃ ১১ এপ্রিল ২০২১, সমকাল
লিঙ্কঃ এ যেন শিশু হত্যার মহামারি
খুলনায় তানিশা আক্তার নামে পাঁচ বছর বয়সী একটি ঘুমন্ত শিশুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার রাত ১০টার দিকে তেরখাদা উপজেলার আড়কান্দী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ শিশুটির সৎ মা মুক্তা খাতুনকে আটক করেছে।
৫ এপ্রিল ২০২১
নোয়াখালীতে নিখোঁজের চারদিন পর শিশুর লাশ উদ্ধার
নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার নজরপুর গ্রামের নানার বাড়িতে বেড়াতে এসে নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শিশুটির নাম মিজানুর রহমান ওরফে আশরাফুল (৬)। স্থানীয় ব্যক্তিদের তথ্যের ভিত্তিতে সেনবাগ থানার পুলিশ মাটিতে অর্ধেক পুঁতে রাখা অবস্থায় লাশটি উদ্ধার করে। পরে লাশটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে সেনবাগ উপজেলার কাদরা ইউনিয়নের নজরপুর গ্রামের নানার বাড়ি (জিতু সওদাগরের বাড়ি) থেকে নিখোঁজ হয় শিশু মিজানুর রহমান ওরফে আশরাফুল।
১৭ মার্চ ২০২১
কানের দুলের জন্য শিশুকে হত্যার অভিযোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল সদর ইউনিয়নের নোয়াহাটি গ্রাম থেকে গত বুধবার আট বছর বয়সী এক শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। লাশ উদ্ধারের পর পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করছেন, শিশুটির কানে থাকা দুই আনার স্বর্ণের দুল নিতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ একটি দোকান থেকে দুল জব্দ করলেও হত্যাকাণ্ডে কারা জড়িত, সে ব্যাপারে কোনো তথ্য পায়নি। নিহত শিশুটির নাম কাশফিয়া আক্তার (৮)। সে নোয়াহাটি গ্রামের আবদুল কাদেরের মেয়ে।
২২ মার্চ ২০২১
গাজীপুরে সেপটিক ট্যাংক থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার
গাজীপুর সদরের বানিয়ারচালা এলাকায় একটি বাসার সেপটিক ট্যাংক থেকে তিন বছরের এক শিশুর লাশ উদ্ধার হয়েছে। জয়দেবপুর থানার পুলিশ লাশটি উদ্ধার করে। শিশুটির নাম শান্ত। সে ময়মনসিংহের গফরগাঁও থানার উত্তর নয়নপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. সাদেক মিয়ার ছেলে।
৩১ জানুয়ারি ২০২১
টয়লেট থেকে শিশুর লাশ উদ্ধার, মা আটক
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থানার পুলিশ টয়লেট থেকে নূর-হাওয়া নামে চার মাস বয়সের একটি শিশুর লাশ উদ্ধার করেছে। সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার ধুমাইটারী তেঁতুলতলা এলাকার নুরুল ইসলামের টয়লেট থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে শিশুটির মা তানজি বেগমকে (৩৮) আটক করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ সন্ধ্যা ৬টার দিকে ধুমাইটারী তেঁতুলতলা এলাকার নুরুল ইসলামের পারিবারিক টয়লেট থেকে শিশু নূর-হাওয়ার লাশ উদ্ধার করে।
দেশের প্রথম সারির কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক সময়ের শিশু হত্যার খবর এগুলো। যে শিশুদের বলা হয় আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, অথচ তারাই আমাদের সমাজের কিছু নরপিশাচের স্বার্থের বলি হয়ে কলি থেকে ফুল হয়ে ফোটার আগেই ঝরে যাচ্ছে, বিদায় নিতে হচ্ছে পৃথিবী থেকে। বলা যায়, শিশু হত্যার এক নীরব মহামারি চলছে আজ সমাজজুড়ে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই বিভিন্ন কারণে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১০০ শিশু। তাদের মধ্যে ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩৩ এবং ৬ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৬। হত্যার শিকার হওয়া বাকি শিশুদের বয়স ১২ বছরের অধিক। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৬ জন, ধর্ষণ চেষ্টায় হত্যা করা হয়েছে ২ জনকে, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ১ জন, নির্যাতনের কারণে শিশু গৃহকর্মী নিহত হয়েছে ১ জন, রহস্যজনকভাবে শিশু গৃহকর্মী নিহত হয়েছে ২ জন, শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে, গৃহবিবাদের কারণে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ১৫ জন, বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যা করেছে ১৫ জন, অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪ জনকে, নিখোঁজ থাকার পর হত্যা করা হয়েছে ৫ জনকে, নিখোঁজ থাকা শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ১১টি ও শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে ২০টি। দুঃখজনক হলেও সত্য, এত হত্যার বিপরীতে মামলা হয়েছে মাত্র ৩৬টি!
শিশু অধিকার ফোরাম ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গেল কয়েক বছরে দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে শিশুমৃত্যু। গত বছর তথা ২০২০ সালে ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, হত্যা, অপহরণ, নিখোঁজ ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছে ১৪৫ শিশু। ২০১৯ সালে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ২৬৬ জন শিশু, ২০১৮ সালে মোট ২৭৬টি শিশু হত্যা ও হত্যা চেষ্টার শিকার হয়েছে, এর মধ্যে মারা গেছে ২২৭ জন। ২০১৭ সালে বিভিন্নভাবে হত্যার শিকার হয় ৩৩৯ জন শিশু, ২০১৬ সালে হত্যার শিকার হয়েছে ২৬৫, ২০১৫ সালে ২৯২, ২০১৪ সালে ৩৬৬, ২০১৩ সালে ২১৮ ও ২০১২ সালে ২০৯ জন।
প্রশ্ন হতে পারে- কেন বাড়ছে শিশু হত্যা, কেন ঘটছে শিশু হত্যা। সংশ্নিষ্টদের মতে, শিশুরা নানা কারণে হত্যার শিকার হচ্ছে, যার দায় কোনোভাবেই তাদের নয়। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত- সমাজের সর্বস্তরেই শিশুরা প্রতিহিংসার বলি হচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক সচেতনতার অভাব, বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, পর্নোগ্রাফি, মানসিক অস্থিরতা, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কুপ্রভাব, মাদকাসক্তি, অসাবধানতাবশত মারধর, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, মানসিক অসুস্থতার কারণে শিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে। সমাজের নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা বেশি যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। তাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় তারা সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। শহরে শিশুদের মানসিক বিকাশে নেই কোনো উদ্যোগ, তাদের খেলাধুলারও নেই তেমন কোনো সুযোগ। পারিবারিক অশান্তির কারণে অনেক মা-বাবা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর জীবন ও সন্তানের মায়া ত্যাগ করে তারা নিষ্ঠুর আচরণ করেন। শিশুকে বিভিন্ন কৌশলে অপহরণ করে হত্যার পর লাশ গুম করাও অপরাধীদের পক্ষে সহজ হয়। অনেকে সমাজে শিশুহত্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে আকাশ সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবকেও দায়ী করেন।
সর্বোপরি, সমাজে শিশু হত্যা বাড়ছে। বড়দের প্রতিহিংসার শিকার হতে হয় কোমলমতি শিশুদের। শিশু নির্যাতন রোধে শিশু সুরক্ষ আইন থাকলেও সেই আইনের প্রয়োগ নেই বললেও চলে। কিংবা বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় ন্যায় বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের জন্য। তাই আইনের প্রয়োগ এবং মানসিকতার পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে আগামী দিনের ভবিষ্যৎ যারা, সেই শিশুদের নিরাপত্তায় এগিয়ে আসতে হবে সবাইকে।
দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি চাই
তাওহিদা জাহান
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আমাদের সে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কারিগররা ফুল হয়ে ফোটার আগেই ক্ষতবিক্ষত হয়ে ঝরে পড়ছে। আজ যে শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে তাকে আমাদের একটি সাজানো বাগানের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা ছিল। আমাদের সে প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারার ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় রোজ সকালের খবরের কাগজ।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব বলছে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩৩২ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালে হত্যা করা হয়েছে ৫২১ জন শিশুকে। কেবল বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ নয়, উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতেও কমবেশি একই চিত্র দেখা যায়। শিশুর নিষ্পাপ হাসিমাখা মুখখানির পরিচয় সংখ্যায় প্রকাশ বড় বেদনার!
বাংলাদেশ ১৯৮৯ সালে শিশু অধিকার সনদে স্বাক্ষর করেছে। এরপর কেটে গেছে ৩৩ বছর। আমরা যখন ঝলমলে আয়োজনে জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের তিন দশক পালন করি, তখন অন্ধকার গলিতে, রাস্তায় সহিংসতার শিকার হয় অনেক শিশু।
বাংলাদেশে আমরা সফলভাবে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়েছি, টিকার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে জয় করেছি শিশুর মরণঘাতী রোগ। শিশুর খর্বকায়ত্ব (বামনত্ব) কমিয়েছি, শিশুর বিশুদ্ধ খাবার পানি, স্যানিটেশন, খাদ্য-পুষ্টি নিশ্চিত করেছি। প্রায় ১০০ শতাংশ শিশু প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। কিন্তু গত তিন দশকে শিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ নির্মাণ করতে পারিনি। আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজও মানুষরূপী অমানুষদের উল্লাস! পরিবার ও পরিচিত পরিবেশের মধ্যে থেকেও শিশুরা নির্যাতন, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, অ্যাসিড সন্ত্রাস ও অপহরণের মতো সহিংসতা ও হত্যার শিকার হতে হয়।
আমাদের প্রতিবন্ধী শিশুরাও কেবল ভাষিক প্রতিবন্ধকতা থাকার কারণে সমাজের সুযোগসন্ধানী মানুষদের লালসার শিকার হচ্ছে; অনেক ক্ষেত্রে প্রাণও হারাচ্ছে।
আমরা এই দুঃস্বপ্নগুলো থেকে মুক্তি চাই। ‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল।’ আমরা শিশুর জন্য নিরাপদ সমাজ নির্মাণ করে যেতে চাই। বলব : ভয় নয়, ভালোবাসা। ঘৃণা নয়, শিশুর জন্য চাই আদর আর ভালোবাসা।
লেখক
আব্দুল্লাহ আল মামুন
চেয়ারপারসন, কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডারস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়











Visit Today : 477
Visit Yesterday : 728
Total Visit : 388387
Who's Online : 5