নদ-নদীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও আদালতের নির্দেশ

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। আদিকাল থেকে এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি প্রভাবিত হয়ে আসছে নদীকে কেন্দ্র করে। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এদেশের সভ্যতা ও বড় বড় নগরীগুলো। একসময় নদীই ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই পরিচালিত হতো নদীকে ঘিরে। মাঝি, জেলে ও বেদে সম্প্রদায়ের পেশাজীবী মানুষের জীবন ও জীবিকা পরিচালিত হত নদীর ওপর নির্ভর করে। নদীর পানি ব্যবহার করে আজও চলছে দেশের কৃষি ব্যবস্থা। নদী থেকে প্রাপ্ত মাছ দেশের নাগরিকের আমিষের চাহিদা মেটাতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শিল্প কারখানা।

দেশের নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা আজও অজানা। নদী সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের একেক সংস্থা নদীর সংখ্যা নিয়ে একেক তথ্য দেয়। নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী নদীর সংখ্যা ৭৭০-এর বেশি। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশে মোট নদী রয়েছে ৪৯৬টি। পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নদ-নদী’ শীর্ষক প্রকাশনায় ৪০৫টি নদীর পরিচয় পাওয়া যায়। একজন নদী গবেষক তাঁর নিজস্ব গবেষণায় ১১৮২টি নদীর তালিকা প্রস্তুত করেছেন। অধিকন্তু দেশের মিডিয়াগুলো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নদীর নাম ও সমস্যা তুলে নিয়ে আসছে।

দেশের প্রতিটি নদী আজ দখল, দূষণ ও ভরাটে জর্জরিত। নদী রক্ষা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৫৭ হাজার ৩৯০ দখলদার নদীগুলোকে দখল করে আছে। কোনো কোনো নদী মৃত, আবার কোনোটি মৃতপ্রায়। নালার আকৃতি ধারণ করেছে এমন নদীর সংখ্যাও কম নয়। নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা শিল্প কারখানা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ নদীগুলোকে এক শোচনীয় পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে প্রয়োগহীন আইনিব্যবস্থা নিঃশেষ করছে নদীগুলোকে। শুধু দখল ও দূষণ নয়, যত্রতত্র থেকে বালু উত্তোলনের ফলে ভেঙে পড়ছে নদীর প্রতিবেশ ব্যবস্থা। উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে নদী ভাঙন। নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ, স্কুলসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।

অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শিতা দেশের নদীর জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠছে। নদীকে বিল ও খাল দেখিয়ে ইজারাও প্রদান করা হচ্ছে সম্প্রতিকালে। শুধু যে পরিবেশগত ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে তা নয়, বরং জনমানব সুপেয় পানির মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ছে। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি ব্যবস্থা, হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মৎস্য ও জীববৈচিত্র্য, নেমে যাচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর। সম্প্রতি নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী দেশে ৬৫ হাজার ১২৭ জন দখলদার আছে বলে সংসদে উল্লেখ করেন। ইতিপূর্বে দেশের সব নদীকে মহামান্য আদালত আইনি সত্তা/জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করে রায় প্রদান করে। আদালতের রায়ে দেশের সব নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের নিমিত্তে নদী কমিশনকে আইনগত অভিভাবক ঘোষণা করে। নদ-নদী সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, অধিদপ্তর, এবং মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশের সব নদ-নদী দূষণ ও দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক নৌ চলাচলের উপযোগী করে সুরক্ষা, সংরক্ষণ, উন্নয়ন, শ্রীবৃদ্ধিসহ যাবতীয় উন্নয়নে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বাধ্য থাকবে মর্মে আদালত উল্লেখ করে।

আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও দখল, ভরাট, দূষণসহ নদী বিরুদ্ধ সব কার্যক্রম থেকে নদীকে রক্ষা করে তা পুনরুদ্ধারে প্রথমেই প্রয়োজন নদীর সঠিক সংখ্যাসংবলিত পরিপূর্ণ তালিকা। অবশেষে ২১ নভেম্বর, ২০২১ তারিখে বেলা কর্তৃক দায়ের করা এক জনস্বার্থমূলক মামলায় (নং৮৫৩৯/২০২১) মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ দেশের সব নদীর সংখ্যা চিহ্নিতকরণ, আইনবহির্ভূত দখল থেকে নদীসমূহকে রক্ষা, নদী দখলকারীদের উচ্ছেদ এবং তুরাগ নদীর সীমানা পিলার সঠিকভাবে স্থাপন এর ব্যর্থতা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে বিবাদীগণের ওপর রুল জারি করেছে। একইসঙ্গে সব নদীর সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত, সঠিকভাবে তুরাগ নদীর সীমানা চিহ্নিতকরণ, বিভিন্ন সময় মিডিয়াতে প্রকাশিত ও নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক চিহ্নিত দখলদারসহ সব নদীসমূহে বিদ্যমান দখলদারদের উচ্ছেদ, ২৪-২৫ জুন, ২০০৯ তারিখে প্রদত্ত ৩৫০৩/২০০৯ মামলার রায় অনুসরণপূর্বক সব নদীর সীমানা সিএস জরিপ অনুযায়ী দৃশ্যতভাবে চিহ্নিতকরণ এবং ভবিষ্যৎ দখলরোধে সাইন, সিম্বল ও বৃক্ষায়নের মাধ্যমে নদী সীমানা চিহ্নিতকরণের নির্দেশ কেন প্রদান করা হবে না, তা-ও জানতে চেয়েছে আদালত।

সে সঙ্গে আগামী ৫ জুন, ২০২২ সালের মধ্যে দেশের সব নদীর একটি সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করতে, নদীকে দখলমুক্ত ও যথাযথভাবে নদী সীমানা নির্ধারণ করতে সময় ও যথাযথ প্রক্রিয়া বর্ণনাপূর্বক কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়, নদী রক্ষা কমিশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ ও সব বিভাগীয় কমিশনারগণের প্রতি নির্দেশ প্রদান করে এবং ৩৫০৩/২০০৯ এবং ১৩৯৮৯/২০১৬ মামলার রায় অনুসরণপূর্বক তুরাগ নদীর সীমানা প্রাচীর চিহ্নিত করতে মহামান্য আদালত বিবাদীগণের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদান করে। ১৩৯৮৯/২০১৬ মামলার রায়ে আদালত দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ (juristic/legal persons/living entities) ঘোষণা করে। একইসঙ্গে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল ও জলাশয়কে রক্ষার জন্য জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে ‘আইনগত অভিভাবক’ ঘোষণা করে। ফলশ্রুতিতে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের সুরক্ষা, সংরক্ষণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, শ্রীবৃদ্ধিসহ সব দায়িত্ব বর্তাবে নদী রক্ষা কমিশনের ওপর।

নদী রক্ষা কমিশন যাতে কার্যকর একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই দায়িত্ব পালন করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে সরকারকে যেসব নির্দেশনা প্রদান করে তা হচ্ছে- নদ-নদী, খাল-বিল জলাশয় দখলকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর ‘কঠিন সাজা ও জরিমানা’ নির্ধারণপূর্বক ২০১৩ সালের নদী রক্ষা কমিশন আইন সংশোধন করে ছয় মাসের মধ্যে তা হলফনামা আকারে আদালতে দাখিল করতে হবে; নদ-নদীর পাশে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় নদীরক্ষা কমিশনের অনাপত্তিপত্র গ্রহণ করতে হবে; এ বিষয়টি সরকারের সব বিভাগকে অবগত করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব; এবং স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের সব নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবস্থান চিহ্নিত ও নির্ণয় করে একটি ডিজিটাল ডেটাবেইজ তৈরি ও তা দেশের সব ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। যে কোনো নাগরিক যেন নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নদ-নদীর ম্যাপ, তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

নদী দখল বন্ধে এ রায়ে রয়েছে কতিপয় প্রতিরোধমূলক নির্দেশনা যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদকে নিজের এলাকার নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের অবৈধ দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের নামের তালিকা জনসম্মুখে ও পত্রিকায় প্রকাশ করতে হবে; দেশের সব সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে এক ঘণ্টা ‘নদী রক্ষা, সুরক্ষা, দূষণ প্রতিরোধ’, নদ-নদীর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সচেতনতামূলক পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে। দেশের সব শিল্প কারখানার সব শ্রমিক কর্মচারীর অংশগ্রহণে প্রতি দুই মাসে এক দিন এক ঘণ্টা সচেতনতামূলক সভা বা বৈঠক করতে হবে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবেশিল্প মন্ত্রণালয়। দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, জেলা ও বিভাগে প্রতি তিন মাসে একবার নদী বিষয়ে দিনব্যাপী সভা-সমাবেশ, সেমিনার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

দেশের নদ-নদীর প্রকৃত সংখ্যা আজও অজানা। নদী সুরক্ষা ও ব্যবস্থাপনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারের একেক সংস্থা নদীর সংখ্যা নিয়ে একেক তথ্য দেয়

জনস্বার্থমূলক (৩৫০৩/২০০৯) নং মামলার ২৪ ও ২৫ জুন, ২০০৯ তারিখের রায়ে আদালতের আদেশসমূহ-সিএস ও আরএস ম্যাপ অনুসারে মধ্যে তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্য নদীসমূহের সীমানা জরিপ কাজ সম্পন্নকরণ। তুরাগ, বালু, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্য নদীসমূহকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (Ecologically Critical Area) ঘোষণা এবং নদীগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা প্রণয়ন। সীমানা পিলার স্থাপন এবং নদীগুলির সীমানায় Walk-way/Pavement নির্মাণ বা বৃক্ষরোপণকরণ। নদীগুলোর অভ্যন্তরে অবস্থিত সব ধরনের স্থাপনা অপসারণ। একটি ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন’ গঠন; মহানগরীর চতুর্পার্শ্বের ৪টি নদী খনন এবং পলিথিন ব্যাগসহ অন্যান্য বর্জ্য ও পলি অপসারণ; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অনতিবিলম্বে সংশ্লিষ্ট আদালতে পরিবেশসংক্রান্ত বিচারাধীন মোকাদ্দমা নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। ঢাকাস্থ বাকল্যান্ড বাঁধসহ নদী তীরস্থ সব সরকারি ভূমি হইতে দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা অপসারণ। যমুনা-ধলেশ্বরী, ধলেশ্বরী-বুড়িগঙ্গা, পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র-বংশী, বংশী-তুরাগ,যমুনা-পুংলীখাল, তুরাগ ও টঙ্গী খাল খনন। এছাড়া আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, ‘অবৈধ স্থাপনা যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানেরই হোক না কেন এবং তিনি যত বড় শক্তিশালীই হন না কেন বা তিনি যে গোষ্ঠীরই হন না কেন, বৈষম্যহীন এবং ব্যতিক্রম ছাড়া তা অপসারণ করতে হইবে…।’


লেখক : জাকিয়া সুলতানা, আইনজীবী
সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ নদ-নদীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা ও আদালতের নির্দেশ