ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযান

দেশে বর্তমানে টাকা দিয়ে মানসম্পন্ন, নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত পণ্য কিনে প্রতারিত হলে প্রতিকারের সুযোগ আছে। যে কোনো পণ্য কেনার সময় উপাদান, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, বিক্রয়মূল্য, পণ্যের মান ও কার্যকারিতা বিষয়ে জানার অধিকার রয়েছে ভোক্তার। তবে দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব সেবা থেকে বঞ্চিত। পণ্য কিনে প্রতারিত ক্রেতা-ভোক্তার সুরক্ষা মিলতে পারে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের করা অভিযানের মাধ্যমে। ২০০৯ সালে প্রণীত ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনটি বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ প্রতিরোধ, অধিকার লঙ্ঘনজনিত বিরোধ নিষ্পত্তি, নিরাপদ পণ্য ও সঠিক সেবা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কাজটি করে সংস্থাটি। ২০১৭ সালে আইনটি প্রয়োগের পদক্ষেপের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজারের বেশি প্রতারিত ভোক্তার অভিযোগ পেয়েছে সংস্থাটি। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে সবকিছুতেই সিন্ডিকেট করে হুটহাট দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ঠকানো হচ্ছে। এমনটি ভোক্তা অধিকার আইনবিরোধী। তবে প্রচার-প্রচারণার অভাবে মানুষ এ আইনের সুফল পাচ্ছে না এবং এ সম্পর্কে তেমন একটা জানেও না।
অভিযোগের ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে এই আইনের প্রয়োগ হলেও সর্বসাকল্যে এর সার্থকতা কমই দেখা যাচ্ছে। ভোক্তাদের অভিযোগের সূত্র ধরে ঘটনাস্থলে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। কিন্তু ঘটনাস্থলে অভিযোগকারী না পাওয়া গেলে অধিদপ্তর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অভিযান কার্যক্রম না করে ফিরে যায়। বিটিআরসির মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলে পালিয়ে যাওয়া অভিযুক্তকে ধরতে পারে না ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এর ফলে পূর্ণাঙ্গভাবে আইন প্রয়োগ সম্ভব হয় না। এটা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের সীমাবদ্ধতা এবং ভোক্তা অধিকারের বিটিআরসির মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকার কারণে তাদের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তবে এখন ভোক্তারা সচেতন হওয়ায় অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। অভিযুক্ত ব্যবসায়ীকে যে জরিমানা করা হয়, তার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারী ভোক্তা পান। এ জন্য অনেকে অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে আরও উৎসাহিত হচ্ছেন। কোনো ব্যবসায়ী ভোক্তাকে ঠকালে শুধু শাস্তিই পাবেন না, বরং ভোক্তাও অভিযোগ করে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন। ভোক্তা অধিকার আইনের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। ভোক্তা অধিকার আইনমতে, ভোক্তা হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যিনি বা যারা পছন্দ বা প্রয়োজনে পুনর্বিক্রয় ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ব্যতীত মূল্য পরিশোধে বা মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতিতে পণ্য বা সেবা কেনেন এবং পরিষেবার চূড়ান্ত ব্যবহারকারী। অধিদপ্তরের যাত্রার প্রথমদিকে মোবাইল ফোন অপারেটরদের বিরুদ্ধে বেশি অভিযোগ পড়ত; যেখানে প্যাকেজের নামে প্রতারণা, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেবা না দেওয়া ও গ্রাহকের অজান্তে টাকা কেটে নেওয়ার অভিযোগ ছিল বেশি।
২০১৭ সালের পর থেকে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বিস্তর। এসব প্রতিষ্ঠান ও তাদের চালকদের ভাড়া বেশি নেওয়াসহ বিভিন্ন অফার ও ছাড়ের প্যাকেজে অনিয়মের অভিযোগ এসেছে অহরহ। এখন অভিযোগ বেশি ই-কমার্স শপগুলোর বিরুদ্ধে। জানা যায়, বিগত তিন বছরে নামি-বেনামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রায় ২০ হাজার অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা। এ ছাড়া বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে অভিযোগ তো আছেই। ২০০৯ সালে প্রণীত ভোক্তা অধিকার আইনে মোট ৮২টি ধারা রয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি ধারার উপধারা রয়েছে। ৩৭ ধারা মোতাবেক কোনো ব্যক্তি কোনো আইন বা বিধি দ্বারা কোনো পণ্য মোড়কাবদ্ধভাবে বিক্রয় করা এবং মোড়কের গায়ে সংশ্নিষ্ট পণ্যের ওজন, পরিমাণ, উপাদান, ব্যবহারবিধি, সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ এবং মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করে থাকলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা হলে ৩৭ ধারায় এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা হলে ৩৮ ধারায় এক বছর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। এ ছাড়া আরও অনেক ধারায় শাস্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। ভোক্তা হিসেবে কারও কোনো অভিযোগ থাকলে অভিযোগ তদন্ত করে প্রমাণিত হলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর মধ্যে আছে জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান।
এক ধরনের বিক্রেতা আছে যারা পবিত্র রমজান মাস এলে নিত্যপণ্যের দাম অধিক মুনাফার জন্য বাড়িয়ে দেন। করোনার পর ২০২২ সালে প্রথমবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালায়। এবার গরমের ভেতরে রমজান এবং এই সময়ে বাজারে ওঠা চাহিদা থাকা ফলমূল কেজি দরে অযৌক্তিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। এসব ক্ষেত্রে অধিদপ্তর তাদের অভিযানের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা এবং অসাধু বিক্রেতাদের জরিমানা দিতে বাধ্য করেছে। প্রথমবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান চালানোর কারণে ভোক্তাদের ঈদের কেনাকাটায় এই অসাধু বিক্রেতাদের চক্র ধরা পড়ে জরিমানা ও শাস্তি পেয়েছে। তবে, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের লোকবল কম থাকায় এখনও সারাদেশে এর সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।


লেখকঃ জাহিদুর রহমান, শিক্ষানবিশ আইনজীবী
সৌজন্যঃ আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযান