আইনের প্রয়োগহীনতা ও ঢাকার জলাধার

দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পূর্বে বালু, উত্তরে টঙ্গী খাল এবং পশ্চিমে তুরাগ নদী দিয়ে ঘেরা প্রায় ৪০০ বছর আগে রাজধানী হিসেবে গড়ে ওঠা ঢাকা মহানগরীর অবস্থান দেশের কেন্দ্র বিন্দুতে। প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত এ নগরীর পাশ দিয়ে প্রবাহমান ছিল সাত-সাতটি নদী, পঞ্চাশোর্ধ খাল ও অসংখ্য ছোটবড় জলাশয়। অপরিকল্পিত ও দ্রুত প্রসারিত এ মহানগরী আজ বিশ্বের বসবাস অযোগ্য ৪র্থ নগরীর পরিচয় গ্রহণ করেছে।

শিল্পায়ন ও আবাসন বাণিজ্যের আগ্রাসন ক্রমান্বয়ে গ্রাস করছে রাজধানী এবং এর আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জলাধারগুলোকে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আদর্শ একটি শহরের জন্য জলাশয় থাকা প্রয়োজন ১০-১৫ শতাংশ যার বিপরীতে ঢাকা শহরে জলাভূমি রয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) পরিচালিত ২০২০ সালের এক গবেষণায় ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় জলাশয় ভরাটের চিত্র উঠে এসেছে। এ গবেষণা অনুযায়ী ২০১০ সালে ঢাকা মহানগরীতে জলাভূমি ছিল ৯ হাজার ৫৫৬ একর, যা ২০১৯ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৩ একর অর্থাৎ বিগত ৯ বছরে ঢাকা নগরীতে ভরাট হয়েছে মোট জলাভূমির ৩৬ শতাংশ। জলাধারগুলো হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীর শান্ত-সৌম্য রূপ দিন দিন রুক্ষ হচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য হারাচ্ছে এ জনপদ। প্রাণ, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ দুরূহ হয়ে উঠেছে। নগরীর বৃষ্টির পানি সুষ্ঠু নির্গমনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতার চরম দুর্ভোগে রয়েছে নগরবাসী।

ঢাকা ও এর আশেপাশের জলাশয় ভরাটের সঙ্গে জড়িত রয়েছে খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানও। সম্প্রতি জাতীয় দৈনিকে রাজধানীর আশকোনা এলাকায় বিশাল আয়তনের একটি জলাশয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ভরাট করছে মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধেক ভরাট হয়ে গেছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী জলাশয়টি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) দক্ষিণ খান মৌজায় অবস্থিত এবং বিমানবন্দর ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় জলাশয়, যা ভরাট হয়ে গেলে বিমান বন্দর, দক্ষিণ খান ও উত্তর খানসহ আশেপাশের এলাকায় পানি নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে ও জলাবদ্ধতার শিকার হবে এলাকাবাসী। চোখের সামনে এমন একটি জনগুরুত্বপূর্ণ জলাশয় ভরাট হতে দেখেও জলাধার রক্ষার দায়িত্বে থাকা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, রাজউক, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নীরব ভূমিকা পালন করছে, যা আইন বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের চরম ব্যর্থতা।

সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করবে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করবে।

দেশে প্রচলিত বিভিন্ন আইনে জলাধারের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০ (২০০০ সালের ৩৬ নং আইন) অনুযায়ী নদী, খাল, বিল, দীঘি, ঝরনা, জলাশয় হিসেবে মাস্টারপ্ল্যানে চিহ্নিত বা সরকার, স্থানীয় সরকার বা কোন সংস্থা কর্তৃক, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, বন্যা প্রবাহ এলাকা হিসেবে ঘোষিত কোন জায়গা এবং সলল পানি এবং বৃষ্টির পানি ধারণ করে এমন কোনো ভূমি প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে গণ্য হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এ ধারা ২(কক) সংযোজনের মাধ্যমে জলাধারের এ সংজ্ঞার সঙ্গে হাওর, বাঁওড় এবং পুকুর শব্দগুলো সংযোজন করা হয়েছে। ২০০০ সালের ৩৬ নং আইনটি শুধু শহর এলাকার জন্য প্রযোজ্য হলেও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের প্রয়োগ দেশব্যাপী। বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর ধারা ২(৫) অনুযায়ী জলাধার হচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বা কৃত্রিমভাবে খননকৃত কোনো নদ-নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়, দীঘি, পুকুর, হ্রদ, ঝরনা বা অনুরূপ কোনো ধারক।

বিভিন্ন আইনে জলাধারের সংজ্ঞা প্রদানের পাশাপাশি জলাধার রক্ষায় কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দখলের হাত থেকে মহানগরীসহ অন্যান্য শহর এলাকার জলাধার রক্ষায় প্রণীত ২০০০ সালের ৩৬ নং আইনের বিধান অনুযায়ী সরকারের পূর্বানুমোদন ছাড়া প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না বা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাবে না (ধারা ৫)। জলাধার ভরাটসংক্রান্ত কোনো আবেদনের নিষ্পত্তিকল্পে সরকার অবশ্যই মাস্টারপ্ল্যানের উদ্দেশ্যকে সমুন্নত রাখবে। মাস্টার প্ল্যানে চিহ্নিত জলাধারগুলো রক্ষার উদ্দেশ্যে মাস্টার প্ল্যানের বহুল প্রচার নিশ্চিত করবে রাজউক (ধারা ৪)। যদি কোনো ব্যক্তি এ আইন লঙ্ঘন করে জলাধার ভরাট করে বা জলাধারকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে তবে তার শাস্তি হবে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদন্ড বা ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ড (ধারা ৮(১))। শাস্তি প্রদান ছাড়াও আইন লঙ্ঘন করে কেউ যদি জলাধারের শ্রেণী পরিবর্তন করে তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নোটিস দ্বারা তাকে বাধা প্রদান করতে পারবে এবং নির্ধারিত পদ্ধতিতে অননুমোদিত নির্মাণকাজ ভেঙে ফেলার জন্য নির্দেশ দিতে পারবে (ধারা ৮(২))।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা (৬ঙ) অনুযায়ী অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থ ও কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া জলাধার হিসেবে চিহ্নিত কোনো জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ। এ ধারার বিধান লঙ্ঘন করে জলাধারের শ্রেণী পরিবর্তন করলে তার শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদন্ড বা ১০ লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয়দন্ড (ধারা ১৫)। পানি আইনের অধীন গঠিত নির্বাহী কমিটির কাছে যদি মনে হয় কোনো জলাধার সংরক্ষণ করা প্রয়োজন তবে নির্বাহী কমিটি সীমানা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট জলাধার সংরক্ষণের জন্য তার মালিক বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে সুরক্ষা আদেশ প্রদান করতে পারবে (ধারা ২২)।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এ সিটি করপোরেশনকে তার নির্ধারিত এলাকার মধ্যে অবস্থিত জলাধার রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। এ আইনের তৃতীয় তফসিলের ক্রমিক নং ৮.১৫ অনুযায়ী করপোরেশন নগরীর মধ্যে অবস্থিত সব পানির উৎস, ঝরনা, নদী, দীঘি, পুকুর ও ধারা বা এর কোনো অংশকে সরকারি জলাধার হিসেবে ঘোষণা করতে পারবে (ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যতীত)। ক্রমিক নং ৮.১৬ অনুযায়ী করপোরেশন সরকারি জলাধারে চিত্ত-বিনোদন এবং জীবনরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে এবং পানি সেচ, পানি নিষ্কাশন ও নৌ-চলাচল-এর উন্নয়ন ও সংষ্কার করতে পারবে। ক্রমিক নং ৮.১৭ অনুযায়ী করপোরেশন তার আওতাভুক্ত সব জলাধার রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী থাকবে।

উপরোক্ত সাধারণ আইনগুলো ছাড়াও ঢাকা মহানগরীর জলাধারগুলো রক্ষায় আরও কিছু আইন ও বিধিমালা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪-এর বিধান অনুযায়ী প্রকল্প এলাকায় কোনো খাল, বিল, নদী, নালা বা অন্য কোনো জলাধার থাকলে তার পানি প্রবাহ যাতে বিঘ্ন না হয় উদ্যোক্তা তা নিশ্চিত করবে (বিধি ৬(চ))। আরও বলা হয়েছে প্রকল্প এলাকার কোন ভূমি সিএস, এসএ এবং আরএস নকশায় খাল, বিল, নদী, নালা বা জলাধার হিসেবে দেখানো ভূমি সংকুচিত করে প্লট সৃষ্টি বা বরাদ্দ করলে উদ্যোক্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে (বিধি ৯(৩))।

দেশে জলাধার রক্ষায় ও সংরক্ষণে সুষ্পষ্ট আইন থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে জলাধার যা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে, আইনের প্রয়োগহীনতাই জলাশয় নিঃশেষের মূল কারণ।


লেখক : জাকিয়া সুলতানা, আইনজীবী

সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)

প্রকাশিত লিঙ্কঃ আইনের প্রয়োগহীনতা ও ঢাকার জলাধার