পুরুষ আধিপত্যের এই সমাজে লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে সাধারণভাবে নারীরা ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার শিকার হয় এবং স্বাভাবিকভাবেই নারীর প্রতি সংঘটিত এসব সহিংসতার প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন পড়ে। অন্যদিকে, আধিপত্যবাদের স্বাভাবিক প্রবণতাই যেহেতু বিভিন্ন কারণে দুর্বল বিবেচিত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর অপেক্ষাকৃত সবল ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর খবরদারি, নির্যাতন এবং নিপীড়ন, ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতা বিবেচনায় দুর্বল অবস্থানে থাকা পুরুষও নির্যাতন ও নিপীড়নের সম্মুখীন হয়। তাই নারী ও মেয়ে শিশুর পাশাপাশি ছেলে শিশু ও পুরুষদেরও বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণসহ বিভিন্ন নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হতে দেখা যায়।
আমরা সংবাদমাধ্যমে প্রায়শই ছেলে শিশুর ওপর সংঘটিত বিভিন্ন যৌন নির্যাতনের খবর প্রকাশিত হতে দেখি। গত ১০ এপ্রিল ২০২১, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় যে, মাদরাসায় ১৫ মাসে ৬২ ছেলে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং এর মধ্যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে ৬ অক্টোবর ২০২০ একই পত্রিকায় বন্ধুকে ধর্ষণের ঘটনায় এক যুবককে গ্রেপ্তার করার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। শুধু নারীর মাধ্যমে নয়, পুরুষের মাধ্যমে পুরুষ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে থাকে। তাছাড়া হিজড়া জনগোষ্ঠীও বিভিন্ন সময় ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে।
কিন্তু নারী-পুরুষের ভূমিকা ও অবস্থান-সম্পর্কিত প্রচলিত মূল্যবোধ ও আদর্শের কারণে পুরুষের প্রতি সংঘটিত যৌন সহিংসতার বিষয়টিকে আমলে নেয়া হয় না। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বৈষম্যমূলক সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পুরুষকে সব সময় শক্তিশালী, আক্রমণকারী এবং একই সঙ্গে রক্ষাকারী হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই ধর্ষণ বা অন্য কোন যৌন সহিংসতার শিকার পুরুষ তার প্রতি সংঘটিত সহিংসতার বিষয়টি প্রকাশ করে না। আবার প্রকাশ করলেও সহিংসতার শিকার পুরুষকেই দোষারোপ করা হয়। তাছাড়া ছেলে শিশু বা পুরুষদের ক্ষেত্রে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনাকে ‘ধর্ষণ’ না বলে ‘বলাৎকার’ নামে অভিহিত করা হয়, যদিও শাব্দিক অর্থে দুটোই ধর্ষণ। সংবাদমাধ্যমকেও ছেলেশিশুদের ক্ষেত্রে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনাকে বলাৎকার হিসেবে প্রকাশ করতে দেখা যায়, যা পক্ষান্তরে ছেলে শিশু বা পুরুষদের ক্ষেত্রে সংঘটিত ধর্ষণকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে না দেখারই প্রবণতা। সামগ্রিক অর্থে এ বিষয়ে তেমন কোন সুপরিকল্পিত গবেষণাও নেই।
পুরুষ ও হিজড়া ব্যক্তিদের ধর্ষণের বিচারিক প্রতিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে আইনি সীমাবদ্ধতা। ধর্ষণসহ নারী ও শিশুর প্রতি সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের বিচারের জন্য রয়েছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনসংক্রান্ত বিশেষ আইন (২০০০)। এই আইনের আওতায় নারীর পাশাপাশি ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত মেয়ে এবং ছেলে উভয় শিশুদের প্রতি সংঘটিত ধর্ষণসহ বিভিন্ন যৌন নির্যাতনের বিচারিক প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু ১৬ বছরের বেশি বয়সের ছেলে শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ওপর সংঘটিত ধর্ষণের বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট আইনি বিধান নেই। আমাদের দেশের ধর্ষণ-সম্পর্কিত প্রচলিত ফৌজদারি আইনে সুস্পষ্টভাবে পুরুষ ধর্ষণ বা বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের (হিজড়া জনগোষ্ঠী) ব্যক্তির ধর্ষণের বিষয়টির উল্লেখ নেই।
দণ্ডবিধির ৩৭৫ নম্বর ধারায় ধর্ষণের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে ধর্ষণকে শুধু নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধ হিসেবে বলা হয়েছে এবং ধর্ষণের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার জন্য যৌন সহবাসকে আবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং যৌন সহবাসের জন্য ‘অনুপ্রবেশ’ই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে বলে বলা হয়েছে। আমাদের দেশের প্রচলিত সামাজিক ও সংস্কৃতিগত ধারণা হচ্ছে, ধর্ষণ শুধু নারীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিষয় এবং অনুপ্রবেশ মানেই নারীর যৌনাঙ্গে পুরুষের যৌনাঙ্গ প্রবেশ করানো। আর আইনে এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষদের ক্ষেত্রে সংঘটিত ধর্ষণ প্রমাণ করা সম্ভব হয় না।
অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি না থাকাই পুরুষদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধর্ষণের বিচারের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করে, যদিও অনেক ক্ষেত্রে পুরুষদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধর্ষণের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় মামলা হয়। কিন্তু দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় বর্ণিত অপরাধ এবং পুরুষদের বিরুদ্ধে সংঘটিত ধর্ষণ দুটো ভিন্ন বিষয়। দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় অস্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক নিয়মবিরুদ্ধ বিবেচনায় সমলিঙ্গের মধ্যে সংঘটিত যৌন সহবাস এবং কোনো ব্যক্তি কর্তৃক কোনো পশুর সঙ্গে যৌন সংগমকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত আইনটির এই ধারার মাধ্যমে সমলিঙ্গের মধ্যে যে কোন ধরনের যৌনকর্মকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে সম্মতিসূচক এবং জোরপূর্বক যৌনকর্মের মধ্যে কোন পার্থক্য করা হয়নি, যেখানে সম্মতির অনুপস্থিতি এবং বলপ্রয়োগ হচ্ছে ধর্ষণের মূল উপাদান।
তাছাড়া এই ধারার অধীনে সংঘটিত অপরাধের শাস্তি হচ্ছে সর্বনিম্ন ১০ বৎসরের কারাদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড, যা দেশের প্রচলিত নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত ধর্ষণের শাস্তির চাইতে অপেক্ষাকৃত কম। বাস্তবে এই ধারায় পরিচালিত মামলাগুলো নারী ও শিশু আইনের অধীনে পরিচালিত ধর্ষণ মামলার মতো গুরুত্বও পায় না। এই ধারায় মামলা হওয়ার ফলে সামাজিকভাবে সমকামী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এখনও সমকামী ব্যক্তিদের ভালো চোখে দেখা হয় না। উল্লেখ্য, ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিপন্থি বিবেচনায় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি বিতর্কিত ধারা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের হাইকোর্ট ইতোমধ্যে সমকামিতাসংক্রান্ত দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারাকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। তাই পুরুষ ধর্ষণের বিষয়টিকে দণ্ডবিধির ৩৭৭ নম্বর ধারায় বর্ণিত অস্বাভাবিক অপরাধ হিসেবে বিচার করা সংগত নয়।
অন্যদিকে, পুরুষ ধর্ষণের বিষয়ে সমাজের অন্য অনেকের মতো বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে। তাছাড়া সুনির্দিষ্ট আইনি বিধানের অনুপস্থিতিতে এই ধরনের মামলা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় হালনাগাদ জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় ভিন্নতা থাকার কারণে আমাদের প্রচলিত ফৌজদারি মামলার বিচারিক দীর্ঘ প্রক্রিয়াও ভুক্তভোগীর বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করে। বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, অনেক সময় ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে সংঘটিত ধর্ষণের ক্ষেত্রে মামলার অভিযোগ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ ধারার অধীনে না করে ১০ ধারার অধীনে করায় ধর্ষণের বদলে যৌন সহিংসতার মামলা হয় এবং শাস্তিও অপেক্ষাকৃত কম হয়।
প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক, আধিপত্যবাদী সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া, নারী-পুরুষ-সম্পর্কিত সমাজের মূল্যবোধ ও আদর্শ এবং লিঙ্গ পরিচয়ভিত্তিক অতি সাধারণীকরণ প্রথাগত ধারণা যে শুধু নারীকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, পুরুষও যে এই ক্ষতির মুখোমুখি হয় তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ পুরুষ এবং ছেলে শিশু ধর্ষণ এবং বিষয়টির প্রতি সামাজিক, আইন ও বিচারিক এই উদাসীনতা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে একই রকম অপরাধের জন্য শুধু ভুক্তভোগীর লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে ভিন্ন রকম বিচারব্যবস্থা স্পষ্টতই এক ধরনের বৈষম্য। তাই লিঙ্গ পরিচয়-নির্বিশেষে নারী-পুরুষ, বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের (হিজড়া জনগোষ্ঠী) ব্যক্তির প্রতি সংঘটিত ধর্ষণের অপরাধের সংজ্ঞা এবং বিচার প্রক্রিয়া একই হওয়া উচিত।
যদিও কেউ কেউ কাজ শুরু করেছেন, তবে এ বিষয়ে সুপরিকল্পিত ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। সম্প্রতি পুরুষ ও হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর ধর্ষণের ঘটনাকে আইনে সুনির্দিষ্টভাবে ধর্ষণ অপরাধ হিসেবে যুক্ত করার আবেদন জানিয়ে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা করা হয়েছে। মামলাটি এখনও শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করি, আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত মানবাধিকারের মূলনীতিসহ ধর্ষণ ও অন্যান্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত হালনাগাদ বিভিন্ন অগ্রগতিকে বিবেচনায় নিয়ে ধর্ষণের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংজ্ঞা গ্রহণের পক্ষে আদালত সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন।
আইনের স্পষ্ট ও যুগোপযোগী সংজ্ঞায়নের পাশাপাশি যে-কোনো ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। ধর্ষণের নামকরণের ক্ষেত্রেও ভিন্নতা পরিহার করা প্রয়োজন। অর্থ এক হলেও ব্যবহারিক গুরুত্ব বিবেচনায় ছেলে বা পুরুষ ধর্ষণের ঘটনাকে বলাৎকার হিসেবে অভিহিত না করে ধর্ষণ হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের অগ্রণী ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
মানবাধিকারের প্রতি প্রকৃতই শ্রদ্ধাশীল যে কোন মানুষই ধর্ষণসহ লিঙ্গভিত্তিক যে কোন সহিংসতা এবং অন্য সব ধরনের সহিংসতার অবসান চায়। সেজন্য আইনকে যুগোপযোগী করার মাধ্যমে আইনি প্রতিকারের পথ যেমন সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, তেমনি লিঙ্গভিত্তিক বিভাজিত ও বৈষম্য সৃষ্টিকারী আদর্শ ও মূল্যবোধের পরিবর্তনও প্রয়োজন। সর্বোপরি প্রয়োজন বিদ্যমান আধিপত্যবাদী ক্ষমতাকাঠামোর স্থলে সমতাপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো, যাতে করে নারী-পুরুষ, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু, দুর্বল-সবল বলে ক্ষমতা বলয়ের কোনো বিশেষ ধাপ থাকার সুযোগ সৃষ্টি না হয়।
বিশেষ করে, নারীর বিরুদ্ধে সংঘটিত ধর্ষণসহ অন্য যে-কোনো বৈষম্য, নির্যাতন ও নিপীড়নের মতোই পুরুষের প্রতি সংঘটিত ধর্ষণসহ বিভিন্ন যৌন সহিংসতার বিষয়টি যাতে কোনোভাবেই নারী-পুরুষকে মুখোমুখি অবস্থানে না নিয়ে যায়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন। কেননা এককভাবে কোনো ব্যক্তি নারী বা কোনো ব্যক্তি পুরুষ নয়, বরং কোনো সমাজে বসবাসকারী বিভিন্ন ব্যক্তি, সমষ্টি, প্রতিষ্ঠানের আচার-আচরণ ও চিন্তাভাবনার মিশেলে তৈরি আদর্শিক কাঠামোই ব্যক্তির আদর্শিক ছাঁচ তৈরি ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে এবং যে কোনো স্থায়িত্বশীল পরিবর্তনের জন্য নারী-পুরুষসহ সব লিঙ্গ পরিচয়ের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের বিকল্প নেই।
লেখক : কামরুন্নেসা নাজলী, মানবাধিকারকর্মী
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
সংবাদ লিঙ্কঃ ধর্ষণের শিকার যখন পুরুষ | বাংলাদেশের আইন ও সামাজিক বাস্তবতা











Visit Today : 399
Visit Yesterday : 728
Total Visit : 388309
Who's Online : 12