সর্বজনীন পেনশন সুবিধা

বাংলাদেশে এতদিন শুধুমাত্র সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারী, চাকরিজীবীরা অবসরের পর পেনশন সুবিধা পেয়ে থাকেন কিন্তু এখন দেশের সবাই কর্মক্ষম মানুষকে পেনশন সুবিধার আওতায় এনে ‘সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা বিল-২০২৩’ পাস হয়েছে।

আইনটিতে যা যা রয়েছে

আইনে একটি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে একজন নির্বাহী চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য থাকবেন এবং এদের নিয়োগ দেবেন সরকার। ১৬ সদস্যের একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে বিলে। এর চেয়ারম্যান হবেন অর্থমন্ত্রী। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যান, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি, উইমেন চেম্বার্স অব কমার্সের সভাপতির সদস্য হবেন। পর্ষদের সদস্য সচিব হবেন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান। বিধি দ্বারা নির্ধারিত এক বা একাধিক তফসিলি ব্যাংক জাতীয় পেনশন তহবিলের ব্যাংকার হিসেবে কাজ করবে বলে বিলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইনটির উল্লেখযোগ্য ২১টি দিক তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। সেগুলো হলো-

১. ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি সব কর্মক্ষম নাগরিক সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

২. বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরাও এ কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন।

৩. সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মচারীদের আপাতত নতুন জাতীয় পেনশন ব্যবস্থার বাইরে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে তাদের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।

৪. জাতীয় পরিচয়পত্রকে ভিত্তি ধরে দেশের ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সি সব নাগরিক পেনশন হিসাব খুলতে পারবেন।

৫. প্রাথমিকভাবে এ পদ্ধতি স্বেচ্ছাধীন থাকবে, যা পরবর্তী সময়ে বাধ্যতামূলক করা হবে।

৬. ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দেয়া সাপেক্ষে মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হবেন।

৭. প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি আলাদা পেনশন হিসাব থাকবে। ফলে চাকরি পরিবর্তন করলেও পেনশন হিসাব অপরিবর্তিত থাকবে।

৮. সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। তবে এক্ষেত্রে কর্মী বা প্রতিষ্ঠানের চাঁদা জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দেবে।

৯. মাসিক সর্বনিম্ন চাঁদার হার নির্ধারিত থাকবে। তবে প্রবাসী কর্মীরা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে চাঁদা জমা দিতে পারবেন।

১০. সুবিধাভোগীরা বছরে ন্যূনতম বার্ষিক জমা নিশ্চিত করবেন। অন্যথায় তার হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত হয়ে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে বিলম্ব ফিসহ বকেয়া চাঁদা দেয়ার মাধ্যমে হিসাব সচল করতে হবে।

১১. সুবিধাভোগীরা আর্থিক সক্ষমতার ভিত্তিতে চাঁদা হিসেবে বাড়তি অর্থ (সর্বনিম্ন ধাপের অতিরিক্ত যেকোন অঙ্ক) জমা করতে পারবেন।

১২. পেনশনের জন্য নির্ধারিত বয়সসীমা অর্থাৎ ৬০ বছর পূর্তিতে পেনশন তহবিলে পুঞ্জীভূত লভ্যাংশসহ জমার বিপরীতে নির্ধারিত হারে পেনশন দেয়া হবে।

১৩. পেনশনধারীরা আজীবন অর্থাৎ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পেনশন সুবিধা ভোগ করবেন।

১৪. নিবন্ধিত চাঁদা জমাকারী পেনশনে থাকাকালীন ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে জমাকারীর নমিনি বাকি সময়কালের (মূল জমাকারীর বয়স ৭৫ বছর পর্যন্ত) জন্য মাসিক পেনশন প্রাপ্য হবেন।

১৫. পেনশন কর্মসূচিতে জমা করা অর্থ কোনো পর্যায়ে এককালীন উত্তোলনের সুযোগ থাকবে না। তবে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জমা করা অর্থের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ ঋণ হিসেবে উত্তোলন করা যাবে, যা সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

১৬. কমপক্ষে ১০ বছর চাঁদা দেয়ার আগে নিবন্ধিত চাঁদাদানকারী মারা গেলে জমা করা অর্থ মুনাফাসহ তার নমিনিকে ফেরত দেয়া হবে।

১৭. পেনশনের জন্য নির্ধারিত চাঁদা বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করে কর রেয়াতের জন্য বিবেচিত হবে এবং মাসিক পেনশন বাবদ প্রাপ্ত অর্থ আয়করমুক্ত থাকবে।

১৮. এ ব্যবস্থা স্থানান্তরযোগ্য ও সহজগম্য অর্থাৎ কর্মী চাকরি পরিবর্তন বা স্থান পরিবর্তন করলেও তার অবসর হিসাবের স্থিতি, চাঁদা প্রদান ও অবসর সুবিধা অব্যাহত থাকবে।

১৯. নিম্ন আয়সীমার নিচের নাগরিকদের ক্ষেত্রে পেনশন কর্মসূচিতে মাসিক চাঁদার একটি অংশ সরকার অনুদান হিসেবে দিতে পারে।

২০. পেনশন কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ব্যয় সরকার নির্বাহ করবে।

২১. পেনশন কর্তৃপক্ষ তহবিলে জমা করা টাকা নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বিনিয়োগ করবে (সর্বোচ্চ আর্থিক রিটার্ন নিশ্চিতকরণে)।

প্রস্তাবিত আইনে আরও বলা হয়েছে, সরকারি অনুদান, নাগরিকদের চাঁদা, বিনিয়োগকৃত অর্থের মুনাফা, প্রতিষ্ঠানসমূহের অংশগ্রহণের চাঁদা, ইত্যাদি নিয়ে পেনশন তহবিল গঠিত হবে। এক বা একাধিক ব্যাংক, পোস্ট অফিসসমূহ এই পেনশন তহবিলের চাঁদা আদায়ের সম্মুখ অফিস হিসাবে কাজ করবে।

আইনটি সম্পর্কে মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিমে কোনো নাগরিককেই বাদ দেয়া যায় না। এটা রাষ্ট্রীয় একটি সেফটি নেটের মতো। করোনার পর এই সুরক্ষার বিষয়টি এখন বড় করে সামনে আসছে। সর্বজনীন করতে হলে যাদের সুনির্দিষ্ট আয় নেই বা আয় কম, তাদেরও এর মধ্যে রাখতে হবে। সর্বোচ্চ বয়সসীমাও থাকা উচিত নয়। আর এটা চূড়ান্ত করার আগে সবার মতামত নেয়া দরকার। কারণ, এখানে সরকার যে অংশ দেবে, সেখানে নাগরিকদের করের অর্থও থাকবে।’ তার মতে, ‘এখানে অর্থনীতির কাঠামো, চাপ নেয়ার ক্ষমতা- এগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।’

ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিস্ট ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘সরকার যেটা বলছে সেটা সর্বজনীন পেনশন নয়, কন্ট্রিবিউটরি পেনশন। কন্ট্রিবিউটরি হলে তো একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমার বিপরীতে সরকার পেনশন দেবে। সরকারেরও অংশগ্রহণ থাকবে।’

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশর (পিআরআইবি) প্রধান নির্বাহী ড. আহসান এইচ মনসুরের মতে, ‘স্কিমটি চালু হওয়া দরকার। চালু হলে এর সুবিধা-অসুবিধা বোঝা যাবে। তখন সংশোধনও করা যাবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘সরকারের সর্বজনীন সেফটি নেটের মতো এটা নয়, এটা হবে কন্ট্রিবিউটরি। তবে এখানেও সবার অংশ নেয়ার সুযোগ থাকতে হবে। সেটা সরকার কিভাবে দিবে তার সঠিক পলিসি করা প্রয়োজন। আর এটা যেহেতু কন্ট্রিবিউটরি তাই সরকার একটা সর্বোচ্চ বয়স নির্ধারণ করছে, যাতে কন্ট্রিবিউশনের পর্যাপ্ত সময় থাকে। তাই আমরা যারা বুড়ো, তারা বাদ পড়ে যাবো। তবুও তারা পাক,’ বলেন এই অর্থনীতিবিদ।


সৌজন্যে: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

[লেখক: জেরিন জান্নাত ঈশিতা, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ]

প্রকাশিত লিঙ্কঃ সর্বজনীন পেনশন সুবিধা