মেধাস্বত্ব আইন, বাণিজ্য ও মানবাধিকার

কাজী আনোয়ার হোসেন প্রয়াত হয়েছেন। তিনি প্রায় এক হাতেই আমাদের দেশে দাঁড় করিয়েছিলেন রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পের জনপ্রিয় সাহিত্যধারা। পাশাপাশি ধ্রুপদি বিদেশি সাহিত্যগুলোও সুলভ করেছিলেন পাঠকের জন্য। গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে শুরু করে পাঁচ দশকের অধিককাল বিশাল জনপ্রিয়তা ধরে রাখার কৃতিত্ব কাজী আনোয়ার হোসেন এবং তার কালজয়ী সৃষ্টি মাসুদ রানাকে অবশ্যই দিতে হবে। ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখকস্বত্ব দাবি করে শেখ আবদুল হাকিমের মামলা এবং সেই মামলায় কাজী আনোয়ার হোসেনের পরাজয় হয়েছে। গত বছরের ২৮ আগস্ট শেখ আবদুল হাকিমও মারা যান।

প্রায় ১০ বছর আগে নিজেকে থ্রিলার সিরিজ ‘মাসুদ রানা’র লেখক দাবি করে বাংলাদেশ কপিরাইট রেজিস্ট্রার অফিসে অভিযোগ জানিয়েছিলেন শেখ আবদুল হাকিম। বইয়ের রয়্যালটি দেওয়াকে কেন্দ্র করে মূলত কাজী আনোয়ার হোসেন ও শেখ আবদুল হাকিমের মধ্যে বিরোধের জন্ম। সেবা প্রকাশনীর অন্যান্য লেখকের মতো আবদুল হাকিম পাণ্ডুলিপি দিয়ে টাকা নিতেন। বই বিক্রির পর আরও টাকা পেতেন। কাজী আনোয়ার হোসেনের সৃষ্টি ‘মাসুদ রানা’ পাঠক-সমাজে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন লেখককে দিয়ে লিখিয়ে লেখার কিছু পরিবর্তন বা সম্পাদনা করে কাজী আনোয়ার হোসেন নিজের নামে এসব বই প্রকাশ করেছেন। ছাপানো বইয়ের সংখ্যা সঠিকভাবে না দেখিয়ে প্রাপ্য রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে লেখক শেখ আবদুল হাকিম কপিরাইট অফিসে অভিযোগ করেন। ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজের কিছু বই শেখ আবদুল হাকিম লিখেছেন, সেটি কপিরাইট বোর্ডের কাছেও লিখিতভাবে কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়। কাজী আনোয়ার হোসেনের পক্ষ থেকে যুক্তি দেখানো হয়, আবদুল হাকিম সেবা প্রকাশনীতে চাকরি করতেন। চাকরি থেকে আনোয়ার হোসেনের নির্দেশে বইগুলো লিখেছেন। মালিকের কথায় বই লেখায় আবদুল হাকিম বইয়ের স্বত্ব পেতে পারেন না। যেসব বইয়ের ভেতর আবদুল হাকিমের নাম রয়েছে, সেগুলো ছাড়া কোনোভাবে তিনি অন্য বইয়ের স্বত্ব দাবি করতে পারেন না।

তবে কপিরাইট বোর্ড রায়ে বলেছে, আবদুল হাকিম যে সেবা প্রকাশনীতে চাকরি করতেন, এর তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেননি প্রতিপক্ষ কাজী আনোয়ার হোসেন। আবদুল হাকিম চাকরিজীবী হলেও পাণ্ডুলিপি প্রণেতা হিসেবে রচনার মূল মালিক। পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা চাকরি দিয়ে কারও রচনা নিজের বলে দাবি করা যায় না।

বাংলাদেশে কপিরাইট বা মেধাস্বত্ব আইনের তোয়াক্কা না করেই গীতিকার ও সুরকারদের বঞ্চিত করে গান বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে দু’জন সুপরিচিত শিল্পীর মধ্যকার দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়ানোর পর আসিফ আকবর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। আসিফ আকবর ও শফিক তুহিন দু’জনেই বাংলা গানের জনপ্রিয় শিল্পী।

বাংলাদেশের দুটি জনপ্রিয় ব্যান্ড নগর বাউল ও মাইলসের প্রধান শিল্পীরা ১০ নভেম্বর ২০২১ ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে গিয়ে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন। মাইলস ব্যান্ডের প্রধান হামিন আহমেদ বলেন, ২০০৭ সাল থেকে মোবাইল অপারেটর বাংলালিংক দেশের ব্যান্ডগুলোর গান, তাদের (শিল্পী ও ব্যান্ডদল) অনুমতি ছাড়াই গ্রাহকদের রিং টোন, কলার রিং ব্যাক টোন, ওয়েলকাম টিউন এবং ফুল-ট্র্যাক ব্রডকাস্ট এবং ডাউনলোডের পূর্ণ সুবিধা দিচ্ছে। উভয় মামলাই কপিরাইট আইন, ২০০০-এর ধারা ৭১, ৮২ ও ৯১-এর অধীনে দায়ের করা হয়েছিল। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলালিংক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সমন জারি করে প্রতিষ্ঠানটিকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে আদালতে হাজির হয়ে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।

বাংলা সাহিত্যের যশস্বী লেখক ও চিন্তক আহমদ ছফার রচনাবলি বাংলাবাজারের হাওলাদার প্রকাশনী আর প্রকাশ করতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত প্রদান করে কপিরাইট অফিস। এই প্রকাশনীর অনুকূলে থাকা ১০টি বইয়ের কপিরাইট বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে একটি নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করে আহমদ ছফা রচনাবলি প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।

২৮ অক্টোবর ২০২১ সালে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে কপিরাইট আইন, ২০২১-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন এই আইনে কপিরাইট-সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, কপিরাইট আইন, ২০২১-এর খসড়ায় অজ্ঞাতনামা বা ছদ্মনামের স্বত্বাধিকারী, ডাটাবেজ, নৈতিক অধিকার, পাবলিক ডোমেইন, ফটোগ্রাফ প্রোডিউসার, লোকজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ সম্প্রচার বন্ধে কপিরাইট রেজিস্ট্রারকে অবহিত করলে তিনি সেটি বন্ধের ব্যবস্থা করবেন। একই সঙ্গে শাস্তি ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে এ আইনের ৮০, ৯৩ ও ৯৪ ধারায়। এসব বিষয় কপিরাইট আইন, ২০০০-এ ছিল না। তিনি জানান, প্রস্তাবিত আইনে নতুন অনেক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কারণ, আগে অনেক কিছুই ছিল না।

আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে মেধাস্বত্ববিষয়ক আইনের চারটি বিষয় রয়েছে :ভৌগোলিক নির্দেশক, প্যাটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট। এই চারটি বিষয়ই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনে স্বীকৃত এবং প্রতিটি বিষয়ে বাংলাদেশে পৃথক আইন রয়েছে। মেধাস্বত্ব আইন মূলত বাণিজ্যিক আইনের একটি শাখা। তাই বাণিজ্যিক আইনের শাখা হয়েও মেধাস্বত্ব আইন মানবাধিকারেরও অন্তর্ভুক্ত। সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ২৭(২) অনুচ্ছেদে মেধাস্বত্বকে মানবাধিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মেধাস্বত্ব থেকে বঞ্চিত হলে জীবনধারণ কতটা কঠিন হতে পারে, সেটার উদাহরণ দেশের অনেক শিল্পী-সাহিত্যিক। পপসম্রাট আজম খান, গায়ক আইয়ুব বাচ্চুসহ অনেকেরই জীবনসংগ্রামের কথা আমরা জানি। ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’ সিরিজ নিয়ে মামলায় লেখক শেখ আবদুল হাকিমও নিজের আর্থিক অনটনের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাই সঠিক সময়ে আইন অনুযায়ী, সৃষ্টিশীল কাজগুলো নিবন্ধিত হওয়া এই অঙ্গনের পেশাদারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পেশাদার সৃষ্টিশীল ব্যক্তিরাও নিজেদের স্বার্থেই সচেতন হবেন।

 


লেখকঃ মাবরুক মোহাম্মদ, মানবাধিকারকর্মী

সৌজন্যঃ আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)
প্রকাশিত লিঙ্কঃ মেধাস্বত্ব আইন, বাণিজ্য ও মানবাধিকার