চোখে নতুন স্বপ্ন নিয়ে তিন বছর পূর্বে প্রেমিকের সাথে পরিবারের অজান্তে সংসার করার আশায় ঘর ছাড়ে মরিয়ম (ছদ্মনাম)। কথিত প্রেমিক মরিয়মকে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসে। মসজিদ সাক্ষী রেখে দুজন দুজনাকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বরণ করে নেয়। কিছুদিন ঢাকায় স্বামী-স্ত্রী হিসেবে বাসা ভাড়া নিয়ে সংসার করে তারা। মরিয়ম টেলিভিশন দেখতে খুবই পছন্দ করে। স্বামী কাজে গেলে মরিয়মের সময় কাটে টেলিভিশনের বিভিন্ন প্রোগ্রাম বিশেষ করে ক্রাইম পেট্রোল দেখে। মরিয়ম ক্রাইম পেট্রোল দেখে আর ভাবে ওই মেয়েগুলোর কথা, যারা বিভিন্নভাবে প্রতারিত হয়েছে। কিছুদিন সংসার করার পর মরিয়মের কথিত স্বামী বেড়ানোর কথা বলে মরিয়মকে নিয়ে বাসে চড়ে রওনা দেয় ফরিদপুরের উদ্দেশে। কিন্তু মরিয়ম বুঝতে পারেনি যে, তার স্বামী ছিল নারী পাচারকারী দলের সক্রিয় সদস্য। পথিমধ্যে গোয়ালন্দ ফেরিঘাটে নেমে মরিয়মের স্বামী তাকে একটি দোকানে কিছু খাবার কিনে দিয়ে বসিয়ে রেখে একটু সামনে এগিয়ে যায় এবং কিছু লোকের সাথে কি যেন শলাপরামর্শ করে। মরিয়ম কিছুই বুঝতে পারে না। ওদের হাব-ভাব দেখে সন্দেহ লাগে মরিয়মের। একটু এগিয়ে গিয়ে আড়াল থেকে মরিয়ম শুনতে পায় তার স্বামী কী যেন বিক্রি করার জন্য লোকগুলোর সাথে দরদাম করছে। ভালো করে শুনে সে বুঝতে পারে যে, তাকে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। শোনা মাত্রই দৌড়ে ফেরিঘাট থেকে ফরিদপুরগামী চলন্ত বাসে উঠে পড়ে মরিয়ম। বাসে ওঠার পর সুপারভাইজার কোথায় যাবে জিজ্ঞাসা করতেই ভয়ে-আতঙ্কে মরিয়ম কান্নায় ভেঙে পড়ে। অন্যান্য যাত্রীর মধ্যে ওই বাসেই যাত্রী হিসেবে ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যার বাড়ি রাজবাড়ীতে। তিনি বিষয়টা বুঝতে পেরে এগিয়ে এসে মরিয়মের সঙ্গে কথা বলেন এবং মরিয়মকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, আর কোনো ভয় নেই, তাকে নিরাপদে পৌঁছে দেয়া হবে। তিনি ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে কিছুই বলতে পারে না মরিয়ম। তখন তিনি মরিয়মকে পুলিশের কাছে পৌঁছে দেবেন বলে জানান এবং তাকে নিয়ে গোয়ালন্দ মোড়ে নামতে চাইলে ড্রাইভার ও সুপারভাইজার বাধা দেয়। আবার বিপদে পড়ার আশঙ্কায় ওই শিক্ষক নিজের পরিচয় দিয়ে কিছুটা জোর করেই মরিয়মকে নিয়ে গোয়ালন্দ মোড়ে নেমে পড়েন। গোয়ালন্দ মোড়ে টহল পুলিশের কাছে শিক্ষক বিস্তারিত জানালে পুলিশ জিডি মূলে মরিয়মকে গ্রহণ করে; যার নম্বর-৬৯২ তাং-১৩/৫/১৭ইং। এরপর পুলিশ রাজবাড়ী কোর্টের মাধ্যমে মরিয়মকে সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের মহিলা ও শিশু-কিশোরী হেফাজতিদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্র, ফরিদপুরে পাঠিয়ে দেয়। এরপর হতেই মরিয়ম ফরিদপুরের সেভ হোমে আছে। ঠিকানা ঠিকভাবে বলতে না পারায় মরিয়ম পড়ে থাকে ফরিদপুর সেভ হোমে।
গত এপ্রিল ২০১৯ সালে ধারাবাহিক কাজের অংশ হিসেবে আসক মাঠকর্মীকে ফরিদপুরের সেভ হোমে পাঠানো হয়। তখনই মরিয়মের বিষয়টি আসক অবগত হয়। আসক মাঠকর্মী মরিয়মের সঙ্গে কথা বলে এবং মরিয়ম কিছুটা অস্পষ্ট ঠিকানা বলে এবং জানায় ময়মনসিংহের পলাশপুরে তার নানার বাড়ি। সেই অস্পষ্ট ঠিকানা নিয়ে আসক কর্মী ঢাকাতে ফিরে আসেন। আসকের সিনিয়র আইনজীবী নিনা গোস্বামীর সাথে আলোচনা করে এবং তারই নির্দেশে মাঠকর্মী ময়মনসিংহ চলে যান এবং বহু খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া যায় পলাশপুর থানায় মরিয়মের নানার বাড়ি।
মা মারা যাওয়ার পর মরিয়ম নানার বাড়ি পলাশপুরেই লালিত-পালিত হয়। সেখান থেকে ঠিকানা নিয়ে মাঠকর্মী মরিয়মের বাবার বাড়ি গফরগাঁও যায়। গফরগাঁওয়ে মরিয়মের বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করে সংসার করছেন। পলাশপুর এবং গফরগাঁওয়ে আসকের মাঠকর্মী এলাকার চেয়ারম্যান, গ্রামের লোকজন, মরিয়মের পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হন মরিয়মের ঠিকানা এবং এরাই মরিয়মের পরিজন। বিস্তারিত জানার পর মরিয়মের বাবা মেয়েকে ফেরত পাওয়ার জন্য আসককে অনুরোধ করেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে রাজবাড়ী কোর্টের মাধ্যমে অ্যাডভোকেট কমলাকান্ত চক্রবর্তীর সহায়তায় ফাইল পুট-আপ দিয়ে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট (পি ডাব্লিউ) চাইলে আদালত গত ২১/৫/১৯ তারিখ জিম্মা শুনানির দিন ধার্য করেন। গত ২০/৫/১৯ তারিখে মরিয়মের বাবা ঢাকাতে আসেন এবং আসক অ্যাডভোকেট ও মাঠকর্মী মরিয়মের বাবাকে নিয়ে রাজবাড়ীতে যান। নির্ধারিত তারিখে আসক আইনজীবী জিম্মা শুনানি করেন। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে মরিয়মকে তার বাবার জিম্মায় প্রদান করেন।
নারী পাচার একটি অপরাধ। ইচ্ছার বিরুদ্ধে, প্রলোভন দেখিয়ে, ঠকিয়ে যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে পাচার করার উদ্দেশ্যে বিক্রি বা স্থানান্তর করে, তবে তা আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এক্ষেত্রে প্রতিটি ভুক্তভোগী মানুষের আইনগত সহযোগিতা পাবার অধিকার রয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি মানবাধিকার ও আইন সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর হতেই অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত নারী, শিশুর অধিকার আদায়ে আইনগত সহযোগিতা প্রদান করে আসছে। আসকের এই কাজেরই ধারাবাহিকতায় বাড়ি ফিরল মরিয়ম।
শিল্পী সাহা
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
The Sangbad Link













Visit Today : 1093
Visit Yesterday : 1475
Total Visit : 417482
Who's Online : 4